২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মেফ্লাই, লেমিং ও মানুষ: নিছক অস্তিত্ব, নাকি জীবনের অর্থ?

পোকা-মাকড়ের অন্ধ দৌড়কে ‘জান্তব’বলে ভাবি, কিন্তু আমরা নিজেরা কি মেফ্লাই আর লেমিংদের থেকে খুব আলাদা?  

মুত্তাকি বিন কামাল মুত্তাকি বিন কামাল

Published : 21 Sep 2026, 01:44 PM

Updated : 21 Sep 2026, 01:44 PM

মেফ্লাই বলে এক বর্গের পোকা আছে। এফেমেরোপ্টেরা বর্গের পোকার প্রজাতিগুলোকে গণহারে মেফ্লাই বলে ডাকা হয়। পোকাটির কিছু প্রজাতি, যেমন ব্যটিস হ্যারিসেরি ও ডোলানিয়া আমেরিকানার প্রাপ্তবয়স্ক জীবন দুই দিন থেকে এক ঘণ্টারও কম। তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এতই ছোট যে তাদের খাদ্যগ্রহণের জন্য মুখ পর্যন্ত নেই। ছোট্ট এই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের শক্তি সে জোগাড় করে তার অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ নিম্ফ পর্যায় থেকে, জলজ জীব হিসেবে। তাহলে তার এই ক্ষুদ্র জীবনের উদ্দেশ্য কী? কেবলই প্রজনন। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এই পোকাটি কাটায় প্রজননের দৌড়ে। স্ত্রী ডোলানিয়া প্রজননক্ষম থাকে মাত্র পাঁচ মিনিট। তাই এই রুদ্ধশ্বাস ছুট, খাবারের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করে ছুট। 

পোকাটি জীবনের নিম্ফ (শিশু), সাব-ইমাগো (কিশোর) ও ইমাগো (প্রাপ্তবয়স্ক) ধাপগুলো পার করছে কেবল একটি লক্ষ্যে, প্রজনন। পোকাটি তার জীবনের প্রতিটি ধাপে বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন অংশকে খাবার, শক্তি এবং তথ্য জোগান দিচ্ছে। মিলনের প্রতিযোগিতা করে ওরা উড়তে উড়তে, তখন তাদের ঝাঁক তৈরি করে বিচিত্র সব প্যাটার্ন। কিন্তু এসব ওরা করে নিজের অজান্তে। তাদের আচরণ বলে, তারা তীব্র আদিম তাড়নায় জৈবযন্ত্রের মতো কেবল চলছে। (আমরা তাদের বাস্তবতার খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ দেখি; যেহেতু আমরা মেফ্লাই নই, তাই আচরণ থেকেই এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া।)

লেমিং বলে ক্রিডিসিটি পরিবারের রোডেন্ট বা ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের একটি দল আছে। বেশ কিছু প্রজাতির ইঁদুর ও চিকা ধরনের প্রাণীদের মধ্যে নরওয়েজীয় লেমিং, সাইবেরিয়ান বাদামি লেমিং ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এদের প্রজননক্ষমতা অকল্পনীয়। একটি স্ত্রী লেমিং জন্মের দুই সপ্তাহের মধ্যে গর্ভধারণ করতে পারে। একেকবারে চার থেকে ১৬টি বাচ্চা দেয়। জন্ম দেওয়ার ২১ দিনের মধ্যে আবার গর্ভধারণ করতে পারে। অর্থাৎ, আমরা যদি একটি ছেলে ও একটি মেয়ে লেমিং নিয়ে শুরু করি, আর প্রতি ২১ দিনে যদি মা লেমিংরা গড়ে চারটি করে বাচ্চা (দুইটি ছেলে ও দুইটি মেয়ে) প্রসব করে, তবে এক বছরে লেমিংদের সংখ্যা হয় ৫১ কোটি ১৬ লাখ! 

এই বিপুল সংখ্যার কারণে প্রচণ্ড খাদ্যসংকট তৈরি হয়। ওরা খাবারের জন্য ছোটাছুটি করতে গিয়ে কাতারে কাতারে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানুষ একসময় মনে করত লেমিংরা দলবেঁধে আত্মহত্যা করে। কিন্তু না; ওরা বাঁচার তাড়নায় অন্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনিশ্চয়তায়। গাণিতিকভাবে ওদের বিলুপ্ত হওয়ার ভয় নেই, শিকারি প্রাণীদের প্রচুর খাবার জোগান দেয় ওরা। কিন্তু ওই বিপুল সংখ্যার কারণেই নিজেদের ওপর অজান্তেই তৈরি করে ভয়াবহ বাস্তুচাপ। তারপর গণহারে মারা পড়ে এবং সংখ্যায় ওলটপালট হয়।

মানুষ একটি চিন্তাশীল প্রাণী। তাদের কাছে মেফ্লাই বা লেমিংয়ের আচরণকে ‘জান্তব’ মনে হয়। মানুষের মনে প্রশ্ন আসে, মেফ্লাইয়ের জীবনের অর্থ কী? মানুষের যুক্তি প্রশ্ন তোলে, কেন এই নিরন্তর প্রজনন? কিসে এর পরিণতি? প্রাণ কি তাহলে বিবর্তনের যন্ত্রবিশেষ? লেমিংরা কেন বাস্তুচাপের হাতে বন্দী? আমরা পরিকল্পনা করি, বাসস্থান বদলাই, প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনি, যেন আমাদের অবস্থা লেমিংদের মতো না হয়। মানুষের অহংবোধ আমাদের জীবনের অর্থ খোঁজার তাড়না দেয়।

প্রশ্নটি তাই মানুষের বেলায়ও করা যায়, মানুষের জীবনের অর্থ কী? আধুনিক সময়ে আমরা জীবনকে স্রেফ জৈব প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি। বস্তুবাদ জীবনকে দেখে বিবর্তনের দৃষ্টিতে (বিবর্তনবাদ প্রাণের জৈব প্রক্রিয়া ও রূপ বোঝাতে সহায়ক হলেও তা জীবনের পূর্ণাঙ্গ অর্থ বোঝাতে অক্ষম)। আর তাতে আমরা হয়ে যাই প্রায় ‘মেফ্লাই মানুষ’। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই হয়ে দাঁড়ায় আমাদের জীবনের একমাত্র অর্থ; অন্তত শহুরে গণমানুষের জন্য, যারা বর্তমান সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ওই অস্তিত্ব রক্ষার অন্ধ দৌড়ে আজ আমরা আটশ কোটি। তার মানেই কি আমাদের অস্তিত্ব নিরাপদ? লেমিংদের কথা ভাবুন, সংখ্যাই নিরাপত্তা নয়; বরং কখনো কখনো সংকটও। পৃথিবীতে সাড়ে ৩৩ থেকে ৩৫ কোটি পোল্ট্রি মুরগি আছে, তার মানে কি তাদের জীবন অর্থবহ?

এই মেফ্লাই-লেমিং আচরণের প্রকটতম উদাহরণ পাওয়া যায় মানুষের ক্ষমতা ও বিলাসের চূড়াগুলোতেও। যেমন, হলিউড অভিনেত্রী সিডনি সুইনিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক। বারবার খোলামেলা দৃশ্যে অভিনয় করে এই অভিনেত্রী প্রায়ই সমালোচিত হন। মানুষ লেমিং-সদৃশ ‘সবাই চলছে তাই চলছি’ নীতিতে তার দিকে আঙুল তোলে, খুব সহজে তাকে কুৎসিত তকমা দিয়ে ফেলে। কিন্তু ২০২২ সালে ‘এল’ এবং ‘কসমোপলিটান’কে দেওয়া আলাদা দুটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাইস্কুল থেকেই স্রেফ স্তনের আকারের জন্য তাকে সবাই এই নজরে দেখতে শুরু করে! মনে রাখবেন, হাইস্কুল মানে মাত্র ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে! অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকা অবস্থাতেই তাকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়! আমরা এমনই ‘মেফ্লাই’ যে আমাদের শিশুদের শক্তি সঞ্চয়ের সময়টুকুও দিই না! এরই ধারাবাহিকতায় ‘ইউফোরিয়া’ নামক একটি টিভি শোতে তার একটি নগ্ন দৃশ্য প্রকাশ করা হয় এবং এর পর থেকে মূলত তার কাছে নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করার প্রস্তাবই আসতে থাকে। তিনি চেষ্টা করেছেন অন্যরকম চরিত্রে অভিনয়ের, কিন্তু তাকে ‘সবচেয়ে লাভজনক উপায়ে’ ব্যবহার করা হয়েছে। এটাই লেমিং-সদৃশ আচরণ। সবাই মিলে একই কাজ বারবার করা, আমরা যে নিয়তির (বাস্তুচাপ অর্থে) শিকার, সেটাও বুঝতে না পারা। 

