Published : 29 Jun 2026, 11:03 PM
ছবি আঁকা, গান গাওয়া, কথা বলা ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের সহজাত গুণ। এক অর্থে কর্মজীবনের বড় অংশ জুড়ে তিনি ছিলেন আমলা! কিন্তু আমলাদের ব্যক্তিত্বের যে ভাবমূর্তি গড়ে-ওঠে মুস্তাফা মনোয়ারের সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব কখনো সেই ভাবমূর্তি পায়নি। তাঁর সঙ্গে যাপিত সময়ের স্মৃতি অন্যত্র লিখেছি। এখানে তাঁর একটি দুষ্প্রাপ্য রচনা উপস্থাপন করছি। এটি লিখিয়ে তোলায় ও পত্রিকায় প্রকাশে আমারও কিছু ভূমিকা ছিল।
১৯৮৪/৮৫ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে তাঁর পাপেট শো আয়োজন সূত্রে তাঁর সঙ্গে ভালোভাবে পরিচয় হয়! আবদুল্লাহ আবু সায়ীদর অনুরোধে সে সময় তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাপেট থিয়েটার একটি প্রদর্শনী করেছিলেন। নিজের হাতে বানানো পাপেট থিয়েটারের কেবল প্রদর্শনী করাই সে আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল না। সায়ীদ স্যার চেয়েছিলেন, তিনি যেন পাপেট থিয়েটার সম্পর্কে একটা সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরেন। ছোট্ট একটি পাপেট থিয়েটার পরিবেশনার আগে তিনি যে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলান সেটা যেমন ছিল তথ্যসমৃদ্ধ তেমনি শৈল্পিক। অনেক কম কথায় পাপেটের ইতিহাস এবং এর ব্যবহারিক ও শিল্পগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এত সুন্দর ও সূক্ষ্ম কৌতুকপূর্ণ ভাষায় হাসিমুখে কথা বলেছিলেন যে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম।
অনুষ্ঠানের কয়েক দিন পরে সায়ীদ স্যারের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হচ্ছিল! তিনি মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পসামর্থ্যের গুণমুগ্ধ ছিলেন বলেই আয়োজনটিকে কেবল একটি পাপেট প্রদর্শনীতে সীমিত না রেখে এর শিল্পগত সৌন্দর্য আস্বাদনের সবগুলো মাত্রা সম্পর্কে ধারণা সমৃদ্ধ সেই অনুষ্ঠানের কথা ভেবেছিলেন। তখন সায়ীদ স্যারের সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর' পত্রিকার তৃতীয় পর্যায় চলছে। সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমি তাঁকে সহযোগিতা করছিলাম! তিনি বললেন, মুস্তাফা মনোয়ারের বক্তৃতাটার লিখিত রূপ পাওয়া গেলে ‘কণ্ঠস্বরে' ছাপা যেত! আমার মনে আছে, মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে ছেঁড়াখোঁড়া ভাবে রুল করা কাগজে কিছু টোকা ছিল। স্যারকে বললাম, ঐ টোকা থেকে খুব সহজেই তো লেখা সম্ভব। স্যার হাসলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের কাছ থেকে একটা লেখা পাওয়া অত সহজ নয়! কারণ, তিনি তো আর লেখক টাইপ নন! তবু আমি খুব উৎসাহিত হলাম। তিনি ফোন তুলে নিলেন হাতে। ততদিনে আমি জেনে গেছি মুস্তাফা মনোয়ারের স্ত্রী সায়ীদ স্যারের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনী। লক্ষ করেছিলাম, মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে সায়ীদ স্যারের ঘনিষ্ঠতা একেবারে পারিবারিক পর্যায়ের। মুস্তাফা মনোয়ারও স্যারের ব্যাপারে খুব সমীহপরায়ণ! যা হোক অনেক কৌতুকপূর্ণ বাক্যালাপের পর সায়ীদ স্যার বক্তৃতাটিকে লিখে দিতে অনুরোধ করলেন। এখনকার মতো হাতে হাতে যে কেউ যেভাবে মোবাইলে অডিও ভিডিও রেকর্ড করে ফেলে তখন ব্যাপার এত সহজ ছিল না। তাই তাঁর বক্তৃতাটি টেপ করে রাখার কথা ভাবা হয়নি। লেখার জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের ওপরই তাই আমাদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হলো।
সায়ীদ স্যার আমাকে সচেতন করে দিয়েছিলেন যে তাঁর কাছ থেকে লেখা আদায় খুব কঠিন হবে, প্রায় এক অসম্ভব কাজ বলা যায়! আমার মনে পড়ে না বন্ধু লুৎফর রহমান রিটন ছাড়া আমার সমসাময়িকেরা কেউ মুস্তাফা মনোয়ারের কাছ থেকে কোনো লেখা আদায় করতে পেরেছেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত লেখাটি আদায়ের ব্যাপারে কৃতিত্ব প্রধানত সায়ীদ স্যারেরই। কারণ এক দিকে তিনিই আমার মনে করিয়ে দেয়া সূত্রে দিনের পর দিন টেলিফোনে মুস্তাফা মনোয়ারকে উজ্জীবিত করতেন লেখাটার জন্য, অন্য দিকে আমি গিয়ে হাজির হতাম তাঁর ধানমণ্ডির বাসায়। আমার সশরীর উপস্থিতির ভীতি থেকে পরিত্রাণ পেতেই হয়তো-বা একদিন চূড়ান্ত না হওয়া পাণ্ডুলিপিটিই আমাকে দেন তিনি। পরে লেখাটির প্রেসকপি প্রস্তুত করি আমি নিজ হাতে। তার ওপর সায়ীদ স্যারের কপি এডিটিং শেষে লেখাটি স্যারের সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার বিংশতি বর্ষ ১ম–৪র্থ সংখ্যায় (জুন, উনিশশো ছিয়াশি) ছাপা হয়। বাংলাদেশে তখনো পুরোপুরি লেটারপ্রেসের যুগ চলছে। ৭ পৃষ্ঠার লেখাটি যে কতবার স্যার কাটাকুটি করে সেটিকে প্রকাশোপোযোগী করে তুলেছিলেন সেটা লিখতে গেলেও হয়তো এক কাহন হয়ে যাবে!
'সভাপতি' নামে তাঁর সেদিন প্রদর্শিত পাপেট থিয়েটারের অচূড়ান্ত স্ক্রিপ্টটিও নিয়ে এসেছিলাম। পরে আমারই উদ্যোগে আন্ওয়ার আহমদের পত্রিকাগুলোর একটি 'সাহিত্য সাময়িকী'তে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল। সম্ভবত সেটিও তাঁর লেখা পাপেট থিয়েটারের মুদ্রিত বিরল এক স্ক্রিপ্ট!
নিচে মুস্তাফা মনোয়ারের লেখাটি উদ্ধৃত হলো।
পাপেট থিয়েটার
মুস্তাফা মনোয়ার
মানব জাতি দুই দলে বিভক্ত। একদল পাপেট চালক আর অন্যদল নিজেরাই পাপেট। জানিনা শেষের কথাটা সকলে স্বীকার করবেন কি না। তবে আমি জানি অন্তত আমি নিজে অবশ্যই একজন ‘যথার্থ' পাপেট।
অন্যের ইঙ্গিতে, অন্যের ইচ্ছায় যে প্রাণ চলমান হয়, যে শরীর চলমান হয়–তাকেই পাপেট বলা চলে। বাংলা ভাষায় পুতুল নাচ কথাটা পাপেটের পরিবর্তে ব্যবহার করতে চাই না। তার কারণ পুতুল নাচ সাধারণভাবে নাচের সঙ্গে সম্পর্কিত–কাজেই সীমিত একটা ধারাকে বোঝায়।
ইংরেজিতে যেমন ডলড্যান্স বললে পাপেটকে বোঝায় না তেমনি বাংলাতে পুতুল নাচ বললেও পাপেট কথাটার অর্থ সঠিকভাবে প্রকাশ পায় না!
