Published : 20 Mar 2026, 11:55 PM
‘আজ ঈদ, মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ’, ছোটবেলায় পড়া গল্পের অপূর্ব এই বাক্য এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে ঈদ এলে। গল্পটি নবী করিম হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মহানুভবতার বিষয় নিয়ে। ঈদের নামাজ শেষ করে তিনি দেখলেন ঈদের নতুন জামা গায়ে দিয়ে সবাই মিলে আনন্দ করছে, কোলাকুলি করছে, শিশুরাও আনন্দে মেতে আছে, শুধু একটি ছেলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একা একা কাঁদছে। নবী করিম তার কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, তুমি কাঁদছো কেন? ছেলেটি বলল, আমরা খুব গরিব, বাবা ঈদের নতুন জামা কিনে দেননি।
নবী করিম ছেলেটির সাথে তাদের বাড়িতে গেলেন এবং তার বাবা-মাকেসহ নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। তাদের অনেক মজার মজার খাবার খাওয়ালেন, নতুন জামা উপহার দিলেন।
নবী করিম (সাঃ) মদিনায় হিজরতে গেছেন ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। ধরা যাক গল্পটি আর দুবছর পরের। অর্থাৎ ৬২৬-এর। এখন দুনিয়াতে চলছে ২০২৬ সাল। ঠিক ১৪০০ বছর পরে বর্তমান মুসলিম জাহানের কী অবস্থা! আজ (২০ মার্চ) সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিস্তিন, বাহরাইন, লেবানন, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতর উদ্যাপন হচ্ছে। কিন্তু সমগ্র মধ্যাপ্রাচ্য জুড়ে ইরান-যুদ্ধাতঙ্কের মাঝে এবারের ঈদ আসলে কেমন হবে? মদিনার ঘরে ঘরে কি আনন্দ আছে?
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমান- এই ৬টি পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইতোমধ্যেই ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নিজেদের রক্ষায় প্রয়োজন হলে তারা সব ধরনের ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে। অর্থাৎ প্রয়োজনে ইরানে হামলা করবে। অর্থাৎ তারা স্বগোত্রের মুসলিম ভাইদের পক্ষ না নিয়ে পক্ষ নিচ্ছে ভিন্ন গোত্রের আমেরিকা-ইসরায়েলের।
ওমান, বাহরাইন, আরব-আমিরাত জানিয়েছে তারা এবার বড় পরিসরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত করবে না। খোলা জায়গায় ঈদের নামাজ হবে না। মসজিদে মসজিদে হবে। এই দেশগুলো না-হয় কোনোভাবে মসজিদে হলেও ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত করতে পারবে, যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরান ও ফিলিস্তিন কি তাও পারবে?
জানা গেছে, ইরানে ঈদ অনুষ্ঠিত হবে ২১ মার্চ, শনিবার। সেদিন বাংলাদেশেও ঈদ উদযাপিত হবে। ইরান-যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব হয়তো বাংলাদেশে তত পড়বে না, পড়বে অনেকখানি অর্থনৈতিক ও মানসিক। অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে, একে তো, তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাবার কারণে সবরকম পণ্যমূল্য বাড়বে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ থাকেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, ফলে একদিকে যেমন প্রবাসী আয় কমবে, আরেক দিকে আয়ের চেয়ে বেশী মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশীদের জীবন নিয়েই নানারকম শঙ্কা আছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে এ-পর্যন্ত ৪ বাংলাদেশী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৪জন। লেবাননে বসবাসরত বাংলাদেশীরাও প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছেন। ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এর মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৮৫০ জন মারা গেছে বলে জানা গেছে। ইরানে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৮৬জনে। এর মধ্যে ২১০জন শিশু।
এই হত্যা ও রক্তপাতের মধ্যে মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ থাকে কী করে? মদিনার ঘরে ঘরে বলতে এখানে শুধু মদিনার ঘরই বোঝানো হচ্ছে না, যেহেতু ইসলামের বড় জাগরণ শুরু হয়েছে মদিনা থেকে সেহেতু প্রতীকী অর্থে মুসলিম জাহানের প্রতিটি শহরকেই আজ মদিনা বলা যায়। তেহরান ও বৈরুত যখন পুড়ছে তখন মক্কা-মদিনায় ঈদ কেমন হবে? কিংবা ধরা যাক এই দূরপ্রাচ্যের ঢাকা শহরের কথাই। বলছিলাম মানসিক প্রভাব পড়ার কথা। একই সম্প্রদায় ‘মুসলিম’ বলে না, বরং ‘মানুষ’ বলেই তো মানুষ-হত্যার বিষয়টি যে-কাউকে শোকার্ত করে। এখন দুনিয়া এমন হাতের মুঠোয়, কে কত দূরে থাকে, তা কোনো বিষয় না। হয়তো ঈদের দিন সকালে সেমাই খেতে বসে টিভিতে বা মোবাইলে দেখব ইরানে বোম পড়ছে, হতাহত হচ্ছে আরো কিছু মানুষ- সংখ্যা বাড়ছে আরো কিছু মৃত-শিশুর- তাতে আমাদের সেমাই খাওয়া কেমন হবে!
এক সময় মানুষের জীবন ছিল নিজের গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ে এসে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়ানো। কাছাকাছি কোনো খারাপ খবর না ঘটলে সাথে সাথে তার মানসিক শান্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। আর এখন? যেখানেই যে-খারাপ ঘটনা ঘটুক, টেলিভিশন-মোবাইল-ফেসবুকের কারণে মুহূর্তেই তা জানা হয়ে যায়। হত্যা, মৃত্যুর মতো খবর- যত দূরের মানুষের জীবনেই ঘটুক, জানা হলে মনটা খারাপ হয়ই। এর মধ্যে যদি যুদ্ধ চলে তাহলে তো কথাই নেই, সারাক্ষণই আতঙ্কিত হয়ে থাকতে হয় কখন কী ঘটে!
বাংলাদেশে যুদ্ধ নেই, তাও যে ঈদের দিন ঘরে ঘরে খুব আনন্দ হয়, তাও না। ঈদ একটা পবিত্র ব্যাপার- তাই মনে আনন্দ না থাকলেও উপরে উপরে তা দেখাতে হয়। এ-দেশে ঈদের সেই ঐতিহ্যবাহী উৎসব আর কিছুই নেই তেমন। এক সময় ঈদ উপলক্ষে মেলা হতো, অনেক গ্রামে নাটক-গান-যাত্রাপালার আয়োজনও হতো। সেসব উঠে গেছে অনেক আগেই। অনেক গ্রামে ঈদ উপলক্ষে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ, কাবাডি খেলা হতো- সেসবও কমে গেছে। জান হাতে নিয়ে শহর থেকে গ্রামে ছুটে যাওয়া হয়তো আছে, সীমিত পরিসরে আছে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়ানো, কিন্তু এই উচ্চমূল্যের বাজারে, যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে- সেসবই-বা কতটা আনন্দের সাথে করতে পারে মানুষ? জানে তো, যেভাবেই হোক, কিছু টাকা যোগাড় করে নতুন জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিশপত্র কিনে কোনো রকমে বাড়ি ছুটে যাওয়া, শহরে ফিরে আসার পরই শুরু হবে আবার নতুন জীবনযুদ্ধ। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব হয়তো এখনো ততটা পড়েনি বাংলাদেশে, পড়বে শীঘ্রই।
তাও এই আনন্দের দিনে আমরা কোনো আতঙ্কের কথা বলতে চাই না। আমরা চাই সবার শুভ হোক, মঙ্গল হোক। রবীঠাকুরের সুরে-বাণীতে গাইতে চাই-
“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।”
ঈদ মোবারক।