০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় কি ইউক্রেইনের পালে হাওয়া দেবে?

মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয়ে ইউক্রেইন কি নতুন সামরিক সহায়তা পাবে, নাকি ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার কাছে থমকে যাবে কিইভের ভাগ্য?

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় কি ইউক্রেইনের পালে হাওয়া দেবে?

ইউক্রেইন যুদ্ধ। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Nov 2026, 05:27 PM

Updated : 07 Nov 2026, 05:27 PM

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় জয়ে আইনসভার নিয়ন্ত্রণ দলটির হাতে যাওয়ায় হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেইনের জন্যও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্কিন সহায়তা কমতে থাকার মুখেও একা রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

আগামী জানুয়ারিতে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউক্রেইনের জন্য সহায়তা বাড়ানো তাদের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হবে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের একাধিক শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সহযোগী।

তবে আইন পাস করতে পারলেও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতার মুখে তা কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। প্রেসিডেন্টের রয়েছে বিল নাকচের ভিটো ক্ষমতা এবং অতীত থেকেই কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির।

ট্রাম্পের অবস্থান ও ডেমোক্র্যাটদের চাপ

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং আইনসভার উভয় কক্ষে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে কংগ্রেসে ইউক্রেইনকে সহায়তা করার জন্য কোনও বড় বিল পাস হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার আগে পাস হওয়া সহায়তার অর্থছাড়ও বিলম্বিত করেছে, ক্ষেত্রবিশেষে পুরোপুরি আটকে দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এবার এই পরিস্থিতি বদলানোর ঘোষণা দিয়েছে।

সেনেটের ‘ইউক্রেইন ককাস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ডিক ডারবিন রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইউক্রেইনের এই জীবন রক্ষাকারী তহবিল দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই টানবাহানা করছে। যত দ্রুত এর পরিবর্তন হবে, ততই মঙ্গল... তিনি যদি এই পথেই হাঁটতে থাকেন, তবে তাকে আইন ও সংবিধান মানতে বাধ্য করার অন্য উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”

ওদিকে ভবিষ্যৎ ইউক্রেইন সহায়তা নিয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা ইমেইল বার্তায় জানান, ট্রাম্প এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি চান “যাতে এই অনর্থক প্রাণহানি বন্ধ হয়।”

তিনি আরও বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেইনের যুদ্ধ বন্ধে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রেসিডেন্ট ও তার টিম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিচুক্তি হবে বলেই ট্রাম্প আশাবাদী।

কংগ্রেসের হাতে বিরোধীদের অস্ত্র

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। ট্রাম্প নিয়মিতভাবেই কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছেন।

এমনকি আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন ছাড়াই তিনি এমন সব সামরিক হামলা চালিয়েছেন, যার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার এই ধারা পুরোপুরি বদলানো কঠিন হলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট চাইলে দেশটির বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’ (এনডিএএ) কিংবা বাজেট বিলের মতো বাধ্যতামূলক পাসযোগ্য আইনের সঙ্গে ইউক্রেইনের জন্য সহায়তা কিংবা রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার ধারা জুড়ে দিতে পারে।

তাছাড়া, ট্রাম্পের মনোনীত কর্মকর্তাদের নিয়োগ আটকে দেওয়া, শুনানি আহ্বান, তদন্ত শুরু করা এবং বাজেটের সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ব্যয় ছাঁটাইয়ের মতো পদক্ষেপ নিয়ে প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।

কংগ্রেসের সহযোগীরা জানান, জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এরই মধ্যে রাশিয়ায় বাণিজ্যে জড়িত বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন, যাতে পরবর্তীতে তদন্ত চালানো যায়।

কিইভের আশা ও কঠিন শীতকাল

ডেমোক্র্যাটদের এই বড় জয়ে নতুন সহায়তার আশা দেখছেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বুধবার জার্মানির জেডডিএফ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি রিপাবলিকানদের প্রতিও কৃতজ্ঞ, তবে ডেমোক্র্যাটরা ইউক্রেইনকে সমর্থন ও সহায়তার বিষয়ে খুবই স্পষ্ট কথা বলে।”

ইউক্রেইনের আইনপ্রণেতা ও শান্তি আলোচনা দলের সদস্য ডেভিড আরাখামিয়া সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বাড়ার সম্ভাবনা ‘অন্তত দ্বিগুণ’ করেছে। তবে আগামী বছরের আগে এই সহায়তা মিলবে না।

আরাখামিয়া সতর্ক করে বলেন, “তার আগে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শীতকাল পার করতে হবে।”

আর সে কারণেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে অনুষ্ঠেয় ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় একটি সফল ফলের জন্য কিইভ মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

শেষ দুই বছরে ট্রাম্পের ‘লেগ্যাসি’

লন্ডনভিত্তিক কৌশলগত যোগাযোগ সংস্থা আর্গিল স্ট্র্যাটেজির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা প্রাইস ফ্লয়েড অবশ্য অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

ক্ষমতায় আর মাত্র দুই বছর বাকি থাকায় ট্রাম্প এখন নিজের ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি) রক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন উল্লেখ করে ফ্লয়েড বলেন, “কংগ্রেস কী বলল বা করল, তাতে ট্রাম্পের কিছু যায় আসে বলে আমার মনে হয় না।”

সম্প্রতি ট্রাম্প রাশিয়ার অনুকূলে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির একটি চুক্তিও রয়েছে, যা বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কংগ্রেসের রিপাবলিকানদেরও ক্ষুব্ধ করেছে।

এর পাশাপাশি কংগ্রেসের ব্যাপক দ্বিদলীয় সমর্থনে পাস হওয়া একটি রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞা বিলে স্বাক্ষর করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ট্রাম্প সেই নিষেধাজ্ঞা মওকুফ (ওয়েভ) করে দেন।