Published : 28 Jun 2026, 11:09 PM
ব্যাংক খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ জানতে চান, ব্যাংক বাঁচাতে অর্থ দেওয়ার আগে যারা ঋণখেলাপি হয়েছে, যারা ব্যাংকের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
গেল ১১ জুন সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ঋণ কেলেঙ্কারি’ ও আর্থিক সংকটে জেরবার ব্যাংকগুলোকে ‘দুর্বল’ ব্যাংক হিসেবে তুলে ধরে সেগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফেরাতে ‘ঝুঁকিভিত্তিক’ তদারকি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছেন।
একই সঙ্গে এমন ব্যাংকের রক্ষায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরকার ব্যয় করছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিরোধী দলের চিফ হুইপ বলেন, “ব্যাংকিং খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন এই সরকার এসে বদল করেছে, সংস্কার করে যারা ঋণখেলাপি ছিল, যারা দেশের টাকা পাচার করেছিল, তাদেরকে আবার সুযোগ দিচ্ছে।”
ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের অপরাধকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “যারা ঋণখেলাপি ছিল, যারা দেশের টাকা লুট করেছে, বিদেশে পাচার করেছে আর যারা গণহত্যা করেছে, তাদের অপরাধ আমি খুব ভিন্ন কিছু দেখি না।”
এস আলম, সিকদার, জেমকন, বেক্সিমকো, নাসা ও ওরিয়নসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নাম তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, যারা দেশের অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে।
তিনি বলেন, এসব ঋণ অনিয়ম ও অর্থপাচারের সঙ্গে শুধু ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রও জড়িত ছিল।
“এস আলমের দুর্নীতি, এটার সাথে রাষ্ট্র জড়িত ছিল। সেই সময় ডিজিএফআইকে দিয়ে সে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে।”
নাহিদ বলেন, এখন সরকার যদি শুধু শেয়ারহোল্ডারের বিষয় হিসেবে দেখে, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে আবার তাদের শেয়ার ফেরত দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
“কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, তারা সেই সময় রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছে।”
অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নতুন আইন করার প্রস্তাব দেন নাহিদ।
তিনি বলেন, “এই ধরনের অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে নতুন আইন লাগবে এবং তাদের সম্পদ অথবা তারা যে সকল সম্পদ দেখিয়ে ঋণ নিয়েছিল, সেগুলাকে জাতীয়করণ করা প্রয়োজন।”
সেই সম্পদ থেকে টাকা উদ্ধার করে ব্যাংক খাতে ফেরত দেওয়ার কথা বলেন বিরোধী দলের চিফ হুইপ।
“সেই টাকা দিয়ে আপনি ব্যাংককে আবার ফেরত দেন। ব্যাংকিং খাতকে আপনি আবার একটি স্থিতিশীল জায়গায় নিয়ে আসেন।”
সীমান্ত হত্যা
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, এই সরকার আসার পর সীমান্তে প্রায় ১০ জনের মতো বাংলাদেশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অবৈধ বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ‘পুশ ইনের’ চেষ্টাও চলছে।
নাহিদ বলেন, “আমরা এই বাজেট অধিবেশনে পুশ ইন নিয়ে একটা আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। আমরা জানি না কোন কারণে এই আলোচনাটা আমাদেরকে করতে দেওয়া হয়নি।”
বিএনপির নামের সঙ্গে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দ আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকার কীভাবে কাজ করে, তা তারা দেখতে চান।
ফ্যামিলি কার্ড
বাজেটের কাঠামো নিয়ে সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও নানা সংকটের মধ্যে বাজেট দেওয়া অর্থমন্ত্রীর জন্য দুরূহ কাজ ছিল।
“যেকোনো অর্থমন্ত্রীর একটা বাজেট পেশ করা আসলেই অনেক দুরূহ কাজ, দুঃসাধ্য কাজ।”
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষের হাতে টাকা দিলে তা অর্থনীতিতে খরচ হবে, এতে টাকা হাতবদল হবে। কিন্তু এর মাধ্যমে উৎপাদন বা বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হবে না।
“ফ্যামিলি কার্ড বা এই প্রকল্পের মাধ্যমে আপনি ‘কনজাম্পশন ডিমান্ড’ তৈরি করতেছেন। আপনি কিন্তু ‘প্রোডাকশন ডিমান্ড’ বা ‘ইনভেস্টমেন্ট’ তৈরি করতেছেন না।”
তার মতে, দেশে উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধু ভোগচাহিদা বাড়ালে মানুষ ভারতীয় বা চীনা পণ্য কিনবে। এতে আমদানি বাড়বে, মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি
বিদ্যুৎ খাতের জরুরি আইনের অধীনে করা চুক্তিগুলো নিয়ে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, তা জানতে চান তিনি।
“আপনি আদানি চুক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন? আদানির সাথে যে চুক্তি হয়েছিল, আপনি সামিটের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন? আপনি এস আলমের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন?”
এই চুক্তিগুলোতে দুর্নীতি হয়েছে প্রমাণ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লড়াই করতে হবে মন্তব্য করে নাহিদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছিল। এখন সরকার তা কাজে লাগাবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিক খাতের সঙ্গে যুক্ত আরেক বড় সংকট হিসেবে দেখছেন নাহিদ।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম না কমলে দেশে বিনিয়োগ আসবে না, শিল্পকারখানার খরচও কমবে না।
তার বক্তব্য, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করছে। এই ভর্তুকির টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণের কর থেকেই আসে।
নাহিদ বলেন, “আমরা জানি ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে প্রতিবছর ৯৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে সরকারকে।”
সংস্কার
বিএনপির ৩১ দফায় অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন ও সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের কথা ছিল দাবি করে নাহিদ বলেন, “অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন কোথায় গেল? সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন কোথায় গেল? তাহলে এগুলো কি জাতির সাথে প্রতারণা নয়?”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর ৫ অগাস্টের মধ্যে খুলে দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, “শোনা যাচ্ছে যে সরকারের একটা অংশ জাদুঘরটাকে খুলতে দিচ্ছে না। আমরা জানি না এটা সত্য কিনা। আমরা আশা করব এই কথাটা যাতে সত্য না হয় এবং ৫ অগাস্টের মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর ওপেন করা হয়।”