Published : 10 Jun 2026, 06:29 PM
যুক্তরাজ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে এক ব্যক্তির ওপর ছুরিকাঘাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে শুরু হওয়া এই সহিংসতায় মুখোশধারী একদল ব্যক্তি বেশ কয়েকটি পরিবারের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু যানবাহনে আগুন দিয়েছে। ওদিকে, ছুরিকাঘাতের ঘটনায় এক সুদানিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে হাজির করা হয়েছে।
ছুরি হামলার শিকার ব্যক্তির চোখ হারানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর উত্তর আয়ারল্যান্ডজুড়ে বিভিন্ন স্থানে শত শত বিক্ষোভকারী পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং গাড়িতে আগুন দেয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, জ্বলন্ত বাড়ি থেকে পুলিশকে কয়েকটি পরিবারকে উদ্ধার করতে দেখা গেছে।
রাজনৈতিক নেতারা জানিয়েছেন, জাতিগত সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে এই সহিংসতা চালানো হচ্ছে। বুধবার সকালে দেখা গেছে, বহু বাড়ি ধোঁয়ায় কালো হয়ে আছে এবং কিছু ঘরবাড়ি আগুনে পুরোপুরি পুড়ে গেছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, "এই সহিংসতার কোনো অজুহাত বা যৌক্তিকতা হতে পারে না। মুখোশধারী ব্যক্তিদের এভাবে মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ।"
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, “গতরাতে মানুষজনকে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এটি স্পষ্ট।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড কখনোই বরদাস্ত করা হবে না। দায়ীদের পুরোপুরি আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে।”
উত্তর বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় অভিযুক্ত ৩০ বছর বয়সী সুদানি নাগরিক হাদি আলোদিদকে বুধবার আদালতে হাজির করা হয়।
অভিযোগের শুনানিতে বলা হয়, ছুরি হামলায় ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি চোখ, মুখ ও পিঠে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। পুলিশ আসার আগে স্থানীয় মানুষ হামলাকারীকে প্রতিহত করে ভুক্তভোগীকে বাঁচিয়েছেন বলে জানান সহকারী প্রধান কনস্টেবল রায়ান হেন্ডারসন।
মঙ্গলবার এই হামলার ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভের ডাক আসে। পুলিশ হামলার ঘটনাটিকে এখনই সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করছে না।
তবে এই ছুরি হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন যুক্তরাজ্যে জনরোষ ও বিক্ষোভ সৃষ্টি করা একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন এক ছাত্র। তিনি ছুরিকাঘাতে আহত হলে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে।
এরপর হামলাকারী মিথ্যা দাবি করে বলেন, ওই ছাত্রই প্রথমে বর্ণবাদী হামলা চালিয়েছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্রিটিশ পুলিশ গুরুতর আহত ছাত্রটিকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে উল্টো তাকেই হাতকড়া পরায়। পরে তার মৃত্যু হয়।
মিথ্যা অভিযোগ করা শিখ সম্প্রদায়ের হত্যাকারীর সাজা গত সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের রায় ঘোষণার পর পুলিশের অভিযানের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ পেলে তাতে দেখা যায়, মুমূর্ষু ও নির্দোষ ছাত্রটির আকুতি আমলে নিচ্ছে না পুলিশ।
এই ভিডিওকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক ঝড় ওঠে। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতির মানুষের সঙ্গে পুলিশ কেমন আচরণ করে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতি নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন ইলন মাস্ক। এক্সে দেওয়া পোস্টে মাস্ক পুলিশি অভিযানের সমালোচনা করেন এবং অন্য ব্যবহারকারীদের করা বেশ কিছু মন্তব্যও তিনি পুনরায় পোস্ট করেন।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জনবাদী দলগুলোর দাবি, যুক্তরাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও আশ্রয় নীতি দেশে বিপজ্জনক ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।
অভিবাসীবিরোধী কর্মী টমি রবিনসনের এক পোস্টের জবাবে মাস্ক লেখেন, "বারবার এবং জোরালো প্রতিবাদ করলেই কেবল পরিবর্তন আসবে।"
তবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী নাওমি লং রয়টার্সকে বলেন, কিছু "স্বার্থান্বেষী মহল" সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে বর্ণবাদী উসকানি দিচ্ছে। বিরোধী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অ্যান্ড লেবার পার্টির নেতা ক্লেয়ার হানা এই সহিংসতাকে "বর্ণভিত্তিক নিপীড়ন" বলে বর্ণনা করেছেন।
সহিংসতা দমনে পুলিশ বেলফাস্টের রাস্তায় সাঁজোয়া যান মোতায়েন করেছে। পুলিশ জানায়, পূর্ব বেলফাস্টে প্রায় ১০০ জনের একটি দল বাড়িঘরের দরজা-জানালা ভেঙেছে এবং বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লন্ডনসহ যুক্তরাজ্যজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভও হয়েছে। লন্ডনে বিক্ষোভকারীরা কিছু সময়ের জন্য পার্লামেন্ট চত্বর অবরোধ করে। এছাড়া স্কটল্যান্ডের দুটো বৃহত্তম নগরী গ্লাসগো এবং এডিনবরাতেও বিক্ষোভ হয়েছে।