Published : 30 May 2026, 06:44 PM
কর্মজীবনে দীর্ঘদিনের অবিরাম শ্রমের বদলে তরুণ পেশাদারদের কাছে ‘মিনি-রিটায়ারমেন্ট’ বা সাময়িক অবসর ইদানিং জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জেন-জি (তরুণ প্রজন্ম) ও মিলেনিয়ালরা প্রচলিত ক্যারিয়ারের গণ্ডি ভেঙে সাময়িক অবসর নিচ্ছেন।
কী এই সাময়িক অবসর? এটি হল- একটানা দীর্ঘ কর্মজীবন বা অবসরের জন্য ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, কর্মজীবনের মাঝেই কয়েক মাস বা কয়েক বছরের জন্য স্বেচ্ছায় কাজ থেকে বিরতি নেওয়া।
এই সময়টাকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিয়ে, ভ্রমণ করে বা কোনও শখ পূরণ করে, নিজের পছন্দের কোনও কাজ করে বা দক্ষতা বাড়িয়ে তুলতেও কাজে লাগানো হয়। অবসরের এই সময়ে মাসিক উপার্জন বন্ধ থাকলেও পরোয়া নেই। সেই অনুযায়ী আগে থেকে সঞ্চয় করে রাখা হয়। কিন্তু অবসর চাই-ই চাই।
এই সূত্র মেনেই অবসর নেন জেনারেশন জি ও মিলেনিয়ালরা। কিছুদিনের জন্য ছুটি নয়, বরং চাকরিও ছেড়ে দেন তারা। কয়েক মাস এমনকি দু’এক বছর অবসর জীবন কাটিয়ে আবার নতুন চাকরি খুঁজতে শুরু করেন তারা।
কিন্তু কেন এই সাময়িক অবসর? তরুণদের মধ্যে এই জীবনধারা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে আছে কাজের একঘেঁয়েমি থেকে মুক্তি, শারিরীক- মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখাসহ আরও নানা কারণ।
৩৩ বছর বয়সের এক পেশাদার যুবক আলি রশলি অন্য সবার মতোই ভবিষ্যতে অবসরে যাওয়ার জন্য অর্থ সঞ্চয় করেছেন। তবে এর সুফল ভোগ করার জন্য তিনি কয়েক দশক অপেক্ষা করতে রাজি নন।
পেশায় অন্তর্বর্তীকালীন ফাইন্যান্স লিড আলি রশলি গত সাত বছরে দুবার ‘মিনি-রিটায়ারমেন্ট’ বা সাময়িক অবসর নিয়েছেন, প্রথমবার ২০১৯ সালে দুই মাসের জন্য এবং দ্বিতীয়বার গত ২০২৫ সালের নভেম্বরে চার মাসের জন্য।
মালয়েশিয়ায় অ্যাসিস্ট্যান্ট অডিট ম্যানেজার হিসেবে সপ্তাহে ৮০ ঘণ্টা কাজ করার পর চরম মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তিতে ভুগে তিনি প্রথম বিরতিটি নিয়েছিলেন।
রশলি বলেন, “আমি ভাবলাম, যখন একটু জিরিয়ে নিচ্ছি আর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে ভাবছি, তখন দুই মাসের জন্য একটা লম্বা ট্যুর দিয়ে আসি না কেন?” সে সময় রশলির বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১৪,০০০ পাউন্ড (১৮,৮১৫ ডলার), যার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ তিনি নিয়মিত সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতেন।
সেই জমানো অর্থ দিয়ে তিনি বেইজিং থেকে রাশিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত স্থলপথে ভ্রমণ করেন, যাকে তিনি তার জীবনের “সেরা ভ্রমণ” বলে উল্লেখ করেছেন।
ভ্রমণ শেষে নতুন উদ্যমে কাজে ফিরে রশলি লন্ডনের একটি ফাইন্যান্স ফার্মে সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। এতে তার বার্ষিক বেতন প্রায় ছয় গুণ বেড়ে ৮৫,০০০ পাউন্ডে (১,১৪,২৩৪ ডলার) পৌঁছায়।
পরবর্তীতে ক্যারিয়ারে নতুন মোড় নেওয়ার কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রশলি আবার একটি বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এবার তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে চার মাসের জন্য মালয়েশিয়ায় চলে যান।
সেখানে থাকাকালীন নিজের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তিনি দূরবর্তী বা রিমোট ফাইন্যান্স প্রজেক্টের কাজ পেয়ে যান। বর্তমানে তিনি লন্ডনে একজন স্বাধীন ফাইন্যান্স কনট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছেন এবং পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যারিয়ার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করছেন।
