Published : 01 Mar 2026, 04:12 PM
এবারের অমর একুশে বইমেলা বিস্ময়কর রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বইমেলা আয়োজনের দু্দিন আগেও প্রকাশকরা নিশ্চিত ছিলেন না যে সত্যি বইমেলা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের কারণে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অমর একুশে বইমেলা আয়োজন করা যায়নি এবার। বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচনের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে। পরে জানা গেল ২০ ফেব্রুয়ারি । প্রকাশকদের একাংশ রোজার সময় বইমেলা করতে চাননি। তারা চেয়েছিলেন ঈদের পর বইমেলা হোক। এ-নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে সিদ্ধান্ত হলো ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে নিশ্চিতভাবেই বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ঠিক ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে জানা গেল ২৫ ফেব্রুয়ারি নয়, বইমেলা হচ্ছে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। সেই মতো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এখন বইমেলা চলছে।
এর মধ্যে আরেকটা বিব্রতকর খবর হচ্ছে, কবি মোহন রায়হানকে এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা হয়েছিল, কিন্তু অকস্মাৎ তার পুরস্কার স্থগিত করা হয়। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে, প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ ১ মার্চ তিনি জানান, তিনি পুরস্কার নিচ্ছেন, তবে পুরস্কারের অর্থ মূল্য তিনি গরিব কবি-সাহিত্যিকদের দান করে দিবেন।
এসব নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম। বাংলাদেশ যে অপূর্ব এক নাটকের দেশ এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়। পাঠকের সংখ্যা যে-দেশে আজ তলানিতে- বই, বইমেলা ও সাহিত্যপুরস্কার নিয়ে সে-দেশে নাটকীয়তা আজ চরমে!
বইমেলা আসলে কেমন হচ্ছে?
গত শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, বইমেলার তৃতীয়দিন সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলার অংশে ঢুকে দেখা গেল বেশ মনোরম আলো-আঁধারি পরিবেশ, সারি সারি সজ্জিত স্টলগুলো উজ্জ্বল তারকারাজির মতো ঝলমল করছে। এবার যেহেতু বড় প্রকাশনীগুলোরও প্যাভিলিয়ন নেই, তাই তারাও অংশ নিয়েছে স্টলের সারিতে। তাতে, বড় প্রকাশনী ছোট প্রকাশনীর বৈষম্য কিছুটা কমলেও অভ্যস্ত চোখ কিছুটা হোঁচট খায়! কেমন যেন ফ্ল্যাট, মানে বেটাল লাগছে অনেকটা।
মেলার মাঠ জুড় ক্রেতা-পাঠক বা দর্শনার্থীর উপস্থিত বেশ ভালোই। তবে, বইয়ের দোকানের সামনে তাদের দাঁড়াতে দেখা গেল কমই। বেশির ভাগই হাঁটছেন উদ্দেশ্যহীন, অকারণে; যেন জীবনের ভারে ক্লান্ত তারা, এই অলস-অবসর সন্ধ্যায় কোথাও যেতে হয়, তাই এসেছেন বইমেলায়, এসেও যেন আর কিছু করার নেই, তাই হাঁটছেন আর হাঁটছেন…
দুএকজন অবশ্য বইয়ের দোকানেও দাঁড়াচ্ছেন, না কিনলেও দু-একটা বই নেড়েচেড়ে দেখছেন। বেশির ভাগ স্টলের বিক্রেতারা বসে আছেন তেমনভাবে, যেমন করে বৃষ্টির অপেক্ষায় বসে থাকে চাতক পাখি। দুচারজন বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা গেল, কেউ আজ একটিও বই বিক্রি করতে পারেননি; বড় এক প্রকাশনীর একজন বিক্রেতা জানালেন গতকাল (শুক্রবার, মেলার দ্বিতীয় দিন) পাঁচ হাজার টাকার মতো বই বিক্রি করেছিলেন, আজ (শনিবার) এক হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি। এমন চললে, জানালেন আরেকজন বিক্রেতা, তাদের ইফতারের খচরও উঠবে না প্রতিদিন।
মেলার ফুড কর্নার ঘুরে দেখা গেল অনেক খাবারের দোকান এখনো নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। কাজ চলছে। আর দুএকদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে, অন্যবারের তুলনায় এবার খাবারের দোকান কম। সবচেয়ে বেশি হতবাক হতে হলো লিটল ম্যাগ চত্বর দেখে। লিটল ম্যাগ চত্বর বইমেলার অন্যরকম এক আকর্ষণ, কারণ, এখানে তরুণ লেখক-কবি-সাহিত্যিক-পাঠকরা আড্ডা মারেন। লিটল ম্যাগ চত্বরে গিয়ে দেখা গেল বিশাল ময়দান খাঁখাঁ করছে, ইংরেজ আর নবাবের সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর যে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল পলাশির আম্রকাননে অনেকটা তেমনই যেন, দূরে দূরে্ একেকটা স্টলে ক্ষীণ আলো টিমটিম করে জ্বলছে, যেন বৈদ্যুতিক আলো নয়, কেরোসিনের কুপি, আর মাঠটা অমসৃণ, মাটি ফেলা হয়েছে নতুন, তা আর সমান করা হয়নি, মাঠের ওই প্রান্তে ছোট ছোট স্টলে বসে আছেন দুএকজন, দূর থেকে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন, আর মাঠ পেরিয়ে ও-প্রান্তে যেতেও ইচ্ছা করে না, সমস্ত লিটল ম্যাগ প্রান্তর জুড়ে এক প্রকার ভৌতিক আবহ!
এবারের বইমেলাটিকে মাসব্যাপী বইমেলা বলা যাবে না। ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ শুরু হয়ে বইমেলাটি শেষ হয়ে যাচ্ছে ১৫ মার্চ। মাত্র ১৮ দিনের বইমেলা। সপ্তাহের শুরুটা দেখে মনে হচ্ছে না যে শেষটা বা দ্বিতীয় সপ্তাহও খুব ভালো যাবে। মেলার দ্বিতীয় সপ্তাহ মানে রোজার মাঝামাঝি, মানুষের পোষাক কেনাকাটার ধুম পড়ে যাবে। চরম বইপ্রেমী না হলে কে আর তখন আসবে মেলায়!
প্রতিবেদনের মতো মেলার খুঁটিনাটি বর্ণনা থাক, বরং দুএক কথা বলা যাক সামগ্রিক বইমেলার উদ্দেশ্য, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে। অমর একুশে বইমেলা যেদিকে যাচ্ছে, ধরে নেয়া যেতে পারে অচিরেই বইমেলাটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আপ্রাণ চেষ্টাক্রমে এবার ঐতিহ্য ধরে রাখা গেছে, সামনে হয়তো তা আর পারা যাবে না, কারণ, ঐতিহ্য রক্ষার চেয়েও বড় কর্তব্য প্রাণ বাঁচানো। সামনের কয়েক বছরও ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা থাকবে, তখনো রোজার মাসে বইমেলা হবে কি না আমরা জানি না। আর যদি হয়ও তখন কী অবস্থা হবে খোদা মালুম! রোজার পরও, এপ্র্রিল মাসে গিয়ে, গরম ও বৃষ্টির কারণে বইমেলা অনুষ্ঠিত করা কঠিন হবে।
তাহলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী অমর একুশে বইমেলাটির কী হবে! ভবিষ্যতে কী হবে তার একটি নমুনা কিন্তু এবারই দেখা গেল। নতুন বই প্রকাশ সম্ভবত ৯০ শতাংশ কমে গেছে। অনেক প্রকাশকও যেমন এবার, এখনই, এই ফেব্রুয়ারি মাসেই, রোজার মধ্যে বইমেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তেমনি অনেক লেখকও। লেখকদের না লেখার বিষয়টা অবশ্য আরো বিস্তৃত ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এমন এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে গত দুবছর ধরে আমরা ছিলাম যে নতুন কিছু লেখা ছিল অসম্ভব। লিখতে বসা বিষয়টাই ছিল অকল্পনীয়। এখনো যে সেই অবস্থা খুব কেটেছে বলা যাবে না।
গত দুবছরে বইয়ের বিক্রি ৬০ শতাংশ কমে গেছে এমন একটা পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে প্রকাশকদের কাছ থেকে। এখন বইয়ের বিক্রি যদি সারা বছর ধরে বাড়ানো না যায় তাহলে বইমেলা দিয়ে তেমন কিছু হবে না। তবে, বইমেলাই ছিল অনেক প্রকাশকের জন্য ঈদের বিক্রির মতো। মানে, ঢাকা শহরে এমন অনেক পোশাক বিপণী বিতান আছে যারা সারা বছর ধরে লোকসান দিয়েই টিকে থাকে, এক রোজার ঈদে তাদের যা বিক্রি হয় তাতে সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে যায়। আমাদের অনেক প্রকাশকের জন্যও বইমেলাটি ছিল তেমন। অনেক প্রকাশনীর প্রকাশিত অনেক বই বইমেলার পর আর কোথাও পাওয়া যায় না। মৌসুমী অনেক প্রকাশনীর মতো অনেক মৌসুমী লেখকও হারিয়ে যায় মেলার পরপরই। বইমেলা যদি এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে আর অনুষ্ঠিত না হয়, বা বইমেলা যদি আর আগের মতো সমারোহ রূপে বর্তমান না থাকে তাহলে কি এসব অরাজকতা কিছু কমবে!
সব সমস্যাই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বইমেলাকেন্দ্রিক আমাদের যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে তা কি আমাদের বইয়ের বাজার ও লেখালেখির নতুন দুয়ার খুলে দিবে? এ-কথা সন্দেহাতীতভাবেই সত্য, যদি এখনই আমরা বইয়ের বাজার ও লেখালেখির ধরন-বিষয়-প্রচার নিয়ে নতুন করে না ভাবি তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের সামগ্রিক প্রকাশনা শিল্প ভয়ঙ্কর হুমকির মধ্যে পড়বে। একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রকাশক না টিকলে লেখকরাও অনেকে টিকবেন না। যদিও লেখালেখি এমন এক শিল্প, যার পুরোটাই ঠিক প্রকাশনার ওপর নির্ভর করে না। তবুও, আধুনিক এই বাজারব্যবস্থায় দুজনের পারস্পরিক সম্পর্ক তো অবশ্যই আছে। সেই সম্পর্ক সুন্দর রাখাও দরকার। যদিও তা সুন্দর হয়নি। বাংলাদেশে প্রকাশক-লেখকদের বোঝাপড়া খুব কম। উভয়ক্ষেত্রেই যথেষ্ট পেশাদারী মনোভাবের অভাব রয়েছে। মিডিয়াগুলো একেবারেই বিমুখ সাহিত্য-জগত থেকে। আমাদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোও সাহিত্য-বান্ধব হিসেবে গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রও সাহিত্য-বান্ধব নয়। কোনো সরকারই সাহিত্যসেবী নয়। ফলে সাহিত্যের সর্বদিকেই নেতিবাচক অবস্থা। এর মধ্যেও, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো করে অনেক কবি-সাহিত্যিক লিখে যাচ্ছেন অক্লান্তভাবে; নিজেকে রক্তাক্ত করে, কারণ, না লিখতে পারলে তারা বাঁচেন না। কিন্তু এভাবে আর কতদিন! লেখালেখি মানে তো শুধু মনের ভাবাবেগ প্রকাশের জন্য কিছু গদ্য-পদ্য নয়, চিন্তাশীল অনেক লেখার জন্য কীরকম অমানবিক পরিশ্রম করতে হয় তা লেখকমাত্রই জানেন। আমাদের দেশের চিন্তাশীল লেখার দরিদ্রতাই প্রমাণ করে লেখালেখিতে আর্থিক-যোগ কত কম। চিন্তাচর্চা ছাড়া তো একটা জাতি দাঁড়াতে পারবে না। রাজনীতিবিদরা যতই বড় বড় কথা বলুক, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারলাম না কেন, তার উত্তরটি তো ওই ফাঁকির মধ্যেই নিহিত। আধুনিক চিন্তাচর্চা তো দূরের কথা, বিশ্বের ভালো ভালো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বইও বাংলাভাষায় অনুবাদ হয়নি। বাংলা ভাষার অসংখ্য ভালো বইও ভীনদেশী ভাষায় অনুবাদ হয়নি। কে করবে? রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা নেই। বাংলা একাডেমি নামে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আছে নামমাত্র। সব মিলিয়ে আমাদের সাহিত্য-জগতটি, সামগ্রিক চিন্তাচর্চার জায়গাটি দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। গভীর অন্ধকারেও নাকি ট্যানেলের শেষে আলো দেখা যায়, কিন্তু আমাদের সাহিত্যজগতটি ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরে, যেখানে আলো ঢুকলে আর বেরোতে পারে না।