০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: কী দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা

এপি-এনওআরসির জনমত জরিপ বলছে, প্রায় অর্ধেক ভোটার চান কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাক; আর ৩৮ শতাংশ চাইছেন, রিপাবলিকানদের হাতেই থাকুক।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: কী দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: বিবিসি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Nov 2026, 12:50 AM

Updated : 03 Nov 2026, 12:50 AM

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর কীভাবে কাটবে, তা নির্ধারণে আগামী মঙ্গলবার ভোট দিতে যাচ্ছে দেশটির জনগণ।

মধ্যবর্তী এ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হাজারো পদে নির্বাচন হলেও ভোটারদের মনোযোগ কংগ্রেসের দুই কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটে। দুই কক্ষেই প্রেসিডেন্টের দল রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। এ নির্বাচন সেই নিয়ন্ত্রণে লাগাম টেনে ধরতে পারে। ফলে ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের সাফল্য ও ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।

ভোটাররা কী দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই প্রশ্নও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ নির্বাচনের আগে জনমত জরিপের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সেইসঙ্গে এবার জীবনযাত্রার ব্যয়, গ্যাসের মূল্য, অভিবাসন, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ আর দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসার পর থেকে ট্রাম্পকে নিয়ে নানা বিতর্কও ভোটারদের রায়ে প্রভাব ফেলতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয়

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবেলায় কোন দল বেশি উপযুক্ত- ভোটারদের এই ধারণায় রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটরা ‘সুবিধাজনক’ অবস্থানে রয়েছে রয়টার্স জানিয়েছে।

বার্তা সংস্থাটি বলছে, গত এক বছর ধরে বিভিন্ন জনমত জরিপে ভোটাররা ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ জীবনযাত্রার খরচের বিষয়টি মাথায় রেখেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেবেন ভোটাররা।

ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক সংবাদপত্র ‘রোল কল’ এর মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগগুলোকে অনেকটাই গুরুত্ব দেননি। ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানে সশস্ত্র যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকে পেট্রোলের দামে ঊর্ধ্বগতির বিষয়টিও ভোটার উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, কোভিড মহামারীর সময়ে ভোটারদের ক্ষোভ আর আর্থিক দূরাবস্থা ট্রাম্পকে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করলেও পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার নেওয়া পদক্ষেপ সেই দূরাবস্থা লাঘবের প্রতিশ্রুতি পূরণে জটিলতা তৈরি করেছে।

স্বাস্থ্যসেবা

সিএনবিসি লিখেছে, যাদের স্বাস্থ্যবীমার কিস্তির খরচ ক্রমাগত বাড়ছে, তাদের কাছে নির্বাচনে প্রার্থীদের অবস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা কতটা সাশ্রয়ী হবে, সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অনেক ভোটারই স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে মনে করেন স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফ এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ল্যারি লেভিট।

তিনি বলেন, সরকারি স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি মেডিকেইড বরাদ্দ কমানোর পক্ষে ভোট দেওয়া এবং অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হতে দেওয়ার কারণে অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী এখন সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ মেডিকেইড বীমা কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা পাচ্ছেন। প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ নাগরিক ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের’ আওতায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মার্কেটপ্লেসে নিবন্ধিত রয়েছেন।

স্বাস্থ্যবিমায় প্রিমিয়ামের ওপর দেওয়া অতিরিক্ত সরকারি ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় মাসিক বীমা প্রিমিয়ামের খরচ বেড়েছে। স্বাস্থ্যবিমার আওতার বাইরে থাকা মার্কিন নাগরিকের সংখ্যাও বেড়েছে।

হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক মেরেডিথ রোজেনথাল বলেন, “এ বিষয়গুলো ২০২৫ সালে সরকারের নেওয়া সুনির্দিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসের বর্তমান কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন চাইলে তা বিস্ময়কর হবে না।”

ডেটা সেন্টার

বিশাল আকারের কম্পিউটিং ওয়্যারহাউজ বা ডেটা সেন্টার তৈরিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার নিয়ামকগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। নিই ইয়র্ক টাইমস বলছে, ডেটা সেন্টার নিয়ে তৈরি হওয়া ‘জনরোষ’ কাজে লাগাতে কিংবা সেই বিতর্ক থেকে নিজেদের রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা, যা প্রতিনিধি পরিষদ, সেনেট ও গভর্নর পদে নির্বাচনের গতিপথ বদলে দিচ্ছে।

বিশাল আকারের ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন হওয়ায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাম অঞ্চলগুলোর ভেতরের দিকে বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। যে কারণে খামার ও কৃষিভিত্তিক রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীগুলো এবং বামঘেঁষা পরিবেশবাদী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প ও কর ছাড়

