Published : 14 Apr 2026, 11:11 AM
এই তো প্রথম দিন, পোড়া বৈশাখের।
এখনো পোড়েনি মাটি, ফাটল ধরেনি;
ধুলোয় ঢাকেনি গাছ, নুয়েও পড়েনি;
আসেনি সময়, জেনো, এখনো ঝড়ের।
বিশ-বাইশ বছর আগে কবি মনজুরে মওলা লিখেছিলেন এই কবিতা। গত দুদশকে বাংলাদেশের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রকৃতিতে ও সংস্কৃতিতে। বৈশাখ আসার আগেই এখন ঝড় আসে। এর মধ্যেই বেশ কয়েক দফা ভারী বৃষ্টিপাতসহ কালবৈশাখী ঝড় হয়ে গেল। বাংলাদেশের ঋতুচক্রে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। গত কয়েক বছর ধরেই আগাম বর্ষায় ভেসে যায় হাওর-অঞ্চল। গ্রীষ্মকালের অনেকটাই এখন বর্ষাকালে ঢুকে গেছে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে এখন বোধহয় আর ছয়টা ঋতু ঠিকঠাক নেই। কোথায় সেই শরৎকাল? কোথায় হেমন্ত? বর্ষাকাল শেষ হতে হতে হতেই দেখি হড়মুড় করে এসে পড়ছে শীত। শীতটাও জাঁকিয়ে বসার আগে ডাকতে শুরু করে দুষ্ট কোকিল। কিন্তু বসন্তই-বা কোথায়? গাছে গাছে ফুল ফোটা শুরু হতে হতেই তো কেমন ভ্যাপসা গরম পড়ে যায়। এক ঋতু আরেক ঋতুর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বোধহয় বাংলাদেশে এখন তিনটা ঋতুই ঠিকঠাক টের পাওয়া যায়- গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত। শরৎ, হেমন্ত আর বসন্ত অনেকটাই উধাও। ধুকে ধুকে তাদের অস্তিত্ব কিছুটা টিকিয়ে রাখতে পারলেও স্থায়ীত্ব খুব কম।
প্রকৃতির মতোই আবহমান বাংলার সংস্কৃতিও এখন পাল গুটিয়ে আনছে। মধ্যপ্রাচ্যের ও আরো দূর পশ্চিমের সংস্কৃতি খলবল করে ঢুকে পড়ছে হাটে-মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, শহরে-বন্দরে, ঘরে-ঘরে, মনে-মস্তিষ্কে। একদল চাচ্ছে খুব জোরেশোরে আরবীয় মুসলমান হতে, আরেক দল খুব করে ওই জোরজবদস্তি করেই ইউরোপ-আমেরিকার মতো আধুনিক হতে। তার সাথে, এই ঘরের কাছে পশ্চিম বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন, আধিপত্য তো আছেই।
বাঙালি মুসলমানের এই সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন চারদিক থেকেই। সেই মধ্যযুগ থেকেই। যার কারণে মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি আবদুল হাকিম লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন, “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবানী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।” দিন যত এগিয়েছে এই সংকট তত বেড়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃটিশ রাজত্বে, উনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি হিন্দুদের পুনর্জাগরণ সময়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রথম বঙ্গভঙ্গ এই সংকট আরো বাড়িয়েছে, যদিও তখন বাঙালি মুসলমান প্রথম নিজের আত্মানুসন্ধানও শুরু করে। পরবর্তীতে, দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ এবং আস্ত ভারত ভাগের মধ্য দিয়েও কি বাঙালি মুসলমান নিজের অস্তিত্বের শেকড় খুঁজে পেয়েছে? তাহলে তো পাকিস্তান ভাঙত না। নিজের জন্য স্বতন্ত্র একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের বাঙালি মুসলমান প্রথমবারের মতো নিজের অস্তিত্বের স্বাধীন-সত্তা ঘোষণা করেছিল। তারা ঘোষণা করেছিল মুসলমান হয়েও তারা বাঙালি, বাঙালি হয়েও তারা মুসলমান। তারা ঘোষণা করেছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাণী। ষাট দশকে যে-বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তিতে তারা একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করে, দুর্ভাগ্যক্রমে, কালক্রমে তা হিন্দু-বাঙালি জাতীয়তাবাদের খপ্পরে গিয়ে পড়ে। এই অঞ্চলের মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতিকে সেই ধার-করা হিন্দু-বাঙালি জাতীয়তাবাদ অনেকটা অস্বীকারই করে। তাই এক সময় সেই নিপীড়িত, অবহেলিত মুসলমান বাঙালিগণ সেই জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করতে চায়। তারা নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। খুবই স্বাভাবিক। বিপুল-সংখ্যক এই জনগোষ্ঠী অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে পারে না। এর সঙ্গে শুধু শিল্প-সাহিত্য, তত্ত্ব-সত্য নয়, রুটিরুজিও জড়িত। গত চব্বিশের জুলাই-গণ-অভ্যুত্থানে আমরা শুধু ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বিদ্রোহ দেখিনি, দেখলাম প্রবলভাবে ভারত-বিরোধিতাও। এই ভারত-বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেকের আবার পাকিস্তান-প্রীতিও দেখলাম। ঢাকায় পালিত হলো জিন্নাহ’র জন্মবার্ষিকী। কাওয়ালী গানের আসর বসার ধুম পড়ে গেল। ঢাকায় পাকিস্তান দিবসও পালিত হলো মোটামুটি খোলামেলাভাবেই। আর এবার, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির পালন করছে ‘বৈশাখী-ই আকবর’। সেটা কীরকম আমরা ঠিক জানি না। মুঘল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা সন চালু করেছিলেন, ঠিক আছে; কিন্তু, আকবরও তো এই অঞ্চলের মানুষ না। এই অঞ্চলের বারো ভূঁইয়ারা তো মুঘল-সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে গেছেন। আকবরের দীন-ই ইলাহির বিরোধিতা করে অনেক আদর্শ-মুসলমান দেশ ত্যাগ করেছিলেন। তাহলে এখন ইসলামী ছাত্রশিবির কোন ‘বৈশাখী-ই আকবর’ পালন করছেন? তারা কি দীন-ই ইলাহির পথেও ফেরত যাবেন? যেতে পারবেন?
এর মধ্যে মওলানা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসূফ বলেছেন, কিসের পহেলা বৈশাখ? আমি কি হিন্দুর বাচ্চা? আমি পহেলা বৈশাখের মুখে লাথি মারি।
আরো অনেক মওলানাই পহেলা বৈশাখের মুখে লাথি মারতে চান। গত দু-তিন দশক ধরেই ওয়াহাবি-পন্থি মওলানারা বৈশাখ-বিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছেন। গ্রামে-গঞ্জের ওয়াজে-মাফিলে সেই প্রচারণা কতটা বীভৎস নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করা যাবে না। এতে অবশ্য পহেলা বৈশাখ থেমে নেই। সারা বাংলাদেশেই এখন দিবসটি অত্যন্ত আড়ম্বরতার সাথে পালিত হয়। হয়তো আগের মতো আর মেলা হয় না, নাটক-যাত্রাপালা হয় না, কিন্তু গানের আসর বসে অনেক জায়গাতেই। প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হয় গ্রামে গ্রামে। ঘরে ঘরে যতটা পারে মানুষ, আয় রোজগার বুঝে দিনটা উদযাপন করে। পান্তাভাত খায় সকালে। দুপুরে একটু মাংস-পোলাও, খিচুরি। সাধারণ মানুষ অতটা তত্ত্বকথা শুনতে চায় না। কোনো একটা উপলক্ষে তাদের একটু উদযাপন করতে পারলেই হলো। সম্প্রীতি ও সম্মিলনেই মানুষের আনন্দ। বিধি-নিষেধের বেড়া দিয়ে তাদের আটকানো যায় না।
সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়। কালে কালে তার সাথে অনেক কিছুর মিশেল হয়। তা নিয়ে হা-হুতাশ করারও কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা, যে-কোনো বিশেষ দিবস উপলক্ষে কিছু বাণিজ্যও হয়। সে ঈদ হোক, রোজা হোক, ভালোবাসা দিবস হোক, বাংলা নববর্ষ হোক আর ইংরেজি হ্যাপি নিউ ইয়ার হোক--সব দিবসের সাথেই এখন একটা বড় বাজারব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাজারই সব ঠিক রাখে। বাজারই সব নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারকেও আবার নিয়ন্ত্রণ করতে হয় জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে। তা না-হলে সভ্যতা হুমকির মধ্যে পড়ে যায়।
সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিশাল কালপরিধির ব্যাপার। দুতিন দশকের অস্থিরতা দিয়ে তা বোঝা যায় না। অন্তত একটা শতাব্দী গেলে বোঝা যায় একটা বিষয় একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে কতটা ধাতস্থ হয়েছে। গত অন্তত এক হাজার বছরের সাংস্কৃতিক আবহ দেখে তো এটা উপলব্ধি করা যায়- বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব একটা সাংস্কৃতিক বিকাশ হয়েছে। মুসলামানরাও এই অঞ্চলে আছে প্রায় এক হাজার বছর ধরেই। তা আছে তেমন কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়াই। বরং দেখা গেছে জোর করে যারা কিছু পরিবর্তন করতে চান তাদেরই শেষ পর্যন্ত আর অস্তিত্ব থাকে না। কারণ, সংস্কৃতির একটা স্বতঃস্ফুর্ততা আছে। সংস্কৃতি এমন এক স্রোতস্বিনী নদী, তার জলধারায় নেমে অবগাহন সম্ভব, তার দিক-পরিবর্তন করতে গেলে সে হয়ে উঠবে কীর্তিনাশা!
তাই সংস্কৃতির নদীতে নেমে সাঁতার কাটুন। স্রোতের টান উপভোগ করুন। স্রোতের গতিমুখ পরিবর্তন করতে গিয়ে নিজের ভাগ্যের বিপর্যয় ডেকে আনবেন না। শুভ নববর্ষ।