Published : 26 Feb 2026, 12:21 PM
নতুন সরকার গঠনের জন্য ৫ মার্চ ভোট দেবে নেপালের জনগণ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তরুণ নেতৃত্বাধীনদের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে সরকার পতনের পর এটাই হবে দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
সরকার পতনের পর থেকে দেশটি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যারা ছয় মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
নেপালের ভোট এক নজরে তুলে ধরেছে বিবিসি।
কীভাবে ভোট হবে?
নেপালের সংসদের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভার নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ ভোট দেবেন। তাদের মধ্যে ৮ লাখ ভোটার রয়েছেন, যারা এবারই ভোটার রয়েছেন।
ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি) এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর)—এই দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে ২৭৫ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।
৩,৪০০ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে সহ্রসাধিক প্রার্থীর বয়স ৪০ বছরের নিচে।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা (বাংলাদেশ সময় সোয়া ৭টা) থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
তবে দেশের কিছু অংশে সব ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ের পরও ভোটকেন্দ্র খোলা থাকতে পারে। অতীতে কিছু আসনে রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলেছে।

দুই ধরনের ব্যালট কেন?
নেপালে বর্তমানে একটি মিশ্র নির্বাচনি ব্যবস্থা রয়েছে, যা ২০১৫ সালের সংবিধানের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়।
প্রথম পদ্ধতিকে বলা হয় ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি), যেখানে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান—তিনিই আসনটি জয় করেন।
দ্বিতীয়টি হলো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (পিআর), যাতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত বিবেচনায় নেওয়া হয়।
মোট ১৬৫টি আসন এফপিটিপি পদ্ধতিতে এবং বাকি ১১০টি আসন পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবে।
বিবিসি লিখেছে, দুই পদ্ধতি রাখার উদ্দেশ্য—অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সমাজে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখা। এ ব্যবস্থায় কোনো একক দলের পক্ষে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন, ফলে শীর্ষে থাকা দলের জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি।
নির্বাচনের প্রধান মুখ কারা?
কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও নেতার ওপর সবার নজর রয়েছে।
তাদের একজন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন।
বালেন নামে সুপরিচিত এই সাবেক র্যাপার ঝাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে লড়ছেন। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনবিস্ফোরণের মুখে গত সেপ্টেম্বরে ওলি ও তার সরকার পদত্যাগ করেন।

বালেন্দ্র শাহ রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির প্রার্থী, যে দলটি ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এবার দলটি অনেক ভালো ফল করতে পারে। শাহকে দলটির সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নেপালি কংগ্রেসও আরেকটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। দলটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাকে সরিয়ে ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে নেতা নির্বাচিত করেছে।
ভোটের মাঠে অন্য প্রধান খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে ওলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল), যা গত নির্বাচনে সর্বাধিক আসন জিতেছিল এবং সাবেক মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি।

তীব্র লড়াইয়ের আসন কোনগুলো?
পূর্ব নেপালের ঝাপা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের একটি ঝাপা-৫, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি অলির ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি।
কিন্তু এবার সেখানে কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ফলে আসনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
কাঠমান্ডুর ১৫টি আসনও নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে, কারণ নগরকেন্দ্রিক ভোটের প্রবণতার সূচক হিসেবে এসব আসনকে দেখা হয়।
নির্বাচনের প্রধান বিষয় কী?
গত সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হন, যাদের অনেকেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান বলে কর্তৃপক্ষের ভাষ্য। সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, কেন্দ্রীয় সরকারি সচিবালয়সহ বহু ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল জনতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা থেকে বিক্ষোভের সূচনা হলেও বিদ্যমান দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার ক্ষোভ থেকে ফুঁসে ওঠে।
৫ মার্চের ভোটে এগুলোই প্রধান বিষয়।

বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে সুশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে, যাকে আগের সরকার পতনের পেছনের ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যেমন নেপালি কংগ্রেস ১৯৯০ সাল থেকে সরকারি চাকুরেদের সম্পদের উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছে।
এই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে নেপালের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখা প্রতিবেশী ভারত ঘনিষ্ঠভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন ছিল।
ভারতের দৃষ্টিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে ওলির প্রধানমন্ত্রিত্বের বিভিন্ন মেয়াদে নেপাল সম্পর্ক জোরদার করেছে।
নেপালে বড় প্রভাব রয়েছে চীনের এবং নেপালের ভবিষ্যৎ সরকার যেন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভসহ বিভিন্ন স্বার্থে সহায়ক হয়, তা বেইজিং প্রত্যাশা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রও এ নির্বাচনে ভূমিকা রাখছে এবং কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

ফল জানা যাবে কখন?
নেপালের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সারা দেশ থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি ভোটের ১৬৫টি আসনের ফল প্রকাশ করা হবে। সাধারণত এ প্রক্রিয়ায় একদিন সময় লাগে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাম প্রসাদ ভান্ডারি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক (পিআর) ১১০টি আসনের ফল গণনা করতে আরও দুই থেকে তিন দিন লাগতে পারে।
যদি তা সত্যি হয়, তবে ফল প্রকাশে এটি হবে বড় পরিবর্তন।
২০২২ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।
ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণ তুলে ধরতে গিয়ে বিবিসি লিখেছে, কিছু ভোটকেন্দ্র দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখান থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে হাতে করে নামিয়ে আনতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে হেলিকপ্টারে আনা-নেওয়া করতে হয়।
তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো গণনা কেন্দ্রে প্রতিনিধিদের পাঠায়। এসব প্রতিনিধি কখনও কখনও ফল ও ভোটের বৈধতা নিয়ে আপত্তি তোলেন, যা ফল প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে।