১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঈদে গরু কেটে রাজ্জাক কামাবেন আড়াই লাখ

১০টি গরু কাটার চুক্তি করেছেন তেজগাঁওয়ের এই পেশাদার কসাই। দুই সহযোগীসহ নিজে কাটবেন আটটি।

ঈদে গরু কেটে রাজ্জাক কামাবেন আড়াই লাখ
তেজগাঁওয়ে নিজের মাংসের দোকানে কাজ করছেন আবদুর রাজ্জাক (মুখে দাড়ি) ও তার সহযোগী। এবার ঈদে ১০টি গরু কাটার চুক্তি করেছেন তিনি।

আবুল বাসার সাজ্জাদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Jun 2024, 09:23 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:08 PM

কোরবানিতে ঢাকায় যত পশু জবাই হয়, তত কসাই নেই। তাই এই ঈদে পশু কাটাকাটিতে দক্ষ কিছু মানুষের স্রোত থাকে ঢাকামুখী। তারা ঈদে বেশ ভালো আয় করে ফিরে যান এলাকায়। 

এই কসাইরা নগদ অর্থের পাশাপাশি মাংসও নিয়ে থাকেন। ঈদের দুই-তিন আগে থেকেই তারা নগরীর বাসাবাড়িতে ঢু দেন, তাদের চাহিদা থাকে ঈদের দুই দিনেই। কারণ, ঢাকায় তিন দিন কোরবানি দেওয়ার চল আছে। 

তবে মৌসুমি কসাইদের তুলনায় পেশাদার কসাইরা টাকা নেন বেশি। তারা দ্রুত গরু কাটতে পারেন, তাই আয়ও বেশি হয়। 

তাদের পারিশ্রমিক ঠিক হয় গরুর দামের ওপর ভিত্তি করে। বেশ কয়েকজন কসাই কথা বলেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে। 

একজন পেশাদার কসাই জানিয়েছেন, এবার ঈদে তিনি ও তার দল আড়াই লাখ টাকা বেশি আয় করবেন। সেই টাকা অবশ্য দলের আরও দুই সদস্যের মধ্যে ভাগ হবে। তবে অন্য একজন কসাই ছয়টি গরু কাটার চুক্তি করেছেন। তিনি একাই কাটবেন সেগুলো। গরুর মালিকের লোকজন হাত লাগাবেন তার সঙ্গে।

পেশাদার কসাইরা গরুর দামের ২০ শতাংশ আর ঢাকার বাইরে থেকে আসা মৌসুমি কসাইরা গরুর দামের ১৫ শতাংশ নিচ্ছেন কাটাকাটির মজুরি হিসেবে। কেউ কেউ গরুর আকারের ওপর ভিত্তি করে মজুরি চান। কেউ কেউ আবার টাকার সঙ্গে মাংস নেন। 

একেকটি গরুর কাটতে কাজ করে তিন থেকে চারজনের দল। আবার একাই কাটবেন, এমন মানুষও আছে। 

তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ায় শনিবার দাঁড়িয়েছিলেন মো. দুলাল হোসেন, সাগর আলী ও নূর উদ্দিন হোসেনসহ মোট ছয়জন। তারা দুই ভাগ হয়ে গরু কাটবেন। শেরপুর সদর থেকে এসেছেন শুক্রবার, ফেরার ইচ্ছা ঈদের দিন রাতে, তবে কাজ বেশি পেলে থাকবেন আরও এক দিন। 

ঈদে গরু কাটাকাটির কাজ করতে এই দলটি ঢাকায় এসেছে শেরপুর থেকে। তারা তেজগাঁও এলাকার একটি গুদাম ঘরে উঠেছেন।

ঈদে গরু কাটাকাটির কাজ করতে এই দলটি ঢাকায় এসেছে শেরপুর থেকে। তারা তেজগাঁও এলাকার একটি গুদাম ঘরে উঠেছেন।

তাদের এই ‘সফর’ বেশ কষ্টকর। তেজগাঁও এলাকার একটি গুদামে প্রতি রাতে ৪০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে রাতে থাকছেন, খাচ্ছেন ফুটপাতের হোটেলে। 

গরুর দামের ১৫ শতাংশ হারে কাটাকাটির মজুরি চাইছেন তারা। সে হিসাবে গরুর দাম এক লাখ টাকা হলে তারা চাইছেন ১৫ হাজার। 

সাগর আলী বলেন, “আমরা গেরাম থেইকা গরু কাডনের জিনিস লগে কইরা লইয়াই ঢাহাত আইছি। আমগোর পরিচিত আরও ২০-২৫ টা গুরুফ (দল) আইছে ঢাহাত। দুইদিন থাইকা কাম খুঁজতাছি। ঈদের দিন রাইতেই যামু গা।” 

তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা মো. সুজন মিয়া মূলত টাইলস মিস্ত্রী। বর্তমানে তেজগাঁওয়ের বিজয় সরণি ব্রিজ সংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে কাজ করছেন। শনিবার থেকে ঈদের ছুটির জন্য কাজ বন্ধ। তিনিও ঈদের দিন ও পরদিন কসাইয়ের কাজ করবেন। 

