আমার সংগীত জীবনের কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

বটকৃষ্ণ দেবটকৃষ্ণ দে
Published : 23 July 2022, 01:36 PM
Updated : 23 July 2022, 01:36 PM

আমার গীতিকার জীবনের সূচনার গল্পটা বেশ মজার কিছুটা হাস্যোদ্দীপকও বটে।

সময়টা ছিলো ১৯৪৭ সাল—দেশের স্বাধীনতার বছর। আমারও। স্কুল থেকে কলেজে (প্রেসিডেন্সী) ঢুকেছি—স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার, কফিহাউসে কফি খাবার, বন্ধু-বান্ধবীবর্গের সাথে বিরতিহীন আড্ডা মারার, সিনেমা দেখার । আমরা তখন থাকি বৌবাজারে একটি ভাড়াটে ফ্ল্যাটে—কাছেই বৌবাজারের মোড়ে, 'রূপম' সিনেমা হল। বেশীরভাগই অন্যত্র পূর্বপ্রদর্শিত মুভির পুনঃপ্রদর্শন হতো এখানে। এইভাবেই, প্রমথেশ বড়ুয়া – কানন বালা (তখনো 'দেবী’ তে উন্নীত হন নি) অভিনীত 'শেষ উত্তর’ দেখে ফিরছি। অনেক মিষ্টিমধুর বিরহ বিধুর গান ছিল তাতে। সেই সব গানের দৃশ্যাবলী মনে রেখে, আমি আমার মত করে, সে সব গান লিখে ফেলতাম। এই রকম অনুকরণ ও অনুসরণ করতে করতে একদিন নিজেই আমার নিজস্ব মৌলিক গান লিখে ফেললাম। তারপর আর পিছন ফিরে দেখিনি। ধীরে ধীরে, আমার লেখা গানেই এক্সারসাইজ বুকের পাতা ভর্তি হয়ে গেল। কেউ জানলো না, আমি যে এক গোপন গীতিকার হয়ে গেছি!

কলেজ স্ট্রীটের ‘ইণ্ডিয়ান কফি হাউস' ছিলো (এখনো নিশ্চয়ই আছে) প্রেসিডেন্সী আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দ্বিতীয় বা বিকল্প ‘কমনরুম’। সারা বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মিলন মেলা (কথ্য ভাষায়, 'বৈঠকখানা বা ড্রইংরুম'), প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছে 'লাভার্স ডেন’ বা ‘গার্ডেন অফ্‌ ইডেন'। এ এক মুক্তমঞ্চ এখানে যে কেউ, যখন তখন এসে সংলাপ বলে যেতে পারে। গল্প ছাড়াই। এখানকার কফির স্বাদ ভিন্ন রকমের - অনেকের কাছে ‘অন্য জগতের'।

এখানেই, কফি খেতে-খেতেই, আলাপ হয়েছিলো–মেগাফোন গ্রামোফোন কোম্পানীর রেকর্ডিং ম্যানেজারের সংগে। ক্ষণিকের এই বন্ধুটির উদ্যোগেই আমার গীতিকার হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ। মেগাফোন কোম্পানীর banner এ আমার লেখা দুটি গানের রেকর্ড বেরুলো আরেকজন নবাগতা শিল্পী গীতারাণী বসু’র কণ্ঠে : “পরম মিলন নাই যদি হয়”। সুর-সংযোজন করেছিলেন আরেক নবাগত শিল্পী জীবন উপাধ্যায়। নবাগতদের ত্রিবেণী সংগম। এরপরই HMV কোম্পানী থেকে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে আর নচিকেতা ঘোষের সুরে একটি রেকর্ড বেরুলো: “হে মহাপৃথিবী” । আর নচিকেতা ঘোষ সুর সঞ্চার করলেন আমার কথায়, কলম্বিয়া কোম্পানী থেকে প্রকাশিত ‘পথ আর কত দূর! '’পথ আর কত দূর” গানটি কবিতারূপে ‘দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটি গানই তখন সুপারহিট—লোকের মুখেমুখে ফিরতো। এর পরপরই সনৎকুমার সিংহ করলেন আর একটি “দেশ”-এ প্রকাশিত কবিতা “সাঁওতালি মেয়ের দল"। নচিকেতার সুরে। দুর্গা সেন এর সুর ও পরিচালনায় সন্ধ্যা মুখার্জি করলেন আরেকটি গান “শুধু জলে লিখে নাম, আমি চলে তো গেলাম” ।

