Published : 12 Jun 2026, 09:41 AM
বাংলা কবিতার সমকালীন ভুবনে তাপস গায়েন এক স্বতন্ত্র উচ্চারণ। তাঁর বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে, তবে বর্তমানে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বসবাসকারী এই কবি ও অধ্যাপক প্রবাসের দূরত্বকে ভাষার অন্তরঙ্গতায় রূপান্তর করেছেন। তাঁর কবিতা একাধারে নগর, নির্বাসন, স্মৃতি ও সময়ের গভীর মানসিক মানচিত্র। আবার অন্যদিকে তা ব্যক্তিসত্তার নীরব অনুসন্ধান, শূন্যতার দর্শন এবং প্রেমের আধ্যাত্মিক বিস্তারের এক অনন্য ভাষ্য। তাঁর ‘একলব্য নিঃসীম নগরে’ (২০১০), ‘সময়ব্যূহে অভিমন্যু’ (২০১৭) এবং ‘অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা’ (২০২১)—এই তিনটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থে আমরা দেখি এক দীর্ঘ আত্মসংলাপ; যেখানে পুরাণের চরিত্র এসে মিশেছে প্রবাসী জীবনের নিঃসঙ্গ বাস্তবতায়, আর ব্যক্তিগত স্মৃতি রূপ নিয়েছে সমকালীন বাঙালি চেতনার দার্শনিক দলিলে। তিনি উত্তর আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা অগ্রবীজ–এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক—যার মাধ্যমে প্রবাসভূমিতেও বাংলা ভাষার এক সৃজনশীল পরিসর গড়ে উঠেছে। তাপস গায়েনের কবিতায় মৃত্যু-চেতনা যেমন জীবনের তীব্রতাকে উন্মোচন করে, তেমনি নীরবতা ও অনুপস্থিতিও সেখানে এক সক্রিয় ভাষা। তাঁর কবিতা সহজ উচ্চারণ নয়; তা পাঠককে থামতে শেখায়, ফিরে তাকাতে বাধ্য করে এবং নিজস্ব অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশের আহ্বান জানায়। এই সাক্ষাৎকার তাই শুধু একজন কবির কথোপকথন নয়—এটি এক অধ্যাপক-মননের, এক প্রবাসী বাঙালির এবং এক দার্শনিক কবির আত্মদর্শনের দরজা খুলে দেয়। তাঁর কবিতার অন্তর্গত সময়, নির্বাসন, প্রেম ও অস্তিত্বের প্রশ্নগুলোকে কাছ থেকে জানতে এই সাক্ষাৎকার পাঠকের জন্য এক মূল্যবান পাঠযাত্রা হয়ে উঠবে। --ড. সাথী নন্দী
সাথী: আপনার একাডেমিক পরিচয় সাহিত্যের নয়, তবু কবিতা আপনার জীবনের কেন্দ্রস্থলে। এই যাত্রা কোথা থেকে শুরু? কবিতা কি সচেতন পছন্দ ছিল, নাকি ধীরে ধীরে আপনাকে দখল করে নিয়েছে?
তাপস: কবিতা নিয়ে—সাথী, নিতান্তই আমার কবিতা নিয়ে— আপনি যে আলাপচারিতায় আমাকে যুক্ত করেছেন, সেজন্য আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি । একটি প্রশ্নের উত্তর তো বহুভাবেই উৎসারিত হতে পারে, কিন্তু যেহেতু অধ্যাপক অভিধাটি আপনি আমার নামের সাথে জুড়ে দিয়েছেন, সেজন্য আপনার প্রথম প্রশ্নটির উত্তর আমি অধ্যাপকসুলভ ভঙ্গিতেই দিতে চেষ্টা করছি । ‘…পোয়েটিক্যালি ম্যান ডুয়ালস…’ কবিতা-পংক্তির এই ভগ্নাংশটুকু যেমন দার্শনিক হাইডেগারের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম, তেমনিভাবে এটি আমার প্রিয় কবি হোল্ডারলিনের পরিণত জীবনের একটি কবিতা-পংক্তির ভগ্নাংশ, যে কবিতাটি শুরু হয়েছে এইভাবে, ‘এই লাবণ্যময় নীলে, ধাতব ছাদে জেগেছে চূড়া, কান্না জাগে সোয়ালো (পাখির) একে ঘিরে…।’ প্রকৃত প্রস্তাবে, কী অর্থে কবিতার বৃত্তে মানুষের বসবাস, দার্শনিক হাইডেগার সেই অধিবিদ্যাকে বুঝতে চেয়েছেন কবি হোল্ডারলিনের এই কবিতাটিকে ভর করে ; বোধকরি, আমার অবস্থান এর ব্যতিক্রমী কিছু নয়। জীবনের অন্তিমপ্রায় প্রান্তে দাঁড়িয়ে, হাইডেগারের চিন্তাকে আমি মান্য করি। যখন তিনি বলেন, “মানুষ আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে নিজেকে মরণশীল জেনেও ঈশ্বরের মুখোমুখি হয়ে ঈশ্বরের সাপেক্ষে নিজেকে পরিমাপ করে; এই পরিমাপ তখনই সম্ভবপর হয়ে উঠে যখন সে ভাষার মধ্যে কান পেতে জন্ম, মৃত্যু, পৃথিবী এবং আকাশকে ‘এক চতুষ্টয়’ বলে মান্য করে।” ভাষার প্রসঙ্গ মূলত কবিতারই প্রসঙ্গ। আমার মনে হয়, কেউ বলে-কয়ে কবি হয় না; কবি হবার প্রক্রিয়াটি আসলে এক অনিবার্যতার বিষয়। কলেজ জীবনে নিঃসঙ্গতার ভিতরে বসবাসের মধ্য দিয়ে মনে হয়, অজ্ঞাতসারেই, আমার কবিতার দিকে যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। আমার কলেজ জীবনের শুরুতে— ঢাকা কলেজে, একাকী আমি— দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণে আমার শরীরে আমি খুব শীত অনুভব করতাম, এবং এমন কোনো দিন ছিল না যে আমি আত্মহনন নিয়ে ভাবিনি; প্রকৃত অর্থেই প্রতিদিন আমি আত্মহত্যা নিয়ে একাধিকবার ভেবেছি, এবং এই অনুভব দুই দশকের অধিক সময় নিয়ে আমার মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল, কিন্তু আত্মবিলোপের জন্য কখনো আমি উদ্যোগী হয়ে উঠিনি। একারণে, আমার কবিতা মৃত্যুর প্রসঙ্গ এড়াতে পারে না, এবং সেইক্ষণে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর সাথে নিজকে সমাঙ্গ করে তুলেছি। নিঃসঙ্গতার অনুভবের মধ্য দিয়েই, কবি শঙ্খ ঘোষকে গুরু মেনে একলব্যের মতো, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে একদিন একটি কবিতা লিখে ফেলি, অনেকটাই ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ কাব্যগ্রন্থের চার পংক্তির কবিতাগুলোর অনুকরণে প্রথম কবিতা, যে কবিতার শেষ দুই পংক্তি হল— আমি তো জন্মান্ধ কবি, বালিয়াড়িজুড়ে/মগ্ন আমি, কেন খুঁজি সেতু-পারাপার (রচনাকাল: জুলাই ৮, ১৯৮৯)
সাথী: আপনি প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত, একাডেমিক জীবনে ব্যস্ত। তবু ‘অগ্রবীজ’ প্রতিষ্ঠা করলেন। সাহিত্য কি আপনার কাছে নেশা, নাকি দায়বোধ? এই তাড়নার উৎসটা কোথায়?
তাপস: আমি চাই বা না চাই, সাথী, খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমার যে জীবন, সেখানে সর্বদাই ভ্রাম্যমাণতা ছিল। টেক্সাসে আমার জীবন প্রায় এক দশকের । তখন আমরা, বন্ধুরা—যারা টেক্সাসে ছিলাম—সবাই মিলে সাহিত্য-চিন্তা-দর্শনের পত্রিকা ‘অগ্রবীজ’- এর হয়ে ওঠার স্তবগান শুরু করি, বোধকরি, ২০০১ সালে। এখানে যুক্ত ছিলেন চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ, সৌম্য দাশগুপ্ত, সুবিমল চক্রবর্তী, আর আমি । পরে এখানে জড়ো হয়েছেন সাদ কামালী এবং সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। সাহিত্য ও চিন্তার এই কাগজের প্রথম সংখ্যার [বিষয়ঃ ‘বিশ্বায়ন’ (জুন ২০০৭)] সম্পাদক ছিলাম আমি, অন্য বন্ধুরা ছিলেন সম্পাদকমণ্ডলীতে, আর ‘অগ্রবীজ’ পত্রিকাটির নামকরণ করেছিলেন প্রয়াত দার্শনিক, ক্রিয়াভিত্তিক ভাষাবিধির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রধান ভাবুক কলিম খান, যেখানে এই চিন্তার অগ্রগামী ঋষি ছিলেন শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে, শ্রদ্ধেয় কলিম খানকে মান্য করে আমি লিখেছিলাম, “ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি অনুসারে, যে বৃক্ষের শাখাগ্র কেটে মাটিতে পুঁতলে কিংবা অন্য বৃক্ষে গ্রাফটিং করলে শাখাগ্রটি জীবিত থাকে এবং নতুন গাছের জন্ম হয়, তাকে ‘অগ্রবীজ’ বলে ।” তাহলে, প্রশ্ন জাগে, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইত্যাদির উত্তরাধিকার হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগলিক অবস্থানে, অর্থাৎ বাংলার বাইরে, প্রতিটি বাংলাভাষী মানুষ কি একজন অগ্রবীজ? বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসি ১৯৯১ সালে এবং আমার লিরিক্যাল পোয়েট্রির যাত্রাপথে সাময়িক বিরতি ঘটে ‘সাঁকোশূন্য মহাদেশ’ কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশের মধ্য দিয়ে, ১৯৯৭ সালে, যার সাক্ষ্য দিতে পারি আমি শেষ কবিতার শেষ দুই-পংক্তির মধ্যে— ‘তোমার প্রস্থান শেষে মনে হয়/ আমরা সবাই দূরাগত, বোধের অতীত, স্বপ্নময় চিল।’ (রচনাকাল: অক্টোবর ১২, ১৯৯৭)। আমি কোনো দায়বোধ থেকে কবিতা লিখি না; কবিতা, মূলত, আমার কাছে একলা থাকার উপায়, আমার এক অদৃশ্যমান বর্ম। কবিতা অপৌরুষেয়, এই বিশ্বাসে আমি আস্থা রাখি। তবে বাংলাদেশের অস্থির সময়ে সমাজের প্রান্তিক মানুষ যখন পদদলিত এবং বাস্তুহারা তখন বিশ্বসাহিত্যের মহারথীদের— যেমন, নেটিভ আমেরিকান কবি জয় হার্জো, প্যালেস্টাইন কবি মাহমুদ দারবীশ প্রমুখের অনুপ্রেরণায় প্রতিবাদী কবিতার জন্ম হয়েছে এই আমারই নিভৃত কবিসত্তায় ।
সাথী: আপনি নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে থাকেন। ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ—সবই তো আপনার বেড়ে ওঠার জগতের থেকে ভিন্ন। প্রথম দিকে মানিয়ে নিতে কোনো অসুবিধা হয়েছিল?
