Published : 23 Jun 2025, 11:04 PM
পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের সবচেয়ে ব্যস্ত জাহাজ চলাচল পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে বলে যথেষ্টই জল্পনা তৈরি হয়েছিল।
রোববার ইরানের পার্লামেন্টের ভোটে এই প্রণালী বন্ধের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে এবং দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ইরান বন্ধ করবে কিনা, কীভাবে তারা এটা বন্ধ করবে আর তা করলেই বা এর ফল কী হবে- উঠে আসছে সেইসব প্রশ্ন।
হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ পথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। বিবিসি লিখেছে, এই প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্বের অর্থনীতিতে তা গভীর প্রভাব ফেলবে। বিঘ্নিত হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। বেড়ে যাবে তেলের দাম।
বিশ্বজুড়ে পণ্য ও সেবার দামও বেড়ে যেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়েকটি অর্থনীতির দেশ, যার মধ্যে আছে চীন, ভারত এবং জাপানও। বিশ্বে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল আমদানির শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে এই তিন দেশও।
হরমুজ প্রণালী কি? এটি কোথায়?
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথগুলোর অন্যতম এই হরমুজ প্রণালী। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ।
এই প্রণালীর উত্তর পাশে ইরান এবং দক্ষিণপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দু’য়ের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া এই করিডোরের প্রবেশ এবং প্রস্থানপথ প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রশস্ত।
প্রণালীটির সবচেয়ে সরু অংশ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত। এ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই প্রণালীর মূল অংশ বড় জাহাজ চলাচলের জন্য যথেষ্ট গভীর। মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদক ও তাদের কাস্টমাররা এই প্রণালী দিয়েই তেল-গ্যাস আনানেওয়া করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)- এর হিসাবমতে, ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে যেত; যা প্রতিবছর সমুদ্রপথে পরিবহন করা প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি বাণিজ্যের সমতুল্য।
এই তেল কেবল ইরান থেকেই আসেনা বরং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও আসে।
ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করলে ফল কী হবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়, হঠাৎ তা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়বে লাফিয়ে।
শেয়ার বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেবে। আর নিশ্চিতভাবেই উপসাগরীয় দেশগুলো এতে ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ, তাদের অর্থনীতি ভীষণভাবে জ্বালানি রপ্তানির ওপরেই নির্ভরশীল।
উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে রপ্তানি করে। এই পরিমাণ সৌদি আরবের যে কোনও প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি। জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থা ভোরটেক্সা’র হিসাবে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবমতে, তুলনামূলকভাবে ইরান প্রতিদিন রপ্তানি করে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া হিসাবমতে, ২০২৫ সালের অর্থবছরে ইরান ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করেছে। গত এক দশকের মধ্যে এটিই ছিল ইরানের সবচেয়ে বেশি তেল রাজস্ব।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এই বিপুল বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। এশিয়াও ক্ষতির মুখে পড়বে। ভোরটেক্সার হিসাবে, ২০২২ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ৮২ শতাংশ অশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়েছে।
বিশ্ব বাজারের জন্য ইরানের রপ্তানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কেনে চীন একাই। এই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে চীনের জ্বালানি ও পরিবহণ খরচ বাড়বে। আবার উৎপাদন খরচও বেড়ে গিয়ে তা প্রভাব ফেলবে ভোক্তাদের ওপর এবং বিশ্বজুড়ে বাড়বে মূল্যস্ফীতি।
চীনের পর যারা তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক সেইসব এশীয় দেশগুলোও বিপদে পড়বে। ভারতের অশোধিত তেলের অর্ধেক এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৬০ শতাংশই আমদানি হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের অশোধিত তেলের ৬০ শতাংশই পায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। আর জাপান পায় প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
ইরান কীভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে পারে?
