Published : 29 Jun 2026, 08:09 PM
চলে গেলেন আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। আজ ২৯ জুন সোমবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। সপ্তাহ দুয়েক সময় ধরে নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন এই শিল্পী। তাঁর পারিবারিক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে বিদেশে অবস্থানরত পুত্র আগামীকাল ৩০ জুন দেশে ফিরলে তাঁকে সমাহিত করা হবে। এর আগে সকাল ৯ টায় তাঁর দীর্ঘদিনের প্রিয় কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে প্রথম জানাজার জন্য তাঁর মরদেহ নেওয়া হবে। এরপর সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। বাদ যোহর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সবশেষে বনানী কবরস্থানে তাঁর মরদেহ সমাহিত হবে।
নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই শিল্পী। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে লাইফ সাপোর্টেও নেওয়া হয়েছিল। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও সম্প্রতি নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এ ছাড়া প্রোস্টেট ক্যানসারেও তিনি ভুগছিলেন।
মুস্তাফা মনোয়ার দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে এক অনন্য নাম। একাধারে চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী ও তাত্ত্বিক, সংগীত পরিচালক, অনুষ্ঠান সংগঠক, নাট্য নির্দেশক ও নির্মাতা, চলচ্চিত্রবোদ্ধা। সাহিত্যপাঠেও ছিলেন প্রবল অনুরাগী এবং অনুসন্ধিৎসু। রবীন্দ্র সাহিত্য ও সংগীতের এমন মুগ্ধ অনুরাগী ছিলেন, তাঁর সব আলোচনা কিংবা ভাষণে ঘুরে ফিরে রবীন্দ্র কথনের উদাহরণ চলে আসতো। কথা বলতেন আকর্ষণীয়ভাবে খুবই সহজ সরল শব্দ প্রয়োগে। ছোট বড় সবার কাছে ভারি উপভোগ্য ছিল তাঁর কথা।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর যশোরের মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তাঁর বাবা প্রয়াত বরেণ্য কবি গোলাম মোস্তফা এবং মায়ের নাম জমিলা খাতুন।
সেই ছেলেবেলা থেকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ ভক্ত তিনি। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের সময়কালে বাংলা ভাষার ওপর ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকারের আক্রমণকে মেনে নিতে পারেন নি। ৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনকালে তিনি নারায়ণগঞ্জ সরকারি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অবস্থায় আন্দোলনে যোগ দেন। ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।
১৯৫৪ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতা স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তে শুরু করলেও পরে তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৫৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক সমমানের ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকায় আর্ট কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে। জলরঙ চিত্ররচনায় ছিল তাঁর অসামান্য বুৎপত্তি! শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমেও তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল।

১৯৬৪ সালে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান টেলিভিশন যাত্রা শুরু করলে অনুষ্ঠান-পরিচালক হিসেবে তিনি এর প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মযজ্ঞে সামিল হন। ষাটের দশকে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের যুগে তাঁর নির্মিত নাটক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ অবলম্বনে নাটক ‘মুখরা রমনী বশীকরণ’ এবং ১৯৭৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘রক্তকরবী’ টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে অমর সৃজন হিসেবে সুধীমহলে স্বীকৃত। তিনি টেলিভিশনে শিশু-কিশোরদের জন্য অসংখ্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুনকুঁড়ি’ তাঁর ব্রেন-চাইল্ড বা পরিকল্পিত, যেটির জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বি! বিটিভির নামজাদা সব প্রযোজক, শিল্পনির্দেশক, ক্যামেরা পারসনসহ সব ক্ষেত্রের কলাকুশলীরা তাঁর কাছে শিখেছেন।
