ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে শীতে ইউরোপে তীব্র গ্যাস সংকটের শঙ্কা
আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে এবং মহাদেশটিতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলে ইউরোপের গ্যাস মজুত সক্ষমতা মাত্র ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে আসন্ন শীতে ইউরোপে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিতে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ত্রৈমাসিক গ্যাস প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)।
সংস্থাটি জানায়, আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে এবং মহাদেশটিতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলে ইউরোপের গ্যাস মজুত সক্ষমতা মাত্র ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
সাধারণত মজুত ধারণক্ষমতার ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ইউরোপীয় বাসাবাড়ি ও শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহের গতি শ্লথ হতে শুরু করে।
আইইএ সতর্ক করে বলেছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শীতের শেষের দিকের তীব্র ঠাণ্ডায় ইউরোপের জ্বালানি বাজার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
একই সঙ্গে আগামী গ্রীষ্মে শূন্যপ্রায় মজুতাগারগুলো নতুন করে পূরণ করতে ইউরোপকে বড় ধরনের চাপে পড়তে হবে, যা যুদ্ধজনিত উচ্চ গ্যাসের দামকে দীর্ঘকাল চড়া রাখবে।
ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি ও হরমুজ সংকট
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ অবসানে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
এখন তিনি কীভাবে সেই অচলাবস্থা দূর করবেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব। গত মাসে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, বুধবার থেকেই ইরানে নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারেন ট্রাম্প।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস সোমবার জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কূটনীতিকে আরও কিছুটা সময় দিতে চান।
ওদিকে, সোমবার কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তি আলোচনার অনুমোদন দিয়েছেন বলে দেশটির গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
এই খবরের পর তাৎক্ষণিকভাবে ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম ১০ শতাংশেরও বেশি কমে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা ৯৩ ইউরোর সামান্য ওপরে নেমে আসে।
তবে এই পতনের পরও বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ইউরোপে গ্যাসের স্পট দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯০ শতাংশ বেশি ছিল বলে উল্লেখ করেছে আইইএ।
অবরুদ্ধ সরবরাহ ও জার্মানির ঘাটতি
গত মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে পাইপলাইন দিয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে পারলেও কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অন্য কোনো পথে পাঠাতে পারছে না।
আইইএ জানিয়েছে, অক্টোবরের শেষ নাগাদও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত থাকায় উত্তর গোলার্ধের আসন্ন শীতে এই ধাক্কা জ্বালানি বাজারকে আরও সংকুচিত করে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের গ্যাস রপ্তানি বাড়ালেও তা দিয়ে কাতারের সরবরাহের শূন্যতা পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না।
তদুপরি, ইউরোপীয় ক্রেতাদের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে মার্কিন এলএনজি কিনে নিচ্ছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
এদিকে ইউরোপের প্রধান অর্থনীতি জার্মানির গ্যাস মজুত এখনো ধারণক্ষমতার দুই-তৃতীয়াংশের কম।
অথচ শীত শুরুর আগে দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী মজুত অন্তত ৮০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।
আইইএ সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দুর্বল মজুত পরিস্থিতি মহাদেশটিকে প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাজারের যেকোনো ধাক্কার মুখে আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
গ্যাসের ঘাটতি নয়, সমস্যা চড়া দামে
তবে সম্ভাব্য সংকট নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন ফরাসি বহুজাতিক জ্বালানি জায়ান্ট টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুয়ানে।
সোমবার তিনি বলেন, ইউরোপে হয়তো সরাসরি গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি হবে না, তবে চরম মূল্য দিতে হবে।
পুয়ানে বলেন, “আমরা ধরে নিয়েছিলাম মানুষ আগেই আঁচ করতে পারবে যে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়বে। কিন্তু বাজার এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল যেন এই গ্রীষ্মেই যুদ্ধ থেমে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাস্তবতা হলো, অন্যদের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি দাম দিয়ে জ্বালানি কিনতে হবে, হিসাব খুবই সাধারণ।”
