Published : 14 Apr 2026, 06:09 PM
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জাহাজ চলাচল বন্ধ বা অবরোধ (ব্লকেড) করার ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে দিনে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল বিশ্ব বাজারে পৌঁছতে পারবে না। এতে বিশ্বে তেল সরবরাহ আরও সংকটে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ এবং তেলের বাজারে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হল:
কী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে?
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন,যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানি বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সব জাহাজ ‘অবরোধ’ করা শুরু করবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সোমবার জানিয়েছে, অননুমোদিত কোনও জাহাজ এই অবরোধ এলাকা অতিক্রমের চেষ্টা করলে সেটিকে ‘বাধা দেওয়া, আটক করা বা ঘুরিয়ে দেওয়া’ হতে পারে।
তবে ইরানের বাইরের অন্যান্য দেশের বন্দরে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।
এর জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া যে কোনো সামরিক জাহাজকে ‘যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
তেল সরবরাহে প্রভাব:
ইরানি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিশ্ববাজার থেকে তেলের একটি বড় উৎসকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর হিসাব অনুযায়ী, ইরান গত মার্চ মাসে প্রতিদিন ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে।
এছাড়া এপ্রিলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দৈনিক ১৭ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে দেশটি।
তবে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের তেল উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে জাহাজে এবং সমুদ্রে ভাসমান মজুদে ১৮ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল রয়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং চীনের উপকূলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।
অন্যান্য দেশগুলোর তেল সরবরাহ পরিস্থিতি:
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।
গত ৭ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হলেও অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল।
তবে মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মিথানলবাহী একটি চীনা ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুরু হওয়ার পর এটিই প্রথম কোনো ট্যাংকারের প্রণালি পার হওয়ার ঘটনা। আরও দুটো জাহাজও এই প্রণালি পার হয়েছে।
তাছাড়া, অবরোধ শুরুর আগে রোববার পাকিস্তান ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী তিনটি বিশাল ট্যাংকার এই পথে যাতায়াত করেছে। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী আরেকটি ট্যাংকারও রোববার এই পথ পাড়ি দিয়েছে।
তবে ইরাকি তেল নিতে আসা মাল্টার একটি ট্যাংকার রোববার গতিপথ পরিবর্তন করে ওমান উপসাগরে নোঙর করেছে।
কেপলার-এর তথ্যমতে, গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পারস্য উপসাগরের ভেতরে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্যবাহী ১৮৭টি ট্যাংকার আটকা পড়ে ছিল।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে কোন দেশগুলোর আমদানিতে?
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন। তবে গত মাসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ছাড়ের পর ভারতসহ অন্য দেশগুলোও ইরানি তেল আমদানির সুযোগ পায়।
জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে গত সাত বছরের মধ্যে প্রথম ইরান থেকে ভারতে তেলের চালান পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এই চালানের সিংহভাগই যায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, যারা বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।