২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করার কৌশল

সব বিষয়ে ঝগড়ার প্রয়োজন নেই। কিছু বিষয় এড়াতেও জানতে হয়।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 21 Sep 2026, 07:48 PM

Updated : 21 Sep 2026, 07:48 PM

সবসময় ঝগড়া বাধানোর কারণবন্ধুত্ব মানেই সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। তবে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে মতের অমিল, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি বা কোনও আচরণ নিয়ে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক।

এমন ধারণাও রয়েছে যে, বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া বা তর্ক হলেই সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে। ফলে সমস্যা নিয়ে কথা না বলে চুপ করে থাকা, বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া বা মনে মনে কষ্ট জমিয়ে রাখাই সহজ মনে হয়।

অথচ এভাবেই ছোট একটি ঘটনা ধীরে ধীরে বড় অভিমান তৈরি করতে পারে।

বিরোধ বা মতবিরোধ নিয়ে কাজ করা মার্কিন বিশেষজ্ঞ প্রিয়া পার্কার মনে করেন, “দ্বন্দ্ব মানেই দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়। সঠিকভাবে সামলাতে পারলে মতবিরোধ বরং মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে পারে।”

রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেন, “নিজের অস্বস্তি বা কষ্টের কথা না বললে অনেক সময় বন্ধুত্বের মধ্যে এমন ক্ষোভ জমে যায়, যা পরে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণ হতে পারে।”

তাই বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে সব সময় চুপ থাকা নয়, বরং কখন কথা বলতে হবে এবং কীভাবে বলতে হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ঝগড়া করারও আছে সঠিক উপায়।

সব বিষয়ে তর্কে জড়ানোর দরকার নেই

বন্ধুর সঙ্গে কোনও বিষয়ে মনোমালিন্য হলেই সঙ্গে সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে নিজেকেই কয়েকটি প্রশ্ন করা দরকার। এই বন্ধুত্ব কি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? বিষয়টি কি সত্যিই আমাকে কষ্ট দিয়েছে? নাকি এই সময়ের রাগ থেকেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাইছি?

সমস্যাটি নিয়ে কথা বললে কি সম্পর্কটি আরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

‘দ্য আর্ট অফ ফাইটিং’ বইয়ের এই লেখক বলেন, “প্রতিটি বিরোধে জড়িয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। কিছু বিষয় সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ছোট হয়ে যায়। আবার কিছু বিষয় বারবার মনে কষ্ট তৈরি করে এবং বন্ধুত্বের ওপর প্রভাব ফেলে।

তাই কোন বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার আর কোনটি ছেড়ে দেওয়া যায়- এই পার্থক্য বুঝতে পারাও বন্ধুত্বের পরিপক্বতার অংশ।”

ছোট অভিমান জমিয়ে বড় সমস্যা না করা

হয়দ সব সময় বন্ধুকে ফোন করছেন, দেখা করার পরিকল্পনা করেন বা কোথাও যাওয়ার কথা বলেন। তবে বন্ধু নিজে থেকে খুব কমই যোগাযোগ করে।

প্রথম দিকে বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। তবে কয়েকবার এমন হওয়ার পর মনে হতে পারে, বন্ধুত হয়তো আর সম্পর্কটিকে গুরুত্ব দেয় না।

প্রিয়া বলেন, “এখানেই সমস্যা তৈরি হয়। একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ধীরে ধীরে মনে একটি গল্প তৈরি করে। তখন ভাবতে শুরু করি, ‘সে আমাকে আর আগের মতো পছন্দ করে না’, ‘আমার সঙ্গে দেখা করতে তার ইচ্ছা করে না’ বা ‘আমি হয়ত তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নই।’ অথচ বন্ধুটি হয়ত অন্য কোনো কারণে ব্যস্ত ছিল।”

“ঘটনা যখন মনের মধ্যে নিজের মতো করে একটি গল্পে পরিণত হয়, তখন সেটি ঠিক করা আরও কঠিন হয়ে যায়। তাই ছোট বিষয় বড় হওয়ার আগেই সহজভাবে বলা ভালো। এ বিষয়ে ঝগড়া হলেও, আছে নির্দিষ্ট ধরন”, বলেন তিনি।

তাই সরাসরি অভিযোগ না করে বলা যায়, ‘তুমি যদি কখনও নিজে থেকে আমাকে কোথাও ডাকতে, আমার ভালো লাগত।’ এই একটি বাক্য অনেক সময় অভিযোগের বদলে নিজের অনুভূতিটিকে সামনে আনে।

