Published : 23 Jul 2026, 02:38 PM
চীনের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাব্যিক অনুভবের সফল রূপকার কবি ওয়াং চিবিং। কারণ তিনি নিজেও একজন শ্রমিক। তাই শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে তিনি পাখির চোখে দেখেননি। বরং দেখেছেন মাটির কাছে দাঁড়িয়ে। চীনের ‘প্রলেতারিত সাহিত্যে’ বর্তমানের জনপ্রিয় নাম কবি ওয়াং চিবিং। বেশ কয়েক বছর ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কবিতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তার কবিতার বই ‘কান সিচিয়ান দা রেন’ (ম্যান ইন আ হারি) ‘যে মানুষের খুব তাড়া’ পাঠকপ্রিয়তা পায়। তার সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘তি চু ফেই সিং’ ( Di Chù Fēi Xíng ‘লো ফ্লাইট’ low flight) বা ‘নিচুতে ওড়া’ জয় করেছে চীনের সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার ‘লুসুন সাহিত্য পুরস্কার’। এই পুরস্কার জয় তাকে পৌঁছে দিয়েছে চীনের কাব্য প্রেমিকদের হৃদয়ে। প্রলেতারিয়েত সাহিত্যের নতুন ধারায় তিনি এখন সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি।
নতুন শ্রমিকদের সাহিত্য হলো প্রলেতারিয়ান লিটারেচার বা সর্বহারা শ্রেণীর সাহিত্যের ধারায় এক নতুন ধরন। ২০০০ সাল থেকে এই ধরনটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এখানে চীনের প্রলেতারিত সাহিত্যের নতুন ধরন বিষয়ে কিছু কথা না বললেই নয়।
আগেকার সর্বহারা সাহিত্যের তুলনায় নতুন শ্রমিক সাহিত্যের দুটি অলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে: প্রথমত, এই সাহিত্যের রচয়িতারা শ্রমিকদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন—বিশেষ করে সেই সব অভিবাসী শ্রমিক, যারা কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমিয়েছেন; দ্বিতীয়ত, নতুন শ্রমিক সাহিত্যে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির প্রথাগত বিষয়বস্তুর ওপর কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এর পরিবর্তে নতুন শ্রমিক শ্রেণীর দুটি ভিন্ন ধরনের চেতনার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে—যার একটিতে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবনযন্ত্রণার বেদনা ও হতাশা ফুটে ওঠে এবং অন্যটিতে তাদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়।
ওয়াং চিবিং তাঁর রচনায় মূলত সমাজের একেবারে নিচের স্তরের অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর সৌন্দর্য খুঁজে পান। এ প্রসঙ্গে তার একটি জনপ্রিয় কবিতার কথা বলা যায়। কবিতাটির নাম, ‘শি ইজ সো লাইক মাই সিস্টার’ (She’s So Like My Sister) বা ‘সে একদম আমার বোনের মতো’। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন যে, সকালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মুখের ওপর যে সূর্যের আলো পড়ে, তাকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিখায় (trenches) পড়া আলোর সাথে তুলনা করেছেন। পরিখার দৃশ্য এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মুখের বলিরেখাকে পাশাপাশি রেখে ওয়াং এমন এক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাধারণ কর্মীদের মূল্য ও পবিত্রতাকে তুলে ধরেছেন, যা আগে কেউ কখনো কল্পনাও করেনি।
ওয়াং চিবিংয়ের কবিতায় এক ধরনের বিষন্নতা রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে চীনের প্রাচীন বৌদ্ধ দর্শনের ছোঁয়া। পাশাপাশি এখানে তাও দার্শনিকদের এক গভীর শান্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। শ্রেণি-সম্পর্কের এক আদর্শ বা ইউটোপীয় দৃষ্টিকোণ তার কবিতায় ফুটে ওঠে।
তিনি তার কবিতায় শ্রেণি-সংগ্রামের সমাধানের পথ খোঁজেন ‘সিবেই’ (cibei)-এর মাধ্যমে—এটি এমন এক চীনা দার্শনিক ধারণা যার মূলে রয়েছে গভীর বৌদ্ধ ও তাও দর্শন। ‘সিবেই’-এর মানে অনেকটা সকল জীবের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করা। বলা যায় সকলের প্রতি করুণা ও সহমর্মিতা পোষণ করা।