তাপস: আমি নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে আছি গত সাত বছর ধরে, কিন্তু অভিবাসী হিসেবে প্রথমে জীবন শুরু করি ‘স্টিভেন্স ইনস্টিটিউড অফ টেকনোলজি’র ক্যাম্পাসে, ক্যাসল পয়েন্টে, নিউ জার্সির হোবোকেন শহরে, আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে । ছোট্ট ক্যাম্পাস, কিন্তু অসামান্য সুন্দর এই ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে হাডসন রিভার, যার এক তীরে নিউ জার্সির ছোট্ট শহর হোবোকেন, আর অন্য তীরে নিউইয়র্কের অমাময়ী মহানগরী ম্যানহাটান। ট্রেনে কিংবা বাসে এই ছোট্ট শহরের বাসিন্দারা বিশ মিনিটের মধ্যেই জনাকীর্ণ ম্যানহাটানে চলে যেতে পারে । সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস থেকে উজ্জ্বল নগরীকে অসম্ভব সুন্দর মনে হতো। এতদিন পরে, আমেরিকা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে এসেও জীবনের সেই প্রথম বিস্ময় কাটেনি। ১৯৯১-এর আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে যখন আমেরিকায় আসি, তার কিছুদিন পরেই দেখি হেমন্ত এসে হাজির; হেমন্তকাল, এই আমেরিকায়, আমার কাছে ঐশ্বর্যের ঋতু বলে মনে হয়, যখন ‘প্রতিটি পত্রই একটি পুষ্প’; হেমন্তের শেষপ্রান্তে ক্যাম্পাসে গাছের রঙিন পাতা কেবলই বিভূতি ছড়িয়ে গেছে আমার জীবনে, আর গির্জার ঘণ্টিতে মাতাল পাতারা নেচে উঠত কী এক অপার্থিবতায়! তবু প্রথম বছর আমার কাছে ভয়ঙ্কর ছিল, বিশেষ করে প্রথম চার মাস । অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভাষাগত দূরত্ব, ইত্যাদি আমাকে বিমর্ষ করেছে; রাতে দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়া করে ফিরেছে। আমার বড়দা, যিনি পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক, যার পারিবারিক ছায়ায় আমার সেই দিনগুলো কেটেছে, এবং তাঁর স্নেহ আর ভালোবাসা না পেলে আমার জীবন কী হয়ে উঠত, তা আজ আমি ভাবতেও পারি না । অনেকটা কাল কেটে গেছে ভিনদেশী মানুষের কথার ইঙ্গিতময়তাকে অনুভব করতে করতে । কিন্তু কবি জীবনানান্দ দাশ, অস্ট্রিয়-জার্মান কবি গেয়র্গ ট্রাকল হয়ে উঠেছিলেন আমার নিভৃতির, আমার নিঃসঙ্গতার পরম বন্ধু।
সাথী: নিউ ইয়র্কে বসে যখন আপনি বাংলা ভাষায় কবিতা লেখেন, সেটা কি শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া? নাকি নিজেকে হারিয়ে ফেলবার ভয় থেকে নিজের ভেতরের মানুষটাকে আঁকড়ে ধরা?
তাপস: ‘শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া’ কখনোই আমার জীবনের অনুসন্ধান হয়ে ওঠেনি । বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহরে কেটেছে আমার শৈশব এবং কৈশোর। প্রতি দুবছর অন্তর, বাবার সরকারি চাকরির বদলির সূত্রে, এক জেলা শহর থেকে আরেক জেলা শহরে আমার জীবন কেটেছে ভাইবোন নিয়ে বৃহৎ এক পরিবারে। সেইসূত্রে, ছোটবেলার বন্ধুরা কখনোই স্থায়ী হয়নি। আমার জীবনে যদি কোনো নির্বাসন জেনে থাকি, তবে তার আস্বাদ, বাংলাদেশে, প্রাক-যৌবনেই আমি পেয়ে গেছি । কলেজ জীবনের শুরু হয়েছিল ঢাকায়—ঢাকা কলেজে, আর তখনই পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে হোস্টেলের জীবন শুরু হয়েছিল । এক দশক ঢাকায়, দুবছর নিউ জার্সি-নিউ ইয়র্ক হয়ে টেক্সাসের আর্লিংটন, ডালাস, প্লেনো, ইত্যাদি শহর আর নগর মিলে কেটে গেল আরও এক দশক । আমি নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রায় পঁচিশ বছর এখন নিউ ইয়র্কে থাকি, এবং নিজেকে নিউ ইয়র্কার ভাবি। এখন নিউ ইয়র্কের জনপদ, সেই জনপদে আমার অভিজ্ঞতাই আমার কবিতার মূল বিষয়। বাংলাদেশ কিংবা ভারতের প্রাচীন জনপদ উঠে আসে জীবনের এক দ্বৈরথ হিসেবে । আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি নিজেকেই নিরন্তর খুঁজে ফিরছি ।
সাথী: নিউ ইয়র্কের সাহিত্য-পরিসর অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুভাষিক। সেখানকার কবি-সাহিত্যিকদের কাজ ও সাহিত্যচর্চা আপনাকে কতটা আকর্ষণ করে? আপনি কি সেই সাহিত্যিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত মনে করেন?