এই ভাবেই ধীরে-সুস্থে চলছিল আমার সাহিত্য ও সংগীতচর্চা—আমি তো আর পেশাদারী গীতিকার নই—সাম্প্রতিককালের jargon-এ 'accidental lyricist' । আকস্মিকভাবেই মেগাফোনের অফিসে আলাপ হয়েছিলো দু'জন মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের সংগে যারা একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করছিলেন। তারা স্নেহ ও কৌতূহলবশত আমাকে সেই ছবির জন্য গান লিখবার আমন্ত্রণ জানালেন। মনোযোগ ও আবেগ দিয়ে লিখলাম—গাইলেন তখনকার শীর্ষ গায়ক - ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। সুর পবিত্র দাশগুপ্ত। গানটি হল- “ভুল করে হায় বেঁধেছিনু ঘর বিরহের বালুচরে।“ এই গানটিই পরে ক্যাসেট করলেন – স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত (পবিত্র দা'র সুগায়িকা কন্যা)। তারপর ডাক পেলাম আরেকটি প্রযোজকসংস্থা থেকে—তাদের ছবির নাম ‘ঘুমপাহাড়ের দেশে’। আমার বেশ কয়েকটি গান ছিলো তাতে। সেই সময় আমার লেখা একটি গীতিনাট্য, পনেরোটি গান সমেত ‘দুই পাতা' অনুষ্ঠিত হয়েছিলো শ্যামবাজারের 'উত্তরা' সিনেমার মঞ্চে।

এদিকে, গ্রামোফোন কোম্পানীর রেকর্ডে আমার গান একটি-দুটি করে বেরুতে লাগলো। তাদের নলিন সরকার স্ট্রীটের রিহার্স্যাল রুমে আলাপ - তরুণ নতুন সুরশিল্পী শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের সংগে। আমি সেন্ট পলস কলেজ ও সিটি কলেজের অধ্যাপক, শৈলেন কলকাতা কর্পোরেশনের আধিকারিক – প্রায় সমবয়সী–সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওর এস.আর.দাস রোডের বাড়িতে / মিউজিকরুমে নিমন্ত্রণ পেয়ে একদিন সেখানে যাই এক সন্ধ্যায়। যখন গান আর গল্প শেষ হল তখন রাত প্রায় বারোটা– দুরুদুরু বক্ষে রাসবিহারী মোড়ে লাস্ট (দোতলা) bus ধরে উত্তর কলকাতায় ফেরা। এরপর বহুবার এই ঘটনা ঘটেছে। দোতলা বাসের জানলার সীটে বসে চৌরঙ্গী স্ট্রীটের ওধারে কৃষ্ণচূড়া ফুলের তার রক্তিম বহ্নিশিখা আমাকে খুব আকর্ষণ করতো। 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ‘কৃষ্ণচূড়া’নিয়ে একটি গীতিধর্মী কবিতা—যার ফলশ্রুতি হল, সুধীন দাশগুপ্তর সুরে গীতা দত্তের কণ্ঠের আজও জনপ্রিয় বিখ্যাত গান—“কৃষ্ণচূড়া আগুন তুমি আগুন ঝরা বাণে!” এতো সব ঘটে গেলো গীতিকারের গায়িকা (বম্বে) ও সুরকারের সংগে প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের আগেই।