তিনি নিম্নবর্গের মানুষের ভোগান্তি বা কষ্টকে এক ধরণের ‘করুণাময় আত্মত্যাগ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘সিবেই’ শিরোনামের কবিতায় তিনি বলেন, “মানুষের জন্য গরু ও ভেড়া হলো করুণাময়; আবার গরু ও ভেড়ার জন্য ঘাস ও গাছপালা হলো করুণাময়।” এভাবেই তিনি নিম্নবর্গের মানুষের সহ্য করা কষ্টকে সকল জীবের প্রতি তাদের করুণা বা সহমর্মিতায় রূপান্তরিত করেন। উচ্চবিত্তের দিকে আঙুল তোলা কিংবা সহিংস ও উগ্র সংঘাতের পথ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে, ওয়াং করুণার বশবর্তী হয়ে আত্মত্যাগকারী নিম্নবর্গের মানুষদের মহিমান্বিত করেন; তিনি অত্যন্ত কোমল ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করে শ্রেণি-বৈষম্যের প্রভাব সম্পর্কে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
অবশ্য অন্যান্য অনেক ‘নতুন শ্রমিক-সাহিত্য’-এর মতোই ওয়াং-এর কবিতাতেও একটি সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। এটি হলো নিম্নবর্গীয় মানুষদের নৈতিকতার আলোকে এক ধরণের রোমান্টিক বা আদর্শায়িত রূপ দেওয়া। তবে ‘নতুন শ্রমিক-সাহিত্য’-এর প্রকৃত গুরুত্ব হলো এই সাহিত্য সমাজের একদম নিচুতলা থেকে উঠে আসা কণ্ঠস্বরকে ধারণ করে। এই সাহিত্য এমন সব মানুষের কথা তুলে ধরে যাদের যুগ যুগ ধরে অবহেলা করা হয়েছে। শ্রমিক শ্রেণির মানুষের কথা তাদের হাতেই উঠে আসার মাধ্যমে এটি হয়ে ওঠে কৃত্রিমতা বর্জিত নিখাদ বাস্তবের ছবি । তবে তা শিল্পে সার্থকভাবে রূপায়িত। এই শিল্প তুলে ধরে শ্রমিক শ্রেণির সৌন্দর্য ও মর্যাদাকে।

কবি ওয়াং চিবিংয়ের জীবন যথেষ্ট কঠিন ও সংগ্রামী। তিনি খুনশান শহরে ফুড ডেলিভারির কাজ করেন। এই কাজে তিনি এক লাখ পঞ্চাশ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন। খাবার ডেলিভারির এই ব্যস্ততার মধ্যে তিনি পাঁচ হাজারের বেশি কবিতা লিখেছেন। এই কবিতাগুলোতে তিনি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা, সংগ্রাম, হতাশা ও প্রাপ্তির অনুভূতিকে রূপায়িত করেছেন।
‘লো ফ্লাইট’ বা নিচুতে ওড়া কবিতার বইয়ের একটি কবিতার পংক্তিতে বলা হয়েছে, "ডানা মেলার অর্থই কি কেবল উঁচুতে ওড়া? নিচু দিয়ে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।" চলতি বছরের ডিসেম্বরে বইটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হবে ।
সত্তরের দশকের শুরুতে পূর্ব চীনের চিয়াংসু প্রদেশের এক কৃষক পরিবারে ওয়াংয়ের জন্ম। ছোটবেলা কেটেছে অভাব অনটনের মধ্যে। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তিনি কিশোর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। তবে লেখাপড়ার নেশা ছাড়তে পারেননি। কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি বই পড়তেন। কবিতা লিখতেন। কিন্তু গ্রামীণ এক তরুণের পক্ষে সাহিত্যিক হিসেবে পাঠকের নজরে আসা সম্ভব হয়নি। জীবন চালাতে তিনি নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেছেন, রাস্তার ধারে ছোট দোকান চালিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি ডেলিভারি রাইডারের পেশা বেছে নেন। ডেলিভারি পেশা বেছে নেয়ার কারণ তুলনামূলক ভালো আয়। তাছাড়া এই কাজের সুবাদে তিনি পথচারী ও পথের ধারের দৃশ্যপট পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেতেন, যা তাঁর লেখার জন্য প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণা জোগাত।
গত এক দশক ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করে আসছিলেন, কিন্তু সেগুলো খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। এরপর ২০১৯ সালে এক গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ায় ওয়াংয়ের ডেলিভারি দিতে দেরি হয়ে যায়। তখন সেই গ্রাহক তাঁকে বিদ্রূপ করে বলেন, "এত বয়সেও আপনি খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন? আপনি কি এতটাই বোকা?"
