Published : 15 Jan 2026, 02:37 PM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানজুড়ে বিক্ষোভ দমনে যে হত্যাকাণ্ড চলছিল তা কমে এসেছে এবং তারা আর বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ভাবছে না বলেই তার ধারণা।
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন ট্রাম্প যে হুমকি ধামকির সুরে কথা বলেছিলেন, বুধবার ওভাল অফিসে করা মন্তব্যে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। তা সত্ত্বেও দেশটিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের শঙ্কা কমেনি বলে ইঙ্গিত বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের।
ট্রাম্প নিজেও ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তবে একাধিক বিশেষজ্ঞ ও আঞ্চলিক কূটনীতিকের আশঙ্কা, মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বিক্ষোভকারীদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ওই পদক্ষেপ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর দমনপীড়নের তীব্রতা বাড়াতে পারে, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি বড়সড় অভিযান চালায়, তেমন ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি সরকার পতন ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে তুমুল বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে, সংখ্যালঘু কুর্দি ও বেলুচদের বিদ্রোহ চাঙা হতে পারে এবং ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অনিরাপদ কারও হাতে পড়তে পারে।
বিষয় সম্বন্ধে অবগত চারটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সাম্প্রতিক এ বিক্ষোভ ইরানের শাসকদের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হলেও এতে সরকার পতনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও আভাস দেওয়া হয়েছে।
“আমাদের অনেকগুলো অস্থির জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে। ছড়ানো-ছিটানো অঘোষিত ফিসাইল পদার্থ রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে, যেগুলোর ওপর কোনো কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শরণার্থীদের প্রবাহ দেখছি, উল্লেখ করার মতো বর্বরতাও ঘটছে।
“শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট সব আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠবে,” বলেছেন ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের বিশ্লেষক বেহনাম বেন তালেবলু।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা নেওয়া ইরানের মোল্লাতন্ত্র দেশের অভ্যন্তরে এবারের বিক্ষোভের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আর পড়েনি। এবার দেশটিতে সরকার উৎখাত করতে চাওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।
২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ইরানি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা একটি গোষ্ঠী নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৬০০-র বেশি বলে দাবি করছে। হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে অনেক বিশেষজ্ঞের অনুমান।
এসব নিয়ে রয়টার্স হোয়াইট হাউস এবং জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দিক থেকে সাড়া পায়নি।
বুধবার ট্রাম্প বলেছেন, ইরানি দমনাভিযানে হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ কমেছে বলে ‘অপর পাশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো’ জানিয়েছে। এর পাশাপাশি তেহরান বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করছে না বলেও তার ধারণা।
তবে তিনি ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়েও দেননি। বলেছেন, “আমরা দেখবো পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে।”
মার্কিন প্রশাসন ইরান থেকে একটি ‘খুব ভালো বিবৃতি’ পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্বেগ
এদিকে ইরানে সম্ভান্য মার্কিন হামলা নিয়ে উপসাগরীয় আরব সরকারগুলোর মধ্যে ‘ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ’ করছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন অঞ্চলটির এক কূটনীতিক।
“মার্কিনি ও ইরানিদের সঙ্গে প্রত্যেক আলোচনায় তারা (উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার) তাদেরকে শান্ত হতে অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছে,” বলেছেন তিনি।
ট্রাম্প এর আগে ইরানে হস্তক্ষেপের যেসব হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছু মার্কিন সেনা সরিয়ে নিচ্ছে এমন খবরে বুধবার তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এর আগে ইরানের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো যে পাল্টা হামলার মুখোমুখি হবে তা প্রতিবেশী দেশগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে সবাই সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন, কেউ কেউ এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানাতেও বসে আছেন।
ইরানি কুর্দিস্তানের কোমালা পার্টির নেতা আবদুল্লাহ মোহতাদি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ জেঁকে বসবে এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, উল্লেখযোগ্য মাত্রার মার্কিন হামলাই কেবল ইরানি নিরাপত্তা রক্ষীদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড থেকে বিক্ষোভকারীদের বাঁচাতে পারে।
“বিশৃঙ্খলা সেখানে এখনই আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা,” বলেছেন সেক্যুলার গণতন্ত্রের পক্ষে প্রচার চালানো শীর্ষস্থানীয় কুর্দি পার্টির নেতা মোহতাদি, যিনি এখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।
তার বিশ্বাস, মোল্লাতন্ত্রের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শাসন ফেরাতে বিরোধী দলগুলোর একসঙ্গে কাজ করতে পারবে।
গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্প এবার কী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে সে বিষয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের সহযোগীরা প্রতীকী সামরিক নিশানায় সংক্ষিপ্ত হামলাসহ একাধিক বিকল্প পর্যালোচনা করে দেখছেন বলে একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বারবার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে ট্রাম্প হস্তক্ষেপ করা ছাড়া বিকল্প রাখেননি। এখন কোনো পদক্ষেপ না নিলে তার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এখন সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কোন নিশানায় হামলা হতে পারে, জিজ্ঞাসা তালেবলুর।
“হামলার প্রকৃতি পরবর্তী দফার বিক্ষোভে প্রভাব ফেলবে কিংবা যদি লোকজন মনে করে ওয়াশিংটনের হামলা প্রতীকী এবং তা ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কোনো অর্থপূর্ণ প্রভাবই ফেলেনি তাহলে তা সমগ্র বিক্ষোভকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে,” বলেছেন তিনি।
ইরানের অর্থের প্রবাহে বাধা দিয়ে কিংবা সাইবার হামলা চালিয়েও ট্রাম্প বড় প্রভাব ফেলতে পারেন, সেক্ষেত্রে বিক্ষোভ আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে, বলেছেন থিংক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যান।
“সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সবাই তাৎক্ষণিক ফলাফল প্রত্যাশা করবে, নাহলে পদক্ষেপে কাজ হচ্ছে না এমন অভিযোগ করবে,” বলেছেন তিনি।
জুনে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর থেকেই ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, বলেছেন হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা।
মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারে প্রেসিডেন্ট যে মোটেও কুণ্ঠিত নন, তা তেহরানের বিরুদ্ধে কথা ও কাজের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদেরও দেখাতে চান, বলেছেন তিনি।