Published : 07 Jul 2026, 06:01 PM
এক.
প্রাচীন সমাজে বা রাজ্যে, ধর্মনিরপেক্ষতার তাত্ত্বিক ধারণা বা কাঠামো আদর্শিকভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা যাকে এখন বলি তত্ত্ব, যা যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা ও চিন্তালেখকে নিয়ে গড়ে ওঠে, তার কোনো নমুনা প্রাচীনকালে দেখা যায় না। রাষ্ট্রে তা গড়ে ওঠেনি, কারণ রাষ্ট্রধারণার বিকাশই ছিল না। আর সিভিল সমাজের উদ্ভবও হয়নি। তবে সাম্রাজ্যের রাজ্যশাসনবিষয়ক নীতিমালায় বা দেশনায় হিংসা বা অহিংসা, যুদ্ধ বা শান্তি, সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি ছিল। সহাবস্থানের রূপটি কেমন ছিল তা-ও বোঝা যেত। সেক্যুলারিজমের যে প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা আজ প্রতিভাত যা একটা নির্দিষ্ট কিছুকে রাজনৈতিকভাবে নির্দেশ করে, যেখানে রাষ্ট্র ও ধর্মের সীমারেখা ও সম্পর্কের বিষয়টির রূপ প্রকাশমান থাকে, তেমন কোনো প্রাচীনকালের কিছু রাষ্ট্রব্যবস্থায়, বিশেষত রাজ্যশাসন বা সর্বজনীন সাম্রাজ্যবিস্তার ধারণায় ছিল না। সুতরাং প্রাচীন দেশব্যবস্থায় এখনকার সেক্যুলারিজমের পরিমাপকগুলো কার্যকর নয়। অষ্টাদশ শতাব্দের আগে তা দেখাও দেয়নি। কিন্তু সেক্যুলারিজমকে বোঝার জন্য তার নিজস্ব ভাবগত ব্যাপারগুলোর উপস্থিতিই এ ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা। রাজা বা সম্রাটের মনোভাব, আন্তর্ধর্মীয় সহাবস্থান, পারস্পরিক জীবনাচার ইত্যাদি বিষয়কে বিবেচনা করে প্রাচীনকালের সেক্যুলারিজমের রূপটিকে বোঝা ছাড়া অন্য উপায় নেই। প্রাচীন ভারতের ক্ষেত্রেও এসব বিবেচনাই সম্বল। তবে সেক্যুলারিজম শুধু কি আন্তর্ধর্মীয় বিষয়, তা কি অন্তর্ধর্মীয় হতে পারে না? নিশ্চয় পারে। একটি সমাজ একধর্মী হলেও তাতে ধর্মীয় বিদ্বেষ বা অসমতা থাকতে পারে। যেমন একটি মুসলিম দেশে শিয়া-সুন্নি সমস্যা বা খ্রিস্টান দেশে প্রোটেস্টান্ট-ক্যাথলিক সমস্যা বা হিন্দু দেশে উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের সমস্যাও সাম্প্রদায়িক সমস্যা। এ ক্ষেত্রে সর্বজনীন সাম্রাজ্যবাদের সময়টায় এক ধর্মী বা একাধিক ধর্মী সমস্যাকে সম্রাট বা রাজা কীভাবে দেখতেন এবং কীভাবে একে মোকাবিলা করতেন এবং সাম্রাজ্যের প্রজাদের অভিন্ন শান্তি ও হিতসাধন নিশ্চিত করতেন--এটাই তখনকার সেক্যুলারিজমকে বোঝার উপায়।
প্রাচীন ভারতের ক্ষেত্রে আমরা আলোচনা শুরু করতে পারি মৌর্য যুগকে মাথায় রেখে। এটাও মনে রাখা দরকার যে মৌর্য বংশের উত্থানের সময়টার ঠিক আগেই আলেকসান্দ্রোস (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট) ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং জয়ও করেছিলেন (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-২৫)। চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন প্রথম মৌর্য সম্রাট, খ্রিস্টপূর্ব ৩২২-এ নন্দবংশকে পরাভূত করে তিনি সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। তাঁর সঙ্গেই গ্রিক সেনাপতি সেলুকাসের সন্ধি হয়েছিল। চন্দ্রগুপ্তর রাজত্বকাল ছিল প্রায় ২৪ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২-২৯৮)। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে বিন্দুসার রাজা হন এবং তাঁর রাজত্বকাল ছিল ২৮ বছর। তাঁর মৃত্যুর পর খ্রিস্টপূর্ব ২৭০-এ অশোক সম্রাট হন, যিনি নানা কারণে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। এর মধ্যে প্রধান হলো কলিঙ্গ যুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ। কথিত আছে, এই যুদ্ধে এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। অশোক এই হত্যাকাণ্ডে অনুতপ্ত হয়ে যুদ্ধের অভিযান ও আগ্রাসন থেকে শান্তির দিকে চলে আসেন এবং বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। প্রজা ও রাজ্যের হিতসাধনে বিখ্যাত হয়ে আছে অশোকের শিলালিপি, যাতে লিপিবদ্ধ আছে তাঁর অনুশাসন। এ সকল শিলালিপিতে সর্বজীবে দয়া ও আঘাত না-করার কথা বলা আছে, ব্রাহ্মণ ও শ্রমণদের প্রতি উদারতার কথা বলা আছে। সপ্তম স্তম্ভ অনুশাসনে শুধু বৌদ্ধদের প্রতিই তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলা হয়নি; বরং ব্রাহ্মণ, অজীবিক এবং জৈনদের উদ্যেশ্যেও তা উচ্চারিত হয়েছে। এই অনুশাসনে তাঁর কথা ছিল : সকল গোষ্ঠীর মানুষই (পসম্দ) সব জায়গায় বসবাস করবে। দ্বাদশ স্তম্ভে তাঁর অনুশাসনটি ছিল, ব্যয়ে ও অধিকারে সমতা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে তিনি ধর্ম-গোত্রনির্বিশেষে সকলের বসবাসের ক্ষেত্রে এবং অধিকারের প্রশ্নে সমতার কথা বলেছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো ধর্মকে রাজধর্ম বা অগ্রাধিকারের কথা তিনি বলেননি, অর্থাৎ, এখন যাকে বলা হয় রাষ্ট্রধর্ম সে রকম কিছুর কথা তিনি বলেননি। অশোকের দ্বাদশ মুখ্য গিরিশাসনের একাংশের নির্যাস এ রকম : ‘নিজ সম্প্রদায়ের প্রশংসা এবং অন্য সম্প্রদায়ের নিন্দা যেন সামান্য কারণে কখনো কেউ না করে।...অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর্তব্য। যদি কেউ...আপন সম্প্রদায়ের প্রশংসা এবং পরসম্প্রদায়ের নিন্দা করে, সেই কাজের দ্বারা সে নিজ সম্প্রদায়ের গুরুতর ক্ষতি করে থাকে। লোকে যেন অন্য ধর্মের বাণী শোনে এবং শুনতে ইচ্ছা প্রকাশ করে।’১

এটা স্পষ্টই যে তিনি রাজনৈতিক ধর্মের কথা বা শাসন-বিবেচনায় কোনো ধর্মকে নির্বাচন করেননি। ইরফান হাবিব ও বিবেকানন্দ ঝা তাঁদের মৌর্য যুগের ভারতবর্ষ গ্রন্থে বলেছেন, অশোক দুবার নিজেকে সমগ্র মানবজাতির কাছে ঋণে আবদ্ধ বলে স্বীকার করেছেন, এবং তিনি মনে করতেন এই ঋণকে পরিশোধের জন্য সমস্ত মানুষের সুখের ব্যবস্থা তাঁকে করতে হবে এবং তাদের প্রতি দয়ার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ইরফান হাবিব ও বিবেকানন্দ ঝা একে বলেছেন একধরনের ‘সামাজিক চুক্তি’, যেখানে রাজত্ব ও খাজনা নেওয়ার বিনিময়ে জনগণের প্রতি সম্রাটের সেবা প্রদানের দায়বদ্ধতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাই আমরা দেখতে পাই রুসোর ‘সামাজিক চুক্তি’ ধারণার ‘সাধারণ ইচ্ছা’য়, যেখানে জনগণের সমবেত ইচ্ছার বাস্তবায়ন সম্রাটের ইচ্ছায় প্রকাশিত। রুসো রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রশ্নে বলেছেন, জনগণের ইচ্ছার বাস্তবায়নই রাষ্ট্রের দায়িত্ব; অশোকের বচনেও এরই প্রতিধ্বনি। তাঁর রাজত্বের ত্রয়োদশ বছরে বা তার পরের প্রস্তর অনুশাসন-৬-এ, নিষ্কর্ম ২.৫-এ, রাজ্যশাসন বিষয়াদি, সর্বলোকহিতের জন্য দ্রুত সম্পাদন করার কথা বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, সকল জীবের প্রতি ঋণ পরিশোধ করাই তাঁর দায়, যেন জনগণ পৃথিবীতে সুখলাভ করে আর পরজীবনে স্বর্গসুখ অর্জন করে। অশোকের সময়ে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিভাজন বা অস্বীকারের উপস্থিতি ছিল সমাজে, এ ছাড়া সমাজে আরও ছিল অজীবিক (নির্জন গুহাবাসী, আত্মসংযমী দিগম্বর সম্প্রদায়) ও জৈন সম্প্রদায়। অশোক ব্রাহ্মণদের দানের নির্দেশ দিতেন আর অজীবিকদের গুহা দান করতেন; যদিও অজীবিকদের সঙ্গে বৌদ্ধদের ছিল চিরাচরিত দ্বন্দ্ব। তিনি শুধু নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং নিজে সে-রকম আচরণও করেছেন। তাঁর রাজত্বের দশম বর্ষে তীর্থভ্রমণের অংশ হিসেবে বোধিবৃক্ষের কাছে গিয়ে ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাঁদের দান করতে ভুলে যাননি তিনি। অশোক তাঁর অনুশাসনে সকলকে এক ও অভিন্ন পসম্দার হিসেবে দেখেছেন। এই শব্দটিকে অশোক একই ধর্মীয় সম্প্রদায় অর্থে ব্যবহার করেছিলেন, যাকে আমরা এখনকার ভাষায় বলতে পারি একই উম্মাহ বা জাতি হিসেবে। ওই সময়ের আরেকটি মহাগ্রন্থ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও সকলকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, যন্ত্রণা প্রদান না করা, সৎ, বিদ্বেষমুক্ত, পরদুঃখকাতর ও ধৈর্যশীল হওয়ার কথা। অশোকের আমলে পুরোহিত বা শ্রমণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ছিল না বলেই মনে হয়, তবে তখনকার অর্থশাস্ত্র-এ বলা হয়েছে, রাজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হবেন একজন পুরোহিত, যাকে শুধু বৈদিক আচারে দক্ষ হলেই চলবে না, জাদুমন্ত্রসহ অশুভ পূর্বলক্ষণ নির্ধারণের দক্ষতাও তাঁর থাকতে হবে।
