Published : 17 Jan 2026, 07:54 PM
গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবনের ফলে শিশুদের অটিজম, এডিএইচডি এবং বিকাশগত সমস্যা হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।
বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি নতুন পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এ ই ফলালের পর সন্তানসম্ভবা নারীদের এ বিষয়ে ‘নিশ্চিন্ত বোধ করা উচিত’।
গবেষণার এ ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের গত বছরের বিতর্কিত এক দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিল। ওই সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, প্যারাসিটামল ‘ভালো নয়’ এবং এটি সেবন না করার জন্য গর্ভবতী নারীদের ‘কঠিন লড়াই’ করা উচিত।
তখন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন চিকিৎসা সংস্থা তার এই দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত এই সাম্প্রতিক পর্যালোচনাটি অত্যন্ত সুসংহত এবং এর নিরাপত্তা নিয়ে চলা বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত।
তবে মার্কিন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখনো বলছেন, গর্ভাবস্থায় এই ওষুধের ব্যবহার নিয়ে ‘অনেক বিশেষজ্ঞ’ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন দাবি করেছিল যে, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল (যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাসিটামিনোফেন নামে পরিচিত, যা গর্ভবতী নারীদের জন্য প্রধান ব্যথানাশক হিসেবে বিবেচিত) সেবনে শিশুদের অটিজম হতে পারে।
তাদের এই দাবি নারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত এই নতুন গবেষণার সূত্রপাত ঘটায়।
‘দ্য ল্যানসেট অবস্টেট্রিক্স, গাইনোকোলজি অ্যান্ড উইমেনস হেলথ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় লক্ষাধিক নারীর ওপর করা ৪৩টি শক্তিশালী গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষকরা বিশেষ করে ‘সহোদরদের’ ওপর করা সমীক্ষাগুলো পর্যালোচনা করেছেন, যা জিনগত বা পারিবারিক পরিবেশের মতো অন্য কারণগুলোকে বাদ দিতে সাহায্য করেছে।
যা তাদের এই প্রতিবেদনটিকে ‘গোল্ড-স্ট্যান্ডার্ড’ বা অনন্য মানে উন্নীত করেছে। এই গবেষণায় পক্ষপাতহীন বা নিরপেক্ষ প্রতিবেদনগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা নিশ্চিত করতে শিশুদের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং সিটি সেন্ট জর্জ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক আসমা খলিল বিবিসিকে বলেন, “আমরা আমাদের বিশ্লেষণে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাইনি। প্যারাসিটামল অটিজমের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কোনো প্রমাণ নেই। বার্তাটি স্পষ্ট, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল একটি নিরাপদ বিকল্প।”
ট্রাম্পের স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রও অটিজম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এই ওষুধকে দায়ী করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এমনকি গত সেপ্টেম্বরে ওভাল অফিসে এক বক্তব্যে ট্রাম্প চিকিৎসকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে গর্ভবতী নারীদের এই ওষুধ না দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর বা ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল না খেলে বরং গর্ভপাতের ঝুঁকি বা ভ্রূণের বিকাশে সমস্যা হতে পারে। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক গ্রেইন ম্যাকঅ্যালোনান বলেন, “আশা করি এই গবেষণার পর বিষয়টি এখানেই শেষ হবে। সন্তানসম্ভবা নারীদের অহেতুক মানসিক চাপে রাখা উচিত নয়।”
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের প্রধান চিকিৎসা সংস্থাগুলো আগে থেকেই প্যারাসিটামলকে গর্ভবতী নারীদের জন্য নিরাপদ হিসেবে গণ্য করে আসছে। যদিও মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগ (এইচএইচএস) এবং এফডিএ কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখার কথা বলে আসছে, তবে তারাও স্বীকার করেছে যে এই ওষুধের সাথে স্নায়বিক সমস্যার কোনো ‘কার্যকারণ সম্পর্ক’ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, গর্ভবতী নারীদের জন্য প্যারাসিটামল এখনো বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যথানাশক ওষুধ।