তাপস: পৃথিবীর যে জনপদেই আমি থাকি না কেন, আমি চিরকাল সেই জনপদে ভ্রাম্যমাণ দর্শক হয়েই থেকে গেছি । যেমন, বাংলাদেশে কবি হিসেবে কখনো নিজের কবিতা জনসমক্ষে পাঠ করিনি । বাঙালিদের প্রচুর অনুষ্ঠান হয় এখানে— এই নিউ ইয়র্কে— কিন্তু গত পঁচিশ বছরে হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থেকেছি, এবং সক্রিয়ভাবে দুটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি, যেখানে হয়ত আমি নিজের কবিতা পড়েছি কিংবা কবিতা নিয়ে কথা বলেছি । ইংরেজভাষীদের বিভিন্ন রাইটার্স ফোরামে দর্শক হয়ে অংশগ্রহণ করেছি, এবং এদেশের রাইটার্সদের বুক সাইনিং প্রোগ্রামে দর্শক হিসেবে থেকেছি । আমেরিকান কবিদের মধ্যে আমি পড়েছি এডগার অ্যাল্যান পো, ওয়াল্ট হুইটম্যান, জয় হার্জো, গলওয়ে কিনেলকে, এবং শেষ দুই কবির কবিতা ভাষ্য সহকারে অনুবাদ করেছি। এখন অ্যাল্যান পো নিয়ে মেতে আছি। কবি গলওয়ে কিনেলের সাথে আমার সংক্ষিপ্তভাবে কথা হয়েছে, এবং কবি জয় হার্জো আমার প্রতিবাদী কবিসত্তার আলোকবর্তিকা হয়ে এখনো জীবিত আছেন। সাম্প্রতিককালের আর কোনো কবিকে আমি এখনো আবিষ্কার করে উঠতে পারিনি । ব্রডওয়ে শো, ক্লাসিক্যাল মিউজিক ইভেন্ট, বহু ভাষাভাষীদের মিউজিক ইভেন্টে আমার অংশগ্রহণ নিতান্তই দর্শকের । অর্থাৎ নিউ ইয়র্কের সাহিত্য-পরিসরে আমার সংযুক্তি, প্রকৃত প্রস্তাবে, আমার বিযুক্তি কিংবা আমার নির্লিপ্ততাকেই উচ্চকিত করে মাত্র।
নন্দী: আপনার কবিতায় বারবার সময়, অপসৃয়মানতা, অসমাপ্ততা ফিরে আসে। এটা কি সমকালীন সময়ের এক গভীর সংকটবোধ?
গায়েন: কবিতা লিখতে গিয়েই আমি সময়কে অনুভব করেছি । সাথী, আমি বুঝেছি, আমরা সময়ের বুদ্বুদ মাত্র । দেকার্তের চিন্তায় স্থান এবং কাল পৃথক, এবং তিনি সময়কেই স্থান থেকে অধিক মান্যতা দিয়েছেন; কিন্তু স্থান সময় থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়—এ হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের কথা, বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আবিষ্কার। অন্যদিকে, তাপবিদ্যার অন্যতম প্রধান ঋষি লুদ্ভেগ বল্টসম্যানের চিন্তায় সময়ের আছে তীর, অর্থাৎ সময়ের অভিমুখ আছে, যা ভবিষ্যতের দিকেই ধাবিত, ফলে এর সাথে ‘এন্ট্রপি’র ধারণা যুক্ত হয়েই আছে । মহাবিশ্বের ধ্বংসের কথাও এসে যায়, কিন্তু মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেই আমরা সময় নিয়েই তাড়িত হই, এবং মানুষের অনুভবে সময় বৃত্তাকারে এবং সরলরেখায়—এই দুইভাবেই উপস্থিত হয়ে আছে। কাল যখন আবর্তনশীল, অর্থাৎ পৃথিবী প্রতি বছরই মানুষকে তার ঋতুচক্রে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে, আবার অনেক ঋতু পার হয়ে মানুষ বার্ধক্যে এসে উপনীত হয়। সময় নিয়ে মানুষের বিভ্রমের শেষ নেই; সময় অবশ্যই কবিকে তাড়া করে ফিরে। প্রকৃত কবি তাঁর সৃজনীসত্তায় ‘গ্রেট ফেমিনিন আর্কিটাইপ-কে’ অনুভব করে তাকে অতিক্রম করে যেতে হয়, এবং তিনি অবচেতনে জেনে যান, নারীর মধ্যেই কাল প্রবাহিত। জন্ম, নারী, সময়, মৃত্যু— এসবই তো একবিন্দুতে প্রোথিত । কবিতা লেখার শুরুতেই অপসৃয়মানতার অনুভব আমার কবিতায় ছিল, কিন্তু ‘অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা’ কাব্যগ্রন্থে বিষয়টি তুমুলভাবে এসেছে। শ্রীকৃষ্ণের মতো দার্শনিক এবং কর্মবীর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষে অনুভবে এনেছেন, তাঁর কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে, সেখানে আমার মতো অলস, নির্বিকার মানুষের পক্ষে ‘অসমাপ্ততার’ বোধ কিংবা অনুভব আরও অনায়াসে উঠে আসে । আমি যেহেতু দৈনন্দিন সময় ব্যবহার নিয়ে সচেতন নই, তাই আমার ঘুমের মধ্যে, প্রায় একই স্বপ্নদৃশ্য পুনঃপুনঃ উপস্থিত হয়ে আমার অসমাপ্ত কাজ নিয়ে নিরন্তর কাহিনি নির্মাণ করে চলেছে । আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি বলতে চাই, সমকালীন সময়ে এটি আমার নিজস্ব সঙ্কট; যৌথ মানবের সঙ্কট কি না তা নিয়ে গভীরতরভাবে হয়ত আমি এখনো ভাবিনি ।
সাথী: আপনার কবিতায় মনে হয় জীবন যেন মৃত্যুর আলোয় দৃশ্যমান হয়। আপনার মতে কি মৃত্যু-বোধই মানুষকে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সবচেয়ে তীক্ষ্ণভাবে সচেতন করে?
