Published : 20 Jun 2021, 02:12 PM

সমকালীন চিন্তাজগতে উত্তরাধুনিকতাবাদ বা পোস্টমর্ডানিজম এক জনপ্রিয় এবং একইসাথে বিতর্কিত শব্দ। বিতর্কিত হওয়ার পেছনে নানা কারণ নানাজনের কথায় নানাভাবে আলোচিত হয়েছে; কিন্তু শতচেষ্টাতেও যে একে অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করা যাবে না সেটা বোধকরি সকলেই মেনে নিয়েছে। শুরু হয়েছিল বিগত কয়েক দশকের সাহিত্য আলোচনা থেকে, যেখানে বিশেষকরে ইউরোপীয় রেনেসাঁ পরবর্তী সময়কালের অনেক শিল্পকলা ও সাহিত্যকে যুক্তিবাদের ঘেরাটোপ থেকে আলাদা করার প্রতিবাদী প্রয়াসটি ছিল মূখ্য। সত্যকে উপলব্ধি করবার জন্য যুক্তি এক অবলম্বন বটে, তবে কোনোভাবেই তা একমাত্র অবলম্বন না। সতেরো থেকে আঠারো শতক― প্রায় শতাব্দিব্যাপী কান্ট, ভলতেয়ার, দিদেরো, লক কিংবা হিউমদের মতো দার্শনিকদের প্রভাবে কট্টর যুক্তিবাদ মানুষের মনোজগতের দখল নিতে সক্ষম হয়। ইউরোপে জন্ম হলেও ক্রমশ তা অন্যান্য মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। পদার্থ বিজ্ঞানে নিউটনীয় জড়বিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে মার্কসের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের তখন জয় জয়কার। সনাতনী ঐতিহ্য, অন্ধ অনুকরণ, জীর্ণ আচার, ধর্মীয় অনুশাসন ও নিষেধাজ্ঞার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের বিপরীতে যুক্তিবাদের এই যাত্রাকে মনে করা হতো আলোকের পথে যাত্রা, যার আরেক নাম আধুনিকতাবাদ। কিন্তু দেরিদা বা মিশেল ফুকোর মতো ভাববাদীরা তাতে সন্তুষ্টু থাকতে পারেনি। ফলে, আধুনিকতাবাদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল তাদের আক্রমণ। তাদের কথা: আধুনিকতাবাদের আড়ালে বহুত্বকে অস্বীকার করা হচ্ছে, সত্যকে জানবার অন্যান্য জানালাগুলো রুদ্ধ করা হচ্ছে। বস্তুবাদী অধিআখ্যান বা মেটান্যারেটিভে ব্যাখ্যা করবার এবং পুনর্নিশ্চয়তা প্রদানের সুযোগ আছে, কিন্তু অস্বীকার করবার রাস্তাটি একেবারেই বন্ধ। অধিকন্তু, বাইবেলের মতো যুক্তিবিদ্যার পাঠগুলোও একধরণের চিরস্থায়ীত্বের দাবি করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।এর বিপরীতে উত্তরাধুনিকতাবাদের দাবিটি ছিল স্পষ্ট: ধ্রুবতার যে কোনো আবেদন তা সেটা ভাবজগতের হোক কি ব্স্তুজগতের, তাকে অস্বীকার করাই কেবল না, তার বিপরীতে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোও দর্শক বা পাঠকের দরবারে হাজির করতে হবে। এটা করতে গিয়ে বস্তুবাদীদের সামনে লোকসানের এক হিসেব হাজির হয়, না হয়ে কোনো উপায় থাকে না। কারণ, সমাজ সংগঠনে মানবপ্রজাতি যে অবলম্বনগুলোকে বরাবর ব্যবহার করেছে, তার জন্ম মানুষের কল্পলোকে, ইতিহাসের অধ্যাপক এবং বর্তমান সময়ের আলোচিত দার্শনিক ইউভাল নোয়া হারারি যার নাম দিয়েছে কল্পিত বাস্তবতা বা ফিকশন। পরিবার হোক কি জাতীয়তা কি ধর্ম, এর সূচনাটি হয় মানুষের কল্পলোকে সৃষ্ট গল্প বা ফিকশন থেকে। নৈতিকতা সত্য-মিথ্যা ভালো-মন্দ সবই সেই কল্পিত গল্পের একেকটি অনুষঙ্গ, মানুষের মনোজগত যাকে গ্রহন করবে, যাকে বিশ্বাস করবে, সেটিই টিকে থাকবে। আর যা বর্জন করবে, তা ইতিহাসের পাতায় প্রত্ন হিসেবে স্থান নেবে। বস্তুজগতের লোকসান হচ্ছে সেই প্রত্ন বিশেষ, যার কোনো ব্যবহারিক মূল্য নাই। ভারতীয় সমাজে একসময় বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কড়ির একটা কদর ছিল, পরে ধাতব মুদ্রা এবং শেষে কাগজের মুদ্রা এসে তাকে স্থলাভিষিক্ত করে। কড়ি, ধাতব কিংবা কাগজের মুদ্রা ততক্ষণই ব্যবহারযোগ্য যতক্ষণ এর পেছনের গল্পটিকে মানুষ বিশ্বাস করে। গল্পের উপর বিশ্বাস চলে গেলে তার আর দাম থাকে না। বাস্তবতার সাথে কল্পিত বাস্তবতার যে তফাৎ, সেটাই তখন তার লোকসান।বলা বাহুল্য, আগের যুগের ভাববাদীদের মতো আধুনিক যুগের যুক্তিবাদীরা এই লোকসান মানতে রাজি ছিল না। সেজন্য, উত্তরাধুনিকতাবাদীদের তারা নয়া ভাববাদী ও পশ্চাতপদ বলে তিরষ্কার করে থাকে।
পাপড়ি রহমানের 'নদীধারা আবাসিক এলাকা' উপন্যাসের পাঠ নিতে গিয়ে উত্তরাধুনিকতার এই ব্যাখ্যাটি হাজির করতে হলো। কারণ, এই গল্পের পরতে পরতে উত্তরাধুনিকতার উপাদানগুলো এমনভাবে লুকিয়ে আছে যে, আলোচনার সুবিধার্থে এর প্রেক্ষাপট ও বিবেচনাগুলোকে মাথায় না রেখে উপায় নেই। তার আগে উপন্যাসটি নিয়ে কিছু বলা দরকার। গল্পটি পড়া শুরু করলে অনেক পাঠকের কাছে একে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের এক নবতর সংযোগ বলে মনে হতে পারে। আর কারো কাছে না হোক, আমার কাছে সেটাই মনে হয়েছে। পাপড়ি রহমান সচেতনভাবে ইলিয়াসকে অনুসরণ করেন কি না, সে আলাদা প্রশ্ন। বর্ণনারীতিতে তেমন অনুসরণ সচেতন কোনো পাপ না। তবে, বেনিফিট অব ডাউট তাঁর পক্ষে যাবে নিঃসন্দেহে; কারণ, কিছুদূর অতিক্রম করার পরে পাঠকদের এটা বুঝে নিতে অসুবিধে হবে না যে, পাপড়ি রহমান আসলে স্বতন্ত্র একটা ধারা তৈরীর প্রয়াসে লিপ্ত। সেই চেষ্টাকে আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। এর একটা কারণ তো অবশ্যই এটা যে, ইলিয়াস-পরবর্তী একটা দীর্ঘ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মানের দিক দিয়ে না হলেও ভাষার বৈচিত্রের দিক দিয়ে বেশ পিছিয়ে পড়ছিল। অধুনা, যাঁদের লেখা সেই অভাব পুরণে এগিয়ে এসেছে বলে মনে হচ্ছে, নিঃসন্দেহে পাপড়ি রহমান তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
জীব মাত্রই সম্প্রসারণশীল বিশ্বজগতের এমন এক উপাদান যা বিবর্তনের স্রোতে ভেসে চলে; কেউ টিকে থাকে, কেউ বা হারিয়ে যায়। জীবের মতো জড়জগতকেও সেই সত্য স্বীকার করে চলতে হয়; টিকে থাকার সংগ্রাম সেখানেও ক্রিয়াশীল, আমাদের অভিজ্ঞতায় তারা হয়তো সেভাবে ধরা পড়ে না। অন্যদের বেলায় যাই ঘটুক না কেন, নদীর বেলায় টিকে থাকার সংগ্রামটি কিন্তু যে কারো নজরে পড়তে বাধ্য। যদিও জড়ত্ব হচ্ছে নদীর এক বড় বৈশিষ্ট; কিন্তু, কে জানে কোন দুঃসাহসে সেই নদী জীবজগতের আজন্ম অহংকারে হানা দেয়, জানিয়ে দেয় এমন এক অস্তিত্বের কথা, যা সেই জগতের একান্ত নিজস্ব। তার নাম মৃত্যু। জীবমাত্র মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হয়; কিন্তু নদীর যে মরণ হয়, তাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? এই ব্যাখ্যাতিত জগতটি উত্তরাধুনিকতার অন্তর্গত বিষয়। পাপড়ি রহমান খুব সচেতনভাবে নদীর এক চলন্ত জীবনের ছবি আঁকেন, নদীধারা শব্দের মধ্য দিয়ে তিনি বুড়িগঙ্গা নামক নদীটির বুকের উপর অবলিলায় কেবল নগরের একাংশ নয়, পুরো ঢাকা শহরের অবয়বকে শুয়ে থাকতে দেখেন। ঢাকা মহানগর পুরুষ তো বুড়িগঙ্গা নদী নারী―; এভাবে কল্পিত বাস্তবতায় নগর ও নদী উভয়ে প্রাণময় হয়ে ওঠে। প্রাণ দেয়ার অধিকার তখন আর বিধাতার একার হাতে থাকে না, লেখক তখন বিধাতার প্রতিরূপ। একইকারণে, সদরঘাট, আলমটাওয়ার ঘাট, নাগরমহল ঘাট, ইস্পাহানি-ময়লার ঘাট, কোচিশাহ ঘাট নামের ঘাটগুলো তখন আর স্রেফ ঘাট থাকে না, তারাও জীবন্ত বুড়িগঙ্গার সঙ্গীর মতো জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই সঙ্গী ছাড়া ঢাকার বুড়িগঙ্গাকে কি কল্পনা করা সম্ভব? আধুনিকতার যুক্তি বিচারে বুড়িগঙ্গা নামের নদী কিংবা এর তীরের অসংখ্য ঘাট এক নিরেট বস্তুবাদি বাস্তবতা মাত্র; কিন্তু লেখকের কল্পনায় এদের রূপটি আর জড়তার মধ্যে আটকে থাকে না, প্রাণহীন নদী আর নদী তীরবর্তী ঘাটগুলোর শরীরের সাথে আত্মা যুক্ত হয়, তারা হয়ে পড়ে সচল, জীবনসংগ্রামে টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা তখন তাদের বুকে খেলা করে। 'ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে, বল কোথায় তোমার দেশ, তোমার নাইকো চলার শেষ…' হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এই গান শুনে কে বলবে তা জড়জগতের এক বস্তুকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া। "নদীধারা আবাসিক এলাকা" উপন্যাসে বুড়িগঙ্গার প্রীতির দিকটি কেবল না, এর বিপরীত রূপটিও ধরা পড়েছে কোথাও না কোথাও। লেখক লিখছেন: "জলদানোর রন্ধ্রে-রন্ধ্রে জলবিষ। এই জলবিষ ঢেলেই সে হরণ করতে পারে প্রাণ। থামিয়ে দিতে পারে মানুষের কোলাহল। এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিতে পারে শত-সহস্র জীবনপ্রদীপ। প্রাণ হরণ করার তীব্র উল্লাস নদীর চাইতে কে আর বেশি জানে?"
তো লেখকের কল্পনায় বুড়িগঙ্গা না হয় জৈবিক বাস্তবতায় উন্নীত হলো; কিন্তু কেবল জৈবিক বাস্তবতা দিয়ে তো পুরো গল্প হয় না, কল্পিত বাস্তবতাও লাগে। সেজন্য, আর সকল গল্পের মতো এই গল্পেও সমাজ, সংসার, নগর, মহল্লা, আইন-কানুন, সত্য-মিথ্যা, বিবেক, নৈতিকতার মতো উপাদানগুলো হাজির। মানুষ, পশু-পাখি কিংবা মাছের মতো জৈবিক বাস্তবতার অনেক চরিত্রের সাথে মিলেমিশে এরা গল্পের হাট বসায়। পুরাণ বলি কি আধুনিকতা, গল্পে এসব জৈবিক উপাদান না থাকলে চলে না। পুরাণ অবশ্য বাড়তি হিসেবে দেবতা ও দানবের কথা বলে, স্বর্গ ও নরকের কথা বলে এবং আরো বলে যে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যজগতে যা কিছু আছে তার পেছনে ক্রিয়া করে এক নিরাকার এবং অহংকারী সত্ত্বা। পুরাণের গল্প এঁকে আমাদের কাছে ইশ্বর বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। আধুনিকতাবাদ এসব মানতে নারাজ। তাদের কথা: দেবতা ও দানব এবং তাদেরকে ঘিরে রচিত গল্পগুলো স্রেফ বাত-কি-বাত, ওসবে পাত্তা দিলে চলবে কেন? এই বিতর্ক অতি প্রাচীন, উত্তরাধুনিকতা সযত্নে এই বিতর্ককে পাশ কাটাতে চেয়েছে। সেজন্য, পুরাণ যে বিষয়গুলোকে ঐশ্বরিক বিবেচনা করে কিংবা আধুনিকতা যে বিষয়গুলোকে বৈজ্ঞানিক বিবেচনা করে ধ্রুবতার পক্ষে সাফাই গায়, উত্তরাধুনিকতা সেই একই বিষয়গুলোকে ধ্রুবতার জায়গা থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে উদ্যত হয়। ঐশ্বরিক বিচারে পরিবার গঠনের আবশ্যিকতা অথবা বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদীতা বিচারে পরিবার গঠনের অপ্রয়োজনীয়তার বিপরীতে উত্তরাধুনিকতা উপস্থিত করে সংসার ভাঙা-গড়ার এক নিত্য আয়োজন। কল্পিত বাস্তবতায় আঁকা অন্যান্য সকল গল্পের ভাঙাচুড়ার মতো তখন সংসার নামক নিত্য প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গটিও বারবার ভাঙনের মুখে পড়ে। ভাঙে আর গড়ে। আর এই খেলায় কখনো সে প্রাণবন্ত তো পরক্ষণেই বেদনায় কালো। ঠিক নদীর জলের মতো। পাপড়ি রহমানের গল্পে বুড়িগঙ্গা নদীর জলের রঙ কালো হয়ে যায় কোনো এক অব্যক্ত যন্ত্রণায়। নাগরিক পাপ তাকেও স্পর্শ করে। এ যেন জালালুদ্দিন রুমির সেই বাঁশির রূপকল্পনা, মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রুমির বাঁশি করুণ সুরে কাঁদে, আর নাগরিক পাপে পাপড়ি রহমানের বুড়িগঙ্গা তার জীবনস্রোত হারিয়ে ফেলে। এই বিবেচনায় রুমির আর পাপড়ি রহমানের ভাবনা কাছাকাছি, কিন্তু বৈশিষ্টের দিক থেকে দুটো পুরোপুরি আলাদা। প্রথমটিতে রুমির বাঁশি ইশ্বরের সাথে মানুষের বিচ্ছেদের ছবি আঁকে, অপরদিকে পাপড়ি রহমানের বুড়িগঙ্গা স্বয়ম্ভু; সে তার নিজের দায়েই কাঁদে। উত্তরাধুনিকতার সৌন্দর্যটা এখানেই। কেবল নদী না, উপন্যাসটি জমজমাট হয়ে থাকে অনেক পরিবারের গল্পে, যেখানে ভাঙা-গড়া এক নিত্য খেলা। পরিবারগুলো কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না, ঐশ্বরিক গল্পে তাদের প্রচন্ড আস্থা। কিন্তু তাতে কী? ভাঙা-গড়ার খেলায় কল্পিত বাস্তবতার ঐশ্বরিক গল্পগুলো ওই পরিবারের সদস্যদের কোনো কাজেই লাগে না। বরং, সমাজের বিবর্তনকে ঘিরে যে নয়া বাস্তবতা নিরন্তর চোখের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে, তার সাথে খাপ খাওয়াটাই যেন প্রধান চ্যালেঞ্জরূপে হাজির হয়। লেখক হিসেবে পাপড়ি রহমানের দক্ষতাটা এখানেই। এক অনন্য উচ্চতায় সংসারের এই মহাবিচিত্র রূপটি তিনি এঁকে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।
নদীধারা আবাসিক এলাকা উপন্যাসে নদীর মতো নারী চরিত্রগুলোও মূখ্য। নদী ও নারীর কল্পনা বাঙলা সাহিত্যের অনন্য বৈশিষ্ট। সভ্যতার আদি পর্বে মানব প্রজাতির যাযাবর জীবনে একধরণের স্থিতিশীলতা এনেছিল নদী ও সাগর। বিশ্বের বহু সভ্যতা নদীর ছোঁয়ায় শক্ত একটা ভিত্তি পেলেও বাঙালির ইতিহাস খানিকটা আলাদা হয়ে গেছে মূলত নদীভাঙনের অনিশ্চয়তার সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে; স্থিতি ও স্থিতিহীনতা তাই বাঙালি সংস্কৃতির সবচে প্রভাবশালী উপাদান। বাঙালি নারীদের বেলায় স্থিতিহীনতার এই উপাদানটি বরাবরই উদার। পাপড়ি রহমানের গল্পের নারীরা সেই স্থিতিহীনতার মূর্ত প্রতীক, তাদের ভাঙাগড়া নদীর ভাঙাগড়াকে হার মানাতে বাধ্য। আধুনিকতাবাদ নারীকে দেখেছে প্রকৃতির সেই উপাদান হিসেবে যাকে অবলম্বন করে মানবপ্রজাতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে আছে। সেই হিসেবে নারীর পক্ষে কেবল যে প্রধান চরিত্র হওয়ার কথা তা না, সবচে প্রবাবশালী চরিত্রে তারই অভিনয় করার কথা। কিন্তু, পরিবার, গ্রাম, নগর বা রাষ্ট্রের মতো কল্পিত বাস্তবতার গল্পের প্রভাবে নারী বহুআগেই তার সেই ভূমিকা থেকে উচ্ছেদ প্রাপ্ত। উল্টো প্রাণী হিসেবে টিকে থাকার অসম সংগ্রামে তাকে লিপ্ত থাকতে হচ্ছে। নারীবাদ নারীদের জন্য তেমনই এক প্রেক্ষিত রচনায় ব্যস্ত, যেখানে নারীরা তাদের প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে কল্পিত বাস্তবতার উপরে স্থান দিতে সক্ষম হবে। বলাবাহুল্য, উত্তরাধুনিকতাবাদ এই প্রশ্নে ততটা কট্টরপন্থী না। হওয়ার কথাও না। উত্তরাধুনিকতার কাজই হচ্ছে আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তার অসারতা ফুটিয়ে তোলা। সেই আখ্যান ঐশ্বরিক বয়ান থেকে আসুক কি বিজ্ঞানের যুক্তির ভেলায় ভেসে, আর সমগ্রের জন্য সেই আখ্যান যত বড় স্বপ্নসৌধ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিক কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এককের স্বপ্নসৌধ নির্মানে তা সফল না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তুলোধুনো হওয়ার হাত থেকে তার রক্ষা নাই। নয়তুন্নেছা, বিলাতন বিবি, এলেমজান, শনতারা, রেফুল, খৈমন, ইছমত আরা, জুলেখা কিংবা সুফিয়ারা প্রাকৃতিক পরিচয়ের দিক থেকে নারী বটে; কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় একেকজনের সমস্যা, সংকট, চাওয়াপাওয়া, মানঅভিমান, প্রতিবাদ, আপস, নমনিয়তা কিংবা সহযোগিতার রূপটি স্বতন্ত্র। এই নিজস্বতার কারণে তাদের মুক্তির প্রশ্নটিকে কোনো নির্দিষ্ট আখ্যানের ছাঁচে ফেলে সমাধান করা সম্ভবপর হয় না। পাপড়ি রহমানের নারীরা তাই বুড়িগঙ্গার এপার-ওপার বসবাসের এক সাধারণ স্থান দখল করে থাকলেও তাদের ভাষা ও গল্পগুলো স্বতন্ত্রবৈশিষ্টমন্ডিত। একই কারণে তাদের মুক্তির গল্পগুলোও আলাদা। নারীমুক্তির নারীবাদী স্বপ্নসৌধের খোঁজ তাদের নাগালের বাইরে। সৌভাগ্য বলতে হবে যে, তেমন কোনো রোমান্টিক কল্পনা লেখককে পেয়ে বসেনি; কিন্তু ঐশ্বরিক গল্পের যে অসংগতি দিয়ে সমাজটি গড়া, সেই অসংগতির পীড়ন কিন্তু এই গল্পের নারী চরিত্রের সকলকে পীড়িত করে রাখে। কী সেই পীড়নের রূপ, তার এক উদাহরণ হচ্ছে ইছমত আরা আর জুলেখা বেগমদের ছোট ছোট আখ্যান। হাবুল আর ইছমত স্বামী-স্ত্রী। তাতে কী? হাবুলের পছন্দ জয়নালের বউ জুলেখাকে। একদিন হঠাৎ করেই