সেই হতাশাজনক অভিজ্ঞতার পর তিনি "ম্যান ইন আ হারি" (Man in a Hurry) বা " যে মানুষের খুব তাড়া’ নামে একটি কবিতা লেখেন। লেখাটি অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং ওয়াং বেশ পরিচিতি পান। এরপর তিনি তাঁর কবিতার জন্য উপাদান সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তিনি অন্যান্য ডেলিভারি রাইডারদের সাক্ষাৎকার নেন, তাঁদের কাজের খোঁজখবর রাখেন এবং তাঁদের জীবনের গল্প থেকে অনুপ্রেরণা পান। ২০২৪ সালে ‘লো ফ্লাইট’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থে ফুড ডেলিভারির কাজে থাকা শ্রমিকদের জীবনকে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে—যারা সমাজের একেবারে নিচের স্তরে অবস্থান করেও একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখে।

৫৬ বছর বয়সী ওয়াং খ্যাতি ও পুরস্কার পাওয়ার পরও ডেলিভারি ম্যানের পেশা ছাড়ছেন না। তবে নিঃসন্দেহে তিনি কবিতায় আরও অনেক শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে তুলে ধরতে উৎসাহী হয়েছেন।
তার ‘লো ফ্লাইট’ কবিতাটির অনুবাদ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি।
নিচুতে ওড়া
কে বলেছে যে, ডানা ছড়িয়ে দিলে কেবল উঁচুতেই উড়তে হবে?
নিচুতে ওড়াও তো উড্ডয়ন।
পাখির কলকাকলির মতো বাতাসের মর্মরধ্বনি
আর উল্কার বেগে ছুটে চলা চাকার ঘূর্ণন
টেক-আউট খাবারের প্যাকেটে সাঁটা সেই চিরকুট—
পরিষ্কার কালো-সাদা অক্ষরে লেখা জরুরি তাগিদের প্রতীক
যেন কোনো আইনি নথি কিংবা জাদুকরী কোনো মন্ত্র
বিচিত্র সব পেশার ভিড় ঠেলে
উঠে আসে এক নতুন কর্মজীবন
আর বছরের চব্বিশটি ঋতু-পর্যায়ের মাঝে
ডেলিভারি কর্মীদের জন্য বরাদ্দ হয় এক বিশেষ সময়
ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে তারা এক ঘণ্টার ভিতরেও
আবিষ্কার করে নেয় বাড়তি এক মিনিট—
আর সময়কে হারিয়ে পৌঁছে দেয় মমতা
রাস্তার বুকে তারা যেন সাজিয়ে তোলে ঘড়ির সেকেন্ড ও মিনিটের কাঁটা
ঠিক যেন সুবিন্যস্ত কোনো কালো-সাদা কি-বোর্ড
কে বলে উচ্চমার্গীয় গানের গায়ক মেলে না সহজে?
মাটির কাছাকাছি শোনা সেই সুরই তো আসলে
ঊর্ধ্বমুখী সব প্রাণের জয়গান
মানুষের পৃথিবীতে যদি আদৌ কোনো পঞ্চম ঋতু থাকে
তবে তা নিশ্চিতভাবেই ডেলিভারি কর্মীদের বসন্তকাল।
এখানে বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য জানিয়ে রাখছি চীনের বছরকে চব্বিশটি সৌর পর্বে ভাগ করা হয়। বলা হয় পনেরো দিন পর পর মৌসুম ও আবহাওয়া বদলে যায়। চীনের ঋতু হলো চারটি। বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ ও শীত।
শীত গ্রীষ্মের কঠোর প্রকৃতি আর সব বিরূপ আবহাওয়াকে জয় করে পরম যত্নে গ্রাহকের দোরে যে পরিশ্রমী মানুষটি খাবার পৌঁছে দেন তিনি ফুড ডেলিভারি ম্যান। এমন শ্রমজীবী মানুষদের কণ্ঠস্বরকে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছেন কবি ওয়াং চিবিং। তিনি এবং অন্যান্য প্রলেতারিয়েত লেখকরা তাদের লেখায় তুলে ধরছেন নিজেদের জীবনের কথা, তাদের সুখ দুঃখের বাস্তব অনুভূতি। ওয়াং চিবিংয়ের লু সুন পুরস্কার জয় এমন সব মানুষের কথা কবিতায় ও গল্পে ফুটিয়ে তুলছে যারা হয়তো আকাশের উঁচুতে ডানা মেলতে পারেন না। তবে তারাও ওড়েন। ওড়েন মাটির কাছাকাছি। তাদের লেখায় তাই থাকে মাটির সৌরভ, জনজীবনের ঘ্রাণ।