Published : 24 Jul 2026, 04:57 PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল শৃঙ্খল ভাঙার লড়াই। যেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল মুক্ত আলো ও মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার। কিন্তু জুলাইয়ের দুই বছর পার হয়ে আজ আমরা কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি? গত আড়াই বছরে রাজপথ ও সৃজনশীল প্রাঙ্গণে আমরা বারবার দেখেছি বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দলবদ্ধ মব সৃষ্টি, ভিন্নমত দমন। ২৩ জুলাই বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে কবি মোহন রায়হানের সঙ্গে যা ঘটলো, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এই মব-সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা-বিরোধীদের সাম্প্রতিক দাপটেরই এক উলঙ্গ প্রকাশ।
শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলে নেওয়া প্রয়োজন, এই লেখায় কবি মোহন রায়হানের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শনের দিকে কোনো আলোকপাত করা হয়নি। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধুই তাঁর লেখা ‘জুলাই এখন’ কবিতাটি এবং কবিতা পাঠের মঞ্চে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও তার পেছনের রূঢ় বাস্তবতা।

একজন কবি তাঁর স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন বাংলা একাডেমির মতো জাতীয় ‘মননের প্রতীক’ রূপে খ্যাত এক প্রতিষ্ঠানে। সেখানে কোনো যুক্তিসঙ্গত আলোচনা বা সাহিত্যিক সমালোচনা ছাড়াই আচমকা মঞ্চে উঠে মাইক কেড়ে নেওয়া হলো, গায়ে হাত তোলার মতো পরিবেশ তৈরি করা হলো এবং ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ কিংবা ‘জুলাইবিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে কবিকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হলো! কিছু স্বঘোষিত কবি ও রাজনৈতিক কর্মীর এমন আচরণ কি ধৃষ্টতা নয়? কবিতা শেষ পর্যন্ত না শুনে, কবিতার মূল বার্তা না বুঝে এই যে মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া ও হুঙ্কার, এটি মূলত ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই নতুন সংস্করণ। কাকে কবিতা পড়তে দেওয়া হবে আর কাকে হবে না, এই ফতোয়া জারি করার অধিকার এই নেতাদের কে দিল?
কবি মোহন রায়হানের ‘জুলাই এখন’ কবিতাটির পাঠ-বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, কবিতাটি কোনোভাবেই জুলাই আন্দোলনের বিরোধী নয়। বরং এটি জুলাই আন্দোলনের রক্তঝরা শহীদদের আত্মত্যাগের পক্ষে এবং আন্দোলনের ফসল হাতছাড়া হতে চলা এক বেদনার দলিল। কবিতায় কবি তীব্র ক্ষোভে লিখেছেন:
জুলাই এখন
ধর্মব্যবসায়ী, ধর্ষক, খুনি আর লুণ্ঠনকারীদের
উল্লাস-উন্মত্ত নৃত্যমঞ্চ।
জুলাই এখন
স্বাধীনতার স্বঘোষিত সোল এজেন্টদের অট্টহাসি,
এবং একই সঙ্গে সতর্ক করে লিখেছেন:
জুলাই এখন
একাত্তরের পরাজিত শক্তির
নতুন মুখোশে ফিরে আসা
ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র।
জুলাই এখন
রাজাকার, আলবদর আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির
নির্লজ্জ পুনরুত্থানের প্রতিধ্বনি।
যে মুহূর্তে কবি কবিতায় ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির পুনরুত্থানের কথা উচ্চারণ করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই একদল চিহ্নিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী হট্টগোল শুরু করে তাঁর মাইক কেড়ে নিল!
যে কথাগুলো কবি কলমের কালিতে ছন্দে বেঁধেছিলেন,
জুলাই এখন
মুক্তচিন্তা আর মানবিক হৃদয়বৃত্তির বিরুদ্ধে
জারি হওয়া ফতোয়া;
কবিতা, কথা, সুর আর সংগীতের
গলায় ঝোলানো মৃত্যুঘণ্টা।

বাংলা একাডেমির ওই হট্টগোল আর মব তৈরি করে তারা হাতে-কলমে সেটাই প্রমাণ করে দিল। কবিতায় বর্ণিত "মুক্তচিন্তা ও মানবিক হৃদয়বৃত্তির বিরুদ্ধে জারি হওয়া ফতোয়া" যে কতটা সত্য, মঞ্চে উঠে মাইক কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আক্রমণকারীরা নিজ হাতে তা সিলমোহর দিয়ে দিল।
বিগত দুই বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে জুলাইয়ের স্বপ্নকে পুঁজি করে একদল মানুষ নতুন করে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে, বাণিজ্য করছে, মব তৈরি করে প্রতিষ্ঠান ও ভিন্নমতের মানুষকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪-এর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ইতিহাস মুছে ফেলার যে ঘৃণ্য অপচেষ্টা চলছে। কবি সাহসের সঙ্গে তাকেই চ্যলেঞ্জ করেছিলেন। কবি স্পষ্ট স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন:
ভেবেছিলাম-
জুলাইয়ের যুদ্ধে বিজয়ী হলে
শৃঙ্খলমুক্ত স্বদেশে
মুক্ত আলো, মুক্ত বাতাসে
বুকভরে নেব নিঃশ্বাস।
কেউ আর চোখ রাঙাবে না,
কেউ আর ভয় দেখাবে না,
কেউ দাদাগিরির বিষদাঁত উঁচিয়ে
মানুষের স্বপ্ন গ্রাস করবে না।
কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো, চোখ রাঙানো বন্ধ হয়নি, ক্ষমতার হাত বদলে কেবল নতুন দাদাগিরির মুখগুলো সামনে এসেছে। কবি প্রশ্ন তুলেছেন, "তবে কি জুলাইয়ের রক্তঋণ এখনও শোধ হয়নি?"
আক্রমণকারীরা হয়তো ভেবেছিল মাইক কেড়ে নিয়ে তারা একজন কবির কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, ইতিহাস বা কবিতা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের বাধানিষেধে আটকে থাকে না। কবিতার শেষেই কবি সেই অবিনাশী সত্য উচ্চারণ করে গেছেন:
ইতিহাসের শেষ বাক্য
এখনও লেখা হয়নি।
যতদিন মানুষের হৃদয়ে
স্বাধীনতার আগুন জ্বলবে
ভালবাসার ফুল ফুটবে
ততদিন জুলাই বেঁচে থাকবে—
প্রতিবাদে, প্রতিরোধে,
ন্যায়ের পতাকায়,
মুক্ত মানুষের অদম্য উচ্চারণে।
বাংলা একাডেমিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সমগ্র দেশ ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য এক অশনি-সংকেত। যদি বাকস্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষাই জুলাইয়ের মূল চেতনা হয়ে থাকে, তবে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে কবিকে অপমানিত করা ও জোর জবরদস্তি করে সভা পণ্ড করার চেষ্টা জুলাইয়েরই অবমাননা। শিল্পীর কণ্ঠরোধের এই বিষদাঁত এখনই উপড়ে ফেলতে না পারলে, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। মাইক কেড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু কবিদের থামানো যায় না। গুন্ডামি করে কবিতা ও সত্যের প্রতিধ্বনি রোধ করা অসম্ভব।