এতে অপর পক্ষও নিজের কথা বলার সুযোগ পায়।

সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলে কথা বলা

কোনও বিষয় যদি বারবার মনে আসে এবং বন্ধুত্বের প্রতি মনোভাব বদলে দিতে শুরু করে, তখন সেটি নিয়ে কথা বলা দরকার। তবে আলোচনার শুরুতেই অভিযোগের ভাষা ব্যবহার না করাই ভালো। ঝগড়া হলেই চিৎকার করে কথা বলতে হবে এমনটিও নয়।

বন্ধুকে বলা যেতে পারে, ‘একটা বিষয় কিছুদিন ধরে আমাকে ভাবাচ্ছে। আমাদের বন্ধুত্বটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই তোমার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই।’

এ ধরনের কথা অপর পক্ষকে বুঝতে সাহায্য করে যে, উদ্দেশ্য ঝগড়া করা নয়। বরং সম্পর্কটি ভালো রাখার জন্যই সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

এমন অনেকে ভাবেন যে, সত্যিকারের বন্ধু হলে তাকে কিছু বলতে হবে না; সে নিজেই বুঝে যাবে। তবে বাস্তবে একে অপরের মনের কথা সব সময় বুঝতে পারা যায় না।

তাই প্রত্যাশা তৈরি করে চুপ করে থাকার বদলে নিজের অনুভূতিটি পরিষ্কারভাবে জানানো অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

রাগের সময় কথা না বলাই ভালো

মতবিরোধ শুধু মানসিক বিষয় নয়, এর সঙ্গে শরীরেরও সম্পর্ক আছে। কেউ রেগে গেলে শরীর কাঁপতে পারে, হাত-পা অস্থির হতে পারে, শরীর গরম লাগতে পারে বা কথা বলার সময় স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে পারে।

প্রিয়া পার্কার পরামর্শ দেন, “কোনও কঠিন আলোচনা করার আগে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া এবং শরীরকে কিছুটা শিথিল করা উচিত। শরীর শান্ত থাকলে কথোপকথনের সময় নিজের বক্তব্য পরিষ্কার রাখা সহজ হয়।”

তাই বন্ধুর সঙ্গে খুব রাগের মুহূর্তে ফোন করে বা বার্তা পাঠিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুরু না করাই ভালো। কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করা যেতে পারে।

এরপর যখন দুজনেই স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবে, তখন বিষয়টি নিয়ে কথা বলা অনেক বেশি কার্যকর হবে।

‘তুমি সব সময়’ ধরনের কথা এড়িয়ে চলা

মতবিরোধ বা ঝগড়ার সময় ভুলগুলোর একটি হল, ব্যক্তিকে আক্রমণ করা। ‘তুমি সব সময় এমন কর’, ‘তুমি কখনও আমাকে বোঝো না’, ‘তোমার কোনো দায়িত্ববোধ নেই’- এ ধরনের কথা সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন আঘাত তৈরি করে।

এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে কথা বলা ভালো। ‘সেদিন আমি যখন তোমাকে ফোন করেছিলাম এবং তুমি পরে আর যোগাযোগ করোনি, তখন আমার খারাপ লেগেছিল।’

এখানে বন্ধুকে খারাপ মানুষ বলা হচ্ছে না। শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কারণে নিজের অনুভূতিটি জানানো হচ্ছে। ফলে অপর পক্ষও আত্মপক্ষ সমর্থনে না গিয়ে নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায়।

বন্ধুর কথাটিও শুনতে হবে

ঝগড়ার সময় অনেকেই শুধু নিজের কথাটাই বলতে চান। তবে একটি সুস্থ আলোচনা তখনই সম্ভব, যখন দুজনেরই কথা বলার সুযোগ থাকে।

প্রিয়া পার্কারের মতে, “বন্ধু যদি কোনও অভিযোগ বা কষ্টের কথা জানায়, সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ হিসেবে না দেখে বন্ধুত্বের প্রতি তার আগ্রহ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বন্ধু যখন সম্পর্কের একটি সমস্যা সামনে আনেন, তখন সেটিকে এমনভাবে দেখা যেতে পারে যে, তিনি সম্পর্কটিতে মনোযোগ দিতে চাইছেন।”

অর্থাৎ কেউ যদি বলে, ‘তুমি আমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলো না’, তখন সঙ্গে সঙ্গে ‘তুমিও তো আমাকে ফোন কর না’- এই বলে পাল্টা অভিযোগ না করে, প্রথমে তার কথাটি শোনা যেতে পারে। পরে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও বলা যাবে।

সামনাসামনি কথা বলা অনেক সময় ভালো

বন্ধুত্বের বড় একটি অংশ বার্তা, ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে মুখোমুখি কথা বলার সুযোগও কমে গেছে। তবে সংবেদনশীল কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে লিখিত বার্তায় ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা বেশি।

একটি বাক্য লিখে পাঠালে সঙ্গে কণ্ঠস্বর, মুখের অভিব্যক্তি বা পরিস্থিতির কোনও ইঙ্গিত থাকে না। ফলে সাধারণ কথাও কঠিন বা রাগী মনে হতে পারে। আর সেটা বড় ঝগড়ার দিকে চলে যেতে পারে।

তাই সম্ভব হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরাসরি দেখা করে বা অন্তত ফোনে কথা বলে মিটিয়ে নেওয়া ভালো।

পুরানো হিসাব টেনে না আনা

একটি সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বহু বছরের পুরানো ঘটনা সামনে আনা বন্ধুত্বের আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ সময়ের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ‘তুমি পাঁচ বছর আগেও এমন করেছিলে’ বলা হলে সমস্যার সমাধান কঠিন হয়ে যায়।

পার্কার তাই পরামর্শ দেন, “যে বিষয় নিয়ে কষ্ট পাওয়া হয়েছে, সেটি নিয়েই কথা বলা ভালো। পুরানো কোনও ঘটনা যদি এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে সেটি আলাদা সময়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

একসঙ্গে সব অভিযোগ সামনে আনলে দুজনের কেউই হয়ত বুঝতে পারবেন না, আসল সমস্যাটি কোথায়। এমন অবস্থায় ঝগড়া খুবই নেতিবাচক হয়ে উঠবে।”

ক্ষমা মানে সবকিছু ভুলে যাওয়া নয়

মতবিরোধ বা ঝগড়ার পর বন্ধুত্ব স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ক্ষমা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, নিজের কষ্ট অস্বীকার করতে হবে।

আবার বন্ধুর একটি ভুলের কারণে পুরো সম্পর্ককে অমূল্যহীন ভাবারও প্রয়োজন নেই।

কেউ ভুল করলে সে ভুল স্বীকার করছে কি-না, নিজের আচরণের ব্যাখ্যা দিচ্ছে কি-না এবং ভবিষ্যতে একই সমস্যা এড়ানোর চেষ্টা করছে কি-না, এসব বিষয়ও বিবেচনা করা যায়।

“বন্ধুত্বের সৌন্দর্য হল, দুজন মানুষ একে অপরের থেকে আলাদা হয়েও সম্পর্কটি ধরে রাখতে পারে। সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়, বরং মতের অমিলের মধ্যেও সম্মান বজায় রাখাই দীর্ঘ বন্ধুত্বের ভিত্তি”, বলেন প্রিয়া পার্কার।

তর্কের উদ্দেশ্য জেতা নয়, বোঝাপড়া তৈরি করা

বন্ধুর সঙ্গে মতবিরোধ বা ঝগড়া হলে কে জিতল আর কে হারল এভাবে দেখলে সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে। কারণ বন্ধুত্ব কোনো প্রতিযোগিতা নয়।

একটি আলোচনার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজের অনুভূতি বোঝানো এবং অন্যের অনুভূতিটিও বোঝার চেষ্টা করা।

প্রিয়ার ভাষায়, “কখনও হয়ত নিজের কথাই ঠিক, আবার কোনও ঘটনায় বন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গিটিও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। আবার দুজনের কেউই পুরোপুরি ভুল বা পুরোপুরি ঠিক নাও হতে পারেন।”

তাই বন্ধুত্বে সব মতবিরোধ বা ঝগড়া এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হল কখন কথা বলতে হবে, কখন থামতে হবে এবং কীভাবে নিজের কষ্টের কথা বলা যায় সেটি শেখাই যথার্থ।

পুরানো খবর:

সবসময় ঝগড়া বাধানোর কারণ

পুরানো খবর:

ঝগড়ার মাঝে যে কথা বলা মানা

পুরানো খবর:

ঝগড়ার পর যা করা যাবে না

পুরানো খবর:

সহকর্মীর সঙ্গে ঝগড়া মেটানোর উপায়

পুরানো খবর:

বিষাক্ত সম্পর্কের লক্ষণ