Published : 26 Mar 2026, 04:02 PM
এক মর্মান্তিক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবসের সূচনা হলো। নিন্দুকেরা প্রশ্ন করতে পারেন, সড়ক দুর্ঘটনার সাথে স্বাধীনতা দিবসের সম্পর্ক কী? তাদের জন্য ব্যাখ্যার অবকাশ আছে।
এবার ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২০০জনের অধিক মানুষ। এটা হচ্ছে একটা দেশের বিশৃঙ্খলার প্রথম উদাহরণ। সমাজ-রাষ্ট্রের যে-কোনো বিশৃঙ্খলার প্রথম দৃষ্টান্ত রাস্তা-ঘাটে-সড়কে দৃশ্যমান হয়। আমাদের সড়ক নিরাপদ না মানে আমাদের রাষ্ট্রের অনেক কিছুই এখনো অনিরাপদ। নিরাপত্তার প্রাথমিক শর্ত সমাজ-রাষ্ট্রের সমস্ত কিছুতে শৃঙ্খলাবোধ। ৫৫ বছরেও যে আমাদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ গড়ে উঠল না তার কারণ কী?
কারণগুলো অনুসন্ধান গবেষণার বিষয়। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগে আমরা আমাদের স্বাধীনতার ফলাফলও চিহ্নিত করতে পারব না। স্বাধীনতা মানে শুধু একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড না, যে-ভূখণ্ড আমরা প্রয়োজনে যেভাবে খুশি লুটপাট করব। বিগত ৫৫ বছরে আমরা দেখেছি এ-দেশ হয়েছে কতিপয়ের লুটপাটের আখড়া। যখনই যে-রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, যেভাবে পেরেছে এই দেশের সম্পদ লুটপাট কর আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। অনেকে এত বিপুল সম্পদ লুট করেছে যে সেসব দেশে রাখতেও ভয় পেয়েছে, বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। এবং এই সম্পদ লুট করতে গিয়ে যতরকম দুর্নীতি করা যায়, তারা করেছে। দেশের শিক্ষা-চিকিৎসাব্যবস্থার কোমড় ভেঙ্গে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে আবহমান বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির মাজাও ভেঙ্গে দিয়েছে। লুটপাটের স্বার্থে যত সব অপসংস্কৃতি আমদানি করা যায়, করেছে। ফলে ৫৫ বছরে বাংলাদেশ হয়ে গেছে তার ভূমিপুত্রদের কাছে অচেনা এক ভূমি। দেশমাতৃকা বলতে যা বোঝায় তা বোধহয় এ-দেশ আর নেই তার সন্তানদের কাছে। যদি তা হতো তাহলে এ-দেশের ছেলেমেয়েরা আজ জান হাতে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে এত ব্যতিব্যস্ত হতো না।
পদে পদে অনিরাপত্তা, অনিশ্চয়তা- দেশ ছেড়ে না গিয়েই-বা করবে কী! লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নেই, রাস্তায় বেরোলে জীবনের নিশ্চয়তা নেই, চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই- এমনকি, একটা খাবার খাবে, তারও যথাযথ স্বাস্থ্যমান নেই, প্রতিটা খাবার বিষাক্ত, এ দেশের বায়ু দূষিত, পানি দূষিত- এ দেশে মানুষ থাকবে কেন!
তখন রুমীর কথা খুব মনে পড়ে। শাফী ইমাম রুমীর কথা। ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আমেরিকা না গিয়ে যুদ্ধে গেলেন এবং শহীদ হলেন। বেঁচে থাকলে বিরাট ইঞ্জিনিয়ার হতেন। আজ তার বয়স হতো ৭৫। তার বয়সী অনেক মানুষ আজও দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন। কিন্তু রুমী এবং রুমীর মতো অনেকে এ-দেশের কথা ভেবে জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেই দেশের আজ এই পরিনতি! আজ এ-দেশের ছেলেমেয়েরা দেশ ছেড়ে পালাতে পারলে বাঁচে!
নতুন এক দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে অভূতপূর্ব এক গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে, যেমনটা হয়েছিল ১৯৯০-এ, এবং ১৯৬৯-এ। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এক অর্থে স্বাধীন এক দেশ এনে দেয়, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানও নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা করে, যেমনটা অনেকটা ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানও করে। কিন্তু, রাষ্ট্রের খোলনলচে অনেকটা সেই পুরনো বন্দোবস্তের মতোই থেকে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো থেকে যায় পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মতোই, যে-পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা থেকে গিয়েছিল অনেকটা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের মতোই। তার মানে মুক্তির প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হলেও জনগণের প্রকৃত মুক্তি আসলে কোনো কালেই আসেনি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও আমরা নতুন বন্দোবস্তের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু তা চোখে দেখিনি।
এ-প্রসঙ্গে আশরাফ সিদ্দিকীর তালেব মাস্টার কবিতাটি মনে পড়ে:
দেশে আসল কংগ্রেস, স্বদেশী আন্দোলন
মহাত্মার অনশন! দেশব্যাপী সে কী আলোড়ন
খিলাফতের ঝড় বইছে এলোমেলো
খড়ো ঘরে ছাত্র পড়াই আর ভাবি: এই সুদিন এল!
তাল সোনাপুরের তালেব মাস্টার বারবারই আশা করেন, এই বুঝি সুদিন এল! কিন্তু সুদিন আর আসে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যেন এ-কথা সত্য, আমরা সবাই আশায় আশায় থাকি, এই বুঝি সুদিন এল! কিন্তু প্রতিবারই আমরা হতাশ হই।
২.
কিন্তু সমস্যাটা আসলে কোথায়? সমাধানের পথই-বা কী? শুধু সমস্যার কথা বললেই তো হবে না, সমাধানের পথও খুঁজতে হবে। সমস্যা যে আছে তা সবাই জানে, সমাধানের উপায় তো কেউ জানে না।
আসলে সমস্যাগুলোও হয়তো আমরা ঠিক মতো চিহ্নিত করতে পারি নাই। সমাধানের প্রাথমিক শর্ত আগে সমস্যা চিহ্নিতকরণ। সমস্যা চিহ্নিত করতে পারলে সমাধানের একটা পথও বেরোয়। আমরা হয়তো এখনো সমস্যাগুলোই ঠিক মতো চিহ্নিত করতে পারি নাই। যে-সমস্যাগুলো বিরাজমান সে-গুলোকে হয়তো আমরা আদতে সমস্যাই মনে করি না। সমস্যা মনে করলে তো সমাধানের উপায় খুঁজতাম। আমাদের মধ্যে কি উত্তরণের, অন্বেষণেরও কোনো লক্ষণ আছে? এই যে এক ঈদে ২০০-এর অধিক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনা মারা গেলেন, এটা হয়তো আমাদের কাছে কোনো সমস্যাই না। এরকম তো আগেও হয়েছে। প্রতিবারই আগের বছরের রেকর্ড ভেঙ্গেছে, তাতেও কি আমাদের হুঁশ ফিরেছে? এই যে বিগত গণ-অভ্যুত্থানে দেড়-হাজারের মতো মানুষ শহীদ হলেন, আরো হাজার হাজার মানুষ আহত হলেন, তাতে আমাদের কী বোধোদয় হয়েছে? এরপরও কি আমরা দেখিনি দেশজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা? হানাহানি, রক্তপাত? মব-সন্ত্রাসের নামে দেশজুড়ে অসংখ্য ভয়াবহ হামলার ঘটনার কি সাক্ষী হইনি আমরা? আমরা কি তারপরও দেখিনি আমাদের রাজনীতিবিদরা যা খুশি তা-ই বলছেন?
