২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ছাত্র সংসদ নাকি সমান্তরাল প্রশাসন: ডাকসুর পেছনে আস্কারা কাদের?

ক্যাম্পাসে অনানুষ্ঠানিক মব, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস আর সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর দুঃসাহস কোথায় পেল ডাকসু?

ছাত্র সংসদ নাকি সমান্তরাল প্রশাসন: ডাকসুর পেছনে আস্কারা কাদের?

ছাত্র সংসদের মূল কাজ ছেড়ে প্রশাসনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছে ডাকসুর বিরুদ্ধে।

জোবাইদা নাসরীন জোবাইদা নাসরীন

Published : 21 Sep 2026, 01:28 AM

Updated : 21 Sep 2026, 01:28 AM

ডাকসু সংগ্রহশালায় ছবির রাজনীতি নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম হয়ে প্রতিদিনকার আলাপেও হয়তো স্থান পেয়েছে। অবশ্য কোনো বিতর্কই আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন থিতু হওয়ার সুযোগ পায় না। চারপাশের নিত্যনতুন অসঙ্গতি, নতুন ঘটনাপ্রবাহ আর প্রতিদিনকার নতুন নতুন ক্ষোভ-বিক্ষোভের তলে আড়াল হয়ে যায় আগের সব ঘটনা।

তবু ডাকসু নিয়ে আলোচনা কেন গুরুত্বপূর্ণ? ডাকসু কী করছে? ছাত্র সংসদ হিসেবে ডাকসু কাজ কী? সাম্প্রতিক তিনটি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে ঘিরে যে শোরগোল চলছে,আলোচনা কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই,আসলে আলোচনা হওয়া উচিত গত এক বছরজুড়ে ডাকসুর সার্বিক ভূমিকার ওপর। একটি ছাত্র সংসদ কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠলে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই স্পষ্ট করে বলতে হয়—ডাকসু সমান্তরাল কোনো প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করছে, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ার তাদের নেই।

আমরা সবাই মোটামুটি কম-বেশি জেনেছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ছাত্রশিবিরের আদি সংগঠন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিল। অবশেষে আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের একজন শিক্ষার্থী নিজ হাতে জিন্নাহর ছবি ভেঙে ফেললে এবং এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠলে কর্তৃপক্ষের যেন ‘সম্মান বাঁচানোর’কথা মনে পড়ে। লোকদেখানো জোরালো বক্তব্য আর তদন্ত কমিটি করে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা দেখা গেল আবার।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের জন্ম দিয়েছে—পৃথিবীতে বাংলাদেশই সেই দেশ এবং সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর সংগ্রহশালায় কী থাকবে আর কী থাকবে না, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ইতিহাসের অংশ। সেখানে চাইলেই নিজের মতো করে ইতিহাস তৈরি করা যায় না।

ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাসের বিনির্মাণের চেষ্টার মধ্যেই কি শুধু ডাকসু তার ক্ষমতা দেখাচ্ছে? এটি কি আলাদা কোনো ঘটনা? সবগুলোর উত্তরই হবে, ‘না’। এই ঘটনার কাছাকাছি সময়েই আরও দুটো বিষয়ের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসুর ওপর আপাতভাবে নাখোশ হয়েছিল। তার মধ্যে একটি হলো, ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দাবি অনেকদিন থেকেই ছিল এবং সেটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই কাজ শুরু করেছিল এবং এটি একেবারেই একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। ডাকসু এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনেক শিক্ষকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেছে, যা কোনোভাবেই করতে পারে না বলে স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে এবং এগুলোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। এর কিছুদিন আগে ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নেওয়ার তোয়াক্কা না করেই ‘অদম্য জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেসময় প্রতিক্রিয়া না দেখালেও স্বীকার করেছে যে, ডাকসু তাদের অনুমতি না নিয়ে এসব করছে।

এতক্ষণ যা বললাম, সবই আমরা জানি, পড়েছি, দেখেছি। কিন্তু এখন প্রশ্নকেন্দ্রিক আলাপের জায়গা হলো, ডাকসু কি এখন হঠাৎ করে প্রশাসনের সমান্তরাল আরেকটি প্রশাসন তৈরি করেছে? এর পেছনে আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কতটুকু দায় আছে? কীভাবে ডাকসুর সদস্যরা প্রথম থেকেই তাদের দলীয় কর্মসূচি এবং দলীয় মতাদর্শই বাস্তবায়নের জন্য ডাকসুকে কাজে লাগাচ্ছে? কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে আসলে ডাকসুর আড়ালে শিবিরের দলীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির মহড়ায় তা দেওয়া হয়েছে, সেটিই এই লেখার মূল জায়গা।