তাপস: কবিতাপাঠ শুরু করেছি কবি জীবনানন্দ দাশ, জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিল্কে, ফরাসি কবি আর্ত্যুর র্যাবো দিয়ে; শক্তির এলিজিগুলো পড়েছি গভীর আনন্দ আর বেদনায়। রিল্কের কবিতার একটি মৌল মোটিফ হল, মৃত্যু যেন জীবন শুরুর আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে, আর জীবনানন্দে বিপুল বিষণ্নতা আর নশ্বরতায় বিদ্ধ আমরা। আমি কিন্তু আমার জীবনে উন্মত্ত মৃত্যু আকাঙ্ক্ষা করিনি; আমি অনেককাল ধরেই ভেবেছি, আমার শরীর যেন এক বিন্দু জল হয়ে সমুদ্রে মিশে যায় কিংবা একটি খড়-কুটোর মতো যেন আমার শরীর ভেসে যায় দূর সমুদ্রে। আপনাকে এই আলোচনার শুরুতেই বলেছি, গোধূলির সময়ে মৃত্যুচিন্তা আমাকে গ্রাস করে রেখেছিল দুদশকের অধিক সময় ধরে । এখনও মৃত্যুভাবনা থেকে আমি বেরিয়ে আসতে পারিনি । বিশ্বসাহিত্যে মহান কবিদের, যাঁরা আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের নিয়ে আমি একটি গ্রন্থ, ‘ঈশ্বর দর্শনযাত্রায় উন্মাদ কবি’ লিখছি এই মুহূর্তে । আর আছেন বিস্রস্ত চুলের আর্ত্যুর র্যাঁবো তাঁর শুদ্ধ নিষ্পলক দৃষ্টি নিয়ে ‘পথভ্রষ্ট হয়ে চলে যাবেন দূরে’ যেন তিনি ‘প্রকৃতির ভেতরে কোনও এক নারীর মতো সুখী।’ আর কবি যখন নিতান্তই শব্দ নয়, বরং সত্য উন্মোচনে রত, তখন মৃত্যুর অনুধ্যান হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনীসত্তার একটি মৌল মোটিফ। আর একটি কথা না বললেই যেন নয়— আমরা কবিরা কী, তা অনেকটাই হাইডেগার কবিদের মতো বলে দিয়েছেন এইভাবে, আমরা যেন ভাষার মধ্যেই বাহিত, যেন কবিতার মধ্যেই একজন কবির প্রতিকৃতি আঁকা হয়ে আছে।
সাথী: আপনার কবিতায় সময়-চেতনা, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং ব্যক্তিসত্তার নিঃসঙ্গ অনুসন্ধান বারবার ফিরে আসে। এই বোধগুলো কি আপনার অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে?
তাপস: যে-কোনো সৃজনশীল কাজ সৃজনীসত্তার চেতন এবং অবচেতনের এক যৌথ নির্মাণ । এই সৃজনশীল সত্তা, দীর্ঘ পথপরিক্রমায়, তাঁর আর্কিটাইপ তিনি নির্মাণ করেন, অনেকটাই তাঁর অজ্ঞাতে । সে এক দীর্ঘ আলোচনা। সে আলোচনায় না গিয়ে, আমি বলতে চাই, কবিতা লেখার কালে আমি তুমুলভাবে শারীরিক । আমার মনে আছে, কবিতা লেখার সেই আদি পর্বে, আমি কবিতা লিখছি আর আমার চোখ থেকে অবিরল জল ঝরে পড়ছে । কবিতা লেখা হয়ে গেলে আমি নিথর হয়ে উঠেছি । এখনো আমি যখন কবিতা লিখি, যখন আমার শরীরে আমি কবিতা অনুভব করি; যখন আমার কষ্ট হয়, ঠিক তখনই কবিতা লিখতে বসি । সেই আদি পর্বে প্রথম যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন হঠাৎ একটি শব্দ আমাকে আঁকড়ে ধরত, তখন সেই একটি শব্দকে অনুসরণ করেই আমার কবিতা লেখা সম্পূর্ণ হয়ে উঠত । ইদানীং দেখছি, একটি প্রতীক, যেমন সরীসৃপ, আমার কাছে এসেছে, তখন আমি ঝরাপাতাদের মতো এলোমেলো হয়ে যাই, এবং আমি লিখতে শুরু করি । নির্মাণ-প্রক্রিয়ায় আমি সচেতন নই; কিন্তু প্রাক-নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আছে আমার ভ্রমণ, আমার পাঠ, আমার অধীত শিক্ষা, যা হয়ত আমার লেখাকে অজান্তেই প্রভাবিত করে, কিন্তু কবিতা লেখার কালে আমি বিশেষ কোনো চিন্তা দিয়ে তাড়িত নই। লেখার প্রক্রিয়াটি আমার কাছে তুমুলভাবে শারীরিক। আমি আমার মস্তিস্ক নয়, আমার শারীরিক অনুভূতির উপরেই বেশি আস্থা রাখি। নির্মাণ-প্রক্রিয়ার অন্তিম পর্বে আমাকে সম্পাদনার দায়িত্ব নিতে হয়, যা সচেতনতারই অংশ । ‘সময়-চেতনা, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং ব্যক্তিসত্তার নিঃসঙ্গ অনুসন্ধান,’ যে-সকল প্রসঙ্গের কথা আপনি তুলেছেন তা আমার অস্তিত্ব থেকে জাত, আমার অনুভবের উৎসারণ, আমার বুদ্ধিবৃত্তির নয় ।
সাথী: আপনার কবিতাগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, এগুলো সমকালীন প্রবাসী বাঙালি চেতনার এক দার্শনিক দলিল। আপনি কি নিজেও এভাবে ভাবেন? নাকি আপনার কবিতা আসলে মানুষের চিরন্তন একাকীত্বের ইতিহাস লিখতে চায়?
