Published : 02 Jul 2026, 05:00 PM
তীব্র গরমে বাইরে বের হওয়ার আগে মুখে একটু সানস্ক্রিন বা সান-ক্রিম মেখে নেওয়া, এখন অনেকেরই নিয়মিত অভ্যাস।
রোদ আর ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে চিকিৎসকেরা বছরের পর বছর ধরে সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
তবে সম্প্রতি টিকটক, ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সানস্ক্রিনের বিরুদ্ধে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণামূলক আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, সানস্ক্রিন মানুষকে রক্ষা করে না, বরং এটি মাখলে উল্টো ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে!
‘দি নিউ ইয়র্ক টাইমস’য়ে প্রকাশিত ‘হোয়াট জেন জি গেটস রং অ্যাবাউট সানস্ক্রিন’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘এই অ্যান্টি-সানস্ক্রিন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অল্টারনেটিভ মেডিসিন প্রচারক এবং বিতর্কিত বক্তারা।’
ডা. লিওনার্ড কোল্ডওয়েলের দাবি ও তার উৎস
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সানস্ক্রিন-বিরোধী প্রচারণায় প্রায়ই জার্মান বংশোদ্ভূত লেখক, মার্কিন নাগরিক ডা. লিওনার্ড কোল্ডওয়েল-এর একটি বক্তব্য, সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তার লেখা বই ও বিভিন্ন ‘অল্টারনেটিভ হেলথ’-বিষয়ক প্রতিবেদন ছাড়াও ডা. কোল্ডওয়েল, নিজস্ব ওয়েবসাইট ও পডকাস্টের মাধ্যমে ক্যান্সার এবং এর প্রাকৃতিক নিরাময় নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচার করে থাকেন।
তার মূল দাবিটি হল: ‘সূর্যের আলো বা রোদ কখনই ত্বকের ক্যান্সারের মূল কারণ নয়। বরং মানুষ রোদ থেকে বাঁচতে যে সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করে, তার ভেতরের কৃত্রিম কেমিক্যাল ও বিষাক্ত উপাদানগুলোই ত্বকের ক্যান্সারের জন্য দায়ী। প্রকৃতিতে থাকা রোদ উল্টো মানুষকে সুস্থ রাখে।’
তিনি আরও দাবি করেন, প্রাচীনকালে মানুষ যখন সানস্ক্রিন মাখতো না, তখন ত্বকের ক্যান্সার এত বেশি ছিল না।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য
আন্তর্জাতিক মূলধারার ক্যান্সার গবেষক, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ সংস্থাগুলো, ডা. লিওনার্ড কোল্ডওয়েলের এই দাবিকে ভিত্তিহীন এবং বিপজ্জনক ভুল তথ্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জার্মানির কোলন শহরের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উটা শ্লোসবার্গার, ডয়চে ভেলে’র ‘ফ্যাক্ট চেক- ‘ফোর ক্লেইমস অ্যাবউট সানস্ক্রিন’ প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে বলেন, “সানস্ক্রিন ক্রিমে কোনো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বা কার্সিনোজেনিক উপাদান থাকে না। বাজারে যেসব প্রসাধনী আসে, সেগুলো কঠোর ল্যাব টেস্ট পার হয়েই আসে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইউটি এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টার’-এর ‘টেন সানস্ক্রিন মিথস ডিবাঙ্কড’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘সানস্ক্রিন ক্যান্সার তৈরি করে’— এই দাবির কোনো চিকিৎসা-বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তাহলে কিছু গবেষণায়, সানস্ক্রিনকে কেন ত্বকের ক্যান্সারের জন্য দায়ী করা হয়?
