Published : 11 Jul 2025, 12:31 AM
চীনের পূর্বাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গরমে অসহনীয় হয়ে উঠেছে ছাত্রাবাসের ঘর, যেখানে সাধারণত চার থেকে আটজন একসঙ্গে থাকেন। এসি না থাকায় অনেকেই এখন আশ্রয় নিচ্ছেন লাইব্রেরি, শপিংমল, হলওয়ে, হোটেল এমনকি তাঁবুতেও।
কেউ কেউ তো ক্যাম্পাসই ছেড়ে দিয়েছেন গরম থেকে বাঁচার আশায়। চাংচুন শহরের ২০ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বিবিসি-কে বলেন, “প্রতি বছর কয়েকদিন এমন থাকে, যখন গরম সহ্য করা যায় না। তখন আমরা অনেক সময় হোটেলে গিয়ে থাকি এসি’র জন্য।”
তবে হোটেল সবার নাগালের মধ্যে নয়। “হোটেলে যাওয়া আমাদের মতো ছাত্রদের জন্য অনেক খরচের ব্যাপার,” বলেন ওই শিক্ষার্থী। এ কারণেই কেউ কেউ বরফের কুচি ভরা বাটি ফ্যানের সামনে রেখে ‘নিজস্ব এসি’ বানিয়ে গরম ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।
চীনে জুলাইয়ের মাঝামাঝি যে সময়টায় সবচেয়ে গরম পড়ে, সেটিকে বলা হয় ‘সানফু সিজন’ বা ‘ডগ ডেজ’। তবে এবার তা শুরু হয়েছে আগেই। গত সপ্তাহে পূর্বাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে।
রোববার কুইংদাও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আবাসিক ভবনে এক নিরাপত্তাকর্মী মারা গেলে চাঞ্চল্য ছড়ায়। তার মৃত্যুতে গরমকে দায়ী করছেন অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, মৃত্যুর কারণ এখনও তদন্তাধীন।
ওই নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন সবার পরিচিত “আঙ্কেল”, যিনি ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো বিড়াগুলোকে দেখভাল করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোর এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বিড়ালগুলো জানে না যে আঙ্কেল অনেক দূরে চলে গেছেন। আজও তারা অনেক মানুষের দেখা পেয়েছে, কিন্তু আর আঙ্কেলের ডাক শোনেনি।”
একই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীও হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এই গরমে ছাত্রছাত্রী ও কর্মীদের জীবনযাপন কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে।
চীনে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চরম আবহাওয়ার তাণ্ডব চলছে। একে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পূর্বাঞ্চলে টাইফুন আঘাত হানার পর হুঁশিয়ারি জারি করা হয়েছে আকস্মিক বন্যার জন্য।
আর পশ্চিমে নেপাল-চীন সীমান্তে বন্যায় একটি সেতু ভেসে গিয়ে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাপপ্রবাহের তীব্রতাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ২০২২ সালে গরমে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট।
২০২৩ সালে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশের একটি এলাকায় তাপমাত্রা উঠেছিল ৫২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে— যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
২০২৪ সাল ছিল চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর। জুলাই ছিল রেকর্ড গরমের মাস। চাংচুন শহরের সেই শিক্ষার্থী বলেন, “ছোটবেলায় আমাদের অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল অনেক স্বস্তিদায়ক ছিল। এখন প্রতিবছর গরম আরও বাড়ছে।”
গরমে অনেকটাই তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। চেচিয়াং প্রদেশে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার সময় এক যাত্রী জানালা ভেঙে বাতাস ঢোকানোর চেষ্টা করেন।
আর পাশের জিয়াংসি প্রদেশে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় বৃদ্ধরা খাবার না কিনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকছেন, যার কারণে অস্বস্তিতে পড়ছেন কর্মীরা।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জিলিন প্রদেশে শিক্ষার্থীরা শীতল করিডরে তাঁবু খাটিয়ে ঘুমাচ্ছেন। শানডং প্রদেশে কেউ কেউ সুপারমার্কেটে বসবাস শুরু করেছেন।
এক বিশ্ববিদ্যালয় এমন পরিস্থিতিতে লাইব্রেরি খুলে দিয়েছে ছাত্রদের থাকার জন্য। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা শিগগিরই ছাত্রাবাসের ঘরগুলোতে এসি বসাবে।
চীনের জ্বালানি কর্তৃপক্ষ জানায়, এসি ব্যবহারের কারণে পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ এখন কেবল শীতাতপ যন্ত্রের পেছনেই খরচ হচ্ছে। জুলাইয়ের শুরুতে বিদ্যুৎ চাহিদা রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
কুইংদাও বিশ্ববিদ্যালয়ও জানিয়েছে, তারা গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ছাত্রাবাসের ঘরগুলোতে এসি বসানোর পরিকল্পনা করছে।
জিনান শহরের এক হাইস্কুল শিক্ষার্থী, যিনি সদ্য কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছেন, তিনি বলেন, “আমি কুইংদাও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইছিলাম। কিন্তু ডরমিটরিতে এসি না থাকায় খুব দ্বিধায় ছিলাম। এত গরমে এসি ছাড়া টিকে থাকাটাই কঠিন।”