তাপস: আপনার এই প্রশ্ন আমাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলেছে । আমি কোনোভাবেই দার্শনিক নই, এবং কোনোকালেই কোনো দার্শনিক প্রকল্প আমার মাথায় ছিল না এবং এখনো নেই । আমার কবি বন্ধু—সৌম্য দাশগুপ্ত—যিনি আমার মতোই দীর্ঘদিন প্রবাসযাপনে অভ্যস্ত, এবং বাংলাসাহিত্যের সেইসব দিকপাল কবি, যাঁরা প্রবাসে ছিলেন, তাঁদের কবিতা ভালোবেসে পড়েছেন; তিনি তাঁদের প্রবাস-জীবনের কবিতার সাপেক্ষে আমার কবিতা নিয়ে কিছু কথা বলেছেন, সেই কথাগুলো আপনার প্রশ্নের উত্তর হিসেবে হয়ত প্রাসঙ্গিক, কিন্তু পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতায় সেই কথাগুলো যদি বলি, তা শ্রুতিমধুর নাও হতে পারে। খুব সংক্ষেপে যদি বলি তবে সৌম্যের ভাষায়, ‘তাপস, তোমার কবিতা তুমুলভাবেই এক নিউ ইয়র্কারের।’ উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, তবে আমাকে বলতে হয় ‘ঈশ্বর’ শব্দ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আমার ভক্তচৈতন্যের দিকনির্দেশ করে না । এই ‘ঈশ্বর’ শব্দটিকে ভাবের মধ্য দিয়ে এর একটি বস্তুময় উৎসারণ হতে হয় । আমি জানি না, আমার প্রবাসজীবনের কবিতায় সেই উৎসারণ হয়েছে কি না ! আমি চেষ্টা করছি, কীভাবে আমার শরীর—আমার কবিতায়—ভাবের বস্তুময় প্রকাশের মধ্য দিয়ে কবিতা হয়ে উঠবে । অনেক আগেই সৌম্য আমার গদ্য কবিতার দুটি বই—‘একলব্য নিঃসীম নগরে’ (২০১০), ‘সময়ব্যূহে অভিমন্যু’ (২০১৭)-কে ইংরেজীতে অনুবাদ করতে বলেছিল । অনুবাদ শুরু করেছিলাম, কিন্তু আমার দীর্ঘসূত্রিতা, আমার তুমুল অলসতা আমাকে কেবলই পিছনে টেনে ধরে । আমি আমার এই জীবনকে কোনোভাবেই আর প্রবাসজীবন বলতে আগ্রহী নই, বরং এই জনপদের যে ভূগোল, তা যেন আমারই। সেইদিক থেকে বিবেচনা করলে, আপনার প্রশ্নের সমাঙ্গতায়, আমি বলতে চাই—আমার কবিতা মূলত ‘মানুষের চিরন্তন একাকীত্বের ইতিহাস।’
সাথী: আপনার কবিতায় শৈশব, অতীত সম্পর্ক ও হারিয়ে যাওয়া মানুষের অনুসন্ধান খুব প্রবল। এই ফিরে যাওয়াটা কী বর্তমানের প্রবাসী শূন্যতা থেকে জন্ম নেয়?
তাপস: উৎসে ফিরে যাওয়া, অনেক প্রাণির মধ্যেই লক্ষণীয়, যাকে আমরা ‘ন্যাটাল হোমিং’ হিসেবে জেনেছি। প্যাসিফিক স্যামন, অনেক পরিযায়ী পাখি, সামুদ্রিক কচ্ছপ, ইত্যাদি প্রজননের জন্য দীর্ঘ পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে উৎমুখে ফিরে আসে ; এটি ‘জিন সংরক্ষণ’ কিংবা ‘জৈবপ্রবাহকে অব্যাহত’ রাখার একটি কৌশল মাত্র । আমি মনে করি, প্রতিটি সৃজনশীল সত্তা, আমরা যাকে কবি, শিল্পী, ইত্যাদি অভিধায় জেনেছি, তিনি তাঁর চৈতন্যে, নিজেরই অজান্তে তাঁর ভূগোলের ‘সাংস্কৃতিক জিন’ কিংবা ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ বয়ে নিয়ে বেড়ান; অনেক সময়, তিনি তাঁর অজান্তেই এই কাজটি করে যাচ্ছেন । বিশ্বসাহিত্যে নির্বাসিত সাহিত্যিক সুপ্রচুর, সে স্বেচ্ছা নির্বাসন হোক আর অনিচ্ছায় হোক ; সেইসব সাহিত্যিকদের কাজ তাঁদের শৈশব এবং কৈশোরের অতীতচারিতায় পূর্ণ। প্রকাশিত আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থটির নাম, ‘সাঁকোশূন্য মহাদেশ’ আর দ্বিতীয়টির নাম ‘একলব্য নিঃসীম নগরে’ ; এই কবিতা বই দুটির প্রচ্ছদ সবকিছু বলে দেয় । আমার সহোদর কবি তুষার গায়েনকৃত প্রচ্ছদে বিষয়গুলোকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথম বইয়ে, দুই ভূগোলকে বাঁধতে গিয়ে সাঁকো ভেঙে পড়েছে; আর দ্বিতীয় বইটিতে ‘ইস্ট রিভারের’ জল ম্যানহাটান নগরীর ছায়া বিম্বিত করে তুলেছে ভারতীয় জনপদের একটি প্রাচীন নগরীকে ! আমাদের স্মৃতিতে শৈশবই সবচে বেশি কোলাহলময়। আপনার প্রশ্ন, ‘এই ফিরে যাওয়াটা কি বর্তমানের প্রবাসী শূন্যতা থেকে জন্ম নেয়?’-এর মধ্যেই নিহিত আছে উত্তর, এবং আপনার অনুমান সত্য বলেই প্রতীয়মান হয়ে উঠছে আমার কাছে। কিন্তু, আমার এই নির্বাসন মূলত ‘এসোটেরিক (esoteric)’, নয় ‘এগসোটেরিক (exoteric)’ অর্থাৎ আমার এই নির্বাসন নিতান্তই স্বেচ্ছা-নির্বাসন, কোনোভাবেই জবরদস্তিমূলক নয়।
সাথী: আপনার কাব্যগ্রন্থের নামেই যেমন ‘একলব্য’ ও ‘অভিমন্যু’ এসেছে, তেমনি কবিতায়ও মহাভারতের বহু চরিত্র ফিরে আসে। আপনার কি মনে হয় যে মহাভারত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ?
তাপস: আমি খুব ভালো পাঠক নই, যদিও আমার নিজস্ব পাঠাগারে কিছু ভালো বইয়ের সংগ্রহ আছে । ভাবছি, মৃত্যুর আগে বইগুলো যেন পড়ে যেতে পারি! কীভাবে যে বলি, ‘মহাভারত’ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, যেহেতু আমি অনেক বই এখনো ছুঁয়ে দেখিনি । তবে মহাভারত মানবজাতির এক বিপুল, বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বলেই মান্য করি। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালে দার্শনিক কলিম খানসহ অনেকেই মহাভারতকে ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস বলে মান্য করেছেন । কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তী প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ,’ যা কিনা ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থের অভিধান, যেখানে মহাভারতসহ ভারতীয় পুরাণের অনেক কাহিনির ব্যাখায় কীভাবে যেন মার্ক্সীয় বিশ্ববীক্ষা, ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি, ভারতের ইতিহাস একাকার হয়ে আছে । মহাভারত অবশ্যই মানুষের চিরন্তন ট্রাজেডির এক বিচিত্র ভাণ্ডার । ‘অগ্রবীজ’ পত্রিকায় নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী ‘ইচ্ছামৃত্যু’ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, সেই চিন্তায় যে নিজস্বতা, তা প্রতীচ্যের কোনো দার্শনিক ভাবনায় আছে কি না, তা আমার জানা নেই । শরশয্যায় ‘ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যু’র প্যারালাল কিছু বিশ্বসাহিত্যে আছে কি না, তাও আমার জ্ঞানের বাইরের জগৎ যেন ।
সাথী: মহাভারত ছাড়া প্রাচীন সাহিত্য বা পুরাণের আর কোনো গ্রন্থ কি আপনার কাব্যচিন্তাকে প্রভাবিত করেছে?
তাপস: আদিপাপ-কল্পের উদ্গাতা যদি হয়ে থাকেন যীশু, তবে নির্বাণ-প্রকল্পের অবতার বুদ্ধ—এই দুই মহাপ্রাণ, তাঁদের জীবন, তাঁদের চিন্তা আমাকে অনেককাল ব্যাপৃত রেখেছে, এবং এখনো রাখে । গীতা, বাইবেল, উপনিষদ্, ধম্মপদ, ইত্যাদি আমি বিক্ষিপ্তভাবে পড়েছি । এইসব চিন্তারাজির ছিটেফোঁটা হয়ত কবিতায় এসেছে নিজেরই অজ্ঞাতসারে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা আমাকে ঠিক তেমনভাবে গ্রাস করেনি, যেভাবে মহাপ্রভু যীশু এবং ভগবান বুদ্ধ আমাকে টেনেছেন, আমার কবিতার অংশ হয়ে উঠেছেন । শ্রীকৃষ্ণ আমার কবিতায় এসেছেন বুদ্ধির, লজিকের পথ ধরে, আত্মার ক্রন্দন হয়ে নয় ।
সাথী: কবিতার ক্ষেত্রে আপনার নান্দনিক ঝোঁক কোন দিকে? অর্থাৎ আপনি কোন ধারার কাব্যচর্চাকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং কোন কবিদের লেখা পড়তে বিশেষভাবে পছন্দ করেন?
তাপস: এ-প্রশ্নের উত্তর আমি শেষের দিক থেকে শুরু করি । আমার প্রিয় কবিরা হলেন— এডগার অ্যাল্যান পো (রোমান্টিক কবি), জেহ্যদ দ্যু নেহভ্যাল (রোমান্টিক কবি), ফ্রিডরীশ হোল্ডারলিন (জার্মান রোমান্টিক কবি যিনি আধুনিক কবিতার পূর্বসূরী), রাইনার মারিয়া রিলকে (প্রতীকবাদী আধুনিক কবি), আর্ত্যুর র্যাঁবো (প্রতীকবাদী/প্রোটোমডার্নিস্ট কবি), গেয়র্গ ট্রাকল (অভিব্যক্তিবাদী কবি), ওসিপ ম্যান্ডেলস্টাম (একমেইস্ট/ আধুনিক কবি), জয় হার্জো (নেটিভ আমেরিকান/আধুনিক কবি), মাহমুদ দারবীশ (আরব্য আধুনিক কবি), জীবনানন্দ দাশ (আধুনিক কবি), উৎপলকুমার বসু (উত্তারাধুনিক কবি) । তাহলে আমি দেখছি, কোনো এক বিশেষ ধারার প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব নেই; ভালো কবিতাই আমার ভিতরে কবিতার এক পাঠক নির্মাণ করে । এঁদের কবিতা পড়ে যত আনন্দ পাই, তা হয়ত অন্য কোনো কবির কবিতা দেয় না । বর্ণনাধর্মী কিংবা খুব বেশি চিন্তাপ্রধান কবিতা আমাকে টানে না । অক্তাবিও পাসের কবিতা যেন প্রতীকের অন্তহীন প্রবাহ, যা আমাকে এখন ক্লান্ত করে । কবিতায় ইঙ্গিতময়তাকেই এখন বেশি প্রাধান্য দেই । সাম্প্রতিককালে আমার প্রয়াত বন্ধু রাহুল পুরকায়স্থসহ আরও অনেকের কবিতা, যা ইঙ্গিতময়তায় পূর্ণ তা আমাকে ভাবায়, আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
সাথী: লোকে বলে কবি মাত্রই প্রেমিক, আর প্রেমের ভেতরেই যৌনতার উপস্থিতি থাকে। কিন্তু প্রেম, যৌনতা ও সংযত বা দূরে সরিয়ে রাখা ভালোবাসা—এই তিনটি অভিজ্ঞতাকে আপনি কীভাবে আলাদা করে দেখেন?