‘হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং’-এ প্রকাশিত ‘দ্য সায়েন্সেস অফ সানস্ক্রিন’ প্রতিবেদনে, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ত্বক-বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জেনিফার লিন বলেন “এই বিভ্রান্তির পেছনের কারণটি হল, কিছু পুরানো পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। দেখা গিয়েছিল যারা সানস্ক্রিন বেশি মাখেন, তাদের মেলানোমা (এক ধরনের ত্বকের ক্যান্সার) বেশি হচ্ছে।”
ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন’স হসপিটালের ‘মেলানোমা রিস্ক অ্যান্ড প্রিভেনশন ক্লিনিক’-এর এই সহ-পরিচালক আরও বলেন, “তবে এর ভেতরের আসল সত্যটি হল, যারা তীব্র রোদে দীর্ঘক্ষণ ‘সানবাথ’ বা সূর্যস্নান করেন কিংবা সমুদ্র সৈকত বা রোদপ্রধান দেশে ঘুরতে যান, কেবল তারাই বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, তাদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে অতিরিক্ত রোদ ও অতি-বেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আসার কারণে, সানস্ক্রিন মাখার কারণে নয়!”
অস্ট্রেলিয়ার ক্যান্সার কাউন্সিলের ‘স্কিন ক্যান্সার কমিটি’র প্রধান অধ্যাপক অ্যানি কাস্ট, দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত ‘দ্য সানস্ক্রিন মিথ: কুড ইট রিয়েলি বি কজিং স্কিন ক্যান্সার’ প্রতিবেদনে উদাহরণ দিয়ে বলেন, "বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা মানুষগুলোর গুলিতে মারা যাওয়ার হার বেশি। এর মানে এই নয় যে, জ্যাকেটটি তাকে মেরে ফেলছে। এর মানে সে এমন বিপজ্জনক জায়গায় গিয়েছে যেখানে গুলি চলার ঝুঁকি বেশি। সানস্ক্রিনের বিষয়টিও ঠিক তাই।"
রোদ কি সত্যিই ত্বকের ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে? বিজ্ঞান যা বলে
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ)-এ, ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস’-এর করা গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সূর্যের আলোতে থাকা আল্ট্রাভায়োলেট-বি রশ্মি সরাসরি ত্বকের কোষের ডিএনএ ধ্বংস করে দেয়। এই ক্ষয়ে যাওয়া ডিএনএ যখন ভুলভাবে পুনর্গঠিত হয়, তখনই ত্বকের ক্যান্সারের জন্ম হয়।
তাই ত্বকের ক্যান্সার হওয়া থেকে রোদ রক্ষা করে, এই দাবি অবৈজ্ঞানিক।
তবে সূর্যের আলোর একটি ইতিবাচক দিক হল, এটি শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি করে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্কিন ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য সারাদিন কড়া রোদে থেকে, ত্বক পুড়িয়ে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই।
সপ্তাহে মাত্র দুতিন দিন সকালের মৃদু রোদে ১০-১৫ মিনিট থাকাই শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি তৈরির জন্য যথেষ্ট। অথবা এটি সাপ্লিমেন্ট বা খাবার থেকেও সহজে পাওয়া যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ-এর নিয়ম ও আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা
আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)-এর নিয়মানুযায়ী, সানস্ক্রিনকে ‘ওভার-দ্য-কাউন্টার’ ওষুধ হিসেবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এফডিএ-এর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন (যা ‘ইউভিএ’ এবং ‘ইউভিবি’ দুই রশ্মিই আটকে দেয়) মাখলে ত্বকের ক্যান্সার এবং অকাল বার্ধক্য রোধ করা সম্ভব।
কানাডিয়ান ডার্মাটোলজি অ্যাসোসিয়েশনও, সুস্থ ত্বকের জন্য অন্তত এসপিএফ ৩০ সমৃদ্ধ সানস্ক্রিন মাখার ওপর জোর দেয়।
তবে যারা কেমিক্যাল সানস্ক্রিন নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে মেডডট স্ট্যানফোর্ড ডট-ইডিইউ’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন-এর চর্মরোগ বিভাগের অধ্যাপক ও শিশু চর্মরোগ বিভাগের প্রধান ডা. জয়েস টেং পরামর্শ দেন, “চাইলে চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান দিয়ে তৈরি 'মিনারেল বা ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন' (যা জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই অক্সাইড দিয়ে তৈরি) ব্যবহার করতে পারেন, যা ত্বকের ভেতরে প্রবেশ না করে, ওপর থেকে ঢাল হিসেবে কাজ করে।”
আরও পড়ুন