ইছমত আরা আবিষ্কার করে যে, জুলেখাকে নিয়ে তার স্বামী হাবুল উধাও। এরই ধারাবাহিকতায় ইছমত আরা ঘর বাঁধে জুলেখার পরিত্যক্ত স্বামী জয়নালের সাথে। এই সম্পর্কে প্রেমভালোবাসার অস্তিত্ব নাই। পুরোপুরি জৈবিক বিধায় নারীবাদীদের জন্য আদর্শ সম্পর্ক। কিন্তু ঝামেলা বাঁধে ইছমতের গর্ভে জন্ম নেয়া হাবুলের সন্তান বাবুলকে নিয়ে, বাবুলকে তার নতুন বাপ জয়নাল নিজের করে নিতে পারে না। এই সংকটের সমাধান আধুনিকতাবাদে নাই। পাপড়ি রহমান একে আরো কঠিন করে তোলেন যখন ইছমত আরা তার প্রাক্তন স্বামী হাবুলের প্রতি টান অনুভব করে তখন। পুরোনো দাম্পত্য নতুন সম্পর্কের মাঝে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দাঁড়ায়। ঐশ্বরিক গল্পে ইছমত আরার এই অনুভবটি পাপের বিধায় পরিতাজ্য, আধুনিক নারীবাদও অসহায়, কারণ নতুন সম্পর্ক যদি লিভ-দুগেদারেও গড়ায়, তো মনের উপর পুরোনো সম্পর্কের যে প্রভাব, তাকে জোর করে অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় যে তাদের হাতে নেই।
সম্পর্কের ভাঙাগড়া, সামাজিক অবকাঠামোতে তাদের আপেক্ষিক অবস্থান, রূপক হিসেবে একই সমতলে নদীর উপস্থাপনা "নদীধারা আবাসিক এলাকা" উপন্যাসের প্রধানতম বৈশিষ্ঠ। স্বাভাবিকভাবে নগরের আরো অনেক চ্যালেঞ্জ এই উপন্যাসে আছে, যা বাড়তি মনোযোগ দাবি করে। তেমন একটি হচ্ছে মানুষের মুক্তির অর্থনৈতিক কাঠামোর সন্ধান। মানুষের জীবনযাত্রার বিস্তৃত বয়ান আছে, তবে তা এসেছে চরিত্রগুলোর সামাজিক অবস্থানকে স্পষ্ট করতে। আধুনিকতাবাদের অন্যতম উপাদান যে সমিষ্টিক অর্থনীতি কিংবা জাতীয় রাজনীতি, তার অসারতা প্রমানে অর্থনীত ও রাজনীতির বুদবুদ উপস্থিতি যথেষ্ট না। প্রয়োজন একে আরো বিস্তৃত করা। সম্পর্ক ভাঙাগড়ায় বিদ্যমান আর্থিক কাঠামোর প্রভাব সেভাবে দেখা যায়নি। ফলে, অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ হিসেবে যে রাজনীতির দেখা পাওয়ার কথা, সেটাও এই গল্পের মধ্যে সেভাবে উপস্থিত হয়নি। লেখক হয়তো ইচ্ছে করেই গল্পকে বিস্তৃত করার এই জায়গাগুলো এড়িয়ে গেছেন। হতে পারে, নিরীক্ষা বিবেচনায় নদী ও নারীর বৈচিত্রময় জগতের বাইরে একে নিয়ে যাওয়াটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা জানি না, তেমন কোনো বিষয়কে তিনি নতুন কোনো উপন্যাসের খোড়াক হিসেবে রেখে দিয়েছেন কি না। তা সত্ত্বেও, বিদ্যমান উপন্যাসকে অসম্পূর্ণতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে না। করা হলে তা হবে অন্যায়। উত্তরাধুনিকতার অন্যতম সওদাগর চার্লস রাসেলের মতে, উত্তরাধুনিক সাহিত্য তার সকল উপলব্ধি, অবধারণ, ফর্ম এবং রূপায়নকে সমাজব্যবস্থার মধ্যেই খুঁজে পায়, সবকিছুর অর্থ সামাজিক অবকাঠামোর মধ্যেই লুকায়িত থাকে। কাজেই, সামাজিক অবকাঠামোর স্বরূপ দেখাতে গিয়ে যতটুকু প্রয়োজন তার অতিরিক্ত কোনো কিছু লেখকের বিবেচনার জন্য গৃহীত নাও হতে পারে। আর অপ্রাপ্তির দায়? এটি কিন্তু উত্তরাধুনিকতারই দায়। সম্প্রসারণশীল বিশ্বে পূর্ণতার কোনো স্থান আছে কি না কেউ জানে না।