অশোকের সময়ের সেক্যুলারিজমকে আমরা আধুনিক সেক্যুলারিজমের ভাষায় বলতে পারি সর্বজনীন সেক্যুলারিজম, যেখানে সর্বধর্মের সর্বসম্প্রদায়ের স্বাধীন ও সম সহাবস্থান ছিল। তিনি বলেছিলেন, কোনো কারণ ছাড়া অন্য ধর্মকে ঘৃণা করে নিজের ধর্মকে সম্মান দেখানো যাবে না। কিন্তু ওই সময়টাতে সেক্যুলারিজমের বর্তমান ব্যক্ত ধারণার আবির্ভাব ঘটেনি, বা রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষবাদের সূচনা হয়নি। সুতরাং এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যগুলোকে দিয়েই ওই সময়টার সহাবস্থানের ইহজাগতিক রূপটিকে বিবেচনা করা উচিত।

এ আলোচনায় সম্রাট অশোকের পর আমরা চলে আসতে পারি মধ্যযুগে, কারণ অশোকের পর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হয়, খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে তাঁর মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। আসে গুপ্ত যুগ, তারপর ভারতবর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়। এরপর আসে হর্ষবর্ধনের রাজত্ব, যা ছিল ৪০ বছরের এক বিশাল রাজত্ব। হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক শশাঙ্ক (৬০৬-৬৩৭) তখন গৌড়ের (বাংলা) সিংহাসন দখল করেন। ওই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, রাজারা অভিজাতবর্গের দ্বারাও মনোনীত হতেন, যেমন বাংলার পাল বংশের রাজা গোপাল, কাঞ্চিতে পল্লবরাজা নন্দিবর্মণ, আর থানেশ্বরের রাজা হর্ষবর্ধন অভিজাতবর্গের দ্বারা মনোনীত হয়েছিলেন। নারীরাও রাজার উত্তরাধিকারী মনোনীত হতে পারতেন। কাশ্মীর, উড়িষ্যা ও দক্ষিণ ভারতের কিছু রাজ্যে এমনটা হয়েছিল। ওই সময়টায় হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে, ফলে সমাজে ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য দেখা দেয়।
দুই.
ভারতে মুসলমানদের বিজয়ে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তিনজন : মুহাম্মদ বিন কাশিম, সুলতান মাহমুদ, বখতিয়ার খলজি। এঁদের মধ্যে বখতিয়ার খলজিই প্রথম বঙ্গ আক্রমণ করেন। তখন বাংলার রাজা ছিলেন লক্ষ্ণণ সেন। পাল যুগের শেষ থেকে লক্ষ্ণণ সেনের সময় পর্যন্ত সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব ছিল অতিমাত্রায়। হিন্দু ছাড়া এ সময় ভারতের অন্যতম প্রধান ধর্মটি ছিল বৌদ্ধধর্ম, অন্যটি জৈনধর্ম।
দিল্লি সাম্রাজ্যের অধিকারী মুসলমান শাসকরা বুঝেছিলেন যে ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম প্রজাদের অবহেলা করে তাঁরা সাম্রাজ্য চালাতে পারবেন না। এ জন্যই স্থানীয় জনগণের প্রতি তাঁদের ছিল অনেকটা নিরপেক্ষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁরা সকলকে একত্র করে শাসন পরিচালনার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এটা ছিল তাঁদের একটি কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি, যা তাঁদের রাজত্বকে টিকিয়ে রাখার উপায় হিসেবে কাজ করেছিল। সে-সময়ের উপযোগী বিমূর্ত কিছু-একটা সেক্যুলার ব্যবস্থা তাঁরা কায়েম করতে পেরেছিলেন। ১২১১ অব্দে সুলতান আলতামাশ দিল্লির সিংহাসনে বসেন। একবার একদল মোল্লা তাঁর কাছে এসে দাবি জানালেন যে হিন্দুদের হয় ইসলাম গ্রহণ করার নয় মৃত্যুবরণ করার বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া উচিত। কারণ হিসেবে তাঁরা বললেন, হিন্দুরা কিতাবধারী নয়, আর কিতাবধারী না হলে শরিয়ত অনুযায়ী খ্রিস্টান বা ইহুদিদের মতো রাষ্ট্রের জিম্মি হওয়ারও অধিকার নেই। শুনে সুলতান তাঁর উজিরের দিকে তাকালেন। তখন উজির নিজামুল মুল্ক জুনাইদি ওলামাদের বোঝালেন যে বর্তমানে এমন অবস্থা বিরাজ করছে, যেখানে একটি ছোটো আকারের মুসলমান গোষ্ঠী বিশাল হিন্দু গোষ্ঠীকে শাসন করছে। সুলতান আরও বললেন, ইসলামে জোরপূর্বক ধর্মান্তর অনুমোদিত নয়, আর তা ছাড়া সমস্ত হিন্দুকে কতল করার মতো এত তরবারিও তাঁর কাছে নেই।২ কথাটির মধ্যে শ্লেষ স্পষ্ট। এভাবে চরমপন্থীরা তাদের প্রথম শিক্ষা পায়। কিন্তু যখন আলতামাশের প্রিয় কন্যা সুলতানা রাজিয়া সিংহাসনে বসলেন, তখন গোঁড়ারা তেতে উঠল আবার। কারণ, একে সুলতানা সুন্দরী নারী, তার ওপর অবিবাহিতা। তিনি পরদা করতেন না, পুরুষের পোশাকে ঘোড়া চরাতে যেতেন, দরবারেও নেকাব ছাড়াই বসতেন। ত্রয়োদশ শতাব্দে এ ছিল অকল্পনীয়। এতে সম্ভ্রান্তরা ষড়যন্ত্র করতে লাগল রাজিয়াকে বিয়ে করে সিংহাসন হাতিয়ে নিতে। এই ষড়যন্ত্রের ফলে সুলতানা রাজিয়া তাঁর জীবন হারালেন।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন তাঁর রাজকার্যে সব সময় মোল্লাদের ও শরিয়তের ব্যাখ্যাকে উপেক্ষা করতেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি সব সময়ই রাজনৈতিক যুক্তিসিদ্ধতা দ্বারা পরিচালিত হবে, ধর্মীয় ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নয়। প্রজাকল্যাণকে মাথায় রেখে রাষ্ট্র চালাবে রাজা, তা কতটুকু শরিয়তসম্মত বা সম্মত নয়, তা বিবেচনার সুযোগ নেই। তাঁকে যখন শোনানো হলো, তাঁর পুত্র বোগরা খান ও মোহাম্মদ খানকে ফিকাহ্ শাস্ত্র পড়ানোর কথা, তিনি তখন সেই ফিকাহ্ শাস্ত্র পড়ানো মোল্লাকে সরিয়ে দিয়ে ছেলেদের রাজনীতি ও ইতিহাসে দক্ষ একজন শিক্ষক দ্বারা ‘আদাবাস আল-সালাতিন’৩ ও ‘মাসিরাত আল-সালাতিন’ ৪ শিক্ষা দিতে বললেন, কারণ ওই মোল্লা যা পড়াবে তা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ছেলেদের কোনো কাজে আসবে না। উল্লেখ্য, এ দুটি বিষয় হলো বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত, আইনজ্ঞ, রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক, ইবনে আল-মাওয়ারদির৫ তত্ত্ব, ‘আদাবাস সালাতিন’ বোঝায় শাসকের রীতিনীতি, আর ‘মাসিরাত আল-সালাতিন’ বোঝায় শাসকের পতন। তিনি মনে করতেন, শাসকের প্রথম কাজ হলো শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দুর্বলকে রক্ষা করা, সমাজকে কার্যকর করা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমন্বিত মতামত গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যকার জটিল সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিল।

