Published : 11 Dec 2025, 06:29 PM
মানুষের আগুন আবিষ্কার ও ব্যবহারের ইতিহাস নিয়ে এতদিন যা জানা ছিল, তা বদলে দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নতুন এক প্রত্নতাত্বিক আবিষ্কার।
যুক্তরাজ্যের সাফোক অঞ্চলের বার্নহাম এলাকায় পাওয়া প্রমাণ বলছে, মানুষ প্রায় ৪ লাখ বছর আগে আগুন তৈরি করত। ইংল্যাণ্ডের পূর্বাঞ্চলে তারা এই আগুন জ্বালাতে শিখেছিল।
অর্থাৎ, আগে যা ধারণা করা হয়ে আসছিল তার তুলনায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখে গিয়েছিল।
এতদিন পর্যন্ত মানুষের আগুন জ্বালানোর সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণটি ছিল বর্তমান ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলে নিয়ান্ডারথালদের একটি স্থানে, যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার বছর আগের।
আর এখন বার্নহামে লাখ লাখ বছর আগে মানুষের আগুন জ্বালাতে শেখার বিষয়টি কিভাবে বুঝলেন গবেষকরা?
ঘটনাস্থলে প্রমাণ হিসাবে গবেষকরা পেয়েছেন আগুনে পোড়া মাটি, আগুনে ফেটে যাওয়া হাতকুঠার এবং দুটি লৌহ সালফাইড (পাইরাইট) পাথর খণ্ড সংগ্রহ করেছেন। চকমকি পাথরের সঙ্গে এই খনিজ পাথরের সংঘর্ষে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয়।
ভূতাত্বিক গবেষণায় এটি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, পাইরাইট ওই এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ দূর অঞ্চল থেকে এটি সংগ্রহ করা আনা হয়েছিল আগুন জ্বালানোর জন্যই।
আর আগুনে পোড়া মাটিটাও দাবানলের কারণে পোড়া ছিল না- এটিও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গবেষকদের নেতৃত্বাধীন দল চার বছর ধরে গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন।
মানব ইতিহাসে আগুন জ্বালানো শেখা এবং তা কাজে লাগানোর মানবজাতির জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগুন আবিষ্কার সবকিছু বদলে দিয়েছে।
আগুন কেবল উষ্ণতা বা আলোই দেয়নি, বরং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, শিকার প্রতিরোধ, সামাজিক সংযোগ এবং ভাষার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
গবেষকদের মতে, সাফোকের বার্নহামে এই আগুন জ্বালানো শিখেছিল সম্ভবত প্রাচীন নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষ। কারণ, বর্তমান প্রজাতির মানুষ হোমো সাপিয়েন্সরা তখনও আফ্রিকার বাইরে স্থায়ীভাবে বাস করত না।
“প্রায় ৪০০,০০০ বছর আগে প্রাথমিক নিয়ান্ডারথালরা ব্রিটেনে আগুন জ্বালাত,” বলেন প্রফেসর ক্রিস স্ট্রিঞ্জার, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রতিনিধি ও আবিষ্কারের দলটির সদস্য।
“আমরা ধারণা করি মানুষ সম্ভবত আগুনের এই জ্ঞান রাখত” বলেন তিনি। “এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অসীম,” বলেন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. রবার্ট ডেভিস, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তার কথায়, “মানুষের আগুন তৈরি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যার ব্যবহারিক ও সামাজিক সুফল মানব বিবর্তনকে বদলে দিয়েছে।”
প্রাথমিকভাবে গবেষকদের সন্দেহ ছিল, মানুষ নিজেই আগুন তৈরি করেছে নাকি প্রাকৃতিক আগুন ব্যবহার করেছে। তবে দুটি লৌহ পাইরাইটের আবিষ্কার প্রমাণ দেয়, নিয়ান্ডারথালরা আগুন জ্বালাতে চকমকি পাথর এবং পাইরাইট ব্যবহার করত।
“আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক বছর লেগেছে,” বলেন প্রফেসর নিক অ্যাশটন, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রলিথিক সংগ্রহের কিউরেটর এবং গবেষণার সহযোগী। তিনি বলেন, “এত প্রাচীন সময়ে নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে চকমকি পাথর, পাইরাইট সম্পর্কে জ্ঞান থাকা সত্যিই আশ্চর্যজনক।”
কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ সেগোলিন ভ্যান্ডেভেল্ডে বলেন, “পাইরাইটের সঙ্গে আগুনের চিহ্ন পাওয়া মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ। আগুন জ্বালানো শেখা এত আগে হয়ে থাকলে এর নিয়মিত ব্যবহার আরও আগেও হতে পারে।”
গবেষণা প্রতিবেদনটি ‘নেচার’ বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা আশা করছেন, গবেষণার এই ফল অন্যান্য প্রাচীন স্থানে আগুনের চিহ্ন খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা বাড়াবে।