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, রিপাবলিকানদের প্রার্থীদের প্রাথমিক নির্বাচনে ‘সবচেয়ে শক্তিশালী হাত’ হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প নিজেই তাদের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারেন। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আর অপ্রিয় যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ‘অনেক নিচে নেমে গেছে’। ফলে ডেমোক্র্যাটরা সুবিধাজনক বা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনগুলোতে ট্রাম্পকে ‘অস্ত্র হিসেবে’ ব্যবহার করতে পারেন। মার্কিন প্রশাসনের জনগণের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা চালাতে পারেন।

সিএনবিসি লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

২০২৫ সালে রিপাবলিকানদের করা এই আইনের মাধ্যমে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের করা কর সংস্কারগুলো স্থায়ী করা হয়। পাশাপাশি নতুন করে বেশ কিছু কর ছাড়ের সুযোগ রাখা হয়। এর মধ্যে বকশিশ বা ‘টিপস’ থেকে অর্জিত আয়, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার (ওভারটাইম) আয়, জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য করছাড় এবং গাড়ির ঋণের সুদের ওপর করছাড়সহ আরও কয়েকটি সুবিধা রাখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, এ আইন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লাখো মার্কিন নাগরিকের সরাসরি করছাড়ের সুবিধা দিয়েছে।

গ্যাসের দাম

পলিটিকো বলছে, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে রিপাবলিকানরা গ্যাসের দাম নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের কঠোরভাবে কোণঠাসা করেছিল। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় এবার সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের জন্য।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত গ্যাসের দাম নিয়ে প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে। এমএস নাউ বলছে, গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি এখন ভোটারদের পাশাপাশি নিজেদের আসন ধরে রাখার চেষ্টা করা রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের জন্যও ‘একটি বড় উদ্বেগের’ কারণ হয়ে উঠছে।

পাম্পগুলোতে জ্বালানির চড়া দাম থাকলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের তুলনামূলক বেশি রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়, এমনটিই দেখা গেছে অতীতের নির্বাচনি বিশ্লেষণগুলোতে।

ইউএস টুডে জানিয়েছে, গত মার্চ মাসে ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেশনাল ক্যাম্পেইন কমিটি জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য একগুচ্ছ সোশ্যাল মিডিয়ায় অর্থ ব্যয় করে। বিজ্ঞাপনগুলো চার ডজন নির্বাচনি এলাকা নিশানা করে প্রচার করা হয়। ওই এলাকাগুলো রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিজেদের দখলে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করে ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেশনাল ক্যাম্পেইন কমিটি।

অভিবাসন

মার্কিন সংবাদপত্র পলিটিকো বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি আর অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের কারণে ভোটারদের মধ্যে যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা ‘পুষিয়ে নিতে’ চাইছেন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও প্রার্থীরা।

আগের নির্বাচনগুলোতে অভিবাসনের বিষয়টি রিপাবলিকানদের জন্য নির্ভরযোগ্যভাবে জয় এনে দিত। কিন্তু এখন দলটি কেবল দোদুল্যমান বা সিদ্ধান্তহীন অবস্থান থাকা কিংবা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহী ভোটারদের সমর্থন আদায়েই হিমশিম খাচ্ছে না, বরং অভিবাসন নীতি নিয়ে নিজেদের জোটের মধ্যেই মতবিরোধের কারণে সেই ঐক্য ধরে রাখতেও লড়াই করছে।

এনবিসি নিউজ বলছে, অবৈধ অভিবাসী তাড়াতে অভিযান যত জোরদার হচ্ছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন আসায় হোয়াইট হাউসের ওই পদক্ষেপ তত রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অপরদিকে সীমান্ত ইস্যুতে কীভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে তা বুঝে গেছেন ‘মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল’- উভয় ধারার ডেমোক্র্যাটরা। তাদের কিছু প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ বিভাগের সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন। কেউ আবার এটিকে ‘পুরোপুরি বিলুপ্ত করে’ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতি সামগ্রিকভাবে ‘ব্যাপক অজনপ্রিয়’ হওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের অনেকেই এর মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা দেখছেন। কেউ আবার আশঙ্কা করছেন, ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ এর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কঠোর হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনি এলাকাগুলোতে তাদের সম্ভাবনা ফের ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইরান যুদ্ধ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারে প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল ‘বিদেশি সংঘাত থেকে দূরে থাকা’। কিন্তু ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়ানো সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এপি বলছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাত মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিত্র বদলে দিয়েছে। কংগ্রেসে নিজেদের ‘স্বল্প ব্যবধানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ ধরে রাখতে গিয়ে রিপাবলিকানরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে যেসব রিপাবলিকান নেতা করছাড়ের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান, তাদের জন্য এই যুদ্ধ নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

Image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প

ছবি: রয়টার্স

রিপাবলিকানরা হোয়াইট হাউসকে সংঘাত ‘দ্রুত শেষ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তাতে দেশের অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব আর নিজেদের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনার ওপর এর বিরূপ প্রভাব কামনো সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন।

সিএনএন বলছে, বিভিন্ন জনমত জরিপে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়টি নিয়ে দেশটির ভেতরে ব্যাপক জন-অসন্তোষের চিত্র উঠে এলেও রিপাবলিকানরা এখনও প্রকাশ্যে এমন প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করতে দ্বিধাগ্রস্ত, যিনি নিজ দলের ভেতরে এখনও জনপ্রিয়।

ইসরায়েল

পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলকে নিয়ে অবস্থানের ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধ দলটির জন্য ‘বিতর্কিত ইস্যুতে’ পরিণত হয়েছে বলে এনপিআর জানিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে দলটির এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দলটির নেতাদের কেউ কেউ আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এই ‘বিভক্তি’ কেবল ইসরায়েলে দেওয়া সামরিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে অন্যরা বলছেন, সবচেয়ে বড় ব্যবধান দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে। কারণ গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর ভোটাররা তাদের প্রতিনিধিদের তুলনায় অনেক দ্রুত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

ইসরায়েলের প্রতি ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা সমর্থন থেকে সরে আসার প্রবণতা বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ‘ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থি শিবিরে’। তারা প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থি লবিং গ্রুপ ‘এআইপ্যাক’ কে এমন এক শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন, যে গ্রুপ বিপুল অর্থের প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ ভোটারদের স্বার্থ উপেক্ষা করছে।

তবে ‘জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থিরাও’ ইসরায়েলের সমালোচনা করছেন। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’নীতির সমর্থক কিছু রক্ষণশীল ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের সমালোচনা করেছেন। তারা মনে করেন, ইসরায়েলপন্থি লবিংয়ের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র আরও গভীরভাবে বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।

ইসরায়েলকে সমর্থনকারী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে একসময় যে নির্বাচনি সমর্থন বা অনুমোদন অত্যন্ত মূল্যবান মনে করা হত, এখন সেটিই প্রার্থীদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি কোনো কোনো প্রার্থী চাইছেন, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা যেন বিষয়টি নিয়ে যতটা সম্ভব কম আলোচনা করেন।

ট্রান্সজেন্ডার অধিকার

ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লিঙ্গ-পরিচয় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের সমালোচনা করছেন রিপাবলিকানরা। তাদের অর্থায়নে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন এখন সাধারণ ঘটনা।

পিবিএস নিউজ জানিয়েছে, দেশজুড়ে এই প্রচারণার পেছনে রয়েছে এমন একটি কৌশল কাজে লাগানোর চেষ্টা, যা ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কাজে লেগেছিল। ওই সময় সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের ট্রান্সজেন্ডার অধিকার সমর্থনের অবস্থানকে ‘মূলধারার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থি’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প।

কীভাবে ট্রান্সজেন্ডারবিরোধী আক্রমণের জবাব দেওয়া উচিত অথবা আদৌ জবাব দেওয়া উচিত কি না- তা নির্ধারণের বিষয়টি এখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক আলোচনায় অনেকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে। কারণ বিষয়টি নিয়ে কোন পথে এগোনো ভালো হবে, তা নিয়ে বিতর্ক করছেন দলটির কৌশল নির্ধারকরা।

তবে কিছু ডেমোক্র্যাট মনে করেন, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ক্রমশ বাড়তে থাকায় ট্রান্সজেন্ডারবিরোধী বিজ্ঞাপন শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের জন্যই জটিলতা তৈরি করবে।

দ্য ওয়াশিংটন টাইমস জানিয়েছে, অতীতে সমলিঙ্গের বিয়ের পক্ষে ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ডেমোক্র্যাটরা যেভাবে সফল হয়েছিল, এবারও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

জরিপ কী বলছে

সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি) লিখেছে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। অধিকাংশ ভোটার মনে করেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর মধ্যে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অন্যতম।

এ ছাড়া ১০ জনের মধ্যে ৮ জন ভোটার মনে করেন, দেশ পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন অথবা সম্পূর্ণ ও আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও অনেকের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। মাত্র ১০ শতাংশ ভোটার বলছেন, তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গত ৮ থেকে ১২ অক্টোবর একটি জরিপ চালিয়েছে এপি এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এনওআরসি’। সেখানে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, ইরান যুদ্ধ ও অপরাধের মত বিষয়গুলোতে ভোটারদের জনমত চাওয়া হয়।