রশলি জানান, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেওয়া এসব বিরতি তার ক্যারিয়ারের কোনও ক্ষতি করেনি, বরং গতি বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এটি আপনার ক্যারিয়ারকে পিছিয়ে দেওয়ার বদলে আরও বেশি চাঙ্গা (সুপারচার্জ) করবে।” রশলি প্রতি চার বা পাঁচ বছর পর পর এমন খণ্ডকালীন অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
২০২৫ সালের ‘এইচএসবিসি কোয়ালিটি অফ লাইফ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সচ্ছল বিনিয়োগকারীদের (যাদের অন্তত ১ লাখ ডলারের সম্পদ রয়েছে) মধ্যে জেন জি এবং মিলিনিয়াল প্রজন্মের তরুণরাই এই নতুন ধারা তৈরি করছেন।
তারা অবসর জীবনকে কর্মজীবনের একবারে শেষ প্রান্তের কোনো একক মুহূর্ত হিসেবে না দেখে, কাজের মাঝেই সুপরিকল্পিত দীর্ঘ বিরতি বা খণ্ডকালীন অবসরের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এই প্রবণতার অন্যতম কারণ হল- ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটালি যাযাবর জীবন ও রিমোট কাজের প্রসার। জেন-জি ও মিলেনিয়ালরা কাজ ও জীবন- দু’য়ের স্বাচ্ছন্দ্য ও পরিপূর্ণতায় বিশ্বাসী। এই প্রজন্মের দাবি, একটানা কাজ করা শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিরতি না নিলে পেশাগত জীবনে উৎপাদন ক্ষমতা কমে। মানসিক অবসাদ দেখা দেয়।
তাছাড়া, তারা ভ্রমণ ও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অতীতের গবেষণায় দেখা গেছে, জেন-জিদের ৭৪ শতাংশই বস্তুগত সম্পদের চেয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে বেশি প্রাধান্য দেন। এ কারণে তারা সাময়িক অবসর বেছে নেন।
লাইফ স্ট্র্যাটেজিস ফাইন্যান্সিয়াল পার্টনারসের আর্থিক পরিকল্পনাবিদ কেলি রেনার বলেন, “এভাবে জীবনযাপনে কোনো ক্ষতি নেই।” তবে শর্ত হল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরি নমনীয় হতে হবে, বাজেট করার ভালো অভ্যাস থাকতে হবে এবং এই বিরতির খরচ চালানোর মতো পর্যাপ্ত সঞ্চয় থাকতে হবে।
এর ব্যতিক্রম হলে এই ধরনের বিরতি “আর্থিক বিপর্যয়” ডেকে আনতে পারে এবং জীবনবৃত্তান্তে (রেজুমে) দীর্ঘ কর্মহীনতার কোনও স্পষ্ট কারণ না থাকলে তা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক:
ক্যারিয়ারের পুনর্গঠন: কর্মজীবনের মাঝে বিরতি নেওয়া কোনো পিছিয়ে পড়া নয়, বরং এটি কৌশলগতভাবে নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করার সুযোগ দেয়। রশলির ক্ষেত্রে প্রথম খণ্ডকালীন অবসর তাকে মালয়েশিয়া থেকে লন্ডনে আসার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল এবং দ্বিতীয়টি তাকে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার পথ দেখিয়েছে।
আর্থিক প্রস্তুতি: পর্যাপ্ত সঞ্চয়ই মূলত এই স্বাধীনতা এনে দেয়। আর্থিক পরিকল্পনাবিদ রেনার মনে করেন, যারা নিয়মিত সঞ্চয় করেন, আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করেন, পেনশনে অবদান রাখেন এবং কয়েক মাসের খরচ চালানোর মতো তহবিল আলাদা করে রাখেন, তাদের জন্য এমন ছুটি নেতিবাচক কিছু নয়।
খরচ কমানোর কৌশল: সাময়িক অবসর কাজে লাগাতে হলে সুকৌশলে খরচ কমাতে হবে। যেমন রশলি ও তার স্ত্রী তাদের দ্বিতীয় বিরতির সময় লন্ডনের ভাড়া বাসাটি ছেড়ে দেন, আসবাবপত্র স্টোরেজে রাখেন এবং মালয়েশিয়ায় চলে যান; যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় কম হওয়ায় তাদের এই দীর্ঘ ছুটি সহজে সামলানো সম্ভব হয়েছিল।