৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

উখিয়ায় গ্যাসের আগুন জোর করে নেভানোর চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে: বাপেক্স

“সাধারণত তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সময় কূপ খনন করে নির্দিষ্ট পথে গ্যাস বের হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ইনানীর ঘটনা অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Oct 2026, 01:31 PM

Updated : 30 Oct 2026, 02:10 PM

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন জোর করে নেভানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হতে পারে বলে সতর্ক করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান-বাপেক্স।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হলে গ্যাস জমে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম।

এদিকে স্থানীয়দের সুরক্ষায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার।

গত ২৭ অক্টোবর উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী এলাকায় মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির বাড়ির আঙিনায় নলকূপ বসানোর জন্য প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়।

পানি না পাওয়ায় পাইপ ও খননকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম তুলে নেওয়ার পর সেখান থেকে গ্যাস ও পানি বের হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।

কেন নেভানো যাচ্ছে না আগুন

বাপেক্সের ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, “ভূগর্ভে প্রচণ্ড চাপ ও তাপের মধ্যে থাকা গ্যাস বের হওয়ার পথ পেলে মাটির দুর্বল স্তর বা ফাটল দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে শুরু করে।

“সাধারণত তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সময় কূপ খনন করে নির্দিষ্ট পথে গ্যাস বের হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ইনানীর ঘটনা অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “এখানে পরিস্থিতি আনকন্ট্রোলড হয়ে গেছে। এটা আমরা চাইনি; কিন্তু ঘটে গেছে। এ কারণে আনকন্ট্রোলড ওয়েল (নিয়ন্ত্রণহীন কূপ) ও শ্যালো ডেপথের ওয়েল (অগভীর স্তরের কূপ) নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

“কূপ খননের সময় বিশেষ ব্যবস্থায় গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং অতিরিক্ত গ্যাস নির্দিষ্ট স্থানে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু এখানে গ্যাসের নির্গমন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।”

আরহাম বলছেন, “উপর থেকে বালি দিয়ে বা অন্যভাবে গ্যাসের নির্গমনের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হলে নতুন নতুন জায়গা দিয়ে গ্যাস বের হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”

তার ভাষায়, “এটাকে যদি আমরা জোরপূর্বক এখানে বন্ধ করতে চাই, তাহলে হিতে-বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। গ্যাস জমে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।”

এ ধরনের দুর্ঘটনার উদাহরণ হিসেবে তিনি সিলেটের হরিপুর, মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার কথা উল্লেখ করেন।

হরিপুরে কূপ খননের সময় ব্লোআউটের ঘটনায় খননযন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম প্রচণ্ড তাপে গলে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বাপেক্সের এই কর্মকর্তা বলেন, ভূগর্ভে গ্যাসের আধার যত দিন শেষ না হবে, তত দিন গ্যাসের নির্গমন চলতে পারে। এ মুহূর্তে তাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা এবং জানমালের ক্ষতি এড়ানো।

পেট্রোবাংলার নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা

গ্যাসের আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা জারি করেছে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন এন্ড মাইন্স) মো. শোয়েব স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনরোধ জানানো য়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্যাস নির্গমনের স্থান থেকে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আগুন জ্বালানো, ধূমপান এবং দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নতুন করে কোথাও গ্যাস নির্গত হচ্ছে কি না, তা বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, গ্যাসের আগুন কোনোভাবেই নেভানো বা বন্ধ করা যাবে না। এতে বাধা সৃষ্টি করা হলে ভূগর্ভে গ্যাস জমে পরবর্তী সময়ে উচ্চচাপে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এতে বড় এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ১৫ দিন গ্যাসের নির্গমন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে গ্যাসের প্রবাহ ধীরে ধীরে কমে স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয় কি না, তা দেখা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্যাসের প্রবাহ না কমলে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এছাড়া নো ফায়ার জোনের ১০০ মিটারের মধ্যে থাকা বৈদ্যুতিক লাইন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

১৪৪ ধারা, নিষিদ্ধ আগুন ও ধূমপান

এদিকে উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে-মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ প্রবেশ করানোর সময় গ্যাস নির্গত হয়ে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের প্রাথমিক সম্ভাবনা পেয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আগুনের উৎস থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হল।

একই সঙ্গে আশপাশের এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেয়াশলাই ও লাইটার ব্যবহারসহ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে, এমন সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

১৪৪ ধারা চলাকালে আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্যাসের নমুনা পরীক্ষা সম্ভব হয়নি

বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা এর আগে ঘটনাস্থল থেকে শিলা ও পানির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তবে গ্যাসের প্রবাহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় এখনো গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

বাপেক্স কর্মকর্তা এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, সংগ্রহ করা শিলা ও পানির নমুনা বাপেক্সের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফল ছাড়া গ্যাসের সঠিক উপাদান বা প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

তার মতে, ঘটনাটি অনুসন্ধানের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভূতাত্ত্বিক ও ভূপদার্থিক জরিপ করা হলে ভূগর্ভে গ্যাসের আধারের আকার ও সম্ভাব্য মজুদ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

তবে এখনই গ্যাসের মজুদ বা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের সম্ভাবনা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলে ও জানান আরহাম।

গ্যাসের আগুনের কারণে আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এরই মধ্যে আগুনের সংস্পর্শে এসে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বিকল্প লাইন নির্মাণ করে সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

পুরনো খবর:

কক্সবাজারে নলকূপ বসাতে মাটি খুঁড়তেই জ্বলে উঠল আগুন
উখিয়ায় নলকূপের গ্যাসের আগুন ২৪ ঘণ্টায়ও নিয়ন্ত্রণে আসেনি, আরও ছড়াচ্ছে