সুলতানি যুগের খলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা জালালুদ্দিন খলজি নিজে ধর্মপ্রাণ হলেও ধর্মগুরুদের পরামর্শে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণের পক্ষে ছিলেন না। কারণ, তিনি মনে করতেন এতে হিন্দুদের অসম্মান করা হবে। তাঁর ঘনিষ্ঠ আহমেদ চাপ তাঁকে হিন্দুদের মূর্তিগুলো, ধর্মচর্চা ও বিধর্মী কার্যকলাপ বন্ধ করতে পরামর্শ দিলেও জালালুদ্দিন হিন্দুদের প্রাসাদের সামনে দিয়ে মিছিল করা, ঢাক বাজানো বা যমুনা নদীতে মূর্তি বিসর্জনের অধিকার নিষিদ্ধ করেননি। তিনি মনে করতেন, হিন্দুদের ভীতি প্রদর্শন করলে সরকারের খ্যাতি সীমিত হয়ে পড়বে এবং জনগণের মনে তা স্থায়িত্ব লাভ করবে না। তাঁর মতে, বলপ্রয়োগ করে হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ অনেকটা জবরদস্তি করে ময়দা ঠাসার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। জনকল্যাণমুখী ও মানবতাবাদী সমাজ নির্মাণই তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল, যা পরে গিয়াসউদ্দিন খলজির মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। সুলতানি আমলের সম্ভবত শ্রেষ্ঠ সুলতান আলাউদ্দিন খলজিও (শাসনকাল ১২৯৬-১৩১৬) মোল্লাদের সম্পর্কে একই মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি বলতেন, মোল্লা আর কাজিদের রাষ্ট্রের সমস্যা নিয়ে কোনো ধারণাই নেই। সাম্রাজ্যের আইন ও শাসনকে ঠিক করার বিশেষ অধিকার শুধু সম্রাটের, শরিয়ত আর শরিয়তিদের এখানে কিছুই করার নেই। একবার তিনি কাজি মুঘিসুদ্দিনকে ডেকে জানতে চাইলেন, হিন্দুদের প্রতি কী আচরণ করা উচিত। কাজি উত্তরে বললেন, যদি কোনো রাজকর্মকর্তা কোনো হিন্দুর কাছে রুপা দাবি করে তো তাকে অত্যন্ত বিনয়সহকারে সোনা দেওয়া উচিত হিন্দুটির। আর যদি ওই কর্মকর্তা কোনো হিন্দুর মুখে থুথু নিক্ষেপ করে তবে হিন্দুটিকে নির্দ্বিধায় মুখ খুলে তা গ্রহণ করতে হবে। কাজি আরও বললেন, তাদের সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদেরকে দাস বানানো উচিত। শুনে আশ্চর্য না হয়েই সুলতান সংকীর্ণমনা গোঁড়া মোল্লার প্রতি বিরক্ত হলেন এবং একটি নতুন ধর্ম শুরুর কথা ভাবলেন। তিনি কাজি মুঘিসকে উত্তরে বলেছিলেন : শরিয়ত অনুসারে কোনটি আইনসম্মত আর কোনটি আইনবিরুদ্ধ তা আমি জানি না; দেশের পক্ষে যা মঙ্গলজনক সেই আদেশই আমি জারি করব। নববিশ্বাস (New faith) প্রবর্তনের কথা তিনি ভেবেছিলেন; কিন্তু আকবরের মতো ধর্মে তাঁর মতি ছিল না, তিনি শুধু নতুন সম্প্রদায়ের স্থপতি হতে চেয়েছিলেন।৬ এ ব্যাপারে সতীশ চন্দ্রের বই মধ্যযুগের ভারত প্রথম খণ্ডে আলোকপাত করা হয়েছে।

মোহাম্মদ বিন তুঘলক ( ১৩২৫-১৩৫১)-ও ছিলেন মোল্লাবিরোধী। তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী, শরিয়াহর প্রথাগত ব্যাখ্যাবিরোধী। তিনি পছন্দ করতেন দর্শন ও বিজ্ঞান, ফলে মোল্লারা তাঁর বিরোধী হয়ে পড়ে। তিনি দর্শন ও বিজ্ঞানের বইপুস্তক পড়তে পছন্দ করতেন, যা ছিল মোল্লাদের চক্ষুশূল। ফলে এসব মোল্লার কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তিনি তাদের দিল্লির বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনিও প্রচলিত শরিয়াহকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে নতুন এক ধর্ম প্রবর্তনের চিন্তা করেছিলেন; কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তিনি নিজে ধার্মিক ছিলেন; কিন্তু কখনও ধর্মগুরুদের পরামর্শ মেনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর অত্যাচার করেননি। তিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাসভিত্তিক যুক্তিহীন নানা ধর্মচর্চা ও ঐতিহ্যকে তিনি বাতিল করে দেন। তিনিই ছিলেন প্রথম সুলতান, যিনি আজমিরের সুফি খাজা মইনউদ্দিন চিশতির দরগা পরিদর্শনে যান, নিজামউদ্দিন আউলিয়াসহ অনেক সুফিসন্তের সমাধিমন্দির নির্মাণ করেন। তিনি গুজরাটে বসবাসকালে জৈনমন্দির পরিদর্শন করে তাদের অনুদান দিয়েছিলেন, হিন্দু যোগী ও সাধুদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি হিন্দুদের দোল উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। তিনিই প্রথম হিন্দু ও মুসলিমদের সংমিশ্রণে অভিজাত গোষ্ঠী তৈরি করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন এবং জাতধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে শাসনকার্য পরিচালনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণেও তিনি মনোযোগী ছিলেন। ৭
দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্লাহ (১৭০৩-৫২) ছিলেন মুসলিম ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি প্রতিভা, তাঁর সাগরেদরা সারা ভারতে ছড়ানো ছিল। তিনিও হিন্দুদের বিষয়ে উদার ধারণা পোষণ করতেন না। দ্য ব্যাটল অব আইডিয়াস ইন পাকিস্তান গ্রন্থে সিবতে হাসান শাহ ওয়ালিউল্লাহর কথাটি উল্লেখ করেছেন : ‘কাফেররা! তারা শ্রেষ্ঠ ভণ্ড ও দ্রোহী মানুষ। তাদের মন অস্থির। তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেছে; কিন্তু তবু তারা ‘‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’’-এই বার্তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। অতএব তারা আল্লাহর পথে যেতে মানুষকে বাধা দেয়। তারা চির অভিশপ্ত ও নষ্ট এবং তারা অনন্তকাল দাসত্ববন্ধনে আবদ্ধ থাকবে।’ তিনি মনে করতেন, অমুসলিমরা প্রকাশ্য স্থানে ধর্মীয় কার্যাদি করতে পারবে না। প্রশাসনে মুসলিমদের সমান পদমর্যাদা দেওয়া যাবে না অমুসলিমদের, সমান মর্যাদা না পেলে তারা ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠবে। ওয়ালিউল্লাহর মত ছিল, মুসলমানদের রাজত্বে সকল ধর্মের ওপর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত এবং কাউকে এই প্রাধান্যের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। সুতরাং রাজ্যে তিন ধরনের মানুষ থাকবে : ইসলাম অনুসারীরা, জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিতরা আর কাফেররা। এই কাফেররা বাঁধা পশুর মতো, তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করা আর জিজিয়া কর আদায় করা ইমামের জন্য বাধ্যতামূলক কাজ।
একটি বিষয় পরিষ্কার, তিনজন সম্রাটই, খলজি-তুঘলক-আকবর, এই তিনজনেই পৃথক ধর্মমত শুরু করার কথা ভেবেছিলেন; যদিও আকবর ছাড়া অন্য দুজন এটা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এটা সত্যিই আশ্চর্যের যে তিনজন মুসলিম সম্রাট ভারতবর্ষে এসে নতুন সাম্রাজ্যের কল্যাণের জন্য নতুন ধর্ম প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন। এটা শুধু অভিনবই নয়, দুঃসাহসিকও যে বিজয়ীদের ধর্মকে পাশ গলিয়ে, হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের সমন্বয়ে, নতুন ধর্ম স্থাপনের স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন সাম্রাজ্যের স্বার্থে। এটা রাজনৈতিক চিন্তায় এক অদৃষ্টপূর্ব ঘটনা। এটা ঘটেছিল গোঁড়া ধর্মীয় নেতাদের বাড়াবাড়িতে। সিবতে হাসান তাঁর উপরিউক্ত গ্রন্থে বলেছেন, সম্ভবত সম্রাটদের এই প্রবণতার কারণ ছিল সুফিদের প্রভাব। সুফিরা ছিলেন অসাধারণ মানবতাবাদী, তারা ধর্মের বহির্কাঠামো অপেক্ষা তার সারত্বে অধিক বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা তথাকথিত বিশ্বাসী আর কাফেরদের মধ্যে বিভাজন করতেন না। তাঁদের মতে, মানুষ নির্বিশেষে স্রষ্টার আলোর প্রকাশ। এ ক্ষেত্রে ভক্তি আন্দোলনও তাদের মনে প্রভাব ফেলতে পারে। ভক্তি আন্দোলনের প্রবর্তক স্বামী রামানন্দ বর্ণপ্রথাকে বাতিল করে সকল নারী ও অস্পৃশ্যকে তাঁর আদর্শের দিকে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরই প্রেম, প্রেমই ঈশ্বর। ঈশ্বরের আরাধনার জন্য একাধারে রাম ও রহিম হতে হবে। তার শিক্ষা অন্ত্যজ হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল। সবচেয়ে বড়ো দিক ছিল, সুফি ও ভক্তি আন্দোলনের লোকরা রাজনীতিতে মাথা ঘামাতেন না, এসব করতেন মোল্লা বা পুরোহিত শ্রেণি। ফলে ধর্মীয় বিবেচনায় রাজনৈতিক শক্তির কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি। এ জন্যই দেখা যায়, সম্রাটদের অনেকেই সুফি ঘরানাকে অনুসরণ করতেন, কারণ তা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি অনাকাঙ্ক্ষী ও অমুখাপেক্ষী। সুলতান সিকান্দার লোদি (১৪৮৮-১৫১৭) যখন শুনলেন যে সন্ত কবিরকে গোঁড়া পণ্ডিত ও মোল্লারা অত্যাচার করছে তাঁর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, তিনি তখন এর বিরুদ্ধে ফরমান জারি করেন।

