যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের প্রতীক গাধা ও হাতি হল যেভাবে
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে এই দুটি প্রাণী কীভাবে জনপ্রিয় হল, তার পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ এক ইতিহাস।
প্রতিবার যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক কার্টুন, ভোটের প্রচারের ব্যাজ, ইন্টারনেটের মিম কিংবা ফ্যাশন বাজারেও দেখা যায় গাধা ও হাতির ছবি। এর অন্যথা হওয়ার যেন উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের পরিচায়ক এ দুই প্রাণী দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সান্তা ক্লজ কিংবা আঙ্কেল স্যামের মতই এরা সবার কাছে পরিচিত।
তবে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকই হয়ত জেনে অবাক হবেন, এই দুটি রাজনৈতিক প্রতীকই জনপ্রিয় হয়েছিল একজন স্বাধীনচেতা কার্টুনিস্টের হাত ধরে। তিনিই এগুলোকে আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আধুনিক সান্তা ক্লজ এবং আঙ্কেল স্যামের রূপকারও তিনি।
তার নাম টমাস নাস্ট। ১৮৬২ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত ‘হার্পারস উইকলি’ পত্রিকায় কাজ করার সময় তিনি হয়ে ওঠেন আমেরিকার প্রথম প্রভাবশালী রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট।একই সঙ্গে তিনি ছিলেন দেশটির অন্যতম তীক্ষ্ণধী ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী।
একজন নাস্ট
সিএনন লিখেছে, কাঠের ব্লকে খোদাই করে তৈরি করা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত চিত্রকর্মের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন নাস্ট। গৃহযুদ্ধ, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার নানা অসংগতি, অভিবাসন এবং সবচেয়ে বেশি আলোচিত নিউ ইয়র্কের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘ট্যামানি হল’ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন তিনি।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৪০ ও ১৮৫০-এর দশকে নিউ ইয়র্ক শহরে বেড়ে ওঠার সময় শৈশবে প্রচণ্ড নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন নাস্ট। তার পুরো কর্মজীবনে দুটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে। একদিকে সব ধরনের ক্ষমতাবান ও নিপীড়কের প্রতি তার তীব্র বিদ্রূপ, অন্যদিকে নিপীড়নের শিকার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা।
১৮৭৪ সালে আঁকা তার বিখ্যাত একটি কার্টুনের নাম ‘ওয়ার্স দ্যান স্লেভারি’ (দাসত্বের চেয়েও ভয়াবহ)। এতে দেখা যায়, নিরস্ত্র একটি কৃষ্ণাঙ্গ পরিবার হাস্যোজ্জ্বল কু ক্লাক্স ক্ল্যানের (কেকেকে) এক সদস্যের সামনে ভয়ে জড়সড় হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, ‘দে আর সোয়ালোয়িং ইচ আদার’ (তারা একে অন্যকে গিলে খাচ্ছে) শিরোনামের আরেকটি কার্টুনে নিউ ইয়র্কের রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কেকেকের আঁতাতকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন নাস্ট।
সেখানে কোনো নিপীড়িত মানুষ নেই। বরং অস্বাভাবিকভাবে স্থূলকায় ও বিস্ফারিত চোখের দুই ব্যক্তিকে এমনভাবে আঁকা হয়েছে, যেন তারা নিজেদেরই গিলে খাচ্ছে।
সিএনএন লিখেছে, বর্তমানে ‘সম্পাদকীয় কার্টুন’ বলতে সাধারণত অল্প কয়েকটি রেখায় আঁকা সহজবোধ্য ছবি বোঝায়, যা খবর পড়ার সময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখে নেওয়া যায়। কিন্তু নাস্টের কার্টুন ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
ঘনবিন্যস্ত, অত্যন্ত বিস্তারিত এবং নানা পরিচিতি-চিহ্নে ভরা এসব কার্টুন ছিল একেকটি সংবাদ। শুধু ছবি নয়, প্রতিটি কার্টুন ছিল এক একটি যুক্তি বা বক্তব্য, যা বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা করার জন্য তৈরি করা হত।
এর একটি উদাহরণ ১৮৭৪ সালে আঁকা ‘থার্ড টার্ম প্যানিক’ (তৃতীয় মেয়াদ নিয়ে আতঙ্ক)। রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হিসেবে হাতির পরিচিতি জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব প্রায়ই এই কার্টুনকে দেওয়া হয়।
যেভাবে রিপাবলিকানদের প্রতীক হলো ‘হাতি’
১৮৭৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড পত্রিকা একটি গুজব ছড়ায়। তখন পত্রিকাটি ডেমোক্রেটিক পার্টির কয়েকজন প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
তারা প্রচার করে, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্র্যান্ট ১৮৭৬ সালে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ভাবছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ২২তম সংশোধনী যুক্ত হওয়ার আগের ঘটনা এটি। ফলে তখন প্রেসিডেন্টের তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পথে আইনি বাধা ছিল না। তবে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ভালো চোখে দেখা হত না।
নাস্ট ছিলেন আব্রাহাম লিংকনের দল রিপাবলিকান পার্টির একনিষ্ঠ সমর্থক। তার কার্টুনে তিনি নিউ ইয়র্ক হেরাল্ডকে দেখান সিংহের চামড়া পরা একটি গাধা হিসেবে। গ্র্যান্টের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে অন্য প্রাণীদের ভয় দেখাচ্ছে সেই গাধা।