পাপেটের জন্ম প্রভুর ইচ্ছে প্রকাশ করার জন্যে। প্রভুর ভালোমন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, ইচ্ছা-অনিচ্ছা– সবই সে প্রকাশ করে। সব মানুষেরই ইচ্ছে কাউকে না কাউকে সে নিজের হুকুমে চালাবে, নাচাবে। আমারও তেমনই ইচ্ছে ছিল। এই ইচ্ছেটা পুরণ করার উদ্দেশ্যে এক সময় একটি মেয়েকে প্রেমের ভাব দেখিয়ে, রবীন্দ্রনাথের 'জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী' দান করে, জীবনানন্দের 'চাল ধোয়া হাতে'র উপমা দিয়ে, বনলতা সেনের 'পাখির নীড়' এবং আমার সমন্বয় ঘটিয়ে এক কথায় পোষ মানালাম। আসল উদ্দেশ্য আমার অবলা নারী পাপেট হবে–যা বলব তাই করবে। আমার মনের মতো হবে তার চাল-চলন। সে চাল ধোবে। তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ে সুতো বেঁধে আমার ইঙ্গিতে আমার আঙ্গিকে চলাফেরা করাবো। মেয়েটি বললে, 'আমি তোমার হাতের পুতুল হয়ে থাকবো।' যাই হোক শেষে বিয়ে হলো, সুখী পরিবারের নাম্বার পূর্ণ হলো, চাকরির উন্নতি হলো, দেশ স্বাধীন হলো। শুধু একা আমি ক্রমে ক্রমে সম্পূর্ণ পরাধীন হতে লাগলাম। কোন সময় কখন কেমন করে আমিই আমার স্ত্রীর হাতের পাপেট হয়ে গেলাম আন্দাজ পেলাম না। সুতরাং আমি এখন পাপেট। কিন্তু তাতেও তত দুঃখ হোতো না, যদি জানতাম আমার কোন কোন জায়গায় সুতো বাঁধা রয়েছে। তা হলে কেটে ফেলার চেষ্টা করা যেতো। তাও বোঝার উপায় নেই, তবে এটাই এখন একমাত্র সান্ত্বনা যে পৃথিবীতে আমিই একা শুধু পাপেট নই, সমস্ত পৃথিবী জুড়েই পাপেটের ভীড়। ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড' সুপার পাওয়ারের পাপেট, গরিব-বড়লোকের পাপেট, কেউ কেউ কমিশনের মিশনে পাপেট, কেউ ‘এল এম জি'র এলেম দেয়া পাপেট। পাপেট সকলেই।
দুঃখ কিছুটা লাঘব হলো। কিন্তু কাউকে না কাউকে পাপেটে পরিণত করার ইচ্ছেটা দমল না। তাই শুরু, করলাম পাপেট তৈরি, কাঠ-কাগজের পাপেট। বর্তমানে পৃথিবীতে শুধু, কেবল এরাই একমাত্র যারা আমার কথা শোনে। আর সবচেয়ে সুখের কথা এরা কথা শোনেই বেশি, বলে সবচেয়ে কম। তাছাড়া সোনাদানা বাড়ি গাড়ি কিছুই চায় না। তাদের আর একটা বিশেষ আশাব্যঞ্জক দিক হলো তারা কথায় কথায় ‘তর্ক' করে না। পৃথিবীর নানাবিধ সাবজেক্টে নিজের ইনটিউশনে পাওয়া মতামত প্রবল জোরে প্রকাশ করে অযথা হট্টগোল তোলে না। আমার ধারণা, যে কোনো স্ত্রীর চেয়ে পাপেট অনেক ভালো। এই হলো আমার পাপেট নিয়ে কাজ করার প্রধান অনুপ্রেরণা।
নানান ধরনের পাপেট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি। আজকে আপনাদের যে পাপেট দেখানো হবে তা বড়ো পাপেট। যেহেতু বড়ো পাপেট দিয়ে থিয়েটার করলে পাপেটদের দিয়ে অনেক রকম ভঙ্গি করানো যায়, আর যে কোনো আকারের মঞ্চেও এরা অভিনয় করতে পারে, তাই এই শিল্পকে থিয়েটার বলে। বর্তমান বিশ্বে বড়ো পাপেটের বিশেষ প্রসার লক্ষ্য করা যাচ্ছে; বিশেষ করে বড়ো পাপেট টেলিভিশন বা ফিল্মের চাহিদা সবচেয়ে বেশি পূরণ করতে পারছে।
পাপেট থিয়েটারকে বলা যায় সবচেয়ে পুরনো পারফর্মিং আর্ট'। সভ্যতার প্রথম পর্যায়েই পাপেটের জন্ম। খুব সম্ভব পাপেট দিয়েই শুর হয় আদি যুগের থিয়েটার। পাপেট থিয়েটারের ইতিহাস বাধাহীন গতিতে যুগের পর যুগ অতিক্রম করেছে। পাপেট আত্মপ্রকাশ করে নানাভাবে। পূজোর দেব-দেবী হয়ে, অশুভ শক্তি হয়ে। পাপেট কখনো ধর্ম প্রচারকের কাজ নিয়েছে; কখনো কুসংস্কার ও শোষকের সহায়তা করেছে, আবার কখনো তার পরিচয় ঘটেছে সাধারণ দুঃখী, দরিদ্র মানুষের বন্ধু হিসেবে। পাপেটরা প্রিয়জনের মত তাদের আশা দিয়েছে, বেঁচে থাকার সেই শ্রেষ্ঠ উপাদানটি উপহার দিয়েছে, যার নাম 'হাসি'। এই চরিত্রগুলোই শুকনো মরুভূমি পার হয়েছে, পার হয়েছে কঠিন পাহাড়, সমুদ্র। দেশ থেকে দেশে, মন থেকে মনে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে একই পাপেট আত্মপ্রকাশ করেছে মানুষের বন্ধু হয়ে।
ইংলন্ডে যার নাম পাণ্ড, রাশিয়ায় সে-ই পেট্রোসকা, তুরস্কে তারই নাম ক্যারাগজ–একই চরিত্র। সুন্দর নয়, শক্তিশালী নয়, অসীম মহিমাময় যোদ্ধা নয়, উপদেশ দেয়ার পণ্ডিতও নয়–সহজ সরল একজন মানুষ মাত্র সে। সম্বল কেবল সমবেদনা, ভালোবাসা আর একটা সহজ প্রীতিমধুর মন। শতাব্দীর পর শতাব্দী–এই চরিত্রের কোনো পরিবর্ত'ন হয়নি। পাল্টেছে শুধুমাত্র পোশাক আর পাসপোর্ট'।
বিংশ শতাব্দীর জীবনযাত্রা যেমন বহুমুখী, সুদূরপ্রসারী–তেমনি কঠিন ও সচেতন। বিজ্ঞানের অসম্ভব দ্রুতগতি, মানব সেবার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, আবিষ্কারের অসীম আগ্রহ একদিকে যেমন মানুষকে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক ঐশ্বর্য, অন্যদিকে তেমনি দিয়েছে দুঃসহ অস্থিরতা, আস্থাহীনতা, স্থিতিহীনতা, সর্বোপরি এক সর্বব্যাপী স্বস্তিহীন পরিস্থিতি।
তাই মানুষ আবার খুঁজছে তার ফেলে-আসা সহজ মনকে–মানবিক সেন্টিমেন্টের সরল সৌন্দর্যকে। কম্পিউটারের নির্ভুল ক্ষমতার কাঠিন্য থেকে তার মাপের, অঙ্কের সীমার বাইরে গিয়ে–বেঠিকের আশ্রয়ে দেখা-না-দেখার কল্পনার জগতের ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে সে। এই আধুনিক মানুষ তার শিল্প ধারাকে তাই এমন অনাড়ম্বর করে তুলেছে, করে তুলেছে সহজ। রিয়েলিটির অসংখ্য সোচ্চার আর জটপাকানো বিষয় আর এখন ‘আর্টে'র বিষয়বস্তু নয়।
পূর্ণ রিয়েলিটির চেয়ে ইঙ্গিত শুদ্ধতর। মানুষের চেয়ে মানুষের এলিগোরি মানুষকে বেশি কাছে টানে, স্টাইলাইজেশন তাই বর্ত'মান যুগের এসথেটিকস এর অন্যতম চিহ্নিত উপাদান।
আমার মনে হয় পাপেট সত্যিকার অর্থে বিংশ শতাব্দীরই কালসম্মত মিডিয়া। এই উক্তির আলোকে ইতিহাসকে একটু পর্যালোচনা করা যাক। দেখা যাচ্ছে আঠারো শতাব্দীতেই পাপেট থিয়েটার শুরু করে দিয়েছে মানুষের থিয়েটারের অনুকরণ করতে। পাপেট অভিনেতা মানুষ অভিনেতার নকল করতে শুরু করেছে চেহারায় আর অঙ্গ-ভঙ্গিতে অতিমাত্রায় মানুষের রিয়েলিটির ভাব ফুটিয়ে তুলছে। আর সেজন্যেই বিকাশের এই পর্বে পাপেট থিয়েটার পরিণত হয়েছে বড়ো থিয়েটারের ক্ষুদ্র সংস্করণে। ফলে পাপেট ক্রমেই তার নিজস্ব শক্তি হারিয়ে ফেলে অধঃপতিত হয়েছে লঘু শিল্পকলায়।
অনেক রকম স্টান্টও সংযোজিত হয়েছে এতে। ফলে ক্ষুদ্র রুচির চিত্তবিভ্রমকারী দীপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে এই পাপেট। শিল্পীর হাত থেকে চলে গেছে ক্রাফটসম্যানের হাতে। বিশ শতকের প্রথম দিকে পাপেট থিয়েটার কয়েকজন কৃতি শিল্পীর প্রচেষ্টায় তার নিজস্ব শৈল্পিক গতিধারায় প্রকাশ পেতে থাকে। বিশেষ করে ইটালি, ফ্রান্স, চেকোশ্লোভাকিয়া, জার্মানী প্রভৃতি দেশে শুরু হয় এক নতুন আঙ্গিকের পাপেট থিয়েটার। পাপেট ক্রমেই সসৃষ্টিধর্মী শিল্পকলার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বিভিন্ন দেশের ট্র্যাডিশনাল ভঙ্গি ও ঐতিহাসিক চরিত্রেরা পাপেট থিয়েটারের বিশেষ মর্যাদায় উপস্থাপিত হতে শুরু করে। কিন্তু বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী মানবিক ও এসথেটিক যুক্তির অনুমোদন করে যে সকল পাপেট থিয়েটারের সৃষ্টি হয়েছে তারাই বর্তমান বিশ্বের পাপেট থিয়েটারের অঙ্গনে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। পাপেট মাধ্যম কেবলমাত্র ট্র্যাডিশনাল দলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন ক্ষেত্রের শিল্পীরা নিজেদের শৈল্পিক অভিব্যক্তির প্রকাশের জন্যে ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প, সাহিত্য, নাটক ইত্যাদি নানান শিল্পকলার সার্থক সমন্বয় ঘটিয়েছেন এর ভেতরে।
মানুষের জগতে মানুষই সৃষ্টি করেছে স্বার্থপরতা, ঘৃণা, দুঃখ, নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধ, ধ্বংস ইত্যাদি অশুভ প্রক্রিয়া। আবার মানুষের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে মানুষের চির আকাঙ্ক্ষিত সুখ, ভালোবাসা, স্নেহ, দয়া, পরিতৃপ্তি, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। এই শুভ এবং সুন্দরকে বিকশিত করার স্বার্থেই আর্টের প্রয়োজন, আনন্দের প্রয়োজন, প্রয়োজন ভালোলাগা আর ভালোবাসার কোমল অনুভূতির। এইসব কাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়ে মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়–এসবের উত্তর পেতে চায়–চায় আশ্বাস পেতে। এইসব আকাঙ্ক্ষিত অন্য মানুষেরা সব সময় রক্তমাংসে গড়া না-ও হতে পারে–অনেক রূপে তার আবির্ভাব হতে পারে। দেব-দেবী থেকে শুরু, করে পাপেট–সকলেই যেহেতু সেই সব কথা বলার–উত্তর দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার নানাধরনের রূপ কাজেই পাপেট বহুকাল দেব দেবীর রূপদান করেছে, মানবাতীত শক্তির রূপদান করেছে। ওদিকে রক্তমাংসের মানুষের মধ্যে ভালোর রূপ বা খারাপের রূপও আবার দোষ গুণের ওপরে উঠতে পারে। যদি সত্যি মানুষটির মুখে মুখোশ পরিয়ে একক মানুষের অস্তিত্ব হরণ করে তাকে দিয়ে রূপক মানুষের কথা শোনানো সম্ভব হয়, তখন ঐ কথাই হয় যথার্থ কথা। এই প্রক্রিয়াতেই পাপেট থেকে মুখোশ অভিনয়ের জন্ম এবং পাপেটের মূল কাজটাও আসলে তাই। পাপেট মুখোশ পরে না, তার জন্ম বিভিন্ন চরিত্রের রূপক হয়েই। তার পূর্ণ অস্তিত্বই এলিগোরিকাল। '’It Seems that the closer we move to actual life, the further we move away from the drama."
পাপেটের গঠন ও আকার সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক। পাপেট মূলত তিন রকম। পাপেট বা ম্যারিওনেট; বড় পাপেট–যা নিচ থেকে রডের সাহায্যে চালনা করা হয় এবং ফ্ল্যাট মোড়া পাপেট–যা ওপর থেকে সুতো বেঁধে একটি অপারেটরে লাগাতে হয় এবং এই অপারেটর নাড়িয়ে নানান ভঙ্গি সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। মোট সাতটি সুতো দিয়ে একটি মানুষ পাপেট চালানো সম্ভব–তবে বিশেষ বিশেষ ভঙ্গির জন্যে সুতোর সংখ্যা বাড়াতে হয়। কোন বিশেষ চরিত্রের বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গির জন্য অনেক সময় কুড়ি পঁচিশটি পর্যন্ত সুতোর প্রয়োজন হতে পারে। আবার অত্যন্ত সহজ অঙ্গ ভঙ্গির জন্যে মাত্র তিনটি সুতো ব্যবহার করলেই চলে। আমাদের দেশজ পাপেটও মাত্র তিনটি সুতো দিয়ে নাচানো হয়।
স্ট্রিং পাপেটের সৃষ্টি সম্ভবই হতো না যদি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি না থাকতো। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানেই ম্যারিওনেট জীবন্ত হয় এবং তাই এই পাপেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায় এই যে এই পাপেট মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে সব-চেয়ে অস্বীকার করার দিকে এগিয়ে যায়–ফলে অসম্ভব উঁচুতে লাফ দিতে পারে, আকাশে বিনা পাখায় উড়তে পারে, শূন্যে শয়ন করতে পারে।
স্ট্রিং পাপেটের সঠিক পরিচালনা করা বেশ কঠিন। অনেক দিনের অনুশীলনের প্রয়োজন হয় এবং পরিচালকের অভিনয় ক্ষমতা ও অঙ্গভঙ্গির চয়ন, চরিত্রের অনুভূতি ও উপমার উপর নির্ভর করে পাপেটের সঠিক রূপায়ণ। স্ট্রিং পাপেটের জন্যে বিশেষ ধরনের মঞ্চ প্রয়োজন। এতোগুলো সুতে। যথাযথভাবে ব্যবহার করা, ঠিক রাখা ইত্যাদি নানান কারণে স্টেজ শো ছাড়া এই ধরনের পাপেটে কাজ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। টেলিভিশনে এর ব্যবহার ব্যাপক হয়নি–কারণ ক্লোজ আপ শটের সময় সুতো বেশ বাধার সৃষ্টি করে। এই কারণেই টেলিভিশনে বড় পাপেটের ব্যবহারই প্রাধান্য পেয়েছে।
বড় পাপেট চালনা নিচের থেকে করা হয়। পাপেট চালক উপরের দিকে হাত তুলে পাপেট চালনা করেন। এতে কোনো সুতো থাকে না। শরীরের ভেতরেই বিভিন্ন পদ্ধতিতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়ানো হয়। তাছাড়া নিচ থেকে যে কোন প্রত্যঙ্গ নাড়ানো যেতে পারে। যে কোনো সাইজের হতে পারে এই পাপেট-মানুষের চেয়ে বড়ো সাইজও ব্যবহার হচ্ছে আজকাল। তবে দুই থেকে তিন ফুটের পাপেটই ব্যবহৃত হয় বেশি। এর বিশেষ সুবিধার দিকটি হলো যেকোনো মঞ্চে মানুষকে আড়াল করার জন্য একটা পর্দা থাকলেই এগুলোকে চালনা করা সম্ভব। এর গতি দেখানো বা স্থান পরিবর্তন দেখানো সামান্য দৌড়া দৌড়ির মাধ্যমেই সম্ভব। এই পাপেটে পোশাক পরিচ্ছদ সুষ্ঠুভাবে পরানো অনেক সহজ; স্ট্রিং পাপেটের মতো অতো অসুবিধাজনক নয়। বর্তমানে এই পাপেট সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করেছে। বিশেষ করে টেলিভিশনের জন্যে বড়ো পাপেট প্রায় সব দেশেই প্রাধান্য পেয়েছে। মস্কোতে বড়োদের জন্যে যে ক'টি পাপেট থিয়েটার আছে তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই বড়ো পাপেট ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশেও বড়ো পাপেটের মতো এক ধরনের পাপেট দেখেছি। ছোটোবেলায় বাঁকুড়ায় রাধাকৃষ্ণের গল্পের বর্ণনার জন্য এই ধরনের পাপেট ব্যবহার করতে দেখেছি। বাঁশের মাথায় প্রায় মানুষের আকারের এই ধরনের বিশাল পাপেট রাখা হয়। প্রতিটি পাপেটই দুজন বা তিনজনে অপারেট করে। ভারতের মেদিনীপুরেও এ ধরনের পাপেটের প্রচলন ছিল।
হাতের আঙুলের সাহায্যে সরাসরি যে পাপেটের মুখ হাত নাড়ানো হয়–সেগুলোকে বলা হয় ‘হাত পাপেট’ বা ‘গ্লোবস পাপেট’। এই পাপেট অপারেট করা সহজ, অল্পদিনের চেষ্টায়ই এই পাপেট চালনা আয়ত্তে আসে। ‘গ্লোবস পাপেটে’র শারীরিক গঠনের প্রেক্ষিতে এর মাধ্যমে কৌতুকপূর্ণ বা লঘু বিষয়বস্তুর উপস্থাপনাই উৎকৃষ্ট হয়। এর নির্মাণ কৌশলও সহজ, বিদেশে প্রায় প্রত্যেক স্কুলে এই ধরনের পাপেট গ্রুপ রয়েছে। এর পরিচালনা থেকে শুরু করে মঞ্চায়ন পর্যন্ত সবকিছুই করে ছাত্রেরা নিজেরা।
ভারত উপমহাদেশেও নানান ধরনের পাপেটের প্রচলন ছিল। সর্বত্রই লক্ষ করা যায় ধর্মীয় বিষয় বা ধর্মীয় গল্প বলাই এইসব পাপেটের একমাত্র উদ্দেশ্য। বিশেষ করে রামায়ণ মহাভারতের গল্পই সবচেয়ে বেশি অভিনীত হয়েছে।
বিভিন্ন দেশে যত রকম পাপেট সৃষ্টি হয়েছে–প্রত্যেকটিতেই নিজ নিজ দেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে তার চরিত্রগুলোর সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য, সব দেশের পাপেটের মধ্যে একটি বিষয়ে অদ্ভুত মিল রয়েছে–সেটি হলো, কোনো পাপেটই কোনো বিশেষ দেশের কৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকে না–সে সার্বজনীন হয়ে পড়ে। এর কারণ শরীরের গতি থেকে এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে যে ভাষার সৃষ্টি হয় তা সবদেশের। তা আন্তর্জাতিক। শুধু, ভাষাই নয়–চেহারা শরীর ও প্রকাশভঙ্গিসহ পুরো চালচলনে তারা বিশেষ দেশের বিশেষ নাগরিকত্ব হারিয়ে পৃথিবীর নাগরিক হয়ে যায়। কারণ সহজ অনুভূতি, সহজ সৌন্দর্য, চিরকালের সত্য ও মঙ্গল–এসব কোনো বিশেষ দেশের নয়–সারা বিশ্বের সম্পদ। বর্তমান বিশ্বে পাপেট তাই একটি ইউনিভার্সে'ল মাধ্যম।*
* [বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাপেট থিয়েটার প্রদর্শনীর পূর্বে প্রদত্ত ভাষণ।]