মোগলদের মধ্যে এই সেক্যুলার প্রবণতার দিকটি আরও সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর তাঁর পুত্র হুমায়ুনের প্রতি যে অছিয়তনামা রেখে গেছেন তাতে এর সুপ্রকাশ দেখা যায়। অছিয়তনামায় তিনি তাঁর পুত্রকে বলছেন : হে আমার পুত্র! হিন্দুস্তানে অনেক ধর্মের মানুষের বসবাস। এটা খোদার মহাবদান্যতা যে তিনি তোমাকে এই দেশের শাসক বানিয়েছেন। সুতরাং নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি তুমি সব সময় তোমার দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে :৮
১. তোমার মনে ধর্মীয় কুসংস্কারকে বাসা বাঁধতে দেবে না। অন্যদিকে, কোনো রকম পক্ষপাত ছাড়াই সব সময় ন্যায়বিচার করবে, জনগণের ধর্মীয় প্রথা ও অনুভূতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রাখবে।
২. গোহত্যাকে সুনির্দিষ্টভাবে পরিহার করবে।
৩. কোনো গোষ্ঠীর আরাধনাস্থলকে কখনোই ধ্বংস করবে না আর সব সময় ন্যায়বিচার করবে, যেন রাজা ও তাঁর প্রজাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বসুলভ থাকে আর রাজ্যে শান্তি বজায় থাকে।
৪. ইসলামের প্রসার যেন দয়া ও সেবার তরবারিতে করা হয়, জোর ও নিপীড়নের মাধ্যমে না হয়।
৫. সব সময় শিয়া-সুন্নির বিভেদকে পরিহার করবে।
৬. সব সময় তোমার প্রজাদের প্রবৃত্তিকে বছরের বিভিন্ন ঋতুর মতো বিবেচনা কোরো, যাতে সরকার রোগ ও দুর্বলতামুক্ত থাকে।
মোগলদের এই উদার ও রাষ্ট্রপরিচালনা নীতি এবং দাক্ষিণাত্যের ব্রাহ্মণদের উদারনীতি শুধু সার্থকই হয়নি, বরং এক নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ের সূচনা করেছিল, যাতে পারসি, তুর্কি ও ভারতীয় উপাদান মিলেমিশে দারুণভাবে বিকশিত হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া বাবর হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু উরওয়া উপত্যকায় জৈনমন্দিরের মূর্তিগুলো ভেঙে দিয়েছিলেন, যেহেতু সেখানকার মূর্তিগুলো ছিল পুরোপুরি নগ্ন। নির্দেশমতো শুধু মূর্তিগুলোই ভাঙা হয়েছিল, মন্দিরগুলো নয়। বাবরের ধর্মীয় ভাবনা যে উদার ছিল তা তাঁর চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও কাব্যের প্রতি অনুরাগ থেকেও কিছুটা ধারণা করা যায়।
মোগল শাসনে ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা বা ধর্মসংস্কারভাবনার জায়গা থেকে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্র হলেন আকবর এবং মধ্যযুগে সারা পৃথিবীতেই এমন নজির অসম্ভব, যা তিনি ধর্মভাবনা বিষয়ে করেছিলেন। শুধু প্রশাসনিকভাবেই নয়, ব্যক্তিচরিত্রেও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র: দৈনন্দিন জীবনে ছিলেন কঠোর নিয়ম মেনে চলা একজন, জীবজন্তুর মাংস খেতেন না, বছরে তিন মাস মাংস খেতেন বাকি নয় মাস সুফি আহার গ্রহণ করতেন এবং প্রাণী হত্যাকে ঘৃণা করতেন। এসব বিষয়ে আকবরনামায় বলা আছে, তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরিতেও বলা আছে। ব্যক্তি আকবরও ছিলেন রহস্যময় : তিনি অন্যের কাছে থাকতেন অপ্রকাশিত, অধরা, কেউ তাকে পরিমাপ করতে পারত না, রহস্য আর ধাঁধায় মোড়ানো ছিল তাঁর চরিত্র। তাঁর দরবারটি ছিল কবি, চিন্তক, ধর্মবিদ, দার্শনিক প্রমুখের উপস্থিতিতে মুখরিত একটি গ্যালাক্সি। ধর্মীয় আলাপ-আলোচনা আর বিতর্কে মুখরিত থাকত তাঁর দরবার, যেখানে মুসলমান ওলামা, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, খ্রিস্টান মিশনারি, জৈন পুরোহিত, পারসি ধর্মবিদরা অংশগ্রহণ করতেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ১৫৭৫ সালে ফতেহপুর সিক্রিতে ‘ইবাদতখানা’ নামে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যেখানে এসব আলোচনা অনুষ্ঠিত হতো। আকবরকে আমরা বলতে পারি ভারতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘ফাউন্ডার ফাদার’। তাঁর পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গির পিতা আকবর সম্পর্কে বলেন : ‘আমার শ্রদ্ধেয় পিতার প্রশাসনে ভালো অথবা মন্দ এবং বিপরীত ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রত্যেকের জন্য জায়গা ছিল, সেখানে ভেদাভেদ অথবা বিবাদের স্থান দেওয়া হয়নি, সে দরজা বন্ধ ছিল। একই মসজিদে সুন্নি ও শিয়ারা নামাজ পাঠ করে, একই গির্জায় ইহুদি ও খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করে এবং যার যার রীতিতে ঈশ্বরের আরাধনার মগ্ন হয়।’ ৯

১৫৮২ সালে প্রবর্তিত তাঁর ‘দিন-ই-ইলাহি’র কথা বেশি চাউর হয়ে আছে, অনেকে মনে করেন এটি নতুন এক ধর্ম। আবুল ফজল দিন-ই-ইলাহি কথাটি ব্যবহার করেননি, করেছেন ‘তৌহিদ-ই-ইলাহি’ কথাটি। কিন্তু এটি ছিল একটি সামাজিক-রাজনৈতিক মতবাদ। আকবর বিশ্বাস করতেন কোনো মানুষকে ধর্মের কারণে বাধা দেওয়া উচিত নয়, যে কেউ তার ইচ্ছামতো ধর্ম গ্রহণ করতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই দিন-ই-ইলাহি গঠিত হয়। এটি ধর্ম হলে আকবর জনগণের মধ্যে তা প্রচারের উদ্যোগ নিতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। অনেকে এর অস্তিত্বও জানত না। দিন-ই-ইলাহিকে বলা যায় একটি ছোটো মতবাদ-সম্প্রদায়। কিন্তু ‘দিন-ই-ইলাহি’ হলো আকবরের এক ‘ভিজন(vision)’, যা ভারতের ভবিষ্যৎ ধর্মনিরপেক্ষতার একটি পূর্বরূপ, ভারতের রাজনৈতিক আধুনিকতার একটি পূর্বাভাস।
কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান কাজটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন। এটি ছিল সমগ্র বিশ্বের প্রেক্ষাপটেই এক যুগান্তকারী বিষয়। তিনি অনেক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন যেখানে গণিত, জ্যামিতি, ওষুধবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাজনীতি, যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ইতিহাস এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় পড়ানো হতো। বিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণের ভাষা ছিল ফারসি, যেখানে হিন্দু-মুসলিমরা একত্রে ধর্মনিরপেক্ষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করত। কিন্তু আকবরের মৃত্যুর পর এই ধারাটি বন্ধ হয়ে যায়।
পৃথিবীর সকল সম্রাটের মধ্যে আকবরের ধর্মনিরপেক্ষতার দৃশ্যমান রূপ ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৫৬২ সালে তীর্থযাত্রা কর এবং ১৫৬৪ সালে জিজিয়া কর রদ করা ছিল তাঁর এই দৃশ্যমানতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
