Published : 28 Jun 2026, 11:24 PM
বছর খানেক আগে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ীকে মাথা থেঁতলে হত্যার যে ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, সেই ঘটনার দ্রুত বিচার আর মনোবেদনার কথা বলতে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চায় নিহতের পরিবার।
নির্মমভাবে প্রাণ হারানো সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বলছেন, “কারো হাত ধরে যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারতাম।
“তাকে আমরা সোহাগকে হারানোর কথাটা বলতে পারতাম। আমরা কেমন অভাবে আছি, জানাতে পারতাম।”
২০২৫ সালের ৯ জুলাই বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে প্রকাশ্যে কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে শরীর ও মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয় ভাঙারি ও পুরনো তারের ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে। সেই ঘটনার এই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, ওই হত্যাকাণ্ডে যাদের অংশ নিতে দেখা গেছে এবং নেপথ্যে যাদের নাম আসছে, তারা সবাই পূর্ব পরিচিত। তাদের কয়েকজন সোহাগের ব্যবসার সহযোগীও ছিলেন একসময়। ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধে এমন ভয়ংকরভাবে কাউকে হত্যা করা হতে পারে, তা পরিচিতজনদের ধারণারও বাইরে।
এ ঘটনায় সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় মামলা করেন। গত ৮ ডিসেম্বর ২১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক মনিরুজ্জামান।
অবশ্য অভিযোগপত্রে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকার কথা জানিয়ে মামলাটি ফের তদন্তে পরে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তাই। ঢাকার মহানগর হাকিম নাজমিন আক্তার গত ২০ জানুয়ারি আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
এর মাঝে বদলি করা হয় পরিদর্শক মনিরুজ্জামানকে। মামলার তদন্তভার পড়ে ওই থানার পরিদর্শক শাহ মো. ফয়সাল আহমেদের ওপর। তিনি ২১ জনের বিরুদ্ধে গত ১০ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ২১ জুন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর আদেশ দেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই কামরুল ইসলাম জানান, মামলার নথি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন—মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজিব ওরফে সজিব বেপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রুমান বেপারী, আবির হোসেন, জহির, ইমরান হোসেন, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার ও জিয়াউদ্দিন রাজি।
তাদের মধ্যে ৮ জন পলাতক এবং ৯ জন কারাগারে আছেন; বাকিরা রয়েছেন জামিনে।
পলাতকরা হলেন—জহির, ইমরান, শারাফাত ওরফে শফিউল, জিয়াউদ্দিন রাজিব, হোসেন চৌকিদার, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে লম্বা মনির ও অপু দাস।
কারাবন্দিরা হলেন—মহিন, আলমগীর, লম্বা মনির, নান্নু, সজিব, টিটন, তারেক রবিন, জহিরুল, পারভেজ।
নিহতের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, “আমার ভাইকে কি নিষ্ঠুরভাবে খুন করছে! দেশের এমন কেউ নাই যে বিচার চায়নি; আমরা সবাই বিচার চাই।

“বাংলাদেশের মানুষ দেখছে কি নির্মমভাবে সোহাগকে খুন করা হয়েছে; এভাবে কেউ কাউকে খুন করতে পারে? ওরা মানুষ না, পশু।”
বাদী বলেন, “আমরা তিন ভাই-বোন, একমাত্র ভাইটাকে খুন করল। সোহাগের স্ত্রী অসুস্থ। ওর স্ত্রী আর দুই ছেলে-মেয়ে আমাদের সাথে থাকে। ওদের তো আর কেউ নাই। বাবার জন্য কান্না করে। ওদের আর কি আছে?
“বিচার পাইলে একটু শান্তি পাবে। বললে পারবে—না, বাবার হত্যাকারীদের বিচার পারছি। এজন্যই তো কোর্টের বারান্দায় দৌড়াচ্ছি।”
নিজেদের আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরে মঞ্জুয়ারা বলেন, “আমাদের অবস্থা খুব একটা ভালো না। সোহাগের ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে। ওদের একটা খরচ আছে। আবার খাওয়া-দাওয়া সবকিছু মিলিয়ে কষ্টের মধ্যে আছি। মামলার পেছনেও অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।
“কারো হাত ধরে যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারতাম। তাকে আমরা সোহাগকে হারানোর কথাটা বলতে পারতাম। আমরা কেমন অভাবে আছি, জানাতে পারতাম। একটু সাক্ষাৎ চাই তার। তাকে বলতাম, আমাদের মামলার বিচারটা যেন দ্রুত শেষ করে।"
বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল বলেন, “এটা একটা আলোচিত মামলা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ মামলা জট, সেই হিসাবে মামলার খুব একটা বেশি বিলম্ব হয়নি। আরও এগিয়ে যেত যদি অভিযোগপত্রে আসামিদের নাম-ঠিকানা ভুল না হতো। এ কারণে পুনরায় মামলাটি তদন্তে চায়।
“প্রায় চার মাস পর সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছে। অভিযোগ গঠন হয়ে গেলে মামলার বিচার শুরু হয়ে যাবে। মামলার বিচার শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষকে সহযোগিতা করব। ভিকটিমের পরিবার যেন ন্যায় বিচার পায়, সেই চেষ্টাটাই করব।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসরুর হোসাইন বলেন, “আসামিদের অব্যাহতির বিষয়ে শুনানি করবো। যদি অব্যাহতি পেয়ে যায়, তাহলে তো পেলই। না পেলে ক্লাইয়েন্টের পক্ষে আইনি লড়াই লড়ে যাব।”