প্রথম থেকেই বেশ কয়েকজন ডাকসুর সদস্য যখন শিক্ষকদের মব করছিল, শিক্ষকদের ওপর হামলা করেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেসময়ের কর্তৃপক্ষ কি তাদের কোনো ধরনের বিচারের আওতায় এনেছিল? একের পর এক টিএসসির চা-বিক্রেতাদের ওপর নিপীড়ন করেছিল, তখনও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের থামায়নি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল? না, নেয়নি। বরং উল্টো তাদের পক্ষেই ছিল এবং তাদের এই সকল কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। যে কারণে তারা আরও আস্কারা পেয়েছে, বেপরোয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময় তাদের দেওয়া, কখনও স্বাক্ষরসহ, কখনও স্বাক্ষরবিহীন, বিভিন্ন অভিযোগকে আমলে নিয়ে শিক্ষকদের হেনস্তার পথকে প্রশস্ত করেছেন সেই প্রশাসনের কর্তারাই এবং তারই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে এই প্রশাসন কয়েকজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছে। ডাকসুর উদ্যোগে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়াতে ‘ফিমেল জোন’ হলো, তখনও কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেটি নিয়ে আপত্তি তুলেছে? বলেছে কি যে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার বিপরীতে? না, তারা বলেনি। কারণ তারা ডাকসুকে ক্ষ্যাপাতে চাননি। তোফাজ্জল হত্যা মামলার আসামিরা শুধু ক্যাম্পাসে থাকছে না, তারা এখনও ক্ষমতাধারী, নিত্যদিন নানা ধরনের বায়না নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে দর কষাকষি করছে—কিন্তু প্রশাসন কেন তাদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিচ্ছে না? কারণ তোফাজ্জল দরিদ্র ছেলে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ না, এজন্য তার বিষয়ে কারও মাথাব্যথা নেই? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলল, কিন্তু তার সব খুনি গ্রেপ্তার হলো না কেন?

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বিগত দুই বছর ধরে যারা ক্যাম্পাসে দিনদুপুরে মব সৃষ্টি আর শিক্ষকদের হেনস্তার মহড়া চালাল, তাদের পেছনে কি প্রশাসনের সায় ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল, আর ছিল বলেই তারা একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। বিএনপি সরকারে থাকলেও ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের উপস্থিতি তেমন জোরালো হতে পারেনি; ফলে ডাকসুকে ঢাল বানিয়ে ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে শিবির। শিবিরের এই রাজনৈতিক আগ্রহে মদদ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের কর্তৃপক্ষ। সত্যি বলতে, আজ ডাকসুর যে বেপরোয়া রূপ আমরা দেখছি, তা গড়ে তোলার পেছনে অনেকটাই প্রশাসনিক অবদান রয়েছে।

ডাকসু নেতারা প্রায়শই বুক ফুলিয়ে দাবি করেন যে ডাকসু প্রশাসনের অংশ; যে কারণে তারা যেকোনো কাজ করতে পারেন।যে কারণে তারা যেকোনো কাজ করতে পারেন। কিন্তু এটি একেবারেই ঠিক নয়। তাদের কাজ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে দেন-দরবার করা, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা এবং প্রশাসনের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় করা। অথচ সেই মূল দায়িত্ব ভুলে ডাকসু আজ কী করছে? মূলত জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের বিশ্বস্ত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে আজকের ডাকসু।

যার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু সংগ্রহশালায় তাদের চোখ। কারণ সেখান থেকে ইতিহাস ‘ওলোট-পালট’ করা গেলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধ মুছে ফেলা যায়। কিন্তু শুধু ছবি পাল্টালেই কি সব মুছে যায়? যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে এদেশের ১৯৪৮-এর পরবর্তী আন্দোলনগুলো—বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ২৫ মার্চের কালো রাত্রির গণহত্যা থেকে দেশ স্বাধীনের মাস ডিসেম্বর পর্যন্ত নানা নিপীড়ন ও হত্যার স্মৃতি। এদেশের ইতিহাস সকলেরই জানা—এদেশে তখন জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রসংঘ, আলবদর, আলশামস, রাজাকারদের ভূমিকা কী ছিল। বিশেষ করে কারা এই হত্যাযজ্ঞে সহায়তা করেছিল, সে ইতিহাস দগদগে। এটি কি ছবি সরিয়ে বদলানো যাবে?

শেষ বিচারে এ সত্য মানতেই হবে—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আস্কারা না পেলে ডাকসুর পক্ষে এতস্পর্ধা দেখানোর কোনো সুযোগ ছিল না। তাই কেবল ডাকসুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে চলবে না; ডাকসুর এমন বেপরোয়া আচরণের দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে।

জোবাইদা নাসরীন: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com