জোহানেস হেভেলিয়াস: চাঁদের প্রথম মানচিত্রকার
নিজের বাড়ির ছাদে মানমন্দির গড়েছিলেন এই জ্যোতির্বিদ।
সালটা ১৬৪৭। ইউরোপের এক জ্যোতির্বিদ চাঁদের এমন একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেন, যা সে সময়ের অন্য যেকোনো মানচিত্রের তুলনায় ছিল অনেক বেশি নির্ভুল। তার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিল চাঁদের পৃষ্ঠের নানা বৈশিষ্ট্য, গর্ত ও ভূপ্রকৃতি।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য তিনি প্রায়ই খালি চোখের ওপর নির্ভর করতেন। নিজের বাড়ির ছাদে মানমন্দির তৈরি করে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা এই বিজ্ঞানীর নাম জোহানেস হেভেলিয়াস। চাঁদের মানচিত্র তৈরির পাশাপাশি ধূমকেতু আবিষ্কার, সৌরকলঙ্ক পর্যবেক্ষণ এবং নতুন নক্ষত্রমণ্ডল চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তার।
১৬১১ সালের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন পোল্যান্ডের ডানজিগ শহরে জন্ম নেন হেভেলিয়াস। শহরটি বর্তমানে ‘গদানস্ক’ নামে পরিচিত। তার বংশপরিচয় ছিল জার্মান ও চেক, আর প্রথম ভাষা ছিল জার্মান। তবে ডানজিগ তখন পোল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং তিনি পোলিশ সমাজজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে কারণে তাকে পোলিশ জ্যোতির্বিদ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
হেভেলিয়াসের বাবা আব্রাহাম ছিলেন একজন সচ্ছল ব্রুয়ারিশিল্পের মালিক। পরিবারের ব্যবসা ছিল লাভজনক। তিন ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে শৈশব পেরিয়ে বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে ছিলেন হেভেলিয়াস। ফলে বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার প্রত্যাশা ছিল তার ওপর। ডানজিগের একটি জিমনেসিয়ামে ছয় বছর পড়াশোনার পর তাকে পাঠানো হয় পোলিশ ভাষাভাষী গ্রাম গন্ডেলৎসে। সেখানে গণিত শিক্ষক পিটার ক্রুগার তাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। অল্প বয়সেই আকাশ পর্যবেক্ষণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। এরপর থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান আকর্ষণ।
তবে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব পালনের কারণে গবেষণায় সব সময় মনোযোগ দিতে পারেননি তিনি। বিভিন্ন সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ থামিয়ে তাকে ব্রুয়ারির দায়িত্ব নিতে হয়েছে। প্রথম স্ত্রী ক্যাথারিনা রেবেশকে ব্যবসার প্রশাসনিক কাজে সহযোগিতা করতেন। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল সুখের। ১৬৬২ সালে ক্যাথারিনার মৃত্যুর পর হেভেলিয়াস বিয়ে করেন এলিজাবেথা কুপম্যানকে। বিয়ের সময় এলিজাবেথার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। পরে তিনিও জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং স্বামীর গবেষণায় সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তাকে খ্রিষ্টীয় যুগের প্রথম নারী জ্যোতির্বিদদের একজন বলেও বিবেচনা করা হয়।
১৬৪১ সালে হেভেলিয়াস নিজের তিনটি পাশাপাশি বাড়ির ছাদে একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি নিজের তৈরি ও কেনা উন্নতমানের যন্ত্রপাতি স্থাপন করেন। সে সময় জ্যোতির্বিদরা মূলত দীর্ঘ ফোকাল দৈর্ঘ্যের প্রতিসারক টেলিস্কোপ ব্যবহার করতেন। প্রতিফলক টেলিস্কোপের প্রচলন তখনও শুরু হয়নি; ১৬৭০ সালের পর নিউটনের হাত ধরে এ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে।
হেভেলিয়াস নিজেই টেলিস্কোপ তৈরি করতেন। তার নির্মিত একটি টেলিস্কোপের ফোকাল দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ মিটার। কাঠ ও তার দিয়ে তৈরি হয়েছিল এর দীর্ঘ নল। তার ছাদের মানমন্দিরটি একসময় ইউরোপের বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এমনকি পোল্যান্ডের রাজা ও রানিও সেটি পরিদর্শন করেন। ১৬৬৪ সালে তাকে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটির সদস্য করা হয়। তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পোলিশ সদস্য।
মানমন্দিরে বসে হেভেলিয়াস সূর্যের সৌরকলঙ্ক নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করেন। ১৬৪৪ সালের ৩ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত সূর্যের পৃষ্ঠে সৌরকলঙ্কের অবস্থান নিয়ে তার আঁকা চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি চারটি ধূমকেতু আবিষ্কার করেন।