জাতিসংঘ বিধি অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ তাদের উপকূলরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (১৩ দশমিক ৮ মাইল) পর্যন্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। তার মানে সবচেয়ে সরু অংশে হরমুজ প্রণালী এবং এর জাহাজ চলাচলপথগুলো পুরোপুরি ইরান এবং ওমানের আঞ্চলিক জলপথের মধ্যে পড়ে।
ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিমাসে ৩ হাজার বা এই সংখ্যক জাহাজ চলাচল বন্ধের চেষ্টা করে তাহলে বিশেষজ্ঞদের মতে, সেটি করার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হল, দ্রুত আক্রমণকারী নৌকা ও সাবমেরিনের সাহায্যে ওই পথে মাইন পেতে দেওয়া।
ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী বিদেশি জাহাজ এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলাও শুরু করতে পারে। তবে বড় আকারের সামরিক জাহাজগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই বিমান হামলা চালাতে পারবে।
ইরানের দ্রুতগতির নৌকাগুলো প্রায়ই জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত থাকে। তাছাড়া, ইরানের আছে পানির ওপর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ, সেমি সাবমেরিন এবং সাবমেরিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা যে সেক্ষেত্রে সামরিক পন্থায় কোনও ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুতই সাগরপথে জাহাজ চলাচল আবার চালু করবে সে ব্যাপারে অনেকেই আস্থাশীল।
যুক্তরাষ্ট্র এরকম কাজ আগেও করেছে। ১৯৮০’র দশকের শেষ দিকে ট্যাংকার যুদ্ধ হিসাবে পরিচিতি পাওয়া ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষই অর্নৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছিল।
ইরাকি তেল নিয়ে যাওয়া কুয়েতি ট্যাংকারগুলো বিশেষত ওই সময় হামলার শিকার হচ্ছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলো এই তেলের ট্যাংকারগুলোকে উপসাগরীয় জলপথ দিয়ে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল।
ইরান কী হরমুজ প্রণালী বন্ধ করবে?
অতীতের অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই ইরান বারবার হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে এসেছে। কিন্তু কখনও তারা সেটি করেনি।
১৯৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে উভয় পক্ষ একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর (ট্যাংকার যুদ্ধ নামে পরিচিত) সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি থাকলেও, সে সময়ও এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কখনও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়নি।
ইরান তাদের দেওয়া হুমকি অনুযায়ী কাজ করলে এবার তা ভিন্নরকম হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানকে এরই মধ্যে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা তাদের জন্য অর্থনৈতিক আত্মহননেরই সামিল হবে। আবার ইরানকে নিবৃত্ত করতে চীনকে হস্তক্ষেপ করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার ফক্স নিউজে এক প্রোগ্রামে রুবিও বলেন, “আমি চীন সরকারকে উৎসাহিত করব যাতে তারা ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কারণ, তারা তেলের জন্য হরমুজ প্রণালীর ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।
“আমাদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিকল্প পথ হাতে আছে। তবে অন্য দেশগুলোও সেইসব বিকল্প পথের সন্ধান করবে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে আমাদের চেয়ে অন্যদেশগুলোর অর্থনীতি অনেক বেশি খারাপ অবস্থায় পড়বে।”
রুবিওর আহ্বানে চীন এখনও সাড়া দেয়নি। তবে ইরানের তেলের প্রধান ভোক্তা হিসেবে চীন কোনেওভাবেই তেলের দাম বেড়ে যাওয়া বা জাহাজ চলাচল পথে কোনোরকম বাধা মানবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
আর সে কারণেই এই গুরুত্বপূর্ণ 'জ্বালানি করিডোর' বন্ধ হওয়া আটকাতে চীন তাদের পূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহার করবে বলেই আশা করা যায়।
জ্বালানি বিশ্লেষক ভান্ডানা হ্যারি বিবিসি-কে বলেন, “হরমুজ প্রণালী বন্ধ করলে ইরানের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। এই প্রণালী বন্ধ হলে ইরান উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিবেশী দেশগুলোর শত্রুতার মুখে পড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ তেলের বাজার চীনের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।”
বিকল্প পথ আছে?
বছরের পর বছর ধরে বার বার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকির কারণে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো একটি বিকল্প রপ্তানি রুট তৈরি করতে উৎসাহী হয়েছে।
ইআইএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন সক্রিয় করেছে। এই পাইপলাইন ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল অশোধিত তেল পরিবহন করতে পারে।
২০১৯ সালে সৌদি আরব সাময়িকভাবে অশোধিত তেল পরিবহনের জন্য একটি প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনকে কাজে লাগায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত তার অভ্যন্তরীন তেলক্ষেত্রগুলোকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেল তেল এই পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে সরবরাহ করা যায়।
২০২১ সালের জুলাইয়ে ইরান ওমান উপসাগরে অশোধিত তেল পরিবহন করতে গোরেহ-জাস্ক পাইপলাইন উদ্বোধন করে।
এই পাইপলাইন দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখনও এই পাইপলাইন চালু করেনি।
ইআইএ-এর হিসাবমতে, এই বিকল্প পথগুলো দিয়ে সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা সম্ভব। এই অংক বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন হওয়া অশোধিত তেলের প্রায় ১৫ শতাংশ।