এভাবেই মেফ্লাই-লেমিং আবর্ত কাজ করে। জৈব-যান্ত্রিক তাড়না থেকে উৎসারিত আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো ওইসব বিষয়েই আমাদের আগ্রহী করে তোলে, যেগুলো আদিম তাড়নায় অনুরণন তোলে, চিন্তায় নয়। তারপর আমরা চিন্তাহীনভাবে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করতে থাকি। এই আচরণ এখন সর্বত্র প্রস্ফুটিত। আমাদের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের উৎপত্তিই হয়েছিল মানবজীবনের অর্থ খোঁজার জন্য, তারাও আজ এই চিন্তাহীন আবর্তে পাক খাচ্ছে।

অথচ মেফ্লাই বা লেমিংদের আমরা মানুষেরাই ছোট চোখে দেখেছি তাদের আচরণের কারণে। তারা কিন্তু অন্ধভাবে আত্মহত্যাও করে না, এমনকি তারা সাঁতরাতেও পারে! তাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন চমকপ্রদ ও জটিল! তাদের জীবনে মমতা আছে, পরিকল্পনা আছে, তথ্যের আদান-প্রদান আছে। মানুষ কেবল নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেমিংদের আচরণকে বিচার করেছে এবং তাদেরকে ‘নিম্নশ্রেণির’ জীব আখ্যায়িত করেছে, কারণ লেমিংরা প্রকৃতির কাছে অসহায়।

এই বাস্তুচাপ ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে গিয়ে বর্তমানে পৃথিবীর সমুদ্রের তলদেশ পুরোটাই ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, চারশর বেশি স্তন্যপায়ী প্রাণী স্রেফ গত ১০০ বছরে বিলুপ্ত হয়েছে। আমাদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে আমাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে বৈশ্বিক পানির সংকট খুব শিগগিরই আসন্ন; কিছুদিন পর অল্প কিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণে পানি থাকবে, বাকিরা তাদের প্রতি বাধ্য থাকবে।

তাই এখনই সময় একটু থামার। প্রশ্ন করার, আমরা যদি অমরও হয়ে যাই, তার পর কী? আমাদের জীবনের অর্থ কী? প্রাক-ইসলামিক আরব কবি রাবি ইবন দা’ব আল ফাযারী তার দুইশ বছরের জীবন (মৌখিক ইতিহাসে বর্ণিত) নিয়ে কেবল আক্ষেপের কবিতাই লিখে গেছেন, একাকীত্ব ও জরায় জর্জরিত হয়ে:

“দুশো বছরের বুড়োর কি আর থাকে?

যৌবনের সেই জোর,

অথবা জীবনের ঘোর?”  

আমরা কি ব্যক্তিগতভাবে ওই পরিণতি চাই? প্রজাতি হিসেবে আমরা কী চাই? একদিন ধরুন আমরা সব জেনে গেলাম, তারপর? এই যে নিরন্তর সম্পদ আহরণ, এর পরিণতিটাই বা কী? মুক্তি খুঁজতে গিয়ে বন্দী হয়ে যাওয়ার এই আবর্তকে অতিক্রমের উপায় কী? কতটা বস্তু বা কতটা বিশ্বাস আসলে প্রয়োজন? মেফ্লাইয়ের সাথে আমাদের জীবনের গুণগত পার্থক্য কী? এই লেখাটি কেবল উত্তর খোঁজার জন্য এসব প্রশ্ন তুলছে, কোনো ধরনের মতবাদ প্রচারের জন্য নয়।

মুত্তাকি বিন কামাল: যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, সান আন্তোনিও-তে নৃতত্ত্বে পিএইচডি গবেষণা করছেন। ই-মেইল: muttakika@gmail.com