Published : 14 May 2014, 01:20 PM
কেবল বাংলা কবিতায় নয়, সমগ্র পৃথিবীর কাব্যচর্চা নিয়ে সাধারণ জরিপ চালানো হলেও হয়তো দেখা যাবে, এ যাবৎকাল পৃথিবীতে যতো কবিতা রচিত হয়েছে তার সিংহভাগই প্রেমের কবিতা। সঙ্গত কারণে ধরেই নিতে পারি একজন কবি যখন কাব্যচর্চা শুরু করেন অথবা কাব্যচর্চা অব্যাহত রাখেন, নিশ্চয়ই তিনি প্রেমকাব্য রচনা করবেন। অন্যভাবে বলতে পারি প্রেম ছাড়া কোনো কবিতাই লেখা যায় না। যে অনুষঙ্গের কথা কবি তাঁর কবিতায় উচ্চারণ করতে চান সে অনুষঙ্গ বিষয়ে যদি তাঁর অন্তরের গভীর প্রদেশে প্রেম জাগ্রত না হয়– যদি তার সঙ্গে কবি একাত্ম হতে না পারেন, তবে সে প্রসঙ্গে কবির পক্ষে উত্তীর্ণ কবিতা লেখা আদৌ সম্ভব নয়। সভ্যতার সূচনায় নয়, বরং প্রাগৈতিহাসিক আদিম যুগেও মানুষ ভালোবেসেছে, নর-নারী পরস্পরের প্রেমে মজেছে। ভালোবাসার অনুভব মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। জীবনে যদি কেউ কখনোই প্রেমাবিষ্ট না হন, তাহলে ধরেই নিতে পারি তিনি সুস্থ-স্বাভাবিক নন। 'ভালোবাসি' কথাটিই পৃথিবীর সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ হতে পারে; কিন্তু তারপরও শব্দটি কি বহুল ব্যবহারে ক্লীশে-মলিন হয়ে গেছে বলতে পারি? যদি না পারি তাহলে মেনেই নিতে হবে একজন কবি তাঁর কাব্যচর্চায় প্রেমানুভূতির অনুষঙ্গ নিয়ে কসরত করবেন, এবং তা প্রবলভাবে করলেও দোষণীয় কিছু নয়। পৃথিবীতে প্রেম কোনো বিচ্ছিন্ন অনুষঙ্গ নয়। তাই প্রেমের কবিতায় পারিপার্শ্বিক অন্যান্য প্রসঙ্গও একাকার হয়ে থাকে সঙ্গত কারণেই। আর প্রেম সেই অনিবার্য রসায়ন যা যে কোনো কবিতাকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে; কাল থেকে কালান্তরে রচনা করে অনুভূতি-সেতু। এখানেই আজকের আলোচনার সূত্রপাত, এখানেই আলোচনার স্থিতি এবং বারবার এখানেই প্রত্যাবর্তন। তবে এ-ও সত্য আলোচনা আধুনিক কালের কবিতায় এবং যতটা সম্ভব বাংলাদেশের কবিতায় সীমাবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট হবো।
আমাদের কবিতায় ঋতুভিত্তিক রচনার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে অনিবার্যভাবেই সবার আগে উচ্চারণ করতে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। বাংলার প্রতিটি ঋতু প্রতিটি মাসের কথা রবীন্দ্রনাথ এতটাই বিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করেছেন ভাবলে অবাক হতে হয়। বাঙালির মানসপটে রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ যেভাবে গেঁথে আছে তার কি কোনো বিকল্প হতে পারে? শামসুর রাহমানের একটি কবিতা আমার নিজের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। শামসুর রাহমান লিখেছেন, 'আমার মাকে আমি কোনোদিন গান গাইতে শুনিনি' কথাটি আমার জীবনেও প্রায় সত্য, ব্যাতিক্রম কেবল চৈত্রসঙক্রান্তির দিন। শিশুকাল থেকে দেখেছি চৈত্রসঙক্রন্তির দিন বাড়ির উঠোন-অঙ্গিনা ঘর-দোর পরিস্কার করতে করতে মা গাইছেন–
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষূরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক
এসো এসো ॥
এসো হে বৈশাখ এসো এসো
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক ॥
মুছে য্কা গ্লানি ঘুচে যাক জরা
অগ্নিস্নানে শূচি হোক ধরা……
রবীন্দ্রনাথের এ গান বাঙালির জীবনে অনিবার্য গান হয়ে আছে, একইভাবে তাঁর অজস্র গান-কবিতা বাঙালির জীবনের নানান উৎসব-আচার-অনুষ্ঠান আনন্দ-বেদনায় অনিবার্য হয়ে মিশে থাকে। বৈশাখ নিয়ে বাংলাদেশের অনেক কবিই কবিতা লিখেছেন, কিন্তু সে অর্থে বাঙালির মানসে বৈশাখের সাথে প্রেম একাকার হয়ে থাকে না, যতটা থাকে বসন্তের সাথে। বসন্তের মাস ফাল্গুন-চৈত্র; পাতা ঝরার সময়-রিক্ততার-হাহাকারের কাল। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ঝরা পাতার কান্না-বিবর্ণ সময়ের চিত্রকল্পের সাক্ষাৎ পেয়ে যাই সহজেই। নির্মলেন্দু গুণ লিখেন 'চৈত্রের ভালোবাসা'। বৈশাখ প্রেমের মাস না হলেও বৈশাখ পুরাতন স্মৃতি-জরা-গ্লানি পেছনে ফেলে নতুনকে-সবুজকে আবাহনের কাল, বৈশাখ নতুনের সাথে হাত ধরে চলার প্রেরণা, বৈশাখ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়ার আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন ছোঁবার স্পর্ধার কাল। আমাদের স্বপ্ন ছোঁবার আকাক্সক্ষাকে উজ্জীবিত রাখতেই সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেন 'বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা'। বৈশাখ স্বপ্নের কথা-আশার কথা উচ্চারণ করে "এমন আলাপ নয়, নয়/ বৈশাখের রুদ্ররোষে বিষন্ন প্লাবন,/ সুপেয় জলের জন্য ১৩৮১ সালে নিবেদন:/ জলমাতা তুমি/ চাঁদের বুকের 'পরে পোঁতো জলকল,/ আসন্ন শস্যের ভারে ভরি গৃহ, নিভিয়ে অনল।"(ফায়ার এক্সটিনগুইশার: বৈশাখ ১৩৮১ ॥ দাও বৃক্ষ দাও দিন ॥ হাবীবুল্লাহ সিরাজী) অথবা "নদী ও দীঘিতে মীনকুমারীরা উন্মুল/ গিরি সমুদ্রে আঁচড়ায় তারা এলোচুল/ নৌকোপৃথিবী খাটিয়েছে বুকে উড়ো পাল/ ডুবো বাংলায় মাঝিমাল্লার হাতে হাল/ ও মাঝি ভাই নাও ছেড়ে দাও নাও ছেড়ে দাও/ ঝড়ের উজানে জাতবাঙালির জান বাঁচাও/ ও মাঝি ভাই 'মানি না, মানি না' দাও ডাক/ ডুবো বাংলার ভাষা বদলাক এ বৈশাখ"(ভাষা বদলাক এ বৈশাখ ॥ আমার সাহস নেই টোকা মেরে সুন্দরকে উড়িয়ে দেবার ॥ মুহম্মদ নূরুল হুদা); এভাবেই সমকালীন কবিদের কবিতায় বৈশাখ আশার সঞ্চার করেছে। বৈশাখের এই আশাবাদই বাংলার কবিকূলকে স্বপ্নতাড়িত করেছে এবং বৈশাখ থেকে চৈত্রতক প্রেমাচ্ছন্ন করে রেখেছে।
প্রেম প্রসঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ অনিবার্য। 'আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন তোমাতে করিব বাস/ দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ বরষ মাস' অথবা 'আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্ক ভাগি/ আমি সকল দাগের হবো দাগী' কিংবা 'কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসার ঘায়ে/ নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে' এসব গানের বাণী কেবল প্রেমিকহৃদয়কে নয় সংবেদনশীল যেকোনো মানুষের অন্তর ছুঁয়ে যায়। বাংলা কবিতায় আধুনিকতার ছোঁয়া রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে না এলেও রবীন্দ্রনাথ নিজ-যোগ্যতায় আধুনিক কবিতার সতীর্থ করে নিয়েছেন নিজেকে। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন–"কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি,/ কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক/ মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে/ কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।/ ঘোমটা মাথায় ছিলো না তার মোটে,/ মুক্তো বেণী পিঠের 'পরে লোটে/ কালো? তা সে যতই কালো হোক/ দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।"(কৃষ্ণকলি ॥ ক্ষণিকা) তখন আমাদের মনে অজস্র লোকপ্রবাদ-লোককবিতার চরণ মনে পড়ে যায়; 'ভাবে মজিলে মন/ কিবা হরি কিবা ডোম' 'ভাবে মজিলে মন জাইত্যা ধরে আরগিলা'। কালিদাস-এর 'মেঘদূত' পড়ে প্রেয়সীর কাছে মেঘের ভাষায় চিঠি লিখতে শিখেছি আমরা। বাংলা কবিতা না হয়েও নানান কারণে ওমর খৈয়াম, হফিজ-এর রুবাইয়াৎ আমাদের প্রেমমগ্ন হতে প্রাণিত করে। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের কবিদের প্রেম কাব্যের উল্লেখ করতে হলে অসংখ্য কবির নাম সামনে এসে যায়। কে লিখেন নি প্রেমের কবিতা! বিশেষভাবে বলা যায় ফজল শাহাবুদ্দীন-এর কথা, যাঁর কবিতায় প্রেমাবেগের সাথে নারীর শরীর ও কামগন্ধ সেঁটে থাকতে দেখি, মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেয়সীর জন্য কাঙালপনা দেখি, শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রেয়সীর স্তুতি দেখা গেলেও দেশপ্রেম-সমকালীন রাজনীতি আর মধ্যবিত্তের জীবন সংগ্রাম তাঁর কবিতার কাঙালপনাকে আড়াল করে রাখে। কাব্যপাঠকের মনে বাংলাদেশের কবিদের প্রেম ও নারীর প্রতি আসক্তির খবর রাষ্ট্র হয়ে যায় যখন সিকদার আমিনুল হক লিখেন "সুলতা জানে সুলতা জানে ভালো/ আকাশে কেন মেঘ পুকুরে কেন হাঁস/ সুলতা জানে সুলতা জানে ভালো/ কবিরা কেন নারীর ক্রীতদাস।" প্রেমানুষঙ্গটি যে জনপ্রিয় একটি বিষয় এবং বিপণনের জন্য আগ্রহেরও অনুষঙ্গ সেটিও কিন্তু লক্ষ করা গেছে। কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে প্রকাশকদের অনাগ্রহ থাকলেও প্রেমকাব্য প্রকাশে কিছুটা আগ্রহ দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। প্রেমের কবিতা লিখতে কবিদের আগ্রহ সব সময়ই ছিলো এবং আছে। একেবারে অখ্যাত নিভৃতিচারী কবিও একান্তে তাঁর প্রেয়সীর কথা মনে করে রচনা করেন প্রেমের কবিতা। সেগুলো মুদ্রিত হলেও অনেকাংশেই অনালোকিত-অনালোচিত থেকে যায়। একজন কবিকে মনে পড়ছে, মহীউদ্দিন খান চৌধুরী, যিনি আশির দশকে লিখেছিলেন 'পিরীতির নক্শা' নামের একটি কাব্য। যেটি কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা চৌত্রিশটি চৌদ্দ চরণের কবিতার সংকলন। সে কাব্যে তাঁর পরবর্তী কাব্য 'কষ্টে আমি সমুদ্রে যাবো' প্রকাশের ঘোষণা থাকলেও সেটি প্রকাশিত হয়েছিলো কি-না জানা যায়নি। পিরীতির নক্শা কাব্যের একটি কবিতা উদ্ধৃত করা হলে সচেতন পাঠক মাত্রেই বুঝে যাবেন প্রেমাবেগ সংক্রমনের রহস্য।
