Published : 22 May 2026, 06:55 PM
দোকান থেকে কেনা খাবারে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ধ্বংসের জন্য সাধারণত যেসব প্রিজারভেটিভ বা সংরক্ষণকারী উপাদান ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়।
ফ্রান্সের এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিজারভেটিভ যুক্ত খাবার সামগ্রিকভাবে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
এমনকি খাবারের বিবর্ণতা রোধে ব্যবহৃত সাইট্রিক অ্যাসিড এবং অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের (যা ভিটামিন সি নামে পরিচিত) মতো তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক’ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রিজারভেটিভগুলোও নিরাপদ নয়।
যারা এই উপাদানযুক্ত খাবার বেশি খান, তাদের শরীরে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ২২ শতাংশ বেড়ে যায়।
ফলমূলের মতো খাবারে প্রাকৃতিকভাবে সাইট্রিক বা অ্যাসকরবিক অ্যাসিড পাওয়া গেলেও, প্রিজারভেটিভ হিসেবে যখন এগুলো ব্যবহার করা হয় তখন তা ‘ঠিক প্রাকৃতিক থাকে না’ বলে ইমেইলে জানিয়েছেন গবেষণার প্রধান লেখক মাতিল্ডে টুভিইয়ে|
টুভিইয়ে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড এবং মেডিকেল রিসার্চ’-এর গবেষণা পরিচালক এবং ‘নিউট্রিঅনেট-সান্তে’ স্টাডির প্রধান গবেষক।
তিনি বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন অ্যাসকরবিক অ্যাসিড এবং কৃত্রিম বা রাসায়নিক উপায়ে তৈরি যুক্ত করা অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের স্বাস্থ্যগত প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
তাই এই খাদ্য সংযোজনীর ক্ষেত্রে যে ফলাফল দেখা গেছে, তা ফল ও সবজিতে থাকা প্রাকৃতিক উপাদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।”
শুধু অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারই নয়:
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত ‘ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন’-এর পুষ্টি বিভাগের প্রধান ট্রেসি পার্কার এক বিবৃতিতে বলেন, “অতি-প্রক্রিয়াজাত বা আল্ট্রাপ্রসেসড খাবারে থাকা বিভিন্ন অ্যাডিটিভ বা সংযোজনী কীভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, এই গবেষণা তা স্পষ্ট করেছে।
তাছাড়া, এটি ইউরোপীয় সোসাইটি অব কার্ডিওলজির সাম্প্রতিক ঐকমত্যকে প্রতিধ্বনিত করে, যা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারকে একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।”
পার্কার আরও জানান, এর আগের গবেষণায় দেখা গেছে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয় এবং এটি স্থূলতার ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ, ঘুমের ব্যাঘাত ৪১ শতাংশ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।
আর স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও কম ঘুম হৃদস্বাস্থ্যের অবনতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পার্কার বলেন, “অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারকে একটি ঢালাও বিভাগ হিসেবে না দেখে প্রতিটি আলাদা আলাদা প্রিজারভেটিভের প্রভাব খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে এটি প্রথম বড় গবেষণাগুলোর একটি।
উচ্চ মাত্রার চিনি, লবণ ও চর্বির কারণে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই উদ্বেগ ছিল, কিন্তু কেবল এই উপাদানগুলো দিয়েই এটি কেন পুষ্টিমানের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর মনে হয়, তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। এই অনুসন্ধান সেই ঘাটতি পূরণে সাহায্য করবে।”
তবে টুভিইয়ে এবং তার দলের আগের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যেসব প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবার খায়, তার মধ্যে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার মাত্র ৩৫ শতাংশ। এর অর্থ হল, প্রিজারভেটিভ এখন সব ধরনের খাবারেই বিদ্যমান।
এই কথা জানিয়েছেন গবেষণার প্রধান লেখক আনাইস হাজুনবোলা, যিনি ‘ইউনিভার্সিটি সোরোবন প্যারিস নর্ড’-এর পুষ্টি মহামারী সংক্রান্ত গবেষণা দলের একজন ডক্টরাল শিক্ষার্থী।
হাজুনবোলা ইমেইলে বলেন, পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাবে এমন কোনও সুনির্দিষ্ট খাদ্য আইটেম নেই।
ফলে ভোক্তাদের প্রক্রিয়াজাত করা হয়নি বা খুব কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে এমন তাজা খাবার বেছে নেওয়ার সুপারিশই করা যায়।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত খাবার তৈরি এবং খাওয়ার জন্য ভোক্তারা কৃত্রিম রাসায়নিক প্রিজারভেটিভের বদলে কম তাপমাত্রায় সংরক্ষিত ‘হিমায়িত খাবার’ বেছে নিতে পারেন।
যেসব প্রিজারভেটিভে ঝুঁকি বেশি:
বুধবার ‘ইউরোপীয় হার্ট জার্নাল’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৫ বছরের বেশি বয়সী ১ লাখ ১২ হাজারেরও বেশি মানুষের হৃদস্বাস্থ্যের ওপর ৫৮টি প্রিজারভেটিভের প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে ফ্রান্সে এই স্বেচ্ছাসেবকদের খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
গবেষকরা অন্তত ১০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর নিয়মিত খাওয়া ১৭টি প্রিজারভেটিভের ওপর নিবিড়ভাবে নজর দিয়ে দেখেন, যার মধ্যে আটটি উপাদান পরবর্তী এক দশকে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এর মধ্যে তিনটি হলো ‘নন-অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট’ প্রিজারভেটিভ, পটাশিয়াম সরবেট, পটাশিয়াম মেটাবিসালফ এবং সোডিয়াম নাইট্রাইট, যা খাবারে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক জন্মাতে দেয় না।
বাকি প্রিজারভেটিভগুলো হল, অ্যাসকরবিক অ্যাসিড, সোডিয়াম অ্যাসকরবেট, সোডিয়াম ইরিথরবেট, সাইট্রিক অ্যাসিড এবং রোজমেরির নির্যাস, যেগুলো খাবার বাসি হওয়া রোধে ‘অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এর মধ্যে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি-র সঙ্গে হৃদরোগের সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
অবশ্য ইংল্যান্ডের রিডিং ইউনিভার্সিটির খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক গুন্টার কুনলে বলেন, “খাদ্য ব্যবস্থায় প্রিজারভেটিভের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি কেবল খাদ্যবাহিত রোগই প্রতিরোধ করে না, বরং খাবার নষ্ট হওয়া রোধ করে এর মেয়াদ বাড়ায়।”
ক্যান্সার ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি:
টুভিইয়ে এবং তার দলের আগের দুটি গবেষণাতেও প্রিজারভেটিভের সঙ্গে ক্যান্সার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের উচ্চ ঝুঁকির একই ধরনের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল।
সোডিয়াম নাইট্রাইট, পটাশিয়াম নাইট্রেট এবং অ্যাসিটিক অ্যাসিডসহ ছয়টি প্রিজারভেটিভ প্রস্টেট ও স্তন ক্যান্সারসহ সব ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সব কটি উপাদান টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও ৪৯ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য ককরেন কোলাবোরেশন’-এর মেথডস সাপোর্ট ইউনিট ম্যানেজার রেচেল রিচার্ডসন বলেন, এই গবেষণাটি পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় এটি সরাসরি কার্যকারণ প্রমাণ করতে পারে না।
তবে বয়স, বিএমআই, ধূমপান এবং শারীরিক সক্রিয়তার মতো অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেই এই ফল পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত গবেষণার দাবি রাখে।