Published : 23 Sep 2025, 08:19 AM
নরেন্দ্র মোদী সরকারের নতুন পদক্ষেপে কোটি কোটি ভারতীয়র দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপ থেকে কিছুটা কমছে।
দুধ, পাউরুটির মত নিত্যপণ্য, জীবন ও চিকিৎসা বীমা এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধে এখন আর কোনো কর থাকছে না। ছোট গাড়ি, টেলিভিশন ও এয়ার কন্ডিশনারের উপর কর ২৮% থেকে কমে ১৮% হচ্ছে। আর চুলের তেল, টয়লেট সোপ ও শ্যাম্পুর মতো সাধারণ পণ্যে ১২% বা ১৮% কর কমে মাত্র ৫% হচ্ছে।
এই বড়সড় করছাড় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জটিল পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের অংশ, যা চলতি মাসের শুরুতে ঘোষণা করা হয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, এই সংস্কার কর কাঠামোকে সহজ করবে এবং কমতে থাকা ভোগ ব্যয়ের সূচকে গতি আনবে। এই গৃহস্থালি ভোগই ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অর্ধেকের বেশি অবদান রাখে।
বিবিসি লিখেছে, কর ছাড়ের সময়টাও একেবারে নিখুঁত হয়েছে।
কম জিএসটি এমন এক সময়ে কার্যকর হচ্ছে, যখন ভারতে দুর্গা পূজা ঘিরে দীর্ঘ উৎসবের মৌসুম শুরু হচ্ছে। এ সময়েই সাধারণত ভারতীয়রা বড় অঙ্কের কেনাকাটা করেন, নতুন গাড়ি থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত সব কিছু।
প্যাকেটজাত খাবার, পোশাক ইত্যাদি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর বার্ষিক বিক্রির বড় একটি অংশই হয় এই চার মাসে।

বিশ্লেষকরা আশা করছেন, এ কর ছাড় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০% আমদানি শুল্কের চাপ কিছুটা লাঘব করবে, মানুষের হাতে খরচ করার মত অর্থ বাড়াবে এবং দেশের অর্থনীতিতে গতি আনবে।
ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত ১২ বিলিয়ন ডলারের আয়কর ছাড় এবং ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর পরপর এ সিদ্ধান্তটি এসেছে। এসব কিছুই ভোগের প্রবণতা বাড়ার একটি শুভ সংকেত।
রিলায়েন্স, হিন্দুস্তান ইউনিলিভার, মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রার মত কোম্পানিগুলো ভোক্তাদের জন্য দাম কমিয়ে চাহিদা বাড়াতে প্রস্তুত।
গাড়ি নির্মাতারা এই করছাড়ে ভরসা রাখছেন; মোদীর অগাস্ট ঘোষণার পর থেকে তাদের শেয়ার দাম ৬ থেকে ১৭% পর্যন্ত বেড়েছে। ডিলারশিপগুলোতে গাড়ির মজুত থাকলেও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।
মুম্বাইয়ের হিরো মোটোকর্পের একটি বিক্রয়কেন্দ্রে এক বিক্রেতা বিবিসিকে বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুরনায় আগামী দুই মাসে বিক্রি ৩০–৪০% পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
হিরো ইন্ডিয়ার চিফ বিজনেস অফিসার আশুতোষ বর্মা বিবিসিকে বলেন, “প্রথমবার গাড়ির মালিক হওয়ার খরচের বোঝা কমায় গ্রাহকের অনুসন্ধান ও উপস্থিতি বেড়েছে।
হিরো ইন্ডিয়ার বিক্রয়কেন্দ্রে আসা সফটওয়্যার ডেভেলপার বিশাল পাওয়ার বললেন, তিনি এবার ২০০ সিসির বাইক কিনতে চাইছেন।
“উৎসবের ছাড় ও করছাড় একসাথে হলে কেনাকাটার জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হয়। আমি দশেরা উৎসবে বাইক কিনব,” বলেন বিশাল।
গ্রাহক চাহিদা বৃদ্ধির আশা করছে ভোক্তা পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও।