কিবায় পাঠাই হেরে পিরীতির চিঠি
পিরীতির চিঠি হেরে কিবায় পাঠাই,
অইছি বেহুস আমি ক্যামন সে বাটি
সে বাটিত কিতা থাহে দ্যাখবার চাই।
যখনি দেখছি তারে উঠানের ভিড়ে
চোখে চোখে মিল অয় শরীল কাঁপন
বুজেও বুজেনা ব্যাথা কান্দায় আমারে
বুকে তার মধু ভরা ফুলের কানন।
যৈবন দিয়াছি তারে দিতে চাই সব
দিছি গো উজার কৈরা তেও হে নীরব
পুন্নিমার চাঁন দেই মিলনের তারা
পাহাড় টুকায়া রুপি পিরীতির চারা।
নিদয়াগো কথা কও ফিরা চাও তুমি
তুমি ছাড়া আমি যেনো ধু ধু মরুভূমি।
(পিরীতির নক্শা-১৬ ॥ মহীউদ্দিন খান চৌধুরী)
১৯৭৩-এ প্রকাশিত আল মাহমুদের 'সোনালি কাবিন' তাঁর পরবর্তী সময়ের কবিদের তো বটেই তাঁর সমসাময়িক কবিদেরও প্রভাবিত করেছে। 'সোনালি কাবিন' শিরোনামে লেখা আল মাহমুদ-এর চৌদ্দ চরণের চৌদ্দটি কবিতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পংক্তি এখানে উদ্ধৃত করছি–
সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাতদু'টি,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি;
…… ………….. ………………..
চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ
উগোল মাছের মাংশ তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়,
ঠোঁটের এ-লাক্ষারসে সিক্ত করে নর্ম কারুকাজ
দ্রুত ডুবে যাই এসো, ঘূর্ণমান রক্তের ধাঁধায়।
……… ………….. …………………
বধুবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল।
………. …………. ……………
বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই
দোহাই মাছ-মাংশ দুগ্ধবতী হালাল পশুর,
লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই
হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।
(সোনালি কাবিন-১, ৩, ১৩ ও ১৪-এর অংশ ॥ আল মাহমুদ)
প্রণয়ের সংক্রমন বুঝতে আল মাহমুদ-এর সোনালি কাবিন পাঠের পাশাপাশি যদি সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক-এর 'পরানের গহীন ভিতর' কাব্য থেকে অন্তত একটি কবিতা পাঠ করতে পারি।
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশীর লহরে ডোবা, পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের 'পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথর?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর ॥
(পরানের গহীন ভিতর-৪ ॥ সৈয়দ শামসুল হক)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সবাই বিদ্রোহী কবি বলে জানেন এবং মানেন; কিন্তু নজরুলকে নিবিড় পাঠে পাই একজন প্রেমিক-দুঃখি কবি হিসেবে। 'তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না/ কোলাহল করি সারাদিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না/ নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।' (বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি ॥ কাজী নজরুল ইসলাম)। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গও প্রেম ও বিরহ। 'সুরঞ্জনা অইখানে যেয়ো নাকো তুমি/ বলো নাকো কথা অই যুবকের সাথে'। কবিতা যুগে যুগে পরম্পরা নিয়ে এগিয়ে যায়। একইভাবে ওমর খৈয়াম-এর রুবাইয়াতের সংক্রমন ও পরম্পরা খুঁজতে নির্মলেন্দু গুণের 'নিশিকাব্য' 'মুঠোফোনের কাব্য' পাঠ করতে পারি; পাঠ করতে পারি অসংখ্য কবির আলোড়ন তোলা সব প্রেমকাব্য, পাঠ করতে পারি অসীম সাহা, রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ অসংখ্য কবির কবিতা। পাঠ করতে পারি স্বল্প পরিচিত মোশাররফ হোসেন ভূঞা'র 'ভালোবাসার পদাবলি' কাব্যের কবিতাও। খৈয়াম যখন লিখেন–
এই যে অধরে শরম-রক্ত চুমার প্রগলভতা
একে একদিন মলিন করবে মরণ-প্রমত্ততা,
তা' হ'লে মিথ্যে আগামী কালের অকারণ সংশয়ে
কেন ভেঙে দেবো আজকের মধু-ফাগুনের পূর্ণতা ॥
(রুবাইয়াৎ ওমর খইয়াম-৪৭ ॥ অনুবাদ- সিকান্দর আবু জাফর ॥ বাংলা একাডেমী ১৯৬৬)
ওমর খৈয়াম-এর অনুবাদ কাজী নজরুল ইসলামও করেছেন। আমরা জানি অনুবাদে কবিতার সিংহভাগই খোয়া যায়, ধারণা করি নজরুলের অনুবাদ পাঠ করলে পাঠকের মনে 'অনুবাদে কবিতার সৌন্দর্য খোয়া যাবার' ভাগটা কমে যাবে, এমন প্রতীতি থেকেই নজরুলকৃত দুটি রুবাইয়াৎ এখানে উদ্ধৃত করছি–
'এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর
প্রিয়া সাকী, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার,
জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ,
এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ আমি শাহান শার।'
'আবার যখন মিলবে হেথায় শরাব সাকীর আঞ্জামে
হে বন্ধুদল একটি ফোঁটা অশ্রু ফেলো মোর নামে।
চক্রাকারে পাত্র ঘুরে আসবে যখন সাকীর পাশ,
পেয়ালা একটি উলটে দিও স্মরণ করে খৈয়ামে।'
বাংলা কবিতায় প্রেম সংক্রমণ কেবল খৈয়াম থেকে নয়, প্রেম সংক্রমণ হয়েছে কালিদাস থেকে, সংক্রমণ হয়েছে মির্জা গালীব, হাফিজ এবং বোদলেয়ার থেকেও। বিশেষত বুদ্ধদেব বসু অনূদিত কালিদাসের 'মেঘদূত' এবং বোলেয়ারের 'ক্লেদজকুসুম' বাংলার কবিদের বিভিন্নকালে আলোড়িত এবং প্রাণিত করেছে। কালিদাসের 'মেঘদূত' থেকে সামান্য উদ্ধৃত করে আধুনিক বাংলা কবিতার প্রেমকাব্যের সংক্রমণ প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে চাই।
'সেথায় বাতায়নে কেশের প্রসাধনে গন্ধধূপ উদ্গীর্ণ,
পুষ্ট তাতে, পাবে প্রীতির উপহার, পালিত ময়ূরের নৃত্য;
শ্রান্তি হবে দূর, দ্যাখো এ-লক্ষ্মীরে পুষ্পসুরভিত ভবনে,
যেখানে আঁকা আছে ললিতা বনিতার অলক্তকরাগচিহ্ন।' (পূর্বমেঘ-৩৩ ॥ মেঘদূত)
বাংলাদেশের কবিরা প্রেমের কবিতা লিখতে পারঙ্গম নন একথা আমি কখনোই বলতে চাই না। আধুনিক কালের কবি তো বটেই এমন কি বাংলার লোককবিদের কবিতায় অজস্র প্রেমের সফল পংক্তির দেখা পাই। আমাদের লোককবিরা সে অর্থে খৈয়াম-হাফিজ-মির্জা গালীব-কালিদাসদের সাথে পরিচিত না হয়েও লিখেছেন–
'পিরীত যতন পিরীত রতন পিরীত গলার হার
পিরীত কইরা যেজন মরে সফল জনম তার'
অথবা
'বন্ধু একবার আইসা আমায় দেইখা যাও রে ॥
জ্বালাইয়াছে চান্দের বাত্তি তুমি ছাড়া কাটে না রাতিরে ॥
চিঠিতে তো লেখি কত কতা
সব কতা কি যায় ওরে লেখারে ॥
মহুয়া-মলুয়া-বীরাঙ্গনা সখিনা-মনসার ভাসানসহ বাংলার প্রায় প্রতিটি গীতিকার পালাই প্রধানত প্রেমনির্ভর এবং হৃদয়গ্রাহী। আমাদের লোকবাংলার সাধারণের সূচিকর্মের দিকে যদি মনোযোগ দেয়া যায় সেখানেও দেখি বাঙালি নারীর প্রেমাকুতির বার্তা। 'ফুল ফুটে ঝরে যায় পৃথিবীর রীতি/ তুমি মোর বন্ধু বটে রেখো মোর স্মৃতি।' অথবা 'যাও পাখি বল তারে/ সে যেন ভুলে না মোরে।' 'আকাশেতে উড়ে পাখি জমিনেতে ছায়া/ তুমি বন্ধু বহুদূরে আছে শুধু মায়া।' এমনি অসংখ্য কবিতার পংক্তির কথা স্মরণ করতে পারি। কেবল বাংলার লোক কবিরা নন আধুনিক কালের কবিরাও নিয়মিত অসংখ্য প্রেমকাব্য লিখে যাচ্ছেন, যাদের কবিতায় স্বাতন্ত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায় সহজেই। এবং তাঁদের কবিতায় বাংলার লোককবিদের প্রচ্ছন্ন প্রভাবও লক্ষ করা যায়।
'মনে পড়ে আমার চুলে তোমার আঙুল খেলা
মনে পড়ে খেলতে খেলতে গড়িয়েছিল বেলা
মনে পড়ে রাত দুপুরে হয়েছিলাম সাপ
মনে পড়ে ছোবল খেয়ে তোমার মনস্তাপ;
এখন তুমি অন্য ঘরে অন্য অভিসার
কোন্ জনমে নারীর দোষে নীড় ভেঙেছে কার?
(বারো বছর-৩॥ বারো বছরের গল্প ॥ মুহম্মদ নূরুল হুদা)
আধুনিক বাংলার কবিদের সবাই প্রেমের কবিতা লিখেছেন সন্দেহ নেই এবং তাঁদের কবিতায় বাংলার ইতিহাস-পুরাণ-লোকঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতি প্রেমিক-প্রেমিকার নিবেদন-কাম ও শরীরী অনুষঙ্গ সবার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ভালোবাসিবার এত আহাজারি, কাছে আসিবার শত মিনতি, নিবেদনের গন্ধডালা, বরণের এত প্রস্তুতি-এত অঙ্গীকার সবকিছুতেই নারী-পুরুষের মন দেয়া-নেয়ার লীলা; সব কিছুতেই বিচ্ছেদ ব্যথার কান্না। ভালোবাসার অঙ্গীকার বৈশাখ থেকে চৈত্র, চৈত্র থেকে ফাল্গুন, ভালোবাসা প্রতিদিন, প্রতি পলে পলে। প্রতিদিন নতুন নতুন কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ভালোবাসার কবিতা। যে কারণে অজস্র ব্যবহারে 'ভালোবাসি' শব্দটি ক্লীশে-মলিন হয়ে যায় না, একই কারণে প্রচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত লেখা প্রেমের কবিতা পুরোনো বাতিল হয়ে যায় না। যে আবেগে লালন ফকির বলেন- 'মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে আমার মনের মানুষের সনে।' একই আবেগে জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন–'তুমি দাঁড়াও/ তোমাকে পাথরে লুকিয়ে রাখি/ জরা হ'তে মৃত্যু হ'তে বার্ধক্যহীন/ তন্বী তোমাকে লুকিয়ে রাখি।/ আমার প্রেমিকা তুমি/ যুগ যুগ পাথরে শোভিত রবে/ জরা হ'তে মৃত্যু হ'তে বার্ধক্যহীন।' (ভাস্করের জন্ম ॥ যে ছিলো প্রাণের জরুরী)। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল-জীবনানন্দ হয়ে শামসুর রাহমান থেকে আল মাহমুদ-সৈয়দ হক-হুদা-গুণ-সিরাজী-মুশাররাফ করিম-আবিদ আজাদ-ফারুক মাহমুদ-কামাল চৌধুরী-আসাদ মান্নান-আবু হাসান শাহরিয়ার-খোন্দকার আশরাফ-আশরাফ রোকন-রহমান হেনরী হয়ে প্রেমকাব্য লেখার পরম্পরা চলতে থাকবে এবং পৃথিবী ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যাবে।