আর শৈলেন মুখার্জির মিউজিক রুমে, সামনে বসে গান তৈরী হলো 'স্বাতীতারা ডুবে গেলো' আর 'স্বপ্ন আমার ওগো সপ্ত রঙের প্রজাপতির পাখা'। তার নিজের জন্য। আরো দু'টি গান ‘ধূসর গোধূলি আকাশের মেঘ -রঙ আলপনা গেলো এঁকে' এবং উল্টো পিঠে, ‘মনে আমার ফাগুন এলো কোন অজানার গুঞ্জণে।' সুর করলো এক নবাগতা কিশোরীর (যদ্দুর মনে পড়ছে) জন্য, যার নাম পরে (প্রায়) সর্ব পরিচিত হয়ে উঠলো—তিনি নির্মলা মিশ্র। আমার লেখা এই দুটি গান দিয়েই তাঁর সংগীত জগতের জয়যাত্রা শুরু। শৈলেনের সুরেই মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় গাইলেন—“তুমি থাকো আমি যাই”! আমার কথাতে শক্তি ঠাকুর ও পিন্টু ভট্টাচার্য যথাক্রমে যে দুটি গান রেকর্ড করলেন তা হলো “সারারাত যার কথা ভেবে ভেবে ঘুম আসে না” আর “আমার দুখের রজনী আমারি থাক” (সুর- অনল চ্যাটার্জি) । দ্বিজেন মুখার্জি বহু বছর পর ‘আজ রবিবার সারাটা সকাল আজ কবিতাপড়ার দিন”. এই শিরোনামে নিজের সুরে রেকর্ড করলেন আর বনানী সেনগুপ্তকে দিয়ে করলেন “মায়া বিকেল এলো!”

আমার গানের কথায় যে আরেকজন দরদী শিল্পী তার জীবনের প্রথম ক্যাসেট করলেন তিনি আর কেউ নন, পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী, প্রথিতযশা ইন্দ্রনীল সেন। দুটি গান ছিলো- “আমার যদি টিয়াপাখীর সবুজ পাখা থাকতো" এবং "একটি কবিতা, একটি গানের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ!” ইন্দ্রনীলের দাদা ইন্দ্রজিত সেনের সুরে।

বাংলাদেশের এক তরুণ সংবেদী শিল্পী সমরজিৎ রায় । তার প্রথম ক্যাসেট আমার কথায় বিধৃত। সমরজিৎ গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ের (দিল্লী) ধ্রুপদী শিক্ষার্থী ছিল ।নিজে গাইলেন রাগাশ্রিত “গাগরি ভরণে রাধা না যাইও যমুনায়, “হে আকাশ, তুমি কি আমায় কিছু মেঘ ধার দিতে পারো”, “কত না সহজে বলতে পারলে, ভুলে যাও!” এবং বম্বের বিখ্যাত ভজন-গজল শিল্পী অনুপ জলোটাকে দিয়ে গাওয়ালেন “চলে যেতে বলো চলে যাবো ভুলে যেতে বোলো না”। এটাই বোধকরি তার গাওয়া প্রথম আধুনিক বাংলা গান।

বম্বের শিল্পী অনুপ জলোটার পর এবার আমি বাংলার আরেক শিল্পী সত্যজিৎ রায়ের আবিষ্কার, “গুপী গায়েন বাঘা বায়েন “ও “হীরক রাজার দেশে”র মহান নেপথ্য কলাকার অনুপ ঘোষালের কথায় আসি আলাপ-আরম্ভের ঘটনাটা মনে নেই, তবে এটা মনে আছে, একদিন আমার বাড়িতে এসে, গান নিয়ে অনেক আলোচনার পর, বললো “সে আমেরিকা কানাডা যাচ্ছে অনুষ্ঠান করতে। Vancouver এর উদ্বোধনী গানটি যদি আমি লিখে দিই। দিয়েছিলাম এবং গেয়েও ছিলো অনুপ।" যে গানের পশরা নিয়ে আজ সন্ধ্যায় এসেছি আমি” . আর সুনামি-র সময় – সুনামি নিয়ে অনুপ একটি ক্যাসেট করলো আমার কয়েকটি লেখা নিয়ে - “আন্দামানের শুনশান সমুদ্রকুলে", "ওরে ময়না, ওরে টিয়া” (পরিবেশ climate change কেন্দ্রিক) আর “বাড়ী আমার পদ্মার পার দীঘলি নাম তার" । অপূর্ব কণ্ঠে বেদনা বিধুর গানগুলি সত্যি মর্মস্পর্শী। বয়সে ছোট, কিন্তু গুণে অনেক বড়।

