Published : 19 Feb 2026, 03:26 PM
ভারতের আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স (এআই) ইমপ্যাক্ট সামিটে পূর্বনির্ধারিত এক বক্তৃতার কয়েক ঘণ্টা আগে নিজেকে সম্মেলন থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।
তার এ ঘোষণা এআই ‘পরাশক্তি’ হতে নয়া দিল্লির আকাঙ্ক্ষার জানান দিতে করা সম্মেলনে জোর ধাক্কা হয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
নানান বিশৃঙ্খলা, রোবট কুকুরের মালিকানা নিয়ে জালিয়াতিসহ একাধিক কারণে ভারতের এ এআই সম্মেলনকে নিয়ে বৈশ্বিক গণমাধ্যমে এরই মধ্যে অনেক নেতিবাচক খবর এসেছে।
তারমধ্যে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং ও পরে বিল গেটসের অনুপস্থিতি গ্লোবাল সাউথে হওয়া কৃত্তিম বু্দ্ধিমত্তাজনিত প্রথম বড় সম্মেলনের উদ্বোধনকে অনেকটাই ফ্যাকাশে করে দিয়েছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে ভারত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় বিশ্বজুড়ে অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হিসেবে আবির্ভূত হতে চেয়েছিল।
‘এআই সম্মেলনের মূল অগ্রাধিকারগুলোর ওপরই যেন সবার মনোযোগ থাকে তা নিশ্চিতে’ বিল গেটস তার বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত বক্তৃতাটি দিচ্ছেন না, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনীর অনুপস্থিতির খবর নিশ্চিত করে জানায় তার ফাউন্ডেশন।
তিনি ভারতের এই এআই সম্মেলনে হাজির হচ্ছেন না বলে আগেই কানাঘুঁষা চলছিল। যদিও গেটস ফাউন্ডেশন কয়েকদিন আগে এই ‘গুজবকে উড়িয়ে দিয়েছিল’ এবং বলেছিল, বিল গেটস নির্ধারিত সময়েই উপস্থিত হওয়ার পথে রয়েছেন।
কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন এবং তার উপস্থিতির কারণে ভারতের এআই সম্মেলন নতুন বিতর্কের মুখে পড়তে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই বিল গেটস শেষ মুহূর্তে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত মাসে মার্কিন বিচার মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইলসের’ সর্বশেষ নথিগুলোতে প্রয়াত বিনিয়োগকারী ও দণ্ডিত যৌন নিপীড়ক এপস্টেইনের সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের কর্মীদের ইমেইল আদান-প্রদানের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিল গেটস বলেছেন, তার সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক কেবল দাতব্য কর্মকাণ্ডজনিত আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা করাটা ‘ভুল হয়েছিল’ বলেও স্বীকার করে নেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এআই প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই, ওপেন এআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ও অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই।
কিন্তু প্রযুক্তি জায়ান্টদের শীর্ষ কর্তাদের এ উপস্থিতি মার খেয়ে গেছে ব্যবস্থাপনাজনিত ত্রুটিতে। ভারতের প্রথম এ বড় এআই সম্মেলনের ‘অগোছালো’ অবস্থা ও পরিকল্পনায় ঘাটতি নিয়ে নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
বৃহস্পতিবার আচমকা প্রদর্শনী হলগুলো দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়ায় সম্মেলনস্থলে দোকান ও প্যাভিলিয়ন বসানো কোম্পানিগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
এ সিদ্ধান্তের কারণে সম্মেলন কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার খুব বেশি মানুষজন দেখা যায়নি, অথচ আগের তিন দিন ছিল লোকে লোকারণ্য।
বুধবার নয়ডার গ্যালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মী চীনে বানানো এক রোবট কুকুরকে নিজেদের বলে দাবি করার পর ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়, এরপর কর্তৃপক্ষ ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে স্টল খালি করার নির্দেশ দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সম্মেলনস্থলে যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ দিল্লির একাধিক সড়কও বন্ধ করে নিয়েছে, যে কারণে ২ কোটি জনসংখ্যার শহরটির অন্য রাস্তাগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে; কোথাও কোথাও সড়কে বিশৃঙ্খলাও দেখা দিয়েছে।
কিছু রাস্তা যান চলাচলের জন্য বন্ধ; পর্যাপ্ত ট্যাক্সি নেই এবং কর্তৃপক্ষও কোনো শাটল গাড়ির ব্যবস্থা রাখেনি, এ অবস্থায় মাইলের পর মাইল হেঁটে অনেক অংশগ্রহণকারীর সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ভিডিও বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েও পড়ে।
এ ধরনের একটি ভিডিও রি-পোস্ট করে সরকারবিরোধী রাজনীতিক মহুয়া মৈত্র এক্সে লিখেছেন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা বিশ্বজুড়ে ভারতের সুনামে দাগ লাগিয়ে দিচ্ছে।
এত কিছুর পরও সম্মেলনে আদানি গ্রুপ, মাইক্রোসফট ও ডাটা সেন্টার কোম্পানি ইয়োটাসহ অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই ভারতের এআই প্রকল্পগুলোতে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আগামী দুই বছরের মধ্যে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা ভারত সরকারের। তবে দ্রুত এসব প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্যাপারে বিশ্লেষকরা সতর্কও করছেন। তাদের ভাষ্য, একের পর এক এ ধরনের মেগাপ্রকল্প ভারতের বৈদ্যুতিক গ্রিড ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।