Published : 04 Apr 2026, 06:00 PM
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরান সহসাই তাদের নিয়ন্ত্রণ সরাবে বলে মনে করছে না মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোর বরাত দিয়ে তিনটি সংশ্লিষ্ট সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য এই মুহূর্তে তেহরানের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো এই জলপথটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ।
এই গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া রেখে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতেই তেহরান এমন কৌশল নিয়েছে। উল্লেখ্য, পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে মার্কিন ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ উল্টো তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, এই সংকটের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা চাইলে যেকোনো সময় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির শ্বাসরোধ করতে সক্ষম।
ট্রাম্পের অবস্থান ও বাস্তবতা
বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি ফের সচল করার বিষয়টিকে বারবার সহজ করে দেখানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। শুক্রবার নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আরেকটু সময় পেলেই আমরা সহজে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারব, তেলের দখল নেব এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করব।”
তবে সামরিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, এই প্রণালির একপাশ নিয়ন্ত্রণ করা ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম ব্যয়বহুল হবে এবং ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ‘ইরান প্রজেক্ট’-এর পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, “ইরানকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের হাতে ‘গণ-বিঘ্নকারী’ একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছে।”
ভায়েজের মতে, বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে জিম্মি করার এই ক্ষমতা ‘পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী’, এটি তেহরান বোঝে।
সংশয় ও সামরিক ঝুঁকি
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী যে প্রণালিটি খুব দ্রুতই খুলে যাবে এবং যুদ্ধের পর ইরানকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না। তবে ট্রাম্প এও বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অন্য দেশগুলোর (যাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এই পথের ওপর নির্ভরশীল) স্বার্থ এখানে বেশি জড়িত।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের এ জলপথটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বেসামরিক জাহাজে হামলা, মাইন ছড়িয়ে দেওয়া ও টোল বা পারাপার বাবদ অর্থ দাবি করার মাধ্যমে ইরান কার্যত এই পথ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে তেলের দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে আর বহু দেশ জ্বালানি সংকটে পড়েছে ।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ইরান এই সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাইবে না।
সামরিক অভিযানের চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলপথটি ফের সচল করতে সামরিক অভিযান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওমান ও ইরানের মাঝখানের এই প্রণালিটি সবচেয়ে সরু জায়গায় মাত্র ২১ মাইল চওড়া। কিন্তু বড় জাহাজ চলাচলের পথটি উভয় দিকে মাত্র ২ মাইল চওড়া, যা জাহাজ ও সেনাদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বাহিনী যদি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল বা দ্বীপগুলো দখলও করে নেয়, তবুও আইআরজিসি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের গভীর থেকেই এই পথে হামলা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে।
এমনকি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ইরান এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠন তহবিলের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে টোল আদায় করার পরিকল্পনা করছে তেহরান।
সাবেক সিআইএ পরিচালক বিল বার্নস এক পডকাস্টে বলেন, “ইরান এই জলপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো শান্তি চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও আর্থিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করবে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি বর্তমানে একটি অত্যন্ত কঠিন দরকষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করেছে।”