উখিয়ায় ২৪ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ২০০ মিটার এলাকা ঘেরার পরামর্শ
বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, আগুন এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত জ্বলতে পারে।
কক্সবাজারের উখিয়ায় নলকূপ বসানোর জন্য মাটি খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে জ্বলে ওঠা আগুন ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েও নেভেনি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী- গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় আপাতত আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে গ্যাসের প্রবাহ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেটি জ্বলতে দিতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলের অন্তত ২০০ মিটার এলাকা ঘিরে জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, “আগুন নেভাতে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হলেও গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় তা সম্ভব হয়নি।
“আমরা মঙ্গলবার সকাল থেকে চারটি ইউনিট নিয়ে কাজ করেছি। বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করেও আগুন নেভাতে পারিনি।”
পরে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাপেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে আসেন বলে জানান তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উখিয়া উপজেলার ছোট ইনানী এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় নলকূপ বসানোর জন্য মাটি খননের সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।
আগুন নিভিয়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, “গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে গিয়ে আগুন নিভিয়ে দিলে গ্যাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একইভাবে চাপ প্রয়োগ করে গ্যাসের নির্গমনস্থল বন্ধ করার চেষ্টা করলেও অন্য দিক দিয়ে গ্যাস বের হয়ে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
“তাদের (বাপেক্স) পরামর্শ হচ্ছে, আগুন এভাবে জ্বলতে দিতে হবে। গ্যাসের প্রবাহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।”
বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের বরাতে মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, আগুন জ্বলতে এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখতে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট সার্বক্ষণিক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০০ মিটার এলাকা ঘিরে নিরাপত্তার উদ্যোগ
উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রথমেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটি বিচ্ছিন্ন করে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা জরুরি।
তিনি বলেন, “আমাদের এখন প্রধান উদ্বেগ হচ্ছে, জায়গাটিকে বিচ্ছিন্ন করে অন্তত ২০০ মিটার বা তার বেশি এলাকা ঘিরে রাখা। যাতে জনসাধারণ ওই এলাকার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।”
ইউএনও বলেন, “কখন, কোন দিক দিয়ে গ্যাস বের হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। গ্যাসের সঙ্গে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এ ছাড়া এলাকাটি পর্যটন এলাকার মধ্যে এবং আশপাশে মানুষের বসতি রয়েছে। শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা আগুন দেখতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।”
এ কারণে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান পান্না আক্তার।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্যাসের উৎস জানতে নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, ঘটনাস্থলে গ্যাসের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পেতে নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করবেন তারা। নমুনা পাওয়া গেলে বাপেক্সের পরীক্ষাগারে তা পরীক্ষা করা হবে।
তিনি বলেন, ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হওয়ার ঘটনাটি কোন উৎস থেকে ঘটছে, তা বোঝার জন্য নমুনা পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ পর্যায়ে গ্যাসের মজুদ কতটা, সে বিষয়ে ধারণা করা কঠিন।
গ্যাসের প্রবাহ একাধিক স্থানে ছড়িয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে আরহাম বলেন, ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্তত সাত দিন এলাকাটি পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত।
তিনি অতীতে টাঙ্গরাটিলা ও মাগুরছড়ায় গ্যাসক্ষেত্রে আগুন এবং গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
তবে উখিয়ার এই ঘটনায় ভূগর্ভে গ্যাসের প্রকৃতি, উৎস ও মজুদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
আরহাম বলেন, “ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। বাপেক্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কারিগরি মতামত ও অনুসন্ধান-সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া সম্ভব।”