আকবর বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত শাসকের চারটি গুণ থাকা আবশ্যক : সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের প্রতি অভিভাবকত্বসুলভ আচরণ, ছোটো-বড়োনির্বিশেষে সকলের কাঙ্ক্ষা পূরণের প্রত্যয়, ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য, সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা। এসবকে নিয়ে পরমতসহিষ্ণুতার ‘সুল-ই-কুল’ (sul-i-kul) নীতির প্রবর্তন করেন তিনি। এর আওতায় তিনি কতকগুলো নিয়ম চালু করেন : কোনো হিন্দুকে কোনো পর্যায়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুসলমান করা হলে সে যদি আবার তার পূর্বের ধর্মে ফিরে যেতে চায় তবে তাকে তার অনুমতি দেওয়া হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার ইচ্ছানুসারে ধর্ম পালন ও ধর্ম গ্রহণ করতে পারবে। যদি কোনো হিন্দু নারী কোনো মুসলমানকে ভালোবেসে মুসলমান হয়ে যায়, তাহলে তাকে বিচ্ছিন্ন করে তার পরিবারের হাতে তুলে দিতে হবে। যে-কোনো ধর্মাবলম্বী যদি তাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে চায়, তবে কেউ বাধা দিতে পারবে না। হিন্দু যুদ্ধাপরাধীদের ক্রীতদাসে পরিণত করা বা জোরপূর্বক মুসলমান করাকে তিনি নিষিদ্ধ করেন। কমবয়সি কোনো হিন্দু মেয়ে, স্বামীর সঙ্গে যার কোনো সহবাস হয়নি, তার স্বামী মারা গেলে সেই মেয়ের ক্ষেত্রে সতীদাহকে নিষিদ্ধ করেন আকবর।
প্রজাদের আনুগত্যের বিষয়ে কোনো পার্থক্য করা যাবে না, সব ধর্মই এক পরম ঈশ্বরের দিকে মানুষকে নিয়ে যায়, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাম্রাজ্য/রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ওপরে অবস্থান করে-আকবরের এই ‘সুল-ই-কুল’ নীতি অনায়াসেই একটি আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ অভিমুখ। এটিকে আমরা তত্ত্বও বলতে পারি, কারণ এর মধ্যে ব্যাখ্যামূলক প্রত্যয় রয়েছে। এবং এটি মোল্লাতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধেও জড়িয়ে পড়ে, যা ‘সেক্যুলার’ হওয়ার জন্য একটি অবস্থা। সেক্যুলার হওয়ার পথে এ-জাতীয় বাধা আসা একটি ঐতিহাসিক সত্য। এই পথপরিক্রমায় জিজিয়া কর তুলে দেওয়াকে একটি সেক্যুলার বন্দোবস্ত বলা যায়, যা ভারতীয় তথা মুসলমান সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আবুল ফজল তাঁর আকবরনামা-য় জিজিয়া করারোপকে বলেছেন ‘প্রজাকুলের মধ্যে মতবিরোধকে জাগিয়ে দেওয়া’, যা প্রকারান্তরে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর এবং রাজনৈতিক যুক্তিযুক্ততা ও প্রাকৃতিক ন্যায্যতার পরিপন্থী। এভাবে আবুল ফজল জিজিয়ার পক্ষে প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক সমর্থনগুলোকে খণ্ডানোর চেষ্টা করেন। জিজিয়া কর রহিতের কারণে মৌলপন্থী ও উদারতন্ত্রীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেড়ে গেল। ফলে ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের চাপে পড়ে ১৫৭৬ সালে আকবর জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন, তবে ১৫৭৯ সালে তা চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়। আকবর যে জিজিয়া কর রহিত করেছিলেন তা ছিল রাজনৈতিক প্রজ্ঞাময় এক সিদ্ধান্ত। কারণ, রাজনৈতিকভাবে জিজিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো, তা হিন্দুদের মধ্যে, বিশেষত, নগরবাসী, উঠতি ব্যবসায়ী ও বুর্জোয়া শ্রেণি, দোকানি, অর্থলগ্নিকারকদের মধ্যে অপমানের জন্ম দিত এবং মূল জনজীবন থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে দিত। এই বিচ্ছিন্নতা প্রজাদের পারস্পরিক গ্রন্থির মধ্যে চির ধরাত। বিশেষত হিন্দুপ্রধান সাম্রাজ্যে এ ধরনের একপেশে অন্যায় ও বৈষম্যমূলক করপদ্ধতি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিত। আকবর এই অবস্থাটি বুঝতে পেরে তা বাতিল করেছেন, কারণ তা তাঁর ‘সুল-ই-কুল’ নীতির বিরোধী। ফারসি এই শব্দবন্ধটির মানে হলো ‘সর্বজনীন শান্তি বা বন্ধুত্ব’। ধর্মীয় নীতি সাম্রাজ্যের ‘পাবলিক পলিসি’কে দুর্বল করে দিচ্ছিল জিজিয়া নামক প্রত্যক্ষ কর আরোপের কারণে। এখানে উল্লেখ্য, সারা পৃথিবীর ইতিহাসে এই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম ছিলেন না, পঞ্চদশ শতকে কাশ্মীরে সুলতান সিকান্দার জিজিয়া কর বাতিল করেছিলেন এবং আকবরের ঠিক আগে গোলাকোন্ডাতে সুলতান কুলি কুতুব-উল-মুল্ক এটি বাতিল করেছিলেন। কিন্তু জিজিয়া কর রদরহিতের এই ধর্মনিরপেক্ষমুখিতা সম্রাট অওরঙ্গজেবের সময়ে আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্রাট অওরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে জিজিয়া কর পুনরায় আরোপ করেন, ফলে ধর্মীয় গোঁড়ামির চূড়ান্ত পরিণতি উন্মোচিত হয়ে যায়। এর ফলে হিন্দুদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ আবারও চাগিয়ে ওঠে, যা সাম্রাজ্যের ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতি করতে থাকে। আর অওরঙ্গজেব কোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা করেননি, করেছিলেন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। এ ব্যাপারে বলা হয় : যেহেতু সম্রাট ধর্ম প্রচারে আগ্রহী ছিলেন এবং শরিয়াহ আইন চালু করতে চাচ্ছিলেন, তিনি ব্যয় নির্ধারণে এবং রাষ্ট্রের যাবতীয় রাজস্ব ও প্রশাসনিক বিষয়ে শরিয়াহবিরোধী সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। যেহেতু সম্রাট সত্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এ সুসময়ে ধর্মতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা সম্রাটের নিকট উপস্থাপন করেন যে সত্য ধর্মের বিরোধীদের ওপর জিজিয়া আরোপ করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক। তারা তাঁকে এটি পুনরায় আরোপের জন্য অনুরোধ করেন। ১০ ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র তাঁর মধ্যযুগের ভারত গ্রন্থে বলেছেন, আকবর যেসব আদেশনামা জারি করেছিলেন তার বেশির ভাগই দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর সর্বধর্ম বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও অযৌক্তিক অন্ধ ধর্মীয় ধারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণার ওপর। আকবরের ধর্মনিরপেক্ষতা ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতার এক দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ, ধর্মকে বাদ না দিয়ে বরং তাকে উদারভাবে অভিযোজিত করে নতুন ধর্মনিরপেক্ষতার বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এটা ছিল এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থা, যেখানে সমন্বয়ের সংস্কারগুলো গতিশীলতার দিকে যাত্রা করেছিল। তাঁর এই প্রচেষ্টা এবং সফলতা এতটাই গতিবিকাশী ও বিপ্লবী ছিল যে পরবর্তী শাসকরা এর সঙ্গে তাল রক্ষা করতে পারেননি।