সেই কার্টুনে থাকা প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বিশালদেহী, কিছুটা বোকাসোকা চেহারার একটি হাতি। তার গায়ে লেখা ‘দ্য রিপাবলিকান ভোট’। দেখে মনে হয়, হাতিটি যেন যে কোনো মুহূর্তে পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচে পড়ে যাবে।
অবশ্য মানুষের সঙ্গে প্রাণীর তুলনা করে ব্যঙ্গ করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। সিংহের চামড়া পরা গাধার গল্পটি প্রাচীন গ্রিক কথাসাহিত্যিক ঈশপের সময় থেকেই প্রচলিত।
আর রিপাবলিকানদের হাতি হিসেবে দেখানোর ক্ষেত্রেও নাস্ট প্রথম শিল্পী নন। তারও অন্তত এক দশক আগে থেকেই বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে রিপাবলিকান পার্টির প্রচারে ‘সি দ্য এলিফ্যান্ট’ স্লোগান ব্যবহার করা হত।
এটি ছিল গৃহযুদ্ধের সময়কার একটি কথ্য অভিব্যক্তি, যার মোটামুটি অর্থ ছিল ‘সাহসের সঙ্গে লড়াই করা’।
ডেমোক্র্যাটদের ‘গাধা’ হওয়ার গল্প
নাস্ট তার কার্টুনে বহুবার ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে গাধা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। যদিও ‘থার্ড টার্ম প্যানিক’ কার্টুনে প্রাণীটি আসলে গাধা নয়, শিয়ালের রূপ নিয়েছিল।
তবে এই দলটির সঙ্গে গাধার সম্পর্ক আরও পুরোনো। নাস্টের আঁকার অন্তত অর্ধশতাব্দী আগে, প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের আমল থেকেই ডেমোক্র্যাটদের গাধা হিসেবে চিত্রিত করা হত।
১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জ্যাকসনকে তার বিরোধীরা অপমান করে ‘জ্যাকঅ্যাস’ বা গাধা বলে ডাকত, যা তিনি পরে নিজেই নিজের প্রচারের কৌশল হিসেবে লুফে নেন।
নাস্টের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে তিনি একটি বিশৃঙ্খল চিড়িয়াখানা বা সার্কাস হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। নিউ ইয়র্কে বার্নাম অ্যান্ড বেইলি সার্কাসের যাত্রা শুরুর তিন বছর পর তার এই ভাবনার প্রকাশ ঘটে।
সেরা ব্যঙ্গশিল্পীদের মত নাস্ট প্রতিপক্ষের পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক শিবিরকেও বিদ্রূপ করতেন সমান উৎসাহ নিয়ে।
রিপাবলিকান পার্টিকে তিনি এমন একটি দুর্বল ও আতঙ্কিত প্রাণী হিসেবে এঁকেছেন, যা প্রায়ই দিশাহারা হয়ে ভুল পথে এগিয়ে যায়। তার বিশাল আকৃতিও এখানে কোনো সুবিধা নয়, বরং দুর্বলতার কারণ।
নাস্টের আঁকা গাধার অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। ১৮৭৯ সালের একটি কার্টুনে দেখা যায়, একগুঁয়ে গাধাটি লেজ ধরে ঝুলে রয়েছে। নিচে ‘আর্থিক বিশৃঙ্খলা’ নামের অতল গহ্বর। যে কোনো মুহূর্তে সেখানে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
আসলে, তার বেশিরভাগ কার্টুনেই হাতি এবং গাধাকে চরম বিশৃঙ্খলার একেবারে দ্বারপ্রান্তে দেখানো হত, যা উনিশ শতকের শেষভাগে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের বেশ নিখুঁত একটি মূল্যায়ন ছিল।
স্রষ্টার করুণ পরিণতি
১৮৮০-এর দশকে নাস্ট ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভীতিকর কার্টুনশিল্পী। ডান ও বাম—দুই রাজনৈতিক শিবিরের দুর্নীতিবাজ ও প্রতারকদের কাছে তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের কার্টুনের মতই এক ঘটনায় সর্বস্ব হারান তিনি। ‘পঞ্জি স্কিম’ বা বিনিয়োগ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তার সব অর্থ শেষ হয়ে যায়।
অথচ জীবনের পুরোটা সময় তিনি এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেই মানুষকে সতর্ক করে এসেছিলেন।
১৮৯০ সালে তিনি বড়দিনের ইলাস্ট্রেশনের একটি বই প্রকাশ করে নিজের ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ততদিনে তিনি তার সৃজনশীল ধারার অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন।
জীবনের শেষ দশকটি তার কেটেছে অসুস্থতা ও আর্থিক দুরবস্থায়। নিজের সেরা কাজগুলো যে অনেক আগেই করে ফেলেছেন, সেই উপলব্ধিও তাকে কষ্ট দিত।
উপহাস থেকেই জন্ম নিল প্রতীক
তবে নাস্টের সেই অসাধারণ উদ্ভাবনী ক্ষমতার কল্যাণে হাতি এবং গাধা আজও মার্কিন রাজনীতির মঞ্চে সগৌরবে বেঁচে আছে।
রিপাবলিকান পার্টি হাতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে। ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে গাধাকে স্বীকৃতি না দিলেও, তাদের যে কোনো সমাবেশে গেলে গাধার ছবি বা প্রতীকের দেখা মিলবেই।
মজার বিষয় হল, আমেরিকার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তাদের এই প্রতীকগুলোকে এত উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেছে, অথচ নাস্টের মূল কার্টুনে এই দুই প্রাণীকে খুব একটা ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
হয়তো কোনো দলই ব্যাজ আর ব্যাগে এই প্রতীক ছাপানোর আগে এর পেছনের ইতিহাস যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি!
অথবা তারা নাস্টের বিদ্রূপের বিষয়টি জানত। আর নিজেদের নিয়ে সেই ঠাট্টায় যোগ দেওয়াকেই যথাযথ জবাব বলে মনে করেছে।
