Published : 07 May 2026, 04:06 PM
প্রতিটা ব্যক্তিমানুষের জীবনেই নানা দুঃখ- কষ্ট-ঘাত-প্রতিঘাত আছে। বেঁচে থাকাটা সবার জন্যই মাঝে মাঝে অসহ্য মনে হয়। বিশেষ করে মৃত্যুচিন্তা যদি কাউকে একবার পেয়ে বসে, এবং জীবনের শুরুর দিকেই, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো খুব কষ্টকর হয়। এ-জীবনের মানে খুঁজতে খুঁজতেই তখন জীবন বেরিয়ে যায়। তখন অনেক কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিক আমাদের পথ দেখান। জীবনের নশ্বরতার বিরুদ্ধে তারা তুলে ধরেন অবিনশ্বর এক জগতের কথা। সেটা পরকাল নয়, অনন্তকালের কোনো জীবন নয়; এ মাটির পৃথিবীকেই তারা স্বর্গে পরিণত করেন। তারা বলেন, চোখ খুলে একবার দেখো, চারদিকে কেমন আলোর ঝর্নাধারা বয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ তেমন একজন মানুষ- তিনি শুধু কবি নন, একজন স্পিরিচুয়াল দার্শনিক। ধর্মের বাইরেও যে এক অধ্যাত্ম জগত আছে আধুনিক বাঙালিকে এই খোঁজ রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কে দিয়েছেন এত বিপুলভাবে, এত গভীরভাবে!
রবীন্দ্রনাথ লিখেন, মৃত্যু সত্য, কিন্তু তার চেয়ে বেশি সত্য এ-জীবন। মৃত্যুর জানালা দিয়ে জীবনকে দেখি বলেই তো জীবন সুন্দর। ওই দূর ভুবনপারে আমাদের আর দেখা হবে কি-না জানি না, কিন্তু এই যে দেখা হলো, ক্ষণিকের এ মিলন, ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে আছে এ জীবন, এর চেয়ে পরম সার্থকতা আর কী থাকতে পারে এ জীবনে!
আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব--
ফুরায়ে গেলে আবার ভরেছ, জীবন নব নব॥
দীর্ঘ দীর্ঘদিন আমি গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে থেকেছি। আমার শুধু মনে হতো, এ জীবনের অর্থ কী? সমগ্র মহাকাল আমার মাথার ভিতর ভনভন করে ঘুরতো। নিজের এই ক্ষুদ্র জীবনটা আমার একেবারেই নিরর্থক বলে মনে হতো। শুধু মনে হতো: যাই করি, একদিন তো আমি মরবোই। যেদিকেই তাকাই সেদিকেই মৃত্যু--উজ্জ্বল একটি সকাল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় বিবর্ণ সন্ধ্যায়; কলরবপূর্ণ একটি দিন মৃত্যুর গ্রাসে নিঃসঙ্গ একটা রাত্রি হয়ে ঝুলে থাকে আমার নির্ঘুম চোখে; আমি তা সহ্য করতে পারি না। পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী নারীর মুখের দিকে তাকালেও আমি কেবল মৃত্যুরই ছায়া দেখি। আর আমার শুধু মনে হয়, মরে যাই, মরে যাই। একদিন তো মরবোই, মৃত্যু আসার আগেই আমি মরে যাই। সে আমার কাছে এগিয়ে আসার আগে আমিই তার দিকে এগিয়ে যাই। আমি আর মৃত্যুর ভাবনা সহ্য করতে পারছিলাম না। মৃত্যুচিন্তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় মৃত্যু।
আমাকে এই অবস্থা থেকে প্রথম মুক্তি দিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনিই আমাকে প্রথম জানালেন,
আকাশভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান॥
তিনি বললেন,
বসিয়া আছ কেন আপন-মনে,
স্বার্থনিমগন কী কারণে?
চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে॥
আমি জানলাম,
যাহা-কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়,
সকলই দুর্লভ বলে আজি মনে হয়।
দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান,
দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।
যা পাই নি তাও থাক, যা পেয়েছি তাও-
তুচ্ছ বলে যা চাই নি তাই মোরে দাও
রবীন্দ্রনাথ আমার কানে কানে বলে দেন,
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে॥
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে॥
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ-
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে॥
আমি জানি না, হৃদয়ের কতোটুকু গভীরে ডুব দিলে একজন মানুষ এমন গান লিখতে পারেন যে-গানে জীবনের এমন আকুল প্রার্থনা ফুটে ওঠে-
শুভ্র আসনে বিরাজ’ অরুণছটামাঝে,
নীলাম্বরে ধরণী পরে কিবা মহিমা তব বিকাশিল॥
দীপ্ত সূর্য তব মুকুটোপরি,
চরণে কোটি তারা মিলাইল,
আলোকে প্রেমে আনন্দে
সকল জগত বিভাসিল॥
রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়ে আমার প্রথম নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়,
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমন পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।
জীবনের অপার সৌন্দর্যে আমি ছটফট করতে শুরু করি। পৃথিবীর সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ আমার প্রাণের ভিতর ঢুকে যেতে শুরু করে। এই প্রথম আমার রক্তের ভিতর নেচে ওঠে, রক্তে রক্তে জীবন নাচে মৃত্যু কোথায় বল!
তারপর জীবনে আমি যতবার হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছি রবীন্দ্রনাথ আমাকে ততোবারই হাত ধরে টেনে তুলেছেন। যখন চারদিকে আর কোনো আলো দেখি নি রবীন্দ্রনাথ আমাকে আলো দেখিয়েছেন। অকূল সমুদ্রে যখনই আমি দিশা হারিয়ে ফেলেছি আমি দেখেছি ঠিকই একজন মানুষ আমার জন্য বাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, বাতিঘরের পাহারাদার তিনি। তার সম্পর্কে এসব লিখতে আমার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ, বন্ধু আমার, আপনি না জন্মালে আমি কেমন করে বাঁচতাম!
আপনি ছাড়া আমাদের এ কথা আর কে শুনিয়েছে,
তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে,
তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না।
ও তোর আশালতা পড়বে ছিঁড়ে,
হয়তো রে ফল ফলবে না॥
আসবে পথে আঁধার নেমে, তাই ব’লেই কি রইবি থেমে-
ও তুই বারে বারে জ্বালবি বাতি,
হয়তো বাতি জ্বলবে না॥
যখনই আমি কোনো কারণে কোনো গভীর দুঃখ পাই তখনই আমি ভাবি কতোটা গভীর দুঃখে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
এই করেছ ভালো, নিঠুর হে, এই করেছ ভালো।
এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো॥
অথবা,
আরো আঘাত সইবে আমার, সইবে আমারো।
আরো কঠিন সুরে জীবন-তারে ঝঙ্কারো॥
অথবা,
আরো আরো, প্রভু, আরো আরো
এমনি ক’রে আমায় মারো॥
অথবা,
দুঃখের বেশে এসেছ বলে তোমারে নাহি ডরিব হে।
যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা নিবিড় করে ধরিব হে॥
অথবা,
আরো বেদনা আরো বেদনা,
প্রভু, দাও মোরে আরো চেতনা।
দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে
মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ।
আর কতো বলবো? সমগ্র রবীন্দ্রভূবনের যেদিকেই তাকাই সেদিকেই জীবনের জয়গান, দুঃখের আগুনে পুড়ে তিনি জ্বালিয়েছেন আলোর মশাল। তার জীবনের জয়গান শুনলেই বোঝা যায় জীবনে তিনি কতোটা গভীর দুঃখই না পেয়েছিলেন। হ্যাঁ, এ কথা সত্য, যে যতো গভীর দুঃখ পায় সে জীবনকে ততো গভীরভাবে অনুভব করে। ভিতরে যতো গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয় ততোই তো মানুষ তা পূর্ণ করতে চায়।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর দুঃখ কী? মৃত্যু, অবশ্যই মৃত্যু।
সবকিছু ছেড়ে দিয়ে একদিন কোথায় চলে যাবে। কীসে এর সান্তনা হয়!
ভালোবাসায়, একমাত্র গভীর ভালোবাসায়। সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি গভীর ভালোবাসায়।
ভালোবাসাই মানুষের একমাত্র আশ্রয়।
কেউ প্রেম করে না, বিয়ে করে না, ঘর-সংসার করে না, বাড়িগাড়ি করে না, শিল্প-সাহিত্য করে না, সবাই শুধু একটা ভালোবাসার আশ্রয় খোঁজে। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন এই আশ্রয় খুঁজে ফিরেছেন। আশ্রয় তিনি পেয়েছেন মানুষের মাঝে, প্রেমের মাঝে, প্রকৃতির মাঝে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের মাঝে। তাই বলেছেন,
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর এ ভূবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!
মৃত্যুকে তিনি গভীরভাবে উপলব্দি করেছিলেন বলেই জীবনকেও রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে অনুভব করেন। রুদ্ধ গৃহ প্রবন্ধে তাই লিখেন, “এ জগতে অবিশ্রাম জীবনের প্রবাহ মৃত্যুকে হু হু করিয়া ভাসাইয়া লইয়া যায়, মৃত্যু কোথাও টিকিয়া থাকিতে পারে না।...পৃথিবী মৃত্যুকেও কোলে করিয়া লয়, জীবনকেও কোলে করিয়া রাখে, পৃথিবীর কোলে উভয়েই ভাইবোনের মতো খেলা করে। ...পৃথিবীতে যাহা আসে তাহাই যায়। এই প্রবাহেই জগতের স্বাস্থ্য রক্ষা হয়।”
‘আত্মস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ লিখেন, “এই জীবনযাত্রার অবকাশকালে মাঝে মাঝে শুভমুহূর্তে বিশ্বের দিকে যখন অনিমেষদৃষ্টি মেলিয়া ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিয়াছি তখন আর এক অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করিয়াছে। নিজের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির এক অবিচ্ছন্ন যোগ, এক চিরপুরাতন একাত্মতা আমাকে একান্তভাবে আকর্ষণ করিয়াছে। কতদিন নৌকায় বসিয়া সূর্যকরোদীপ্ত জলে স্থলে আকাশে আমার অন্তরাত্মাকে নিঃশেষে বিকীর্ণ করিয়া দিয়াছি; তখন মাটিকে আর মাটি বলিয়া দূরে রাখি নাই, তখন জলের ধারা আমার অন্তরের মধ্যে আনন্দগানে বহিয়া গেছে।”
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিজেকে মুক্ত করে দিয়ে নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করতে থাকেন। তাঁর ছিন্নপত্রাবলী পড়লে মনে হয় কোনো এক অবোধ বালক বুঝি অসীম কৌতূহল নিয়ে এই বিশ্বপ্রকৃতিকে দেখছেন। ভাতিজী ইন্দিরাকে তিনি লিখেন, “ইচ্ছে করে জীবনের প্রত্যেক সূর্যোদয়কে সজ্ঞানভারে অভিবাদন করি এবং প্রত্যেক সূর্যাস্তকে পরিচিত বন্ধুর মতো বিদায় দিই।”
রবীন্দ্রসাহিত্যের যতটুকুই আমি পড়েছি, আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, তাঁর সৃষ্টির কোথাও কোনো মলিনতা নেই। রবীন্দ্ররচনাবলীর যে কোনো পৃষ্ঠা উল্টালেই সেখানে কিছু না কিছু মুক্তামাণিক খুঁজে পাওয়া যাবে। একটা সামান্য চিঠিও তাঁর অসামান্য জীবনবোধে অনন্য সাধারণ হয়ে ওঠে। যেমন, বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে তিনি এক চিঠিতে লিখছেন, “আমাদের জীবনের চারিদিকেই এত দুঃখ এত অভাব এত অপমান পড়িয়া আছে যে নিজের শোক লইয়া অভিভূত হইয়া এবং নিজেকেই বিশেষরূপে দুর্ভাগা কল্পনা করিয়া পড়িয়া থাকিতে আমার লজ্জা বোধ হয়।”