তার কাছে গরু কাটার চাকু বা ছুরি নেই। তাই রোববার কারওয়ান বাজার থেকে কিনেছেন। 

সুজন বলেন, “আমি যেখানে থাকি এর পাশের বিল্ডিংগুলোর লোকজন বলতেছে গরু কাটার জন্য, এগুলাই কাটবো। দূরে যাব না।” 

তার পরিচিত আরও তিনজন সিলেট থেকে রোববার রাতে ঢাকা আসার কথা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা ঈদের দিন ও পরের দুইদিন ঢাকায় গরু কাটাকাটির কাজ করবে। 

এই যাত্রায় ভালোই আয় হয় জানিয়ে সুজন বলেন, “একেকজনের আয় হয় অন্তত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। 

“তারা তিন দিনে আট থেকে দশটা গরু কাটবে। আমি এত কাটতে পারি না। অভ্যস্ত না। আমি বড়জোর দুইদিনে কাটব ৪টা। আমার লগে আরও একজন থাকব। সে আমার চেয়ে ভালো কাটে।” 

গুলশান-বনানীতে যারা কাজ করবেন, তাদের আয় বেশি হবে বলেও মনে করেন সুজন। তিনি বলেন, “এই এলাকার মানুষের টাকা বেশি, তাই সেখানে কাজ করা কসাইরা টাকা বেশি পায়। সেই এলাকায় যে পেশাদার কসাইরা ঢুকবে, তারা গ্রামে ফিরবে ৮০ থেকে থেকে ৯০ হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে।” 

মহাখালী এলাকার রিকশাচালক থেকে মৌসুমি কসাই বনে যাওয়া গুলজার হোসেন বলেন, “ঈদের দিন বা পরের দিন রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করুম, গরু কাইটা তিনগুণ আয় করুম।” 

একই এলাকায় চা বিক্রি করেন খলীল মিয়া। তিনি বলেন, আগেই কাজ ঠিক করে রাখলে চিন্তা কম থাকে। হুটহাট কাজ পাওয়া যায় না। কারণ, যার গরু তিনি লোক ঠিকঠাক করে নিশ্চিন্তে থাকতে চান। 

খলিল মিয়া গরুর আকার হিসেবে টাকা নেন। ছোট হলে ১০ হাজার, মাঝারি হলে ১৫ হাজার, আর বেশি বড় হলে ২০ হাজার টাকা চান তিনি। 

বেশি চাহিদা পেশাদার কসাইদের 

অনেকে আছেন মাংস কাটায় অভ্যস্ত নন। তাই কাটতে দেরি হওয়ার পাশাপাশি মাংসের আকার হয় অসমান। তাই মানুষ পেশাদার কসাইদের খোঁজেন বেশি। 

পেশাদার কসাইদের চাহিদা বেশি থাকায় রেটও বেশি তাদের। 

ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা আকবর হোসাইন আজমল বলেন, “আমি এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনেছি। হাজারে দুইশত টাকা হিসেবে কারওয়ান বাজারের এক কসাইয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছি। 

“তারা দুইজন আসবে। আমারটা কাটার আগে আরও দুইটা কাটবে তারা। আমার সিরিয়াল দিয়েছে ৩ নম্বর।” 

গরুর দামের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মাংস কাটার মজুরি হিসেবে নেন কসাইরা।

গরুর দামের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মাংস কাটার মজুরি হিসেবে নেন কসাইরা।

তেজগাঁওয়ের বিপ্লব গোস্ত বিতানের কসাই আব্দুর রাজ্জাক ঈদের দিন গরু কাটার চুক্তি করেন ১০ টি, নিজে কাটবেন আটটি, সঙ্গে দুইজন সহযোগীও নেবেন। 

তিনি গরুর দামের প্রতি হাজারে নিচ্ছেন দুইশত টাকা। সেক্ষেত্রে এক লাখের গরুতে নেবেন ২০ হাজার টাকা, দুই লাখের গরুতে ৪০ হাজার টাকা। 

তিনি যে আটটি গরু কাটবেন, তার মধ্যে একটি কেনা হয়েছে আড়াই লাখে, দুটি কেনা হয়েছে দুই লাখের আশেপাশে, বাকিগুলো ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখের মধ্যে কেনা হয়েছে। 

সব মিলিয়ে রাজ্জাক ও তার দল ঈদে আয় করবেন আড়াই লাখ টাকার ওপর। 

আরেকজন কসাই বিল্লাল হোসেন শুধু ঈদের দিন ছয়টা গরু কাটার চুক্তি করেছেন। তার চুক্তি হাজারে ১৫০ টাকা। তিনি একাই কাটবেন, সহযোগী নেবেন না। 

বিল্লাল বলেন, “যাদের গরু তারা আমার সঙ্গে সাহায্য করবে।”