এই স্মৃতিকথার শেষে এসে, যার প্রসঙ্গে আমি বলব, তিনি পদবীগতভাবে আমার আত্মীয় মনে হলেও (অনেকেই আমাকে আর তাঁকে নিয়ে এই প্রশ্ন করে থাকে) পারিবারিক অর্থে নয়। মুখ্যত বম্বের বাসিন্দা হলেও তিনি মূলত বাঙালি সংগীতশিল্পী হিসেবে বিশ্বখ্যাত। হিন্দি, বাংলা ও আরো ভারতীয় ভাষায় তিনি গান করেছেন অসংখ্য, জনপ্রিয়তার শীর্যে তার অবস্থান। তিনি “প্লে ব্যাক সিঙ্গার”—প্রচুর ফিল্মের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী - তিনি মান্না দে। থাকেন বম্বে কিংবা বাঙ্গালোর - কলকাতায় আসেন রেকর্ড করতে। আমি থাকি কলকাতায় পরে চলে গিয়েছিলাম দিল্লিতে। তার সংগে আমার না ছিলো পরিচয় না ছিলো চেনাজানা, অথচ তিনি আমার বেশ কয়েকটি গান পছন্দ করে রেকর্ড করলেন (গানগুলি শুনেছিলাম গ্রামোফোন কোম্পানী সূত্রে পেয়েছিলেন)। চারটি গানের প্রথম লাইন উদ্ধৃত করি—“তোমায় যে নামে আমি মনে মনে ডাকি”, “লাল জবাকেও লজ্জা দিয়েছে”, “ও কুয়াশা...", " সাগর গভীর হতে পারে”। মান্না দে'র সংগে আমার প্রথম আলাপের গল্পটিও বেশ মজার। আমি তখন দিল্লিতে ভারত সরকারের আধিকারিক, সে হিসেবে এবং বাংলা কবি-সাহিত্যসেবী হওয়ার দরুন সরকারি বেসরকারি অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমার নিমন্ত্রণ থাকতো। এমনি এক অনুষ্ঠানে মান্না দে এসেছেন, একক শিল্পী তিনিই। শুরুতেই তিনি মাইকে ঘোষণা করলেন - আমি আজ যে গীতিকারের গান গাইব তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, শুনেছি তিনি দিল্লিবাসী সরকারি অফিসার। নাম বটকৃষ্ণ দে। উনি অডিটরিয়ামে থাকলে ওর গান শুনে নিশ্চয়ই খুশি হবেন! সংগে সংগে উদ্যোক্তারা—যাদের নিমন্ত্রণে আমি প্রথম লাইনে বসা বিশিষ্ট অতিথিদের অন্যতম, আমাকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে মান্না দের সংগে পরিচয় করিয়ে দিলেন। প্রচুর সম্বর্ধনার মধ্যে মান্না দে একটার পর একটা গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে গেলেন। আমি তার মন্ত্রমুগ্ধ ভক্ত, মগ্ন বিস্ময় নির্বাক বসে রইলাম।

আমার কাছে সঙ্গীত যেহেতু মানুষের অন্তরতম অনুভূতির রস, তা সে আনন্দই হোক কী নিরানন্দ - সুখ কী দুঃখ– রস নির্যাসই সংগীতের এক মাত্র আপসহীন শর্ত হওয়া উচিত । সৌন্দৰ্যবোধ, ভালোবাসার সুরেলা ঝংকার, জীবনের প্রার্থিত প্রেমের পূজা - আমার গানে তারই আরাধনা । আমাকে মান্না দে ফাউন্ডেশন এর লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান তারই স্বীকৃতি সন্মান ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক