বিএনপির বড় জয়ের নেপথ্যে কী?
আইনসভা ও রাজনীতির মাঠে বিএনপির জন্য অপেক্ষা করছে শক্ত এক প্রতিপক্ষ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি, তাদের এই বড় জয় কি অবধারিত ছিল?
আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে বিএনপির বিরুদ্ধে যে সংগঠিত প্রচার ও জয়ের হাইপ তুলেছিল, তা কীভাবে মোকাবিলা করল দলটি?
জামায়াত যেখানে আওয়াজে ও সামাজিক মাধ্যমে জয়ের সম্ভাবনা জাগাল, সেখানে তারা ব্যর্থ হল কেন? সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
রাজনীতির বিশ্লেষকরা যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, মোটা দাগে তা হল-বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ও বিস্তৃতি এবং ভোটারদের ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী মনোভাব বিএনপির বিপুল জয়ে ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে ভোটের আগের দিন বিভিন্ন স্থানে টাকাসহ জামায়াত নেতাদের ধরা পড়ার ঘটনায় তাদের প্রচার হোঁচট খেয়েছে, যার সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।
কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগের আমলে দুই দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক হামলা-মামলা, নির্যাতন, গুম, হত্যার শিকার হওয়া বিএনপি ও জামায়াত-দুই দলের ভোটের বাক্সেই ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে।
বিশ্লেষকদের চোখে, ভোটের এই ফলাফলের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হল-আইনসভা ও রাজনীতির মাঠে বিএনপির জন্য অপেক্ষা করছে শক্ত এক প্রতিপক্ষ।
গণতন্ত্রের ফেরার লক্ষ্য ধরে বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হয়েছে।
শুক্রবার নির্বাচন কমিশন ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের ফলাফল ঘোষণা করেছে। আদালতের নির্দেশনা থাকায় চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফল দেওয়া হবে পরে। আর জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন থেকে দেওয়া ফলাফল অনুযায়ী, ২০৯ আসনে জিতেছে বিএনপি। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা পাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতকে। জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ইসলামপন্থি দলটি পেয়েছে ৬৮টি আসন।
বিএনপির মিত্রদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ একটি করে আসন পেয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে।
আলাদা নির্বাচন করে ইসলামী আন্দোলন জয় পেয়েছে একটি আসনে। আর সাতটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যারা আসলে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’।
তবে বিএনপির বিদ্রোহী থাকায় বেশকিছু আসনে সুবিধা পেয়েছে জামায়াত।
ফলাফল ঘোষণা করা আসনগুলোর ভোটের ভিত্তিতে এবার সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। আর গণভোটে প্রদত্ত ভোটের হার ৬০.২৬ শতাংশ। ২৯৯ আসনের গণভোটের তথ্য একীভূত ফলাফলে এ হার।
রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে যে গণভোট হয়েছে, তাতে অনুমিতভাবেই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে।
এই ফলের অর্থ হল, জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছেন দেশের নাগরিকরা। অবশ্য গণভোটের প্রক্রিয়া ও প্রশ্নের গঠন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ’ ঠেকাতে বিএনপিতে ভোট
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। দলের কার্যক্রমে অন্তর্বর্তী সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর তাদের নির্বাচনের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতের সামনে সে শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ আসে।
অভ্যুত্থানের পর জামায়াত ও তার ছাত্র সংগঠন নতুন বয়ান নিয়ে হাজির হয়, আর সংগঠিত প্রচারের কারণে সামাজিক মাধ্যমে তারা এমন ধারণা তুলে ধরে যে তারাই রাজনীতিতে চালকের আসনে বসতে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড়বছরে নিজেদের সাংগঠনিক কাজ বিস্তৃত করার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিতে থাকে জামায়াত।
পাঁচটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের একচেটিয়া জয়ও তরুণদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ার ধারণা তুলে ধরে।
উল্টো দিকে বিএনপির রাজনীতিতে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি ‘চাঁদাবাজি ও দখলবাজির’ নানা অভিযোগ দলটিকে রাজনীতির মাঠে পিছনে ঠেলে দেয়। এ নিয়ে জামায়াত সংগঠিতভাবে ব্যাপক প্রচার চালায়।
তবে এতসব করার পরও নারী প্রশ্নে জামায়াত নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য, ভোটের আগে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্টে নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ দলটিকে বেকায়দায় ফেলে দেয়।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বিরোধিতা, নারীদের কর্ম ঘণ্টা কমানো নিয়ে বক্তব্য, সংসদ নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী না করায় জামায়াত সমালোচিত হয়।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কথিত তৌহিদি জনতার নামে ‘মব’ তৈরি করে মাজারে হামলা, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো মানুষের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে, প্রতিবাদও হয়েছে নানা ভাবে।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে ‘ধর্মভিত্তিক ফ্যাসিবাদের উত্থান’ ঘটতে পারে, এমন শঙ্কায় জামায়াত বিরোধী ভোট বিএনপির বড় জয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী লীগের শাসনের সময় তারাই (বিএনপি) ছিল প্রধান বিরোধী দল। প্রথমে সংসদে ছিল, তারপর সংসদের বাইরে তারা পুরো সময়টাতে আন্দোলন করেছে। এবং তারাই এটার সবচেয়ে বড় অংশীদার। দেশব্যাপী সাংগঠনিক ভিত্তি তাদেরই ছিল।
“যারাই আন্দোলনগুলো করেছে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে, তাদের মধ্যে বিএনপির ভূমিকা ছিল প্রধান। তারাই প্রধান বিরোধী দল ছিল সেই ১৯৯১ সালের পর থেকে বিভিন্ন আমলে। সেই সাংগঠনিক কাঠামোটা তারা অটুট রেখেছে। সারা বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তৃত আছে।”
তার মতে, জামায়াত বিরোধী অবস্থানও বিএনপির বিপুল জয়ের অন্যতম কারণ।
মুশতাক হোসেন বলেন, “বিএনপির বাইরে যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে পছন্দ করে না, যারা নতুন করে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিষয়ে ভয় পেয়েছে, সে সমস্ত দলের নেতারা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, একাত্তরের ঘাতকদের পরাজিত করবেন। একাত্তরের ঘাতক বলতে তারা জামায়াতকেই বুঝিয়েছেন।
“কাজেই শেষ মুহূর্তে জামায়াতের যে প্রচার ছিল যে তারা ক্ষমতায় চলে আসতেছে, এটাকে ঠেকাবার জন্য তারা নিজেদের দলের প্রার্থীদের ভোট না দিয়ে তারা শেষমেশ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে; যেন বিএনপির জয়টা নিশ্চিত হয়।”
শেষ সময়ে দলটির নানা অনিয়মের বিষয়গুলো সামনে আসায় জামায়াতের ভোটে প্রভাব পড়ার ইঙ্গিত দেন সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার।
তার মতে, ১৯৯১, ১৯৯৬ বা ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে লেনদেন তুলনামূলক কম হলেও সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে তা বেশি প্রচার পাওয়ায় কোনো কোনো প্রার্থীর জন্য ‘ভোটের মাঠে’ প্রতিকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। যা ফলাফলে প্রভাব রেখেছে।”
জামায়াতের বয়ান তৈরি ও প্রচারের ধরণের সমালোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, “জামায়াত বিএনপির বিপক্ষে অনেক কিছু বলেছে, যে বিএনপি চাঁদাবাজি করছে, সন্ত্রাস করছে ইত্যাদি। হয়ত অনেকক্ষেত্রে সেটার সত্যতা পাওয়াও যাবে।