গোদরেজ এন্টারপ্রাইজেসের সাব্যসাচী গুপ্ত বলেন, করছাড় ও ভালো ফলন মিলিয়ে এসির মত ‘অত্যাবশক নয়’- এমন পণ্যের বাজার শহরের বাইরেও সম্প্রসারিত হতে পারে।
তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শেষ মুহূর্তে নতুন দামে লেবেল ছাপানো থেকে শুরু করে চাহিদা সামাল দিতে উৎপাদন ভারসাম্য রক্ষা—সবকিছু নিয়েই কোম্পানিগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
“আমরা পুরনো ও নতুন লেবেল পাশাপাশি রাখছি, যাতে ক্রেতারা তাদের সাশ্রয়টা বুঝতে পারেন,” বলেন সব্যসাচী।
এ করছাড়ের খবর ছোট ব্র্যান্ড ও দোকানদারদের মধ্যে ধীরে পৌঁছচ্ছে এবং অনেকেই বলছেন, এত কম সময়ে দাম ও প্যাকেজিং পরিবর্তনের সক্ষমতা তাদের নেই।
মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ক্রাফোর্ড মার্কেট, যেখানে মশলা থেকে সিকুইন—সবকিছুই বিক্রি হয়; সেখানকার অনেক দোকানদার জিএসটির এই পরিবর্তন সম্পর্কে জানেনই না। যারা জানেন, তারাও বিভ্রান্ত।
ক্রোকারি দোকানের মালিক শেখ রেহমান বলেন, আগেই কেনা পণ্যের কর কীভাবে সামলাবেন তা নিয়ে সরবরাহকারীর সঙ্গে আলোচনা করছেন।

পাশের একটি বিয়ের পোশাকের দোকানে হতাশা দেখা গেছে। সরকার এমন পোশাকে জিএসটি কমিয়েছে, যেগুলোর দাম ২৯ ডলারের নিচে। কিন্তু এর বেশি দামের পণ্যে কর বেড়ে ১৮% হয়ে গেছে।
বিয়ের পোশাক সাধারণত ২৯ ডলারের নিচে হয় না। তার মানে নরেশ জি’র দোকানের প্রায় সব পণ্যেই কর বেড়েছে। এর প্রভাব পড়বে পুরো সরবরাহ চেইনে—কারিগর থেকে ডিজাইনার, খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত।
“ভারতীয়রা বিয়েতে প্রচুর খরচ করেন, আর এখনই বিয়ের মৌসুম শুরু হচ্ছে। এই করবৃদ্ধি হয়ত উৎসবের ঔজ্জ্বল্য কিছুটা কমিয়ে দেবে,” বলেন নরেশ।
তবে সার্বিকভাবে কর ছাড়ের প্রভাব ইতিবাচক হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
রেটিং সংস্থা ক্রিসিল বলছে, কর ছাড়ের ফলে একজন সাধারণ ভোক্তার মাসিক খরচের এক-তৃতীয়াংশ সাশ্রয় হবে এবং মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করবে প্রস্তুতকারকরা এই করছাড়ের কতটা সুবিধা গ্রাহককে দেবেন তার ওপর। করছাড়ের প্রভাব চলতি ও পরবর্তী আর্থিক বছরে ধাপে ধাপে দেখা যাবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
তবে স্বভাবতই এ করছাড়ের জন্যও মূল্য দিতে হবে।
সরকার ধারণা করছে, এতে চলতি বছরে প্রায় ৫.৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব কমে যেতে পারে। তবে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও মুডির মত রেটিং সংস্থাগুলো বলছে, এই ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে এটি বাজেটের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
এই রাজস্ব হ্রাস এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব আদায় গত বছরের তুলনায় প্রথম চার মাসে খুব একটা বাড়েনি, অথচ খরচ ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
মোদী সরকার রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্রহী; ফলে বড় রাস্তাঘাট বা বন্দর নির্মাণের মত ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোতে হয়ত লাগাম টানতে হতে পারে—যেগুলো গত পাঁচ বছরে ভারতের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি ছিল।