ভোটাররা কোন বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার জন্য মতামত দিতে জরিপে ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ’, ‘গুরুত্বপূর্ণ’, ‘গুরুত্বপূর্ণ নয়’ অপশন রাখা হয়।

১ হাজার ১১৯ জন ভোটারের ওপর চালানো সেই জরিপে দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ ভোটার অর্থনীতিকে ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় বলে মনে করেন। ৮৪ শতাংশ ভোটারের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয়কে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়। স্বাস্থ্যসেবাকে দেশের ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় মনে করেন ৬৯ শতাংশ ভোটার। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন ৬৪ শতাংশ ভোটার।

অপরদিকে ৪৫ শতাংশ ভোটার অভিবাসন ও অপরাধকে ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় হিসেবে দেখছেন। এআইকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অগ্রাধিকার হিসেবে মনে করেন ৩৫ শতাংশ ভোটার। আর ট্রান্সজেন্ডারদের বিষয়গুলো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করেন মাত্র ১২ শতাংশ ভোটার।

অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের ভোটাররাই ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় হিসেবে জরিপে মতামত দিয়েছেন। নির্বাচন ঘিরে অপরাধ ও অভিবাসনকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে বেশি। আর স্বাস্থ্যসেবাকে ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বেশি।

দেশ যেভাবে চলছে, সেক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনের দরকার আছে কি না, সেই প্রশ্ন ভোটারদের সামনে রাখা হয় এপি-এনওআরসির জরিপে।

পরিবর্তন হলে কতটুকু দরকার তা বোঝার জন্য ‘সম্পূর্ণ ও আমূল পরিবর্তন’, ‘বড় ধরনের পরিবর্তন’, ‘ছোট পরিবর্তন’ ও ‘পরিবর্তনের দরকার নেই’- এমন পাঁচটি অপশন করা হয়।

তাতে দেখা যায়, ভোটারদের বড় সংখ্যক মনে করেন দেশ পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থায় ‘বড় ধরনের পরিবর্তন’ আনতে হবে, নয়তো ‘সম্পূর্ণ ও আমূল পরিবর্তন’ ঘটাতে হবে। ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র বা স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তুলনামূলকভাবে বেশি।

ডেমোক্র্যাট ভোটারদের প্রায় অর্ধেক এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের ১০ জনের মধ্যে ৪ জন দেশ পরিচালনার ব্যবস্থায় ‘সম্পূর্ণ ও আমূল পরিবর্তন’ চান।

রিপাবলিকান ভোটাররা ‘সম্পূর্ণ ও আমূল পরিবর্তনের’ পক্ষে তুলনামূলকভাবে কম হলেও তারাও পরিবর্তন চান। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ ভোটার মনে করেন, দেশ পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থায় ‘বড় ধরনের পরিবর্তন’ আনা প্রয়োজন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও ভোটারদের মতামত চাওয়া হয়। সেখানে ‘খুব/কিছুটা আশাবাদী’, ‘খুব/কিছুটা হতাশাবাদী’ এবং ‘আশাবাদী নয়, হতাশাবাদীও নয়’- এমন অপশন রাখা হয়।

তাতে দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘হতাশা’ প্রকাশ করছেন। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রায় অর্ধেক ভোটার হতাশা প্রকাশ করেছেন। একইভাবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রায় অর্ধেক ভোটারের মধ্যে ‘হতাশা’ বিরাজ করছে।

এপি লিখেছে, জরিপ অনুযায়ী প্রায় অর্ধেক ভোটার চান যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকুক। এসব ভোটারদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ এবং ৪৬ শতাংশ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে দেখতে চান।

বিপরীতে ৩৮ শতাংশ ভোটার কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই রাখতে চান। জরিপে অংশ নেওয়া ১৫ শতাংশ ভোটার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত, সে বিষয়ে দলীয় সমর্থকদের তুলনায় স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার প্রবণতা বেশি।

সামগ্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়িত্ব পালনের ধরন সমর্থন করেন ৩৬ শতাংশ ভোটার। ৬৪ শতাংশ ভোটার তার কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

অপরাধ দমনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তার প্রতি ৪৫ শতাংশ ভোটার সমর্থন জানিয়েছেন। তবে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ অনেক বেশি। অর্থনীতি পরিচালনায় তার ভূমিকার প্রতি ৭৪ শতাংশ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তার পদক্ষেপের প্রতি ৭৯ শতাংশ ভোটার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের প্রতি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

পুরনো খবর:

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে ভুয়া জরিপের ফাঁদ, আস্থার সংকট
মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ইতিহাসের পাতা থেকে