“এর বিপরীতে জামায়াত কী অফার করেছে মানুষকে, কেন জামায়াত ভালো চয়েস—এ ব্যাপারে ভালোমতো ধারণা ওরা দিতে পারে নাই। ফলে, যারা জামায়াতের বক্তব্যে প্রভাবিতও হয়েছে, তারাও বিপরীতে ভালো ব্যাখ্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।”
এছাড়া, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপি তাদের ঝানু রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন দিয়েছে, যারা আগে এমপি-মন্ত্রী ছিলেন বা রাজনীতির ময়দানে ছিলেন, এটা তাদের এগিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক শাহান বলেন, জামায়াত অনেক জায়গায় মনোনয়ন দিয়েছে অপরিচিত প্রার্থীদের। মানুষ ভোট দিতে গিয়ে পরিচিতদেরই ভোট দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘শোরগোল’ সবসময় সত্য নাও হতে পারে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, “সোশাল মিডিয়ার হাইপটা আসলে যারা তোলেন, তারাই এটাকে দৃশ্যমান করেন, কিন্তু বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন। এ হাইপের কারণে অনেকের কাছে ভোটের আগের পরিস্থিতি ও ফলাফলে তফাৎ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে একদমই ওইসব আলোচনার কানেকশন ছিল না।”
‘ফলাফল কাঙ্খিত’
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলছেন, বিএনপির এবারের যে ফলাফল, তা কাঙ্খিত ছিল। জামায়াতও রেকর্ড সংখ্যক আসন পেয়েছে। দুই দলই তাদের প্রতি বিগত সময়ে অত্যাচারের কারণে জনগণের সহানুভূতি পাওয়ায় ভোটব্যাংকও বিস্তৃত হয়েছে।
“আমি সারপ্রাইজড না। কারণ যদি কেয়ারটেকার সরকার থাকত, বিএনপি নবম সংসদের পরে হয়ত ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসত। আমাদের আগের কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইতিহাস, একটা দল কখনও পরপর দুটা নির্বাচনে আসতে পারেনি।”
বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মামলা, একেক নেতার বিরুদ্ধে কয়েকশ করে মামলা এবং অত্যাচার-অবিচারের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে করে বিএনপির প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দীর্ঘ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের অসুস্থ থাকা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রবাসে থেকে দল পরিচালনা সত্বেও বিএনপিতে ভাঙন না ধরার বিষয়টিও আব্দুল আলীম নজরে এনেছেন।
“এই অবস্থায় দলটা ভাঙেনি। এত অত্যাচারের পরেও দলটা ভাঙেনি।”
তিনি বলেন, “ভাঙার চেষ্টা করা সত্ত্বেও দল ভাঙতে পারেনি। এছাড়া বিএনপি চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার নানা বিষয়ে আপোসহীন ভূমিকা, নানা চাপ প্রত্যাখ্যান করা- এইসব বিষয়গুলো জনগণের কাছে পজিটিভ বার্তা হিসেবে এসেছে। সঙ্গে দলটির ভোটব্যাংকও তো ভালো বেড়েছে।”
অন্যদিকে জামায়াতের ভোট বাড়ার প্রসঙ্গ টেনে এ নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “বিগত সরকারের আমলে জামায়াত নিষিদ্ধ করা হল, তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হল। এটাও বাংলাদেশের অনেক মানুষ ভালোভাবে নেয়নি, একটা পলিটিক্যাল পার্টি তার রাজনৈতিক অধিকার থাকবে না? তারও একটা আমরা একটা প্রভাব দেখতে পেলাম এই নির্বাচনে।”
তিনি বলছেন, জামায়াত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল। এবার সেটা ছাড়িয়ে রেকর্ড সংখ্যক আসনে তারা বিজয়ী হয়েছে।
‘সক্ষম’ বিএনপি বনাম ‘সীমাবদ্ধ’ জামায়াত
জামায়াতের রাজনীতি আঞ্চলিকতায় ‘সীমাবদ্ধ’ থাকার বিপরীতে দেশজুড়ে বিএনপির ‘সক্ষমতা’ দেখানোর বিষয়টি এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানের বিশ্লেষণে।
বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ দলটির সক্ষমতা প্রমাণ করে বলে তিনি মনে করেন।
“বিএনপি যে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাবে, এটা আমারও ধারণা ছিল না। আমার ধারণা ছিল যে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ১৬০ থেকে ১৭০ আসনে বিএনপি জিতবে। এর কারণ হচ্ছে, জামায়াতের পপুলারিটির যে ধারণা করা হয়েছিল, বোঝা যাচ্ছে যে সেটা তো পুরোপুরি ঠিক না।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে তো ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট সিস্টেম। মানে, কোনো একটা পার্টি যদি একটা বেশি ভোট পায়, যখন ৫০ শতাংশ ক্রস করে, তখন আসলে এটা দুই-তৃতীয়াংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এর আগে বাংলাদেশে আমরা যেটা দেখছি যে, ৪০ শতাংশ ভোটেও দুই-তৃতীয়াংশ পেয়েছে, আওয়ামী লীগ শেষবার ৪৮ শতাংশ ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়েছিল। তো বিএনপির ভোটের পার্সেন্টেজ এরকম হবে, এটা বিস্ময়কর।”
এই বিশ্লেষক বলেন, “জামায়াতের ভোটের ধরণটা যদি দেখি, এটা একটু আঞ্চলিক। এই অর্থে যে এটা খুলনা, রাজশাহী আর রংপুর—এই কয়েকটা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকিগুলোতে জামায়াত জিতেনি, তা না। ঢাকাতে ভালো করেছে, ময়মনসিংহ একটা জিতেছে, সিলেটে একটা জিতছে। এই কারণেই বলেছি আঞ্চলিকভাবে ভালো করেছে। ফলস্বরূপ, দেশে সমানভাবে নিরঙ্কুশ আসন জেতা সম্ভব ছিল না।
“অন্যদিকে, নির্বাচনে বিএনপি বিএনপি ছিল একমাত্র দল, যেটা স্পষ্ট যে তাদের সারা বাংলাদেশ থেকেই জেতার সক্ষমতা ছিল। এমনকি যে জায়গাগুলোতে জামায়াত খুব ভালো করেছে, সেই জায়গাগুলোতেও বিএনপি ভালো লড়াই করেছে। দেশজুড়ে আসন জেতা, কোনো একটা অঞ্চল নির্ভর না হওয়া—এটা বিএনপির বড় জয়ে ভূমিকা রেখেছে। বোঝা যাচ্ছে, বিএনপির যে সাংগঠনিক কাঠামো সারাদেশে, জামায়াতের সেটা ছিল না।”
তিনি বলেন, “নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট হয়ত খুব বেশি আসে নাই। যেহেতু ৬০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে। কিন্তু ক্লোজ ইলেকশনে—যেখানে জামায়াত ৫-৬ হাজার ভোটে হেরেছে এই জায়গাগুলোতে আওয়ামী লীগের ভোট যত কমই আসুক না, বোঝা যাচ্ছে এই ভোটগুলো পুরাটাই বিএনপির দিকে গেছে। এই ভোটগুলো যদি ভাগ হয়ে যেত, তাহলে হয়ত অন্যরকম হতো।”
এছাড়া সংখ্যালঘু এবং কৃষক, শ্রমিক তথা সাধারণ জনগণও একচেটিয়াভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো জিনিসগুলো ভালো কাজে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
জামায়াতের ফল কী বলছে?
পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনের ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জামায়াতের ভোট ৪ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ ছিল। দলটির ভোট চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে এসে সব পরিসংখ্যান বদলে দিয়ে তার স্বর্ণযুগের চেয়েও প্রায় চারগুণ আসন দখলে নিল জামায়াত; এর জন্য ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোটের ভূমিকা যেমন রয়েছে, তেমনি গণঅভ্যুত্থানের গর্ভে জন্ম নেওয়া তরুণদের দল এনসিপিকে কাছে টেনে নেওয়া অন্যতম কারণ।
এছাড়াও কয়েকটি জেলায় তাদের স্পষ্ট আধিপত্য দেখা গেছে এ নির্বাচনে। উত্তরবঙ্গে দুই বিভাগে তারা বড় রকমের সফলতা দেখিয়েছে।
আসন ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, দলটি সেখানকার কিছু আসনে হারলেও বিএনপির সঙ্গে ব্যবধান সামান্যই।
তবে দলটি একদম খেই হারিয়ে ফেলে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। ময়মনসিংহে জামায়াত তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে পারলেও সেখানে সাফল্য রয়েছে।
দলটির ইতিহাস আমলে নিলে দেখা যায়, এবার সবচেয়ে ভালো ফল মিলেছে ঢাকা জেলায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জামায়াতের আসন পাওয়া তাদের বড় সাফল্য, যে দলটি কখনো ঢাকা বিভাগের কোনো আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। সেখানে জামায়াত দুই সিটি করপোরেশনের ১৫টি আসনের মধ্যে ছয়টি নিয়েছে নিজেদের ঝুলিতে। একটি নিশ্চিত করে দিয়েছে তার শরিক এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলামকে।
