Published : 28 Jul 2025, 05:29 PM
সীমান্তজুড়ে পাঁচ দিনের তুমুল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অস্ত্রবিরতিতে রাজি হয়েছে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া।
সোমবার মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার পর ব্যাংকক ও নম পেন নিজেদের মধ্যে সংঘাত বন্ধ ও সরাসরি যোগাযোগ পুনরায় শুরুর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
দুই নেতার আলোচনায় মালয়েশিয়ার সময় মধ্যরাত থেকে অস্ত্রবিরতি কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তাদের এ বৈঠকের মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে বড় সংঘাত অবসানের সুযোগ সৃষ্টি হল।
দুই নেতা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, তার মধ্যে আছে মালয়েশিয়া সময় মধ্যরাত (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা) থেকে অস্ত্রবিরতি কার্যকর, মঙ্গলবার সকাল ৭টায় দুই দেশের সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে ‘অনানুষ্ঠানিক বৈঠক’ এবং এরপর ৪ অগাস্ট আসিয়ানের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশেদের বৈঠক।
অস্ত্রবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও পুনরায় শুরু হবে।
থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদেরকে অস্ত্রবিরতি ‘কার্যকর, যাচাই ও এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের’ জন্য ‘বিশদ প্রক্রিয়া’ গড়ে তুলতে বলা হয়েছে বলে মালয়েশিয়ায় দুই নেতার বিকালের আলোচনার পর দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
তবে এ প্রক্রিয়া কেমন হবে, সে সম্বন্ধে সেখানে কিছু বলা হয়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি।

সোমবার থাই ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়চাই ও কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেটকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, “অবিলম্বে শর্তহীন অস্ত্রবিরতি আজ মধ্যরাত থেকে কার্যকর হচ্ছে। এটা চূড়ান্ত।”
পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেই ফুমথাম ও হুন মানেটের এদিনের বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
এ আলোচনায় মালয়েশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রাষ্ট্রদূতও উপস্থিত ছিলেন বলে রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল।
“আজ আমাদের মধ্যে চমৎকার এক বৈঠক হয়েছে, ভালো ফলাফলও এসেছে। অনেক প্রাণহানি, আহত, অসংখ্য মানুষের বাস্তুচ্যুতি যে কারণে হয়েছে, সেই সংঘাত শিগগিরই থেমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে,” বলেন হুন মানেট। তিনি শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ধন্যবাদও দেন।
“আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার এখনই যে সমাধানগুলো ঘোষণা করলেন, সেগুলো আমাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথ সুগম করবে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর শর্ত তৈরি করবে। পাশাপাশি, এসব সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানোর ভিত্তিও হবে,” বলেছেন মানেট।
মালয়েশিয়ায় বৈঠকের আগে কম্বোডিয়ার ‘আন্তরিকতা’ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা ভারপ্রাপ্ত থাই প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম বলেছেন, থাইল্যান্ড একটি যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা ‘সফলভাবে কার্যকর করা যাবে দুই পক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছার ভিত্তিতে’।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া উভয়েই গত সপ্তাহে শুরু হওয়া সীমান্ত সংঘাতের জন্য একে অপরকে দায়ী করছে।
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ বেশ পুরনো। এ নিয়ে মাঝেমাঝে ছোটখাট সংঘাতও হয়েছে।
চলতি বছর মে-র শেষদিকে তেমনই এক সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার এক সেনা নিহত হওয়ার পর ব্যাংকক ও কম্বোডিয়ার মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। দুই দেশই সীমান্তে বিপুল পরিমাণ সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র জড়ো করতে শুরু করে।
দেশদুটির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটলও এতই চওড়া হয় যে এর প্রভাবে থাইল্যান্ডের নড়বড়ে জোট সরকার ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
উত্তেজনার এক পর্যায়ে বৃহস্পতিবার শুরু হয় সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা, পরে তা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র লড়াইয়ে রূপ নেয়।
প্রতিবেশী এ দুই দেশের সংঘাতে এরই মধ্যে ৩০ এর অধিক নিহত হয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিকই ২০ জনের বেশি। দুই দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে দুই লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে বলেও জানিয়েছে উভয় দেশের কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার থাই-কম্বোডিয়া সীমান্তে সংঘাত বেধে যাওয়ার পরপরই দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের চেয়ার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দুই দেশকে শিগগির অস্ত্রবিরতিতে রাজি হতে আহ্বান জানান এবং এ নিয়ে আলোচনায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন।
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনও আলোচনায় সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়।
থাইল্যান্ড এতদিন বলে আসছিল, তারা অস্ত্রবিরতির পক্ষে নীতিগতভাবে একমত, তবে আলোচনা হতে হবে দ্বিপাক্ষিক। অন্যদিকে কম্বোডিয়া শুরু থেকেই আলোচনায় আন্তর্জাতিক মহলের সম্পৃক্ততা চাইছিল।