বাংলাদেশে পাপেট শো-এর পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁকে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থীশিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে তিনি প্রথম পাপেট শো করে মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির অধিকার আদায়ে দৃঢ় থাকতে তাঁদেরকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এ ছাড়াও আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়া চিত্রশিল্পীদের উদ্বুদ্ধ করে গণহত্যা নিয়ে তাঁদের আঁকা এবং ছবির প্রদর্শনী আয়োজনে কামরুল হাসানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইসহ বড় বড় শহরগুলোয় এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার পূজাসংখ্যায় শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ এর ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
সরকারি চাকরিজীবনে তিনি বিটিভির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, বিএফডিসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। তাঁরই পরিকল্পনায় ১৯৮৯ সালে বিটিভির পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী রামপুরা টিভি ভবনের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে দেশ বিদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন হয়, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ ডাকসু সাংস্কৃতিক দলের শিল্পীদের অংশগ্রহণে কবি শামসুর রাহমানের কবিতা অবলম্বনে আমার গ্রন্থনা ও ডাকসুর সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক শিল্পী অশোক কর্মকারের নির্দেশনায় নৃত্য-গীতি-আলেখ্য ‘স্বাধীনতা তুমি’র মঞ্চায়ন হয়। ভারতীয় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই এখানে সংগীত পরিবেশন করেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় আয়োজিত সাফ গেমস অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত ও রঙিনভাবে উপস্থাপনের জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় নির্মিত মাসকাট হরিনশাবক মিশুক ও ব্যঘ্রশাবক অদম্য দারুণ সাড়া জাগিয়েছিল! সচল প্রাণবন্ত মাসকাটের সঙ্গে রুনা লায়লার গান পুরো স্টেডিয়ামকে মাতিয়ে দিয়েছিল। একে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য পেছনের পরিকল্পক মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর ওই টিমে বিটিভির পরিচালক আনোয়ার হোসেন এবং আমিসহ অনেকেই যুক্ত ছিলাম।
১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল অব্দি সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন, এর পেছনে চারুশিল্পী সংসদের কার্টুন সম্বলিত ব্যানার পেইন্টিং ‘গরু সমাচার’--এর আঁকা রফিকুন নবীর হলেও এর যে ভাবনার সূত্র বের করা, এটির কৃতিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের। শহিদ মিনারের মা প্রতীকের পেছনে লালবৃত্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পেছনে দু'জন শিল্পীর অবদানের কথা জানা যায়। একজন ইমদাদ হোসেন ও অন্যজন মুস্তাফা মনোয়ার।
স্বাভাবিক কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বিটিভিতে ‘মনের কথা’ নামে শিশুদের সৃজনশীল জ্ঞান আহরণমূলক জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান নিয়মিত করতেন। তাঁর এই সৃজন কাজে যুক্ত হয়েছেন দেশের ছোট বড় অনেক সংস্কৃতিজন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন শিল্পিত উপায়ে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ রাতে পাকিস্তানি পতাকা না উড়ানোর ব্রত নিয়ে বাঙালির জাগরণের গান টিভিতে প্রচার করার অন্যতম কুশীলব ছিলেন তিনি।
তাঁর সঙ্গে আমাদের অসংখ্য স্মৃতি। ২০১৪ সালে তৎকালীন মহাপরিচালক কবি আসাদ মান্নানের অনুরোধে বিটিভির পঞ্চাশ বছর পূর্তির লোগো করেছিলেন তিনি। আমাদের শিল্পনির্দেশনা শাখার আয়োজনে আর্টক্যাম্পে যোগ দিয়ে তিনি ছবি এঁকেছেন, অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের উৎসাহ যুগিয়েছেন।
সংস্কৃতি অঙ্গনে অসামান্য সব অবদান তাঁর। এজন্য ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে ‘সুলতান স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। দুঃখজনক হলো- কোন সরকারই এই বরেণ্য সংস্কৃতিজনকে স্বাধীনতা পদক দেন নি!
তবে গুণি এই মানুষটির যুগান্তকারী সব সৃজন, শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য পাপেট শো, নতুন কুঁড়ি ও আমাদের কথা অনুষ্ঠানসহ বাঙালির রুচি নির্মাণের সব কাজগুলো আমাদের ক্ষণে ক্ষণে মনে করাবে তাঁর প্রসঙ্গ।