এছাড়াও যে আটটি আসনে বিএনপির বিপরীতে হেরেছে সেখানকার ফলাফল বলছে, তিনটিতে বিএনপির সঙ্গে তাদের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৩২০ থেকে ৪ হাজার ৩৯৯ এর মধ্যে। এর মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আসনও রয়েছে।
এছাড়াও ৫-৭ হাজারের মধ্যে রয়েছে দুটি আসন রয়েছে। বড় ব্যবধানে হারা আসনে লড়াই করেছে এনসিপির এক তরুণ; তার সঙ্গে ছিল এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র নির্বাচন করা তাসনিম জারা। তাদের দুইজনের লড়াইয়ে সেখানকার বিএনপির প্রার্থী বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে।
আরেকটি আসনেও ছিল বড় ব্যবধান; তবে তরুণ ও অনেকটাই অচেনা এনসিপির প্রার্থী সেখানে এক লাখের ওপর ভোট পেয়েছেন।
ঢাকার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে নেতৃত্বের সঙ্গে ঢাকার এসব আসনে জামায়াতের জয় স্বাভাবিকভাবেই সরকারবিরোধী রাজনীতির মাঠে তাদের বড় সুবিধা দেবে।
একটা সময় ঢাকা নিয়ন্ত্রণ রাখতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যে ছক ছিল, সেখানে এখন জামায়াতের পাল্লা দেওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
দেশের সীমান্ত এলাকায় নিজেদের প্রভাব তৈরির পাশাপাশ ঢাকার প্রবেশমুখে জামায়াতের আসন নিশ্চিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনও সেভাবেই গড়ে উঠেছিল।
যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও জুরাইন বেষ্ঠিত ঢাকা-৪ এবং ঢাকা-৫ আসন রয়েছে জামায়াতের ঝুলিতে। যেখানে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে জুলাই আন্দোলনে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের উত্তপ্ত এলাকা ছিল বাড্ডা ও রামপুরা। তার প্রভাব এবার ভোটে দেখা গেল। সেখানকার ঢাকা-১১ আসনে জিতেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
আন্দোলনের আরেক উত্তপ্ত ক্ষেত্র ছিল ঢাকার আরেক প্রবেশমুখ মোহাম্মদপুর-বছিলা এলাকা। সেখানে জামায়াত জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক সামান্য ব্যবধানে হেরেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রবেশদ্বার উত্তরা, যেখানে আন্দোলনের ঢেউ ওঠেছিল, সেখানে এনসিপির তরুণ নেতা ১ লাখ ১১ হাজার ভোট পেয়েছেন।
তবে অপর প্রবেশদ্বার গাবতলী-মিরপুর হাতছাড়া করেনি ধর্মভিত্তিক এ দল। যেখানে থাকা তিনটি আসনই তারা নিশ্চিত করেছে। আর এ এলাকাতেই আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে আন্দোলন খুব জোরদার ছিল।
দুই দলের নেতারা যা বলছেন
ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভালো ফলের আশা প্রকাশ করেছেন দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
শুক্রবার নির্বাচন কমিশনে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “দেখেন, আমরা ২৯২টি আসনে আমাদের প্রার্থীদের মনোনীত করেছিলাম। আমাদের তো ধারণা ছিল যে, আমাদের সব প্রার্থীই জিতবে। এটা সবাই তাই মনে করে। এমনকি যারা ২-৪-৫০০ ভোটও পায়, তারাও বিজয়ের আশা করেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
“এই ব্যাপারে এই প্রশ্নের জবাব তো সেভাবে দেওয়া যাবে না। আমরা বলি যে আমাদের যা হয়েছে, ইনশাআল্লাহ আগামী নির্বাচনে নিশ্চয়ই আমাদের ফলাফল আরও ভালো হবে।”
তবে এ ফল নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তারা এদিন তাদের পরাজয়কে ‘সাজানো’ বলে মন্তব্য করে সবাইকে ‘ধৈর্য্য ধরার আহ্বান’ জানিয়েছে।
ফেইসবুকে এক পোস্টে ‘নির্বাচনের স্বচ্ছতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দল বলেছে, “ফলাফল তৈরি ও ঘোষণার ধরণ আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থীরা অল্প ভোটে রহস্যজনকভাবে হেরে গেছেন। ফলাফলে বারবার গরমিল ও সাজানো দেখা যাচ্ছে এবং প্রশাসনও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি বলে মনে হচ্ছে। এসব কারণে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।”
