Published : 03 May 2026, 01:25 PM
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের দুই মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বলার মতো সামরিক বিজয় বা কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে না পারায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের অচলাবস্থার এক ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে রয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বকে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে তেহরান একটি নতুন প্রস্তাব দিলেও শুক্রবার ট্রাম্প তা তড়িঘড়ি নাকচ করে দিয়েছেন।
দুই পক্ষ এখনও নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও অনড় অবস্থান ধরে রাখায় উত্তেজনা কমার সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
অপূর্ণ লক্ষ্য
যুদ্ধে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তার কোনোটিই কি পূরণ হয়েছে? ইসলামী শাসনব্যবস্থার পতন থেকে শুরু করে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া—কোনোটিই হাসিল করতে পারেনি ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনও ভূগর্ভস্থ কোনো সুড়ঙ্গে চাপা পড়ে আছে বলেই অনেকের ধারণা। সেসব ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা এবং সেগুলোকে বোমা বানানোর উপকরণে পরিণত করাও হয়তো সম্ভব।
“বিশ্বকে আগের তুলনায় কম নিরাপদ করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখা হবে তাকে,” ট্রাম্পকে নিয়ে এমনটাই বলেছেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম এশিয়া বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড।
এ সংঘাত অমীমাংসিত থাকার অর্থই হচ্ছে—বৈশ্বিক অর্থনীতির পতন অব্যাহত থাকা, এতে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দামও চড়াই থাকবে। এমন কিছু ট্রাম্পের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে, যুদ্ধের কারণে যার প্রতি আস্থা রাখা মার্কিনিদের সংখ্যাও ইতিমধ্যে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
এ বছরের নভেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের কারণে রিপাবলিকানরা সেখানে বড় ধরা খেতে পারেন বলে অনেকেই মনে করছেন।
অবরোধ, নাকি আরও হামলা?
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলোচনায় ট্রাম্প ইরানে কয়েক মাস দীর্ঘ নৌ-অবরোধের সম্ভাবনার কথা তুলছেন, যাতে তেল রপ্তানি চেপে ধরার মাধ্যমে ইরানকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের আলোচনায় বসাতে বাধ্য করা যায়।
পাশাপাশি তিনি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ফের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দরজাও খোলা রেখেছেন। সম্প্রতি অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ইরানে ‘সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী’ হামলা চালানো এবং হরমুজ প্রণালির কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও বলা হয়েছে।
তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা মনে করছেন, এই অচলাবস্থা এবং নৌ-অবরোধই লম্বা সময় বহাল থাকতে পারে।
“খুব শিগগির এটা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না,” নাম না প্রকাশ করার শর্তে এমনটাই বলেছেন তাদের একজন।
ইরানের ‘তুরুপের তাস’
ইরান টুটি চেপে ধরেছে হরমুজ প্রণালির, যুদ্ধের আগে যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল অবাধে পার হতে পারত। তাদের এ পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দিয়েছে জোর ধাক্কা।
তেহরান এখন জানে, তারা যে কোনো সময় প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, এমনকি তাদের অবস্থা যদি খারাপও হয় তাও তারা প্রণালিটির ওপর তাদের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
“এই জানাটাই তাদেরকে যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় নিয়ে যাবে,” বলেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যান।
ইরান এমনকী হামাস, হুতি ও হিজবুল্লাহ’র মতো পশ্চিম এশিয়ায় সক্রিয় প্রতিরোধ অক্ষের সদস্যদের সহায়তা বন্ধ করতেও নারাজ। যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প এবং তার মিত্র ইসরায়েল এ লক্ষ্য ঠিক করেছিল; কিন্তু অন্য সব লক্ষ্যের মতো এটিও ‘অধরা’।
কূটনৈতিক অচলায়তন, সুপ্ত সংঘাতের ঝুঁকি
তেহরানের প্রস্তাব ছিল—সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ও হরমুজ প্রণালি খোলা পর্যন্ত তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা একপাশে সরিয়ে রাখা। ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে তা খারিজ করে দেন। তিনি চান শুরুতেই পরমাণু ইস্যু নিয়ে আলোচনা।
পাকিস্তানি মধ্যস্থাতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো সংশোধিত ইরানি প্রস্তাব শুক্রবার তেলের দাম খানিকটা নামিয়ে এনেছিল। অবশ্য ট্রাম্প সেদিনও বলেন, তেহরানের প্রস্তাবে তিনি ‘সন্তুষ্ট নন’।
বিশ্লেষকদের অনেকেই সতর্ক করে বলছেন, কোনো স্থায়ী সমাধান না এলে পশ্চিম এশিয়ার এ সংঘাত ‘সুপ্ত’ অবস্থায় চলে যেতে পারে। তেমনটা হলে ট্রাম্প ওই অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মার্কিন সেনা সরাতেও পারবেন না। যার প্রভাব পড়বে বিশ্বের অন্যত্র। এতে এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানেই ওয়াশিংটনের গুরুত্ব আরও কমবে।
ইরানে হামলা চালিয়েও এমনিতেও কৌশলগতভাবে চড়া মূল্য চুকাতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। যুদ্ধের আগে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা না করায় ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল গভীর হয়েছে। ইরানে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তন তো দূর, উল্টো আগের চেয়েও কট্টরপন্থিরা ক্ষমতায় বসেছে, প্রভাব বেড়েছে রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি)।
অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানির মতো তুলনামূলক মধ্যপন্থিদের মেরে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানকে আলোচনার মাধ্যমে বাগে আনার সম্ভাবনাও অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে।
দেশের ভেতর চাপ
তুমুল অজনপ্রিয় এ ইরান যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি টানতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প যুদ্ধবিরোধী শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন; সেই তিনিই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন যুদ্ধ বাধিয়ে সমর্থকদের অনেকেরই মন ভেঙে দিয়েছেন।
দেশটিতে এখন পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে চলে গেছে, যার ধাক্কায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে বলে দলের ভেতরেই অনেকে আশঙ্কা করছেন।
হোয়াইট হাউসের সহকারী প্রেস সেক্রেটারি টেইলর রজার্স অবশ্য এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে নারাজ। তার মতে, পেট্রলের এ চড়া দাম খুব বেশিদিন থাকবে না। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা প্রশমিত হলে দামও দ্রুত নেমে আসবে।
ট্রাম্প যে নানামুখী চাপে রয়েছে, হয়তো ইরান তা উপভোগই করছে। ওয়াশিংটনের দেওয়া চাপে ‘নুইয়ে পড়ার’ কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে দেখা যায়নি।
“ইরান মচকায়নি বা গুটিয়েও যায়নি, তারা সময় নিয়ে খেলছে,” এক্সে এমনটাই বলেছেন সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনা টুসি।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প একতরফাভাবে বিজয় ঘোষণা করে ইরান সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন কিনা তা নিয়েও তার ঘনিষ্ঠ মহলে বেশ আলোচনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তার মূল্যায়নও চেয়েছেন ট্রাম্পের সহযোগীরা।
স্বাধীন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন কিছু ঘটলে তা ট্রাম্পের ‘পরাজয়কেই’ নিশ্চিত করবে, তেহরানও একে দেখবে নিজেদের ‘কৌশলগত সাফল্য’ হিসেবে। যা আদতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের আগের সময়ের চেয়েও ‘বাজে অবস্থায়’ ঠেলে দেবে।