তাপস: যেখানে জীবন, সেখানেই যৌনতা; যৌনতা ব্যতীত কোনো জীবন নেই, কোনো সৃজন নেই, নেই কোনো সৃজনশীলতা । এই যে প্রকৃতি—পত্র, পুষ্প নিয়ে এতো যে বৃক্ষের সমাহার, কিংবা বিচিত্র প্রাণীকুল—এসব কিছুর অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে নিরন্তর যৌনতার কারণেই । যৌনতা এক পরম ঈশ্বর, আর প্রেম তো সেইদিনের শিশু । প্রেম, অর্থাৎ যাকে আমরা রোমান্টিক প্রেম বলি, সে তো মানুষের, আরও সংকীর্ণ অর্থে কবি, শিল্পীদের হাতে এক কল্পনির্মাণ। এ বিষয়ে, আমি কার্ল গুস্তাভ ইয়ুঙের চিন্তাকে মান্য করি । যতক্ষণ না আমরা আমাদের শ্যাডো (অবচেতন)-কে সচেতনতার সাথে ইন্টিগ্রেট করতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত এই প্রেমের খেলা চলতে থাকবে । তবে আমাদের আমৃত্যু ভালোবেসে যেতে হবে । কীভাবে লাস্টকে, অর্থাৎ লিপ্সাকে, যৌনতাকে শিল্পে পরিণত করে তুলতে হয়, তা প্রত্যেক সাধককে জেনে নিতে হয় । যৌনতার মৃত্যু হলে সৃজনশীলতার মৃত্যু হতে বাধ্য । এই বিশ্বপ্রকৃতিতে চলছে অবিরাম রূপান্তরের খেলা। এই রূপান্তরের কথা আমাদের জেনে নিতে হয়—এই হল শিল্পের সাধনা, এই হল কবির নিরন্তর অন্বেষণ ।
সাথী: ভালোবাসা ও বিয়ের মধ্যে আপনি কী ধরনের সম্পর্ক দেখতে পান? বিয়ে কি ভালোবাসার স্বাভাবিক পরিণতি, নাকি তা এক ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা?
তাপস: পৃথিবীতে আপাতভাবে তিনটি প্রবাহ আছে: (এক) সম্পদপ্রবাহ; (দুই) জ্ঞানপ্রবাহ; (৩) জৈবপ্রবাহ। এই পৃথিবীতে মানবপ্রবাহকে অব্যাহত রাখতে হলে জৈবপ্রবাহ কিংবা সন্তানপ্রবাহকে আমাদের সচল রাখতে হবে। আমি তো আগেই বলেছি, যৌনতা এক পরম ঈশ্বর, যার মধ্য দিয়ে আমরা অস্তিত্ববান হয়ে উঠি, আর ভালোবাসা, বোধকরি, মানুষের এক সাংস্কৃতিক অর্জন; বিয়ে ভালোবাসার স্বাভাবিক পরিণতি নয়, বরং বলা যায় এ এক বিপর্যয়। ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিয়ে করা, যা সমাজে চালু হয়ে আছে, তা আসলে ‘অ্যা গেম উই প্লে’ এবং যা সন্তান লালনপালনে সহায়ক ভূমিকা রাখে, আমরা ভালো সামাজিক উৎপাদক হয়ে উঠি, এবং পরিশেষে আমরা ভালো অনুভব করি । কিন্তু, ভালোবাসা এক তুরীয় অবস্থান, যেখানে আমরা অনেকক্ষণ অস্তিত্বমান থাকতে পারি না । তাই বিয়ের পর ভালোবাসা নিয়ে এতো বিভ্রম । নৃবিজ্ঞান এবং এভুল্যুশনারি সাইকোলজি বলছে, মেয়েরা সেই পুরুষকে নির্বাচন করে, যার মধ্য দিয়ে সে তার সন্তানদের সবচে ভালো নিরাপত্তা দিতে পারে, এবং ভবিষ্যতের জন্য তাঁর সন্তানরা সমাজের যোগ্য প্রতিনিধি হয়ে উঠবে । ‘হান্টার-গেদারার সোসাইটিতে’ সবচে ভালো শিকারি হয়ে উঠবে এক নারীর কাঙ্ক্ষিত পুরুষ, ঠিক তেমনি করেই বর্তমানে বিত্তবান সুপুরুষ হয়ে উঠবে নারীর আকাঙ্ক্ষার ধন । কৃষিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সুডৌল নারীকে পুরুষ যেমন আকাঙ্ক্ষা করে, একই কারণে মহানাগরিক সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষীণকায়, দীর্ঘাঙ্গী, বুদ্ধিদীপ্ত নারীকেই পুরুষ তার সঙ্গী করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে । কিন্তু, সমাজ হল এক রণক্ষেত্র, সাপ্লাই-ডিমান্ডের ক্ষেত্রভূমি । তার আকাঙ্ক্ষার মানুষকে পাবার জন্য তাকে নিরন্তর অনুসন্ধান এবং যুদ্ধ করে যেতে হয় । যুদ্ধক্লান্ত মানুষটি যা অর্জন করে, তাকেই সে ভালোবাসা বলে। ভালোবাসা শব্দটি ঈশ্বর শব্দের সমার্থক; সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ঈশ্বরকে ভালোবাসে যেভাবে সে তার সঙ্গীকে ভালোবাসে, কিন্তু সে তার ঈশ্বরকে সত্যিকা্র অর্থে ভালোবাসে না । ‘আমি ভালোবাসি’ বলার মধ্য দিয়ে সে প্রকৃত অর্থেই অস্তিত্বমান হয়ে উঠে । আসলে, এ হল এক প্রয়োজনীয় মিথ্যা । যখন কেউ বলে, ‘আমি তোমাকে ভালবাসি,’ একজন শ্রোতা হিসেবে আমাদের জেনে নেওয়া ভালো, এর অর্থ বিভিন্ন— অর্থাৎ পাত্রভেদে এবং কালভেদে বিভিন্ন। ভালোবাসার পথ এতো সহজ নয়, তাকে অর্জন করতে হয়। খুব কম মানুষই এই পথ দিয়ে হাঁটার সৌভাগ্য অর্জন করে। হাইডেগারের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই, ‘উই আর ঠু লেট ফর গড, অ্যান্ড ঠু আর্লি ফর বীয়িং।’
সাথী, আপনার জন্য রইল অনেক শুভেচ্ছা, আপনার মঙ্গল হোক।