হেভেলিয়াসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ১৬৪৭ সালে তৈরি চাঁদের বিস্তারিত মানচিত্র। এর সঙ্গে তিনি চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি বিবরণও প্রকাশ করেন। তার আগে থমাস হ্যারিয়ট ও গ্যালিলিও চাঁদের মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। তবে হেভেলিয়াসের মানচিত্র ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নির্ভুল। এ কারণে তাকে চন্দ্রপৃষ্ঠের ভূপ্রকৃতিবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চাঁদের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য তিনি নিজস্ব নামও প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ১৬৫১ সালে ইতালীয় জ্যোতির্বিদ জিওভান্নি বাতিস্তা রিচিওলি নতুন নামকরণ চালু করলে হেভেলিয়াসের দেওয়া নামগুলো ক্রমে হারিয়ে যায়। যেমন, বর্তমানে চাঁদের যে গর্তটি ‘প্লেটো’ নামে পরিচিত, হেভেলিয়াস সেটিকে বলেছিলেন ‘দ্য গ্রেট ব্ল্যাক লেক’ বা বিশাল কালো হ্রদ।
চাঁদের লিব্রেশন বা আপাত দোলন নিয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল। পৃথিবী থেকে চাঁদকে সব সময় একইভাবে দেখা যায় না। চাঁদের কক্ষপথ ও ঘূর্ণনের কারণে কখনও এর পূর্ব বা পশ্চিম প্রান্তের কিছু অতিরিক্ত অংশ দৃশ্যমান হয়। হেভেলিয়াস বিশেষ করে দ্রাঘিমাংশের দিকে এই আপাত অবস্থান পরিবর্তন শনাক্ত করেন। নক্ষত্রমণ্ডল চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও তার অবদান রয়েছে। তিনি নতুন নয়টি নক্ষত্রমণ্ডল প্রবর্তন করেন, যেগুলো পরবর্তী সময়েও স্বীকৃতি ধরে রেখেছে।
১৬৭৯ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে হেভেলিয়াসের মানমন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। আগুনে পুড়ে যায় তার যন্ত্রপাতি, বইপত্র এবং বহু বছরের গবেষণার নথি। কিন্তু তিনি গবেষণা ছেড়ে দেননি। স্ত্রী এলিজাবেথার সহযোগিতায় আবার মানমন্দির নির্মাণ করেন। নতুন করে তৈরি করেন ৪৫ মিটার ফোকাল দৈর্ঘ্যের আরেকটি টেলিস্কোপ।
এবার টেলিস্কোপের জন্য পুরো দৈর্ঘ্যের কোনো নল তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তাই কয়েকটি রিং বা বলয়ের সাহায্যে যন্ত্রটির দুই প্রান্তে অবজেক্টিভ লেন্স ও আইপিস স্থাপন করেন। মাঝখানে অবিচ্ছিন্ন নল না থাকায় সামান্য বাতাসেই যন্ত্রটি কেঁপে উঠত। তবু তিনি এই কঠিন যন্ত্র ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান।
হেভেলিয়াসের পর্যবেক্ষণপদ্ধতি নিয়ে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুকের সঙ্গে দীর্ঘ বিরোধও ছিল। হুক মনে করতেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য টেলিস্কোপিক সাইট ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু হেভেলিয়াস নিজের খালি চোখে পর্যবেক্ষণের পদ্ধতির ওপর আস্থা রাখতেন। বৈজ্ঞানিক বিচারে হুকের যুক্তিই সঠিক ছিল। আরেক জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি দুই পক্ষের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। হেভেলিয়াস শেষ পর্যন্ত নিজের পদ্ধতি পরিবর্তন করেননি।
১৬৮৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, নিজের ৭৬তম জন্মদিনে ডানজিগে মারা যান হেভেলিয়াস। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী এলিজাবেথা স্বামীর রেখে যাওয়া পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার নথি সংরক্ষণ এবং তিনটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন। তার চাঁদের মানচিত্রের মূল তামার খোদাই করা প্লেটটি পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায়।
এ নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে, প্লেটটি গলিয়ে চায়ের পাত্র তৈরি করা হয়েছিল। যদিও গল্পটির সত্যতা নিশ্চিত নয়, তবু এটি তার গবেষণাকর্মের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার করুণ স্মারক। চাঁদের একটি বড় গর্তের নাম তার সম্মানে ‘হেভেলিয়াস’ রাখা হয়েছে। কয়েক শতাব্দী আগে যে চাঁদের ভূপ্রকৃতি তিনি নিজের হাতে মানচিত্রে তুলে ধরেছিলেন, সেই চাঁদের বুকেই আজ তার নাম স্থায়ী হয়ে আছে।
সূত্র: বিবিসি স্কাই অ্যাট নাইট ম্যাগাজিন।
