১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩ কার্তিক ১৪৩৩

বেড়াতে গিয়ে অঙ্গার হওয়া স্বজনদের অপেক্ষায় পশ্চিম নন্দীপাড়া

এক স্বজন ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, “কেন এ রকম হলো?”

বেড়াতে গিয়ে অঙ্গার হওয়া স্বজনদের অপেক্ষায় পশ্চিম নন্দীপাড়া

স্বজনদের মরমেহ আসবে, পশ্চিম নন্দীপাড়ার মদীনা গলিতে সেই অপেক্ষা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Oct 2026, 06:35 PM

Updated : 18 Oct 2026, 06:35 PM

ঢাকার পশ্চিম নন্দীপাড়ার মদীনা গলির শেষ মাথার ছয়তলা বাড়িজুড়ে মাতম। কান্না আর বিলাপ শোনা যাচ্ছিল নিচ থেকে।

ঢুকতেই গ্যারেজে যে দরজা, তা দিয়ে প্রতিবেশী ও স্বজনরা আসছেন; যাচ্ছেন।

সবারই অপেক্ষা কখন আসবে তাদের ছেলে-মেয়েরা। কিন্তু আগুনে পোড়া ছেলে-মেয়েদের চেহারা দেখারও উপায় নেই। তাদের বাবা-মায়েরা ছুটছেন ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দিতে, সবার চেষ্টা যত দ্রুত সম্ভব লাশ বুঝে পাওয়ার।

কক্সবাজার টুপটুপ রিসোর্টে পুড়ে মারা যাওয়া এক পরিবারের ছয়জনের বাড়ি এটা। নিহতরা সবাই খালাতো-মামাতো ভাইবোন। তাদের মা-বাবারা যৌথভাবে এ বাড়ি ভাড়া নিয়ে কয়েক বছর ধরে থাকছেন।

এ পরিবারের ১০ জন যান কক্সবাজার বেড়াতে। সেখানে আগুন লাগার পর থেকে তাদের ছয় সদস্য নিখোঁজ।

পরিবারের লোকজনের ধারণা, ঘটনাস্থলে অঙ্গার হওয়া যেসব দেহাবশেষ মিলেছে, সেখানকার ছয়জন তাদের সেই সব নিখোঁজ স্বজন।

Image

স্বজনদের মরমেহ আসবে, পশ্চিম নন্দীপাড়ার মদীনা গলিতে সেই অপেক্ষা।

ছয়জনের তালিকায় আছেন, ইসরাত জাহান মালিহা, তার বোন লায়লা জাহান নাবিলা, তাদের খালাতো বোন মিলিতা মেহজাবিন আলভি ও ফারিহা কবির, ফারিহার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান ফায়িজান আহমদ এবং তাদেরই খালাতো ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাফিস তেহামি জেরিফ।

স্বজনরা বলেন, ঢাকার পশ্চিম নন্দীপাড়ার এ পরিবারের ১০ জন গত বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজার পৌঁছান। তারা ওঠেন কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক টুপটুপ রিসোর্টে।

পরিবারের ১০ জনের মধ্যে নিহত ফারিহার স্বামী নূর আলম ইফতি একদিন আগেই স্ত্রী-সন্তানকে রেখে তার কর্মক্ষেত্র চুয়াডাঙ্গায় চলে যান। এখন স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় ওষুধ কোম্পানির এই বিক্রয় কর্মকর্তা।

আর সকালের সাগরপাড়ে হাঁটতে বেরিয়ে স্ত্রীসহ বেঁচে যান নিহত মালিহা-নাবিলাদের মামা মো. মাসুদ। আর আগুন লাগার পর জানালা ভেঙে বের হতে সক্ষম হন মালিহার স্বামী আশিকুল ইসলাম।

রোববার সকালে পশ্চিম নন্দীপাড়ায় মালিহা-নাবিলাদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। অনেকে রাত থেকেই আছেন।

Image

কক্সবাজারে রিসোর্টে পুড়ে মারা যাওয়া এক পরিবারের ছয়জনের বাড়ি এটা।

ছয়তলা ভবনটির বিভিন্ন তলায় তাদের একেকজনের বাস। সবাই জড়ো হয়েছেন মূলত তিনতলা ও চার তলায়।

তিনতলায় মালিহা-নাবিলাদের বাসায় গিয়ে দেখা গেল স্বজনদের ভিড়।

মালিহা-নাবিলাদের মা-বাবা গেছেন ঢাকার সিআইডি দপ্তরে ডিএনএ নমুনা দেওয়ার জন্য। তাদের চাচা আবু তালেব বসে অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছেন।

তিনি বলেন, “কক্সবাজারে নিহতদের দেহাবশেষ থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ করছে সিআইডি। ওখানে আমাদের কয়েকজন প্রতিনিধি রয়েছে। তবে কক্সবাজারে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে যথাযথ পাত্র নিয়ে যাননি সিআইডির কর্মকর্তারা। যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।”

আবু তালেব বলছেন, “আমরা চাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের যেন দ্রুত ফেরানো যায়। সেজন্য ওদের বাবা-মায়েরা ঢাকার সিআইডি অফিসে সকালে উঠেই চলে গেছে ডিএনএ নমুনা দিতে।”

রোববার সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, “কক্সবাজারের ঘটনায় নিহত পরিবারের কয়েকজন ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছেন। আমাদের ফরেনসিক বিভাগ কাজ করছে।"

Image

কক্সবাজারে রিসোর্টে পুড়ে মারা যাওয়া এক পরিবারের ছয়জন এ গলিতেই থাকতেন।

থেমে থেমে কান্না

মালিহাদের বাসায় ঢুকতেই এক সেট সোফা রাখা। তাতে চুপ করে বসে আছেন স্বজনেরা। পাশের ঘরগুলো থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে থেমে থেমে। স্বজনদের কেউ কেউ বলছেন, মালিহার কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষা জীবনের কথা। মালিহা গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর গবেষণার কাজ করছিলেন। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার।

পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেকেই আসছেন। এসেই জানতে চাইছেন লাশ কখন আসবে, দাফন-কাফনের কী ব্যবস্থা?

মালিহার চাচা আবু তালেব তাদের বলছেন, “এখনো ডিসিশন হয়নি। আমাদের বলেছে ডিএনএ ছাড়া লাশ দেবে না। এখন এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা লাশ নিয়ে আসব।”

এক স্বজন ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, “কেন এরকম হল, ওদের চেহারা নাকি বোঝা যাচ্ছে না।”

পুরনো খবর:

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন: নিহত বেড়ে ১০, ‘ছয়জনই এক পরিবারের’
১০টা মিনিট পেলে স্ত্রীও নামতে পারতেন: কক্সবাজারে আগুনে আহত আশিকুল
কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন: ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে প্রতিনিধি দল পাঠানোর নির্দেশ
কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন: বেলকনি থেকে লাফ দিয়ে বাঁচেন চিকিৎসক দম্পতি
সকালে রিসোর্ট ছাড়ার কথা পরিবারটির, তার আগে আগুনে প্রাণ গেল ছয়জনের
কক্সবাজারে আগুনে নিহত ১০: আরও একজনের খোঁজে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি
কক্সবাজারে আগুনে নিহত ১০: ডিএনএ নমুনা দিতে পরিবারের সদস্যরা সিআইডির দপ্তরে
কক্সবাজারে আগুনে নিহত ১০: রিসোর্টের একজন হেফাজতে