আকবরপুত্র জাহাঙ্গিরের রাজত্বকালেও দেখা যায় সম্রাট হিন্দুদের নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন, তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি-তে এর প্রমাণ মেলে, যদিও মূর্তি ভাঙার বা হিন্দুধর্মের মূর্তিপূজার অসারতার কথা বলার নজিরও সেখানে দেখা যায়, কিন্তু প্রশংসারও অভাব নেই-যেমন তিনি বেদান্তের প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এটি সুফিবাদের উৎস বা তাসাওউফের বিজ্ঞান; আবার অনেক হিন্দু সাধুর প্রশংসাও দেখা যায়-রুদ্র ভট্টাচার্য নামক এক সাধুর বিজ্ঞানবিষয়ক জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন তিনি, সাধুর জ্ঞানকে তার নিজস্ব ঘরানায় সম্পূর্ণ সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ্য ‘রাখি’ পরানোর অনুষ্ঠানটির কথা--সম্রাটদেরও রাখি পরিয়ে দেওয়া হতো, এ ছাড়া নানা মন্দির পরিদর্শনের বিষয়াদিও রয়েছে। বাবরের আত্মজীবনী বাবরনামায়ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার দেখা যায়, কিন্তু এই মূর্তিভাঙা বা বিষোদ্গার রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে মোটাদাগে ছায়া ফেলেনি, তা হয়তো ছিল ক্ষমতা আরোহণের প্রথম দিকের রাজনৈতিক অপরিপক্বতার এবং ব্যক্তিগত ধর্মাচ্ছন্নতার প্রকাশ বা দরবারের মোল্লাদের খুশি করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণের কর্ম, যা সম্রাট হিসেবে পরিণতাবস্থায় অনেকটাই থাকেনি। এখানে উল্লেখ করা বিধেয় যে পুষ্কর ভ্রমণের সময় জাহাঙ্গির হিন্দুদের দেবতা বিষ্ণুকে বরাহ (শূকর) রূপে পূজা করতে দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন এ কারণে যে এভাবে ঈশ্বরকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কিন্তু অন্য বিষ্ণু মন্দিরের কোনো রকম ক্ষতি করা হয়নি। আজমেরে তিনি সমগ্র পুষ্কর গ্রামকে মদদ-ই-মাশ বা নিষ্কর ভূমিদান হিসেবে সেখানকার ব্রাহ্মণদের দান করে দিয়েছিলেন। সুতরাং আমরা এ বলে উপসংহার টানতে পারি যে ধর্মের দিক থেকে জাহাঙ্গির ছিলেন আকবরের মতোই উদার ও সহনশীল। সকল ধর্মকেই তিনি সহ্য করতে পারতেন। ইতালীয় পর্যটক দেল্লা ভাল্লেও বলেন, জাহাঙ্গিরের দরবারে একধরনের ধর্মসমতা বজায় ছিল; এক ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের খুব একটা পার্থক্য করা হতো না, এমনকি রাজ্য ও সেনাবাহিনীতেও। আব্রাহাম এরালি তাঁর এমপারার অব দ্য পিকক থ্রোন বইয়েও জাহাঙ্গিরের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, ধর্ম বিষয়ে জাহাঙ্গির আকবরের মতোই ছিলেন বৈচিত্র্যময় এবং সহনশীল। জাহাঙ্গিরের দরবারের একজন যাজক টেরির উক্তি দিয়ে মধ্যযুগের ইতালীয় পর্যটক দেল্লা ভাল্লে জানান যে জাহাঙ্গির বলেছিলেন, সব ধর্মের প্রতি সহনশীলতা দেখাতে হবে এবং তাঁর রাজ্যে একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো বৈষম্য নেই। জাহাঙ্গির পশুহত্যাও নিষিদ্ধ করেছিলেন, বিশেষত বৃহস্পতিবার তাঁর নিজ জন্মদিনে আর রবিবার পিতা আকবরের জন্মদিনে। সিংহাসনে বসে উল্লিখিত কাজটি করার পর যে কাজটি তিনি করেছিলেন তাকে বলা হয় আইন-ই জাহাঙ্গিরি, তাতে বলপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরকরণকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ছিলেন তাঁর পিতা আকবরের ‘সুল-ই-কুল’ নীতির সমর্থক বা রক্ষক। তাঁর স্মৃতিকথা তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি-তে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রচারকদের এক কক্ষে বসে ভাব আদান-প্রদানের কথা। সতীশ চন্দ্র তাঁর মধ্যযুগের ভারত গ্রন্থে এ বিষয়ে বলেছেন: জাহাঙ্গির যে কেবল ‘সুল-ই-কুল’ নীতিই অনুসরণ করেছিলেন তা নয়, আকবরের নীতি মেনে তিনিও মুরিদ (শিষ্য) নিয়োগ করে তাদের প্রত্যেককে অঙ্গীকারপত্র বা শস্ত ও শাবি বা সম্রাটের স্বীকৃতিপত্র দান করেছিলেন। মুরিদদের সব রকম সাম্প্রদায়িক বিবাদ থেকে দূরে থাকার এবং ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সর্বজনীন শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া নিজের হাতে কোনো প্রাণী বধ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল তাদেরকে, আর স্রষ্টার প্রতীক হিসেবে সূর্য, আলো ও অন্য প্রভাবশালী গ্রহ-নক্ষত্র মেনে চলার এবং আল্লাহর উপাসনায় অবিরত ডুবে থাকার উপদেশ দেওয়া হয়েছিল। জাহাঙ্গিরের দরবারে দেওয়ালি, হোলি, দশেরা, রাখি, শিবরাত্রি ইত্যাদি হিন্দু উৎসব পালিত হতো। সম্রাট নিজেও এসবে অংশগ্রহণ করতেন এবং অভিজাতদেরও অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন। কথা চাউর ছিল যে কোনো এক দেওয়ালি পালনের সময় জাহাঙ্গির নাকি তিন রাত ধরে চলা এক জুয়ার আসরে অংশগ্রহণও করেছিলেন। তিনি পাঞ্জাবে গো-হত্যা নিষেধ করেছিলেন এবং সম্ভবত গুজরাটেও তা বলবৎ ছিল। তাঁর সময়ে প্রাচীন পারসিদের উৎসব নওরোজও সংগীত সহযোগে টানা ১৯ দিন পালন করা হতো মহাধুমধামে। খ্রিস্টানদেরও ইস্টার, বড়োদিন ও অন্যান্য উৎসব পালনের অধিকার ছিল। এসবের অর্থ সকল ধর্মীয় স্বাধীনতাকে রাজ্য স্বীকৃতি দিত। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্ধর্মীয় মিথস্ক্রিয়ার পথও উন্মোচিত হয়েছিল। সে-সময় সব ধর্মের স্বাধীনতা বিষয়ে সাম্রাজ্যের অবস্থান সম্পর্কে তুজুক-এর প্রথম খসড়ায় জাহাঙ্গির বলেছিলেন যে আমি আদেশ দিয়েছি কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে (যেমন জোর করে সতী বানানোর প্রথা নিষিদ্ধ), হিন্দুরা তাদের নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি পালন করতে পারবে এবং কেউ কারও ওপর জোর, নিষেধাজ্ঞা বা পীড়ন চালালে রাষ্ট্র কিন্তু রেয়াত করবে না। হিন্দুদের নতুন মন্দির নির্মাণেও কোনো বাধা ছিল না, মথুরায় বীর সিংহ দেও বুন্দেলার বানানো চোখধাঁধানো একটি মন্দির ছাড়াও বেনারসে তখন অসংখ্য নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। খ্রিস্টানরাও গির্জা নির্মাণের অনুমতি ও জমি পেয়েছিল। জাহাঙ্গির মন্দির নির্মাণের জন্য জমিও দান করতেন। রাজত্বের প্রথম বর্ষে (১৬০৫-০৬) খোরাসানে অভিযানের সময় তিনি প্রচুর অর্থ ফকির ও ব্রাহ্মণদের দান করেছিলেন। চৈতন্য সম্প্রদায়ের বৃন্দাবন এলাকায় জমি অধিকার করার সময়ের কিছু নথি থেকে এটা পরিষ্কার যে তাদের ভক্তদের এবং মন্দিরের জন্য জাহাঙ্গির জমি দান করেছিলেন। ১৬১২ খ্রি. থেকে ১৬১৫ খ্রি. পর্যন্ত সময়ে বৃন্দাবনে চৈতন্য অনুরাগীদের অন্তত পাঁচবার জমি দান করেছিলেন বলে জানা যায়। ১৬২১ সালে কাংড়া যাওয়ার সময় তিনি হরিদ্বার গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায় হরিদ্বার ছিল হিন্দুদের ঈশ্বর আরাধনার পীঠস্থান, যেখানে ব্রাহ্মণ ও সন্ন্যাসীরা নিজেদের মতো পূজাচার করে থাকেন। যাওয়ার সময় এদের অনেককেই তিনি নগদে ও জিনিসপত্রে উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু এত সব উদারতার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে অনেক সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ রয়েছে। মেবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তিনি জেহাদ বলে অভিহিত করেছিলেন। তুজুক-এ অনেক ঘটনা দেখা যায়, যেখানে তিনি অন্য ধর্ম বিষয়ে বাজে মন্তব্যও করেছেন। হয়তো দরবারের প্রভাবশালী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য, তাদের কাছে নিজেকে খাঁটি মুসলমান হিসেবে তুলে ধরার জন্য এসব করে থাকতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি অনেক হিন্দু আচারাদি পালন করতেন; কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসে তিনি একেশ্বরবাদী ও মূর্তিপূজাবিরোধী ছিলেন। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল না বিশ্বাস, বরং ছিল এক গুপ্ত জ্ঞান। জাহাঙ্গিরের দরবারের ব্রিটিশ দূত স্যার টমাস রো বলেছেন, তাঁর ধর্ম ছিল তাঁর নিজের আবিষ্কার। তিনি জাহাঙ্গিরকে নাস্তিক বলেও হালকাভাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। শাজাহানের রাজত্বের শেষ দিকে সেখানে অবস্থানকারী ফরাসি চিকিৎসক ও পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের বলেছিলেন : জাহাঙ্গির মারা গেছেন, যেমনটা তিনি বেঁচে ছিলেন, সব ধর্ম থেকে বঞ্চিত হয়ে। অর্থাৎ, তিনি কোনো ধর্মেই ছিলেন না। অওরঙ্গজেব জাহাঙ্গিরের সমাধিসৌধ পরিদর্শনে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এই বলে যে এটা এক অবিশ্বাসীর কবর। আব্রাহাম এরালি তাঁর এমপাররস অব দ্য পিকক থ্রোন বইয়ে এসব তথ্য দিয়েছেন।
তবে এটা ঠিক, আকবরের মতো এ ক্ষেত্রে তিনি শাসকের নিরপেক্ষ চিন্তার প্রমাণ দিতে পারেননি। এর জন্য তাঁর দোলায়িত মন দায়ী ছিল বলে মনে হয়। এ জন্যই শাসককে সংযত থাকার যে গুণ অর্জন করতে হয়, যাকে বলা যায় tolerance and restraint of the ruler, অর্থাৎ শাসকের নিজেকে সংযত রাখা ও ঘৃণা না ছড়িয়ে সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখা, এই গুণের অভাব ছিল তাঁর চরিত্রে, যা সম্রাট অশোক, সম্রাট আকবরের মধ্যে ছিল। জন লক তাঁর ‘লেটার কনসার্নিং টলারেশন’-এ বলেছিলেন, শাসককে ধর্মীয় বিষয়ে ঘৃণা ও পক্ষপাত ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রেও বলা হয় ‘হেইট স্পিস’ থেকে দূরে থাকার কথা।
জাহাঙ্গিরের পর শাজাহানের সময় আকবরের উদার ধর্মীয় নীতি বদলে গিয়েছিল। কাশ্মীরে যে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিবাহপদ্ধতি ছিল শাজাহান তা নিষিদ্ধ করেন এই যুক্তিতে যে এর মাধ্যমে মুসলিম মেয়েরা বা ছেলেরা হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে ফেলছে। তিনি তাঁর রাজত্বের ষষ্ঠ বর্ষে এক আদেশ জারি করেন এই বলে যে কোনো নির্মাণাধীন মন্দিরের কাজ সমাপ্ত করা যাবে না। তাঁর এই ফরমানবলে বেনারসের ৭৬টি মন্দির ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর আমলেই শেখ আহমেদ শিরিনদির নেতৃত্বে কট্টরপন্থী মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান শুরু হয়েছিল।
তিন.
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রকৃত সেক্যুলারিজমের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন আকবর এবং সেটা রাজনৈতিক সেক্যুলারিজমও ছিল। মনে করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে এটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা থেকেও বড়ো ও ব্যাপ্তিবহুল একটি ইহজাগতিকতা, যেখানে ধর্মীয় ও অধর্মীয় উপাদানগুলো পরস্পর একটি মৌন বৈশিষ্ট্যে ঐকতান সৃষ্টির জন্য মুক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু, কিন্তু শাসকশ্রেণি মুসলমান, অর্থাৎ শাসকের ধর্ম সংখ্যালঘিষ্ঠ কিন্তু শাসিতদের ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই দেশে রাষ্ট্রপরিচালনা এবং সামজিক ও ধর্মীয় সংহতি কীভাবে রক্ষা ও জোরদার করা যায়, ধর্মের কোন রূপটিকে উদ্ভাসিত করা যায়, তার বিশেষ বিবেচনা ও কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে আকবর সমগ্র বিশ্বেই অনন্য এবং এটা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির ফল। তা ছাড়া শুধু হিন্দু-মুসলমানই নয়, সমস্ত সম্প্রদায়, জাতপাত এবং নানামুখী ভাবনাকে সমন্বয় করে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বৃহৎ রাজ্যকে সুশাসিত করার কৃতিত্ব আকবরের। সাধারণত শাসকের ধর্মসংস্কৃতি শাসিতের ওপর প্রত্যক্ষভাবেই ক্রিয়াশীল থাকে, মাতব্বরি করে, কিন্তু শাসিতের ধর্মসংস্কৃতি দ্বারা শাসক তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত ও চালিত হওয়ার দৃষ্টান্ত বোধ হয় আকবরের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এখানে আমরা মনে করতে পারি, অশোক বা মোগল যুগের অনেক সম্রাটের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার একটি অন্তর্নিহিত রূপ দানা বেঁধেছিল, কিন্তু আকবরের সময়েই এটা প্রকাশিত ও স্পষ্ট রূপ পেল এবং অর্থময় হয়ে উঠল। কারণ, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও উপস্থিতির বিবেচনায় আকবরের কাল ছিল অনেক বেশি স্পর্শকাতর। অর্থাৎ, ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু নীতিগতভাবেই স্বীকৃত হয়নি, বরং তা সমাজে বাস্তবায়িতও হয়েছিল। এবং এর হাত ধরে ধর্মনিরপেক্ষতার অন্য প্রত্যয়গুলোর অনুপূরণ ঘটেছিল।
আরও যেটি দেখার বিষয়, আকবরের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, এটা সর্বত ঠিক নয়। তাঁর প্রজ্ঞা ও মানববাদী ধারণাই বরং ধর্মনিরপেক্ষ নীতিকে বেশি মাত্রায় প্রভাবিত করেছিল। মোগল আমলে সাধারণভাবে হিন্দু-মুসলমান সৌহার্দ্য বজায় ছিল বলেই ঐতিহাসিকেরা মত দেন। মুসলমানদের উৎসবে হিন্দুরা, আবার মুসলমানরাও হিন্দুদের উৎসবে অংশ নিত। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘শোনা যায় যে সয়ীদ ভ্রাতৃদ্বয়ের অন্যতম আবদুল্লা খান হোলি উৎসবে যোগ দিতেন : সিরাজ-উদ-দৌলা ও মির জাফর তেমনই হোলি খেলতেন, ঠিক যেমন দৌলত রাও সিন্ধিয়া প্রমুখ মহরমের শোভাযাত্রায় যোগদান করতেন। একজন গবেষক ফরাসি কাগজ ঘেঁটে দেখিয়েছেন যে দিল্লিতে রাজসভার কারও কারও উদ্যোগে ১৮২৫ সালেও নাকি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়েছিল।’ ১১
আকবরের রাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁর জীবনীকার আবুল ফজল কোথাও ‘দার-উল-ইসলাম’ বা ‘দার-উল-র্হাব’ কথাগুলো ব্যবহারই করেননি। এটাকে বলা যায় ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি ছিল সুবিচার ও সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করে এক সর্বভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন। ইতিহাস-লেখক সতীশ চন্দ্র একে বলেছেন দার-উল-সুলহ বা শান্তিরাজ্য। এর মানে হলো যেখানে মুসলিম-অমুসলিম অলিখিত সন্ধির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে। আকবর ওয়াহদাত-উল-ওয়াজুদ বা সকল প্রাণীর একতার তত্ত্ব সমর্থন করতেন, যা সুফিদের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু অনেকেই এর বিরোধী ছিলেন। ওই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাচন শোনা গিয়েছিল অওরঙ্গজেবের পরবর্তীকালে নাক্শবন্দি আন্দোলনের সদস্য মির্জা মজহর জান-হি জানান-এর কণ্ঠে। তিনি এই মীমাংসায় আসেন যে বেদ স্রষ্টার ভাবেরই প্রকাশ, এ জন্য হিন্দুরা ছিল আহল-ই-কিতাবেরই মর্যাদাভুক্ত। সুতরাং আরবে কাফেরদের সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করা হয় তা ভারতীয় হিন্দুদের সঙ্গে করা যাবে না। তাঁর মতে সাজদা দু-ধরনের: ‘সাজদা-ই তাহিয়্যাত’ এবং ‘সাজদা-ই উবুদিয়্যাত’; প্রথমটি শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের জন্য যা হিন্দুরা দেবতাদের মূর্তিকে করে থাকে, আর দ্বিতীয়টি হলো পরম আত্মসমর্পণ যা পরম স্রষ্টার উদ্দেশে করে থাকে। ভারতীয় সুফিদের অনেকের বিশ্বাসও ছিল অনেকটা এ রকম। তবে তাঁর ব্যতিক্রমও রয়েছে অনেক। নাক্শবন্দি সুফি শাইখ আহমাদ সিরাহিন্দি (১৫৬৪-১৬২৪) ছিলেন এক্ষেত্রে কঠোর প্রকৃতির, তিনি হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসকে সোজাসুজি বাতিল করে দিয়েছিলেন। জান-হি জানান-এর বেদসম্পর্কিত কথাও ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের আগের সময়ে প্রযোজ্য মর্মে তিনি বলেছিলেন। ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন-বিষয়ে অনেকেই ইতিবাচক কথা বলেছেন, এঁদের মধ্যে আবু রাইহান আল-বিরুনি, আমির খসরু, দারা শুকোহ অতি বিখ্যাত। দারা শুকোহ তাঁর গ্রন্থ মাজমা আল-বাহরাইন-এ ইসলাম ও হিন্দুধর্মের মিলন নিয়ে যা বলেছেন তা ছিল যুগান্তকারী। মাজমা আল-বাহরাইন-এর অর্থও ‘দুই সাগরের মিলন’। রিচার্ড এম. ইটন সম্পাদিত ইন্ডিয়া’স ইসলামিক ট্যাডিশনস, ৭১১-১৭৫০ গ্রন্থে এসব বিষয়ে চমৎকার আলো ফেলা হয়েছে। ধর্ম-সম্পর্কে এই যে কথন বা বয়ান রচনার পরিসর, তাকে তালাল আসাদের ভাষায় বলা যায় এক ধরনের ‘সেক্যুলার ট্রান্সলেশন’।

চার.
একটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেকটা পরম্পরাহীনভাবে আকবর যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে নীতি ও কর্মে প্রবর্তন ও প্রয়োগ করেছিলেন এবং এর রূপটিকে মূর্ত করেছিলেন, তার দৃঢ়ীকরণ তো দূরে থাক, এর ধারাবাহিকতাও পরবর্তী সময়ে তাঁর উত্তরাধিকারীদের দ্বারা রক্ষিত হয়নি। জাহাঙ্গির একে ধারণ করলেও কোনো উন্নতি সাধন করতে পারেননি। শাহজাহান তা ধারণই করেননি আর অওরঙ্গজেবের হাতে তা সমূলে উৎপাটিত হয়েছে। বস্তুত অওরঙ্গজেব একটি ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য দরকারি নীতি ও কর্মগুলোর পুনঃপ্রবর্তন ও কার্যকর করতে সারা জীবন সচেষ্ট ছিলেন যা মোগল সাম্রাজ্যের পতনের দায়ভারকে বহন করেছে। তাঁর সময়ের এ-বিষয়ক একটি দালিলিক সংকলন হলো ফাতুয়া-ই-আলমগিরি, যেখানে অওরঙ্গজেবের বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত ফতোয়াগুলো সংকলিত।
টীকা ও গ্রন্থনির্দেশ
১. দীনেশচন্দ্র সরকার, অশোকের বাণী, ‘দ্বাদশ মুখ্য অনুশাসন, শাহবাজগঢ়ীর পাঠ’, সাহিত্যলোক, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০১, পৃষ্ঠা : ৫৯)।
২. সিবতে হাসান, দ্য ব্যাটল অব আইডিয়াস ইন পাকিস্তান (পাকিস্তান পাবলিশিং হাউস, লাহোর, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা : ১৩৯, অধ্যায় : সেক্যুলারিজম ইন দ্য সাবকন্টিনেন্ট)।
৩. আদাবাস আল-সালাতিন : শাসকদের শিষ্টাচার বা নৈতিক আচরণ/নীতিবোধ।
৪. মাসিরাত আল-সালাতিন : শাসকদের কার্যধারা বা পথচলা।
৫. পুরো নাম আবু আল-হাসান আলি ইবনে মোহাম্মদ আল-মাওয়ারদি, আনুমানিক ৯৭২/৯৭৪ খ্রি.-১০৫৮ খ্রি.। তাঁর জন্ম বসরায়। তাঁকে সেই যুগের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ছিলেন আল-কাদি আল-কুদাত (প্রধান বিচারপতি) এবং বুয়াহিদ শাসকদের পক্ষে খলিফার সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। তিনি শুধু একজন বিখ্যাত বিচারকই ছিলেন না, একজন বিখ্যাত লেখকও ছিলেন। তাঁর লেখার ক্ষেত্র ছিল আইন ও রাজনীতি। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলো হলো : কিতাব আল-হাওয়াই, আল-ইকনা, সিয়াসাত আল-মুল্ক, কাওয়ানিন আল-ভিজারাহ, আদাব আল-দুনিয়া ওয়া-আল-দিন, এবং আল আহকাম আল-সুলতানিয়াহ। তবে শেষ কাজটিকেই তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা বলে মনে করা হয়; এই রচনায় রাষ্ট্রনীতি, জনপ্রশাসন ও সরকারি নীতি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে পরবর্তী সময়ে যার প্রভাব বহমান ছিল। ইবনে খাল্লিকান উল্লেখ করেছেন যে আল-মাওয়ারদির জীবৎকালে তাঁর কোনো লেখা প্রকাশিত হয়নি, কারণ লেখক সংশয়ী ছিলেন যে তাঁর লেখাগুলোতে অনুমান বা জ্ঞান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ঠিক সৎ ছিলেন কি না। তাঁর কাজগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি কেবলমাত্র একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, ছিলেন একজন বিচক্ষণ কূটনীতিকও। তিনি তাঁর বিখ্যাত আল আহকাম আল-সুলতানিয়াহ-র ভূমিকায় বলেছেন : যেহেতু শাসকদের আচরণ ও শাসনব্যবস্থার প্রকৃত স্বভাব সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া জরুরি এবং যেহেতু বর্তমান শাসকেরা রাষ্ট্রীয় কাজে এতটাই ব্যস্ত যে তারা এ বিষয়ে নিজ থেকে খোঁজ নিতে অক্ষম, তাই আমি বিভিন্ন ইসলামি আইনি বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তসমূহ একত্র করে একটি গ্রন্থ রচনা করেছি, যাতে তাঁরা এ বিষয়ে অবগত থাকতে পারেন এবং শাসনকার্যে সুবিচার, ন্যায় ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৬. সিবতে হাসান, দ্য ব্যাটল অব আইডিয়াস ইন পাকিস্তান (পাকিস্তান পাবলিশিং হাউস, লাহোর, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা : ১৪০, অধ্যায় : সেক্যুলারিজম ইন দ্য সাবকন্টিনেন্ট)।
৭. সিবতে হাসান, দ্য ব্যাটল অব আইডিয়াস ইন পাকিস্তান (পাকিস্তান পাবলিশিং হাউস, লাহোর, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা : ১৪০, অধ্যায় : সেক্যুলারিজম ইন দ্য সাবকন্টিনেন্ট) এবং সতীশ চন্দ্র, মধ্যযুগের ভারত, প্রথম খণ্ড, সুলতানি আমল থেকে মুঘল আমল (বুকপোষ্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ২০১৭); ভাষান্তর : মুজিবর রহমান, সাবির আলী।
৮. আমিনুল ইসলাম, ভারতবর্ষের ইতিহাস : রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা (এডুকেশন ফোরাম, কলকাতা, ২০২২, অধ্যায় : ভারতের ইতিহাসে বাবর ও তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা)।
৯. সম্রাট জাহাঙ্গির, তুজুক-ই জাহাঙ্গিরি : জাহাঙ্গিরের স্মৃকিকথা, অনুবাদ : সুবীরকুমার পাল, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২৫, প্রকাশক : তবুও প্রয়াস, কলকাতা; পৃষ্ঠা : ৪৯।
১০. এ ব্যাপারে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত রিচার্ড এম ইটন সম্পাদিত ইন্ডিয়াস ইসলামিক ট্র্যাডিশনস গ্রন্থের সতীশ চন্দ্র রচিত ‘জিজিয়া অ্যান্ড দ্য স্টেট ইন ইন্ডিয়া ডিউরিং দ্য সেভেনটিনথ সেন্সুরি’ প্রবন্ধে।
১১. হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ভারতবর্ষের ইতিহাস : মুঘল যুগ (বহুস্বর : ২০২৫, কলকাতা, পৃষ্ঠা : ১৯১-১৯২)।