Published : 06 Feb 2026, 12:34 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে রোহিঙ্গাদের আটকাতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিতে বলেছে নির্বাচন কমিশন।
বিভিন্ন সংস্থার বিশেষ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও রিটার্নিং অফিসারকে বুধবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ ও গণভোট হবে দেশের ২৯৯ আসনে। ভোট ঘিরে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকছে।
ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে জানানো হয়েছে, ভোটের চার দিন আগে, ভোটের দিন ও ভোটের পরে দুদিন মিলিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এবারের নির্বাচনে ভোটার আছেন পৌনে ১৩ কোটি। দেশের প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষে তাদের ভোটগ্রহণের আয়োজন হচ্ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। তাদের কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করিয়েছেন বলে বিভিন্ন সময়ে তথ্য মিলেছে।
রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকার্ভুক্তি ঠেকাতে এর আগে বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। এবার নির্বাচনী কর্মকাণ্ড থেকে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখতেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে ভোটের সময় রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। চেকপোস্টগুলোতে পরিচয় যাচাই ও তল্লাশি জোরদার করার পাশাপাশি সতর্ক থাকতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে ইসি।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এক মত বিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সশস্ত্র দল ও অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। কিছু রোহিঙ্গা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় ভোট দান বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান, ভোটের সাত দিন আগে থেকে চেকপোস্ট স্থাপন করে ভোটদানে নিবৃত করা, বিদেশিদের সতর্কভাবে চলাচলসহ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ সুপারিশ করা হয়।
আরেকটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘অবৈধ হস্তক্ষেপের আশঙ্কা’, আসন্ন নির্বাচনে এমপি প্রার্থীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় প্রচার বা ভোটকেন্দ্রে লোকবল হিসেবে ব্যবহার, টাকার বিনিময়ে জাল ভোট দেওয়া এবং বিরোধী প্রার্থী দমনের ঝুঁকি রয়েছে।
এছাড়া ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও বড় ঝুঁকি। সিআইসি আউটপাস বা অবৈধভাবে কাঁটাতার অতিক্রম করে উখিয়া-টেকনাফের লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে।
ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সক্রিয় বিভিন্ন সোশ্যাল গ্রুপ গুজব বা উসকানিমূলক বার্তা ছড়িয়ে ক্যাম্পের পরিবেশ ‘অস্থিতিশীল’ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়।
আরসা, আরএসও, আরাকান আর্মির মত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যে নির্বাচনকালীন সময়ে সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, সেই ঝুঁকির কথাও সেখানে বলা হয়।
যত পদক্ষেপ
নির্বাচন ঘিরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ঝুঁকি রোধে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবিহিত করা হয়েছে।
>> নির্বাচনকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বহির্গমন সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা, এপিবিএনের চেকপোস্টগুলোতে শতভাগ পরিচয় যাচাই ও তল্লাশি জোরদার করতে হবে।
>> নির্বাচনের আগের দিন ও ভোটের দিন ক্যাম্পের ভেতরে অটোরিকশা ও মোটরবাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে হবে।
>> নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে ক্যাম্পে সক্রিয় সব সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ও রোহিঙ্গা সংগঠনের সভা-সমাবেশ বন্ধ রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যেন নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় জড়িত না হয়, সে বিষয়ে মসজিদের ইমাম ও মাঝিদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।
>> বিজিবির টহল জোরদার এবং মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর গতিবিধির ওপর বিশেষ নজরদারি, নির্বাচনকালীন সময়ে দেশি-বিদেশি এনজিও কর্মকর্তা ও দর্শনার্থীদের ক্যাম্প পরিদর্শন সীমিত বা নিরুৎসাহিত করতে হবে।
>> নির্বাচনি প্রচারের সময় রোহিঙ্গা শ্রমিক নিয়োগ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জনসমাগম এড়াতে বালুখালী, লেদা ও নয়াপাড়ার মত ক্যাম্পসংলগ্ন বড় বাজার নির্বাচনের আগের দিন, ভোটের দিন ও পরদিন সাময়িক বন্ধ রাখতে হবে।
>> ক্যাম্পে পর্যাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন রেখে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মরিচ্যা, রেজুখাল ও হোয়াইক্যং চেকপোস্টসহ ক্যাম্পের আশপাশে এপিবিএন ও বিজিবির যৌথ নজরদারি জোরদার করতে হবে।
>> রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলকে সতর্কবার্তা দিতে হবে। একই সঙ্গে এমপি প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার, টাকার বিনিময়ে জাল ভোট বা বিরোধী প্রার্থী দমনে রোহিঙ্গা ব্যবহারের ঝুঁকি ঠেকাতে এপিবিএন ও সিআইসির সমন্বয়ে ক্যাম্পে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার এবং নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকবেন বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন সদস্য। এছাড়া নির্বাচনে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন।
পুরনো খবর
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথ খোঁজার প্রতিশ্রুতি ১১ পশ্চিমা দেশের
ভোটের মাঠে ‘বন্ধু সেজে’ পাশে দাঁড়ানোদের বিষয়ে সতর্ক করল ইসি
ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা: বিশেষ এলাকায় 'কঠোর পদক্ষেপ'
রোহিঙ্গা ঢলের ৬ বছর: 'গ্যাঁড়াকলে' প্রত্যাবাসন, মুখ ফিরিয়েছে দাতারা
ভোটের মাঠে আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে ৭ দিন
সংসদ ও গণভোট: কোথায় কখন কীভাবে কাজ করবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী?