Published : 26 Jul 2025, 12:36 PM
চীনঘনিষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের পদচ্যুত করার উদ্দেশ্যে হওয়া নজিরবিহীন ও বিতর্কিত এক ভোটে রায় জানাতে কেন্দ্রে যাচ্ছেন তাইওয়ানের হাজারো বাসিন্দা।
‘দাবামিয়ান’ বা প্রতিনিধি প্রত্যাহারের এ ভোটের নিশানায় ৩০ জনের বেশি আইনপ্রণেতার নাম রয়েছে।
একটি নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে এই ‘গ্রেট রিকল’ ভোটের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল।
বিবিসি জানিয়েছে, শনিবারের এই ভোট তাইওয়ানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
স্বশাসিত এ দ্বীপটিতে এখন ক্ষমতায় রয়েছে ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি), অন্যদিকে আইনসভায় বিরোধী দল কুওমিনতাং ও তার মিত্রদের আধিপত্য রয়েছে।
‘রিকল’ ভোটের টার্গেটে থাকা সব আইনপ্রণেতাই সরকারবিরোধী। তাদের প্রত্যাহারের পর নতুন ভোটে সরকারপন্থিরা জিতলে আইনসভায় ডিপিপির জোর বাড়বে।
এই প্রতিনিধি প্রত্যাহারের ভোটকে কেন্দ্র করে তাইওয়ানের সমাজে গভীর বিভাজন দেখা যাচ্ছে, বড় বড় সব সমাবেশ ও তীব্র তর্কবিতর্কও হচ্ছে।
রিকলপন্থি ও রিকলবিরোধী উভয় শিবিরের কর্মীরাই বলছেন, তারা তাইওয়ানের গণতন্ত্রের জন্য লড়ছেন।
এই রিকল ভোটঘিরে উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গেই। সেবার ভোটাররা ডিপিপি’র উইলিয়াম লাইকে তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পার্লামেন্টের আইনসভায় বিরোধীদের শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
পরের মাসগুলোতে প্রধান বিরোধীদল কুওমিনতাং ছোট দল তাইওয়ান পিপল’স পার্টি ও স্বতন্ত্রদের সঙ্গে নিয়ে ডিপিপি’র বিল আটকে দেয় এবং বিতর্কিত কিছু আইন পাস করে।
এসব পদক্ষেপ তাইওয়ানের অনেককে ক্ষেপিয়ে দেয়, তারা একে ডিপিপি’র সরকারকে ক্ষমতাহীন করে বিরোধীদের পার্লামেন্টারি ক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে দেখা শুরু করেন।
২০২৪ সালের মে-তে শুরু হয় বিক্ষোভ, যা পরে পরিচিতি পায় ব্লুবার্ড মুভমেন্ট নামে।
গত কয়েক বছর ধরে চীনের সঙ্গে কুওমিনতাংয়ের সম্পর্ক অন্য দলগুলোর তুলনায় বন্ধুত্বপূর্ণ বলেই মনে হচ্ছে।
ব্লুবার্ড আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, বেইজিংয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কুওমিনতাং গোপনে তাইওয়ানের আইনসভায় চীনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
কুওমিনতাং এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও গত বছর দলটির একদল আইনপ্রণেতা চীন সফর করলে তাদের ঘিরে সন্দেহ জোরদার হয়। চীনে ওই আইনপ্রনেতাদের স্বাগত জানান দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ঊর্ধ্বতন পদধারী কর্মকর্তা ওয়াং হানিং।
এরপর ব্লুবার্ড আন্দোলনে থাকা একাধিক নাগরিক গোষ্ঠী বেশ কজন কুওমিনতাং আইনপ্রণেতাকে প্রত্যাহারের দাবিতে ‘পিটিশন’ করা শুরু করে। এর পাল্টায় কুওমিনতাংয়ের সমর্থকরাও ডিপিপির কয়েক আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে একই পদক্ষেপে নামে।
এখন পর্যন্ত যে ৩১ আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে ‘রিকল’ ভোটের জন্য পর্যাপ্ত প্রাথমিক সমর্থন মিলেছে, তারা সবাই কুওমিনতাংয়ের। ভোটে এ আইনপ্রণেতাদের সবাই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার হলে ডিপিপির আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তাইওয়ানে এর আগেও রিকল ভোট হয়েছে, তবে এত অল্প সময়ে এত আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের ভোট এবারই প্রথম।
শনিবার তাইওয়ানের ২৪টি জেলার ভোটাররা তাদের আইনপ্রণেতাকে বাদ দিতে চান কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এ রায় জানাবেন। বাকি আইনপ্রণেতাদের ব্যাপারে রিকল ভোট হবে অগাস্টে।
প্রতিটি আসনে যদি ভোটের পরিমাণ নিবন্ধিত ভোটারদের ২৫ শতাংশের বেশি হয় এবং তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি আইনপ্রণেতা প্রত্যাহারে ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলেই ওই আসন শূন্য হয়ে যাবে এবং তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচন হবে।
এ কারণে শনিবার ভোটার উপস্থিতিকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা অনেক গোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও রাস্তাঘাটে নিরলসভাবে ভোট চেয়ে গেছেন।
অন্যদিকে কুওমিনতাং ও এর মিত্ররা বড় বড় সমাবেশ করে রিকলকে ‘না’ বলতে ভোটারদের উৎসাহিত করেছে।
তাদের অভিযোগ, ডিপিপি-ই এই রিকল ভোট ও ব্লুবার্ড মুভমেন্টের নাটক সাজিয়েছে, যেন নির্বাচনের ফল বদলে আইনসভা ইউয়ানের কর্তৃত্ব নেওয়া যায়।
ডিপিপি শুরুর দিকে এই ‘রিকল’ আন্দোলন থেকে দৃশ্যত নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল, কিন্তু পরের দিকে তারা দৃঢ় সমর্থন দিয়ে বসে।
আন্দোলন নিয়ে লাই বলেন, ডিপিপিকে ‘অবশ্যই জনগণের শক্তিকে সম্মান দেখাতে হবে’।
বেইজিংও দূর থেকে তাইওয়ানের ভেতরকার এই বিতর্কে কড়া নজর রাখছে।
চীনের তাইওয়ান সংক্রান্ত কার্যালয় লাইয়ের বিরুদ্ধে ‘গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম’ এবং ‘বিরোধীদের দমনে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপকে কাজে লাগানোর’ অভিযোগ এনেছে।