একটা নির্বাচন হয়ে গেছে মাত্র দেড় মাস হয়, যে-নির্বাচন তাদের কাছেই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত যারা এবার সরকার ও বিরোধী দল হয়ে সংসদে বসেছেন, কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আমরা কত হাস্যকর কাণ্ডকারখানা দেখলাম- সংসদ অধিবেশনে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন না, অর্থাৎ জাতীয় সংগীতকে শ্রদ্ধা জানালেন না- অর্থাৎ, বাংলাদেশের সার্বেভৌমত্বকেই তারা অস্বীকার করলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন। স্বাধীনতার প্রশ্নটি মীমাংসা না করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ না করে বাংলাদেশ তো এক পা-ও সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। দুঃখ হচ্ছে এই, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেছিলেন তারাও মুক্তিযুদ্ধের সাথে এক প্রকার বেঈমানী করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ না করে তারা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ব্যবসা করেছেন। যার কারণে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীরাও একটা সুযোগ পেয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাচ্ছেতাই প্রশ্ন তোলার। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তো কোনো দলের না, মুক্তিযুদ্ধ এ-দেশের সমস্ত মুক্তিকামী জনতার। মুক্তিযুদ্ধ এক গৌরবোজ্জ্বল জনযুদ্ধ। এটা শুধু একটা দেশ থেকে আলাদা হওয়ার বিষয় ছিল না, একটা নির্দিষ্ট নিজস্ব ভূখন্ড পাওয়ার বিষয় ছিল না- মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে, ঔপনিবেশিক, সাম্প্রদায়িক চিন্তার দাসত্ব থেকে আপাময় জনসাধারণের সর্বপ্রকার মানবিক মুক্তি। মুক্তিযুদ্ধ দিয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ডাক।
সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার আজও আমাদের সমাজে-রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং দিন দিন আমাদের জাতির আত্মা কলুষিত, দূষিত, বিষাক্ত হয়ে গেছে। জাতির আত্মা যখন নষ্ট হয়ে যায় তখনই ঘটে এ-ধরনের ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। কেউই তখন সুশৃ্ঙ্খলায় থাকে না। কিছুই তখন শৃঙ্খলামতো চলে না। শৃঙ্খলা একটি চেইন অব কমান্ড। শৃঙ্খলা যদি থাকে তাহলে সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বস্তরে থাকবে, না-হলে কোথাও থাকবে না।
বাংলাদেশে বছরে পাঁচ-সাত হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। আপনি কি মনে করেন এসব শুধু চালকদের বেপরোয়া মনোভাব আর অতিরিক্ত গতির কারণে? না। এ গতি তারা পায় কোথায় এবং কীভাবে? এ সমাজ থেকেই। সমাজই লাগামছাড়া গতিশীল, গরিব ড্রাইভারকে দোষ দিয়ে লাভ কী! দোষটা কি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর? তাও না, ওই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টিও এই সমাজেই। সমাজের প্রতিটা বিশৃঙ্খলার জন্য প্রতিটা মানুষ দায়ী, আর আমি নিজে সবচেয়ে বেশি দায়ী। আমি সচেতন হই নাই, অন্যকেও সচেতন করি নাই, আমি আমার দায়িত্ব পালন করি নাই। এবং তার জন্য আমার নিজের মৃত্যুও যখন একদিন এমন অতর্কিতে নেমে আসবে তার জন্যও আমি কাউকে দোষ দিতে পারব না।
আমরা সবাই যদি সাবধান না হই এবং অন্যকে সাবধান না করি এসব ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে আমরা বাঁচব না। তেমনি আমাদের সবার আত্মাই যদি শুদ্ধ করে গড়ে না তুলি তাহলে এ দেশের আত্মাও কোনোদিন শুদ্ধ হবে না। আত্মা শুদ্ধ বলতে কেবল ধর্মীয় আচার পালন করা না, বরং রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা পালন করা, মানবিক বোধ জাগ্রত করাই প্রধান ধর্ম।