Published : 09 Jun 2026, 06:21 PM
যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টাকালে গতবছর গ্রীষ্মে তিন শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অপহরণ ও নির্যাতনের পর তাদের কিডনি কেটে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল লিবিয়ার এক মিলিশিয়া গোষ্ঠী। বিবিসি এক অনুসন্ধানের পর এই তথ্য জানিয়েছে।
অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার এই যুবকদের সবাই ইরাকি কুর্দিস্তানের বাসিন্দা। লিবিয়ায় একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠী তাদেরকে আটকে রেখে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ৫ হাজার ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৭০০ পাউন্ড) মুক্তিপণ দাবি করে।
সময়মতো এই মুক্তিপণ না দিলে বন্দিদের কিডনি কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে ফিরে আসা কয়েকজন অভিবাসনপ্রত্যাশী তাদের ওপর চলা নির্যাতনের প্রমাণ দেখিয়েছেন।
তাছাড়া জোর করে অস্ত্রোপচার করার কিছু ছবিও পাওয়া গেছে, তবে তা এখনও নিশ্চিতভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাবেক বন্দিরা জানান, প্রায় ১৮০ জনকে একটিমাত্র ছোট কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনায় অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং কতজন এখনও বন্দি আছেন তা স্পষ্ট নয়।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল মিলিশিয়া গোষ্ঠীটির। কিন্তু ইরাকি কুর্দি মানবপাচারকারী নোয়াহ অ্যারনের সঙ্গে অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধের জেরে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অপহৃত হন।
অ্যারন ওই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রার আয়োজন করেছিলেন। অ্যারন বর্তমানে অর্থ পাচার ও মানবপাচারের অপরাধে ফ্রান্সে ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
কার্দো জাফ নামের আরেক পাচারকারীকে নিয়ে সম্প্রতি বিবিসি’র অনুসন্ধান চলার সময় অপহরণের বিস্তারিত এই তথ্য সামনে এসেছে। কার্দো জাফ গতমাসে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
অ্যারন এবং জাফ দুইজনই অতীতে একসঙ্গে কাজ করেছেন বলে ধারণা করা হয়। তারা দুজনই ইরাকি কুর্দিস্তানের রানিয়া শহরের বাসিন্দা। শহরটি সক্রিয় চোরাকারবারীদের নেটওয়ার্কে ভরপুর বলে জানানো হয়েছে যুক্তরাজ্যের থিংকট্যাংক চাথাম হাউজের প্রতিবেদনে।
লিবিয়া উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগর হয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার একটি অবৈধ মানবপাচার রুট। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় সরকারি নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি থাকায় অপরাধী চক্রগুলো সেখানে সক্রিয়।
লিবিয়ার বেশিরভাগই প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং মানব পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো তাদের সহযোগিতার ওপরই নির্ভর করে।
বিবিসি’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে বিমানে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি বন্দিশালায় নিয়ে গিয়ে জিম্মি করা হয়।
এরপরই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রার আয়োজন করা নোয়াহ অ্যারন পূর্বের করা চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন অভিযোগ করে প্রতি জিম্মির জন্য মুক্তিপণ দাবি করে মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি।
অর্থ দিতে দেরি হলে কিডনি কেটে নেওয়া হবে বলে জিম্মিদের পরিবারগুলোকে ভিডিও পাঠানো হয়। জিম্মিদের অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হত, শারীরিক নির্যাতন করা হত এবং নির্যাতনের ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলত।
রানিয়া শহরের এক বাসিন্দা জানান, মুক্তিপণ দেওয়ার পর গত জানুয়ারিতে ইরাক সরকারের বিশেষ বিমানে তার ছেলেসহ ১১০ জন দেশে ফেরেন।
তবে তার ছেলের শরীরে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন রয়েছে, যা জোর করে কিডনি কেটে নেওয়ার অস্ত্রোপচারের দাগ বলে তারা আশঙ্কা করছেন। যুক্তরাজ্যের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, ক্ষতটি কিডনি কাটার দাগের মতোই।
কুর্দিস্তানের আঞ্চলিক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হেম্ন মেরানি জানান, ভয়াবহ এই ঝুঁকির পরও ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনের প্রবাহ থামছে না।
তিনি ফিরে আসা অভিবাসীদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন নিজেদের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সবাইকে বলেন, যাতে অন্য কেউ এই বিপজ্জনক পথে পা না বাড়ায়।