ট্রাম্পের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা, ডেমোক্র্যাটদের সামনেও পরীক্ষা
এই ফলাফল কি ট্রাম্পের ‘মাগা’ রাজনীতির পতনের সংকেত, নাকি ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিচিত প্রতিক্রিয়া? কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের জনমত জরিপগুলোর পূর্বাভাস বলছিল, মঙ্গলবার রাতটা ডেমোক্র্যাটদের ভালোই কাটবে। কিন্তু এই রাত যে তাদের জন্য রীতিমত ঈদের আনন্দ নিয়ে আসবে, বিশ্লেষকদের অনেকেই তা ভাবতে পারেননি।
ডেমোক্র্যাটদের এই নীল জোয়ার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে নতুন এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে ফেলে দিয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তার দল রিপাবলিকান পার্টি। শুধু কংগ্রেস নয়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য ভোটের ফলাফলকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান তাদের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে লিখেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই বিপুল বিজয়ের কৃতিত্ব দলের ভেতরের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশের নয়, বরং পুরো দলের।
“তাদের এই জয় এতটাই ব্যাপক ও অভাবনীয় ছিল যে, দলের ভেতরের বিভেদ দিয়ে এর ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। এ বছর নির্বাচনে জেতার জন্য ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা ছিল—তারা রিপাবলিকান নন।”
নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজেই ডেমোক্র্যাটদের হাতে বেশ কিছু রাজনৈতিক উপহার তুলে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে চরম অজনপ্রিয় এক যুদ্ধ, যার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে; বিশৃঙ্খল শুল্কনীতি যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের পথে বসিয়েছে; স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট, অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার ভয়ংকর এক পরিকল্পনা, নিজের পকেট ভারী করা, দুর্নীতি এবং একটি রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার নিয়ে অন্তহীন বিতর্ক।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যখন কমতে শুরু করল, ডেমোক্র্যাটরা সেই সুযোগ লুফে নিয়ে তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিল। আর তা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের বিরুদ্ধে সাধারণ কোনো ক্ষোভের প্রতিফলন ছিল না; বরং এটি ছিল প্রেসিডেন্টের 'মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' (মাগা) আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক প্রত্যাখ্যান।
গার্ডিয়ান লিখেছে, ভোটাররা যে 'ট্রাম্পবাদ' আর সহ্য করতে পারছেন না, এটি তারই স্পষ্ট প্রমাণ।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নিজেই ভোটারদের সামনে নিজের উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিলেন। কিন্তু ফলাফল বলছে, সেই কৌশল উল্টো তার দলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এপির বিশ্লেষণ বলছে, টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাস ও জর্জিয়ার মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রভাবিত অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের জয় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের কর্মসূচির বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সামনে যেমন ক্ষমতার নতুন সুযোগ এসেছে, তেমনি ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণের কঠিন পরীক্ষাও শুরু হয়েছে।
অসন্তোষের প্রতিফলন
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হয় প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মত এতে জাতীয়ভাবে একজন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন না। বরং প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন, সেনেটের একাংশ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নরসহ স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন পদে নির্বাচন হয়।
এই নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও তার সরকারের কাজের ওপর ভোটারদের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসেও দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রায়ই আসন হারায়। তবে এবারের ফলাফলকে শুধু সেই প্রচলিত প্রবণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
কারণ, নির্বাচনের আগে ও প্রচারের সময় ট্রাম্প নিজেই ভোটের লড়াইকে তার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ফলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও আলোচনায় আসে।
ডেমোক্র্যাটদের জয় তাই কেবল বিরোধী দলের আসন বাড়ার ঘটনা নয়; এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপরও একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষক র্যাচেল লেইনগ্যাংয়ের পর্যবেক্ষণ, এবারের বিজয় ডেমোক্র্যাটদের কোনো একটি মতাদর্শিক অংশের একক সাফল্য নয়। মধ্যপন্থি, প্রগতিশীল, জনতাবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী—দলের বিভিন্ন ধারার প্রার্থীরাই জয় পেয়েছেন।
তার বিশ্লেষণ বলছে, ভোটারদের একটি বড় অংশ হয়ত ডেমোক্র্যাটদের সব নীতির প্রতি একমত হয়ে ভোট দেননি; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
একটি যুদ্ধ এবং বাজারের আগুন
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার খরচ যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা অনুমিতই ছিল।
রয়টার্সের নির্বাচনি বিশ্লেষণ বলছে, ভোটারদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখেছেন।
তাদের অনেকেই মনে করেছেন, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পের নীতির দায় রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষও নির্বাচনি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি।
আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের নীতি দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর যুক্তিতে উপস্থাপন করা হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভোক্তা পর্যায়ে দামের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকদের ওপর শুল্কনীতির চাপ নির্বাচনী প্রচারে আলোচনায় আসে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং এর জেরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ভোটারদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের ঘাটতিকে রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর বুধবার ট্রাম্প নিজেও দলের পরাজয়ে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা স্বীকার করেছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, এর একটি অংশ ছিল ইরান।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকেও তিনি বলেন, ইরান ছিল কারণগুলোর একটি। তবে নির্বাচনী ধাক্কা স্বীকার করলেও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত তিনি দেননি।
ট্রাম্পের নির্বাচনি রাজনীতির অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, আমেরিকাকে তিনি বিদেশে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না। কিন্তু ইরান যুদ্ধ তার প্রশাসনের নীতির অংশ হয়ে ওঠার পর এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে।
যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—সব কিছুরই প্রভাব পড়েছে ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনে।
রিপাবলিকান দুর্গে ডেমোক্র্যাট পতাকা
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য প্রচলিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও তারা জয় পেয়েছে।
টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সেনেটর নির্বাচিত হলেন।
সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয়ও ঐতিহাসিক। চলতি শতাব্দীতে এই অঙ্গরাজ্যে সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এটাই প্রথম জয়।
একইভাবে, ওহাইওতে শেরড ব্রাউনের জয় এবং কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটনের সাফল্য রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা।
কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে ডেমোক্র্যাটরা সেনেট আসন পেয়েছিল। অর্থাৎ, এবারের নির্বাচনে দলটি এমন সব এলাকায় জয় পেয়েছে, যেগুলো কয়েক মাস আগেও তাদের জন্য কঠিন কিংবা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সেনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে এবার নির্বাচন হয়েছে। একই দিনে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদেও ভোট হয়েছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, এই বিস্তৃত নির্বাচনি লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য কেবল জাতীয় পর্যায়ে নয়, অঙ্গরাজ্য পর্যায়েও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
ফলাফলে নারী ও সংখ্যালঘু প্রার্থীদের সাফল্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জর্জিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ নারী কেইশা ল্যান্স বটমস গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। টেক্সাসে প্রথম লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন জিনা হিনোজোসা।
তাদের জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের নতুন নির্বাচনি সংহতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রয়টার্স লিখেছে, এই পরিবর্তনকে শুধু প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন এবং দলীয় সমর্থকদের শক্তিশালী উপস্থিতিও ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্পের ২০২৪ সালের ভোটার ঐক্যে ফাটল
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের অন্যতম কারণ ছিল বিভিন্ন শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর ভোটারদের সমর্থন জড়ো করতে পারা। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ, লাতিনো এবং তরুণ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন রিপাবলিকানদের নির্বাচনি সাফল্যে ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বলছে, লাল শিবিরের সেই ঐক্যে ফাটল তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সে প্রকাশিত নির্বাচনি জরিপের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রায় ৪৬ শতাংশ লাতিনো ভোটারের সমর্থন পেয়েছিলেন। এবার সেই সমর্থন কমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। আর এ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ।
টেক্সাসের মত অঙ্গরাজ্যে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বেশি। কারণ, সেখানে লাতিনো জনগোষ্ঠীর ভোট নির্বাচনী ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানও এই জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জরিপে দেখা গেছে, তরুণ ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যেও রিপাবলিকানদের সমর্থন কমেছে।
অর্থাৎ, ২০২৪ সালে যে ভোটারদের সমর্থন ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরতে সহায়তা করেছিল, তাদের একটি অংশ দুই বছরের ব্যবধানে দলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
এখানে ডেমোক্র্যাটদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। এই ভোটাররা স্থায়ীভাবে দলটির সমর্থক হয়ে গেছেন—এমন ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তাদের ভোটের পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, প্রশাসনের নীতি এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা কাজ করে থাকতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন এই সমর্থন ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
মাগা রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী
ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি তার ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলন।
জাতীয়তাবাদ, অভিবাসনবিরোধী অবস্থান, প্রচলিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমালোচনা এবং সাংস্কৃতিক বিভাজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক ধারা রিপাবলিকান পার্টিকে গত এক দশকে নতুনভাবে সাজিয়েছে।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি। তার সমর্থকদের কাছে তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে আসা এমন একজন নেতা, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু এবারের নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় সেই রাজনৈতিক কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রয়টার্স লিখেছে, সাউথ ক্যারোলাইনা ও নর্থ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের পছন্দের সেনেট প্রার্থীরা হেরেছেন। টেক্সাসেও তার সমর্থন পাওয়া কেন প্যাক্সটন পরাজিত হয়েছেন।
তাতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি ও প্রার্থী বাছাইয়ের কৌশল নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা থাকা প্রার্থীদের পরিবর্তে ট্রাম্পের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দলটির নির্বাচনি সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানদের সামনে এখন ট্রাম্প-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দলটির ভেতরে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতভিন্নতা পোষণ করা অংশ ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। ফলে তার রাজনৈতিক প্রভাব কমতে শুরু করলে দলটি কোন পথে এগোবে, তা স্পষ্ট নয়।
ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাবে, কিন্তু ট্রাম্পকে থামানো যাবে?
ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে তারা কী করতে পারবে।
কংগ্রেস দুই কক্ষ–প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ পাবেন।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস নতুন স্পিকার হওয়ার পথে রয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে পারেন। তবে তার সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দলের মধ্যপন্থি ও প্রগতিশীল অংশের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা।
রয়টার্স লিখেছে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় কমানোর মত যেসব সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন জেফরিস। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী ও করপোরেট স্বার্থের সম্পর্ক নিয়েও তদন্তের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া মানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারা নয়। ট্রাম্পের হাতে থাকবে প্রেসিডেন্টের ভিটো ক্ষমতা। ডেমোক্র্যাটরা কোনো বিল পাস করালেও প্রেসিডেন্ট তাতে ভিটো দিতে পারেন।
সেই ভিটো অতিক্রম করতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সহজ নয়।
আইন পাসে বাধা থাকলেও কংগ্রেসের তদন্ত ও নজরদারির ক্ষমতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনের ব্যয়, নীতিনির্ধারণ, অভিবাসন প্রয়োগ, করপোরেট সম্পর্ক এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি ও তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারবে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস।
তাতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। সেই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত জনসম্মুখে ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হতে পারে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের সামনে আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে। নির্বাচনে জয়ের পর তারা যদি শুধু ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত ও রাজনৈতিক সংঘাতে মনোযোগ দেয়, তাহলে ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পিছিয়ে পড়তে পারে।
সুযোগ এবং ঝুঁকি
নির্বাচনে বড় জয় পেলেও ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণ করা। কারণ, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া এবং ডেমোক্র্যাটদের শাসনক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখা এক বিষয় নয়।
দলের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, করনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। মধ্যপন্থিরা যেখানে নির্বাচনে মধ্যবিত্ত ও স্বতন্ত্র ভোটারদের আকৃষ্ট করার মত অবস্থান নিতে চান, সেখানে প্রগতিশীল অংশ আরও বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে।
নির্বাচনে এই বিভিন্ন ধারার প্রার্থীদের জয় দলের জন্য ইতিবাচক হলেও কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জটিলতা বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া ভোটারদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। তারা যদি মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা ফিরে পেয়েও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে কিংবা প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে না, তাহলে এই বিজয়ের রাজনৈতিক সুফল দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
রয়টার্স লিখেছে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবে, অন্যদিকে অর্থনীতির অবস্থা ভালো না হলে তার দায় তাদের ওপরও পড়তে পারে। ট্রাম্পও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করার সুযোগ পাবেন।
অর্থাৎ, এখন থেকে ডেমোক্র্যাটদের শুধু বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলেই চলবে না; বিকল্প নীতির কার্যকারিতাও দেখাতে হবে।
২০২৮ সালের নির্বাচনের ভিত তৈরি হচ্ছে?
এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আলোচনা বাড়াবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রিপাবলিকান পার্টি কাকে সামনে আনবে, তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন।
এই নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় তার রাজনৈতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে। দলের প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি কৌশলে তার ভূমিকা কতটা থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থক এবং তার রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে সংশয়ী অংশের সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। হাকিম জেফরিসের মত নেতাদের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে জয়ী প্রার্থীরাও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় মানেই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় নিশ্চিত হওয়া নয়। ২০২৮ সালের নির্বাচনে অর্থনীতি, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পররাষ্ট্রনীতি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রাখবে।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু দুই বছর পর সেই সমীকরণ একইরকম থাকবে, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
ফলে মঙ্গলবারের ভোটের ফল শুধু ট্রাম্পের জন্য একটি নির্বাচনি ধাক্কা নয়; এটি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন শক্তির হিসাব-নিকাশ শুরুরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
