Published : 31 Jul 2025, 07:43 PM
আমার এক মামা ছিলেন
বড্ড সহজ-সরল আর হাসিখুশি
কখনো কখনো হুটহাট রেগে যেতেন!
মাঝেমধ্যে কাঁধে চড়িয়ে তিনি আমাকে নিয়ে যেতেন
বিলপাড়ের নিজেদের গ্রামÑশিমরাইল
আমি তাঁর ঘাড়ে চড়ে দু’কাঁধে দু’পা ঝুলিয়ে দিতাম
তিনি এক্কাদোক্কা চালে পা চালাতেন
আমি যেন তখন রূপকথার এক রাজকুমার
যদিও তখন রাজকুমার হওয়ার বয়স হয়নি!
তবে রাজপরিবারের একজন রাজশিশুও তো ভাবা যেতে পারে!
আচ্ছা, তা-ও যদি না ভাবলেন
নিদেনপক্ষে শিশু-সহিস তো ভাবা যেতে পারে!
তা-ই না হয় কবুল করুন আজ!
এবার চোখ বুজে একটু কল্পনা করুন :
দিগন্তবিস্তৃত সবুজ-শ্যামল গ্রাম ছাড়িয়ে
ছোটো ছোটো খাল পেরিয়ে
রবিশস্যের চোখজুড়ানো মাঠ ছাড়িয়ে
বোরোধানের বিল পেরিয়ে
আঁকাবাঁকা বুড়ি নদীর খেয়া পার হয়ে
আমরা পৌঁছে যেতাম মামাদের বাড়ি
আহা! আমার শৈশবের সেই প্রিয় ঘোড়ামামা!
কখনো কখনো আমাদের এই পথযাত্রায়
সঙ্গী হতেন আমার মা-ও
মা’র তো সেই জান-মামার বাড়ি
একমাত্র মামা বলে কথা!
জীবনের গল্পে এই মামাই যেন তার কাছে
এক অচিন জাদুকর
যার ঝোলায় আছে চমকে-দেয়ার মতো
সব জিনিসপাতি!
মা হাঁটতেন আমাদের পেছনে পেছনে
তার মেয়েবেলাটাও তখন চলচ্চিত্রের
রঙিন ফিতায় জীবন্ত হয়ে উঠতো
আমি বিস্ফারিত চোখে দেখতাম সেসব দৃশপট!
মনে পড়ে
সেবার পিটিআই ট্রেনিংয়ের জন্যে বাবা কুমিল্লা শহরে গেলেন
ঘোড়ামামা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিলেন
আমাদের সংসারের দেখভালের দায়িত্ব
ঘোড়ামামা কথা বলতেন গরগর করে
দূর থেকে মনে হতো যেন বাজছে এক ঝগড়াবাদ্য
কিন্তু তার মনটা ছিল পলিমাটির মতো নরম আর আর্দ্র!
এক বর্ষাকালÑআষাঢ় কিংবা শ্রাবণ
চারদিকে থইথই পানি
বাড়ির পাশে পাকা আউশধানের জমি
সেই ভোরে জমির আইলে ঘোড়ামামা পেঁতে আসলেন
কইমাছের জাল
তখন প্রায় মধ্যাহ্ন
মামা ও আমি নৌকা নিয়ে গেলাম
জালের ফাঁদে মাছ আটকালো কি না দেখতে
মামা জলে নেমে জাল টেনে টেনে মাছ খুলছেন
হঠাৎ দেখি চিৎকার দিয়ে নৌকায় উঠে পড়লেন!
মামার এই কাণ্ডে আমি তো হতবুদ্ধি!
‘কী হলো মামা?’
‘জালে কী জানি লাগছে রে!’
আমি বললাম : চলেন দেখি...
কিছুক্ষণ কী ভেবে মামা আবার পানিতে নামলেন
নৌকায় দাঁড়িয়ে আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি
হঠাৎ দেখি মামার দু’চোখ বিস্ফারিত
মুখ থেকে কথা বেরুচ্ছে না
কেবল তোতলাচ্ছেন
মামার কোলে প্রায় শিশু-আকৃতির এক মৎস্য
অস্পষ্ট স্বরে মামা বললেন : ধর ব্যাটা...
আমিও কোলে তুলে নিলাম
ইয়া বড়ো এক মাছ!
মামা বললেন : ‘এইডা হইল নান্দিল মাছ
খাইলে বুঝবি রে বাপ, কী স্বাদ এর!’
অবশ্য খেয়ে বুঝেছিলাম এইটা মাছ নয় অন্যকিছু!
এরকম কত গল্প আছে
আমার আর ঘোড়ামামার!
ঘোড়ামামা একদিন তার সদ্য যৌবনপ্রাপ্তির এক
উত্তেজনাময় ছবি এঁকেছিলেন আমার সমুখে
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছিলাম সেই দৃশ্যপট
কী এক অদ্ভুত তাতানো মুহূর্ত
চারদিকে থইথই বর্ষাকাল
জল, নৌকা ও পাটক্ষেতেরও উদ্বেল যৌবন
আর আউশধানের কী মৌ-মৌ করা ঘ্রাণ!
আমার সেই ঘোড়ামামা সম্প্রতি গত হয়েছেন
শ্মশ্রæমÐিত কী মায়াময় তার অবয়ব
সাংসারিক সচ্ছলতাও ফিরেছিল বেশ
পুত্রদের বিদেশসাফল্যে
মাঝেমধ্যেই ছুটে আসতেন মায়ের কাছে
‘বুবু’ বলতেই অজ্ঞান!
ঘোড়ামামার নাম ছিল ‘হাবিব’
হাবিব অর্থ ‘দোস্ত’
মানে আল্লাহর দোস্ত
এমন সহজ-সরল মানুষ
আল্লাহর দোস্ত না হয়ে যায় কোথায়?
ঘোড়ামামা, আপনি যেখানেই থাকুন
ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন
আমিও আসছি...
আপনার দু’কাঁধে পা ঝুলিয়ে আবারও
ফিরে যাবো আমার রঙিন শৈশবে
কারণ আমি তো আপনার